Sunday, January 29, 2017

মেনিমুখো

আকাশ ঝকঝকে নীল তখন। কাঠফাটা রোদ্দুর। ঘাসগুলো সব শুকিয়ে হদ্দ। এমনই নিষ্প্রাণ একটা দুপুর যে তানসেনের মেঘমল্লার মুখ থুবড়ে পড়লে শুকনো কুয়োর মধ্যে।

খিদে মরে গেছিল ভদ্রলোকের। বারান্দায় পাতা তক্তপোষে গা এলিয়ে কপালের ঘাম মুছতেই দেখতে পেলেন আকাশের এক কোণে আচমকা এক ফোঁটা কালোর ছোপ, বাতাসের তাপ অল্প নুয়ে পড়লো বোধ হয়।  টুকরো মেঘটা দেখতে অবিকল একটা বেড়ালের মাথার মত, দু'জোড়া কান সহ।

**

মায়ের কথা মনে পড়লেই মেঘ কেটে যায়। সঞ্জীববাবু ভূতে বিশ্বাসি না হলেও মায়ের গন্ধ টের পান সহজেই। আশেপাশে। এই লেখাটায় তিনি ফিরে আসেন শুধু মেঘ জমলে। মায়ের জন্য লেখা কিনা। মায়ের কথা। ঝাপসা আকাশ, ঝাপসা চোখ আর কলমের খসখস।

ক্রমশ লেখা ফুরিয়ে আসে। কয়েক টুকরো মেঘ আর মায়ের সুবাস গায়েব হয়ে যায়। ঠিক যেমন আজ এক চিলতে আকাশের কালো মুছে নীল বেরিয়ে এলো। সে নীলটুকু যেন অবিকল মেনির মুখ।

Tuesday, January 24, 2017

বেগুনপোড়া

বেগুনপোড়া।
সর্ষের তেল, নুন, কাঁচালঙ্কা (যথেষ্ট পরিমাণে) আর কুচো পেঁয়াজ দিয়ে মেখে।

গরম ভাতে সেই বেগুনপোড়া চটকে নিয়ে।

মুখে প্রথম দলায় গায়ে জুড়বে কবিগন্ধ।
দ্বিতীয় দলায় ঘাড়ের কাছে সদ্য গজিয়ে ওঠা ডানার ফরফর।
তৃতীয় দলায় পায়ের তলায় মেঘমেঘ তুল তুল।
আর চতুর্থ দলা চিবুনোর সময় বুকের ভিতর শতরঞ্চি পেতে জাঁকিয়ে বসবেন জগজিৎ সিং, তার হারমোনিয়ামে "দেশ মে নিকলা হোগা চাঁদ"।

পঞ্চম দলায় ছাতের নিভু নিভু আলোয়। পার্ট ওয়ানে ব্যাক পাওয়া প্রেমিকের জামা ধরে টান দেবে উচ্চমাধ্যমিকি হাত।

"কিচ্ছু ভেবো না, ঠেলেঠুলে দু'জনে পাশ করলেই বিয়ে। এক জোড়া পাথরকুচির মত খুচরো দু'টো চাকরী। সপ্তাহে তিন দিন বেগুন পোড়ার গন্ধে মাত করে দেবো বাড়ি। আমি খুব ভালো করে মাখতে পারি, দিদার কাছ থেকে শেখা। রেস্টুরেন্টের মুর্গ ভর্তাকে ফেল করিয়ে দেওয়া সে বেগুন পোড়া। তুমি শুধু চিন্তা কোরো না, কেমন? আমি সামলে নেব ঠিক"।

অরোরা বোরিয়ালিস

- খবর কী?
- শুভেন্দু! তুই?
- অবাক হয়েছিস?
- হাহ্! হব না? কদ্দিন পর বল তো? অবাক হব না?
- আমি ভেবেছিলাম তুই অরোরা বোরিয়ালিস দেখে চমকেছিস।
- কী?
- দ্যাখ। আকাশে...।
- আরিব্বাস। কিন্তু..কিন্তু...কলকাতায়...।
- সবুজ আলো রে। সবুজ। কালোর মধ্যে ছেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। দেখ।
- তা বলে কলকাতায়...।
- শিউলিদির জিওগ্রাফি ক্লাস। মনে পড়ে? একটা গোটা ক্লাস জুরে অরোরা বোরিয়ালিসের গল্প।
- জ'গ্রাফি।
- মনে পড়ে?
- শুভেন্দু, তুই এখন কোথায়?
- ক্লাস ফাইভে ট্রেকার কেনার প্ল্যান হয়েছিল মনে আছে? আমি ড্রাইভার, তুই খালাসী।
- ড্রাইভার খালাসী হলে মদ খেতে হবে, সে চিন্তায় একটু পিছিয়ে এসেছিলাম।
- সে অসুবিধে এখন তো আর নেই খোকা।
- ট্রু। বীরভূমের গ্রাম টু গ্রাম। দিনে ছ'টা ট্রিপ। বারো ঘণ্টা।
- করক্ট। দেহাতি গান শেখার কথা ছিল। ঢোল কেনার কথা ছিল।
- তুই কেমন আছিস শুভেন্দু?
- সন্তুদাকে মনে পড়ে?
- ডিউসে খেলতে গিয়ে মুখ ফেটে গেছিল।
- মাসখানেক আগে একটা ট্রাক এসে মুখ ফাটিয়ে দেয়। এবার আর ষোলোটা স্টিচে কাজ হয়নি।
- কী বলছিস?
- সন্তুদা পিকনিকে চিকেন কষা রাঁধত, সে স্বাদ মনে আছে? "অমৃত,অমৃত" করে আমরা লাফাতাম।
- কী হয়েছে শুভেন্দু? আমরা এখানে এসেছি কেন?
- তোর লিপিকে লেখা চিঠিগুলো। উফ, আমায় কত যে গ্রামার শুধরে দিতে হয়েছে।
- তুইও তো ওকে...।
- তুই বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। লিপিফিপি আবার কে? লিপি এসে অফ ব্রেকে বালকসঙ্ঘের খেপে খেলানো ব্যাটসম্যানগুলোকে ঘায়েল করবে? তুই চিঠিতে বানান ভুল করবি, আর তোর ক্যাপ্টেন হয়ে আমি সেটা বরদাস্ত করব ভেবেছিস?
- শুভেন্দু। আমাদের এই ভাবে দেখা হচ্ছে কেন? তুই ঠিকঠাক আছিস?
- তুই ভাল আছিস বাবু?
- চাকরীবাকরি দিব্বি চলছে। ফ্যামিলি ফ্রন্টে স্মুদ। ফটোগ্রাফিতে একটু নামডাক হয়েছে রে আজকাল।
- খবর পাই।
- সামনেই একটা এগজিবিশন। ঠিকানা দে, ইনভিট পাঠাই।
- আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না। কেমন আছিস?
- তুই পাশে থেকে কেন খোঁজ নিস না? আমাদের গত দশ বছরে একবারও দেখা হয়নি কেন?
- তুই এড়িয়ে থেকেছিস বাবু। ব্যস্ত থেকেছিস।
- রাগ দেখাতে আমায় এখানে নিয়ে এসেছিস?
- না। তুই কেমন আছিস? সেটা জানতে।
- ফোটোগ্রাফি ক্লাবের ইয়ারদোস্তদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি।  ক্লাব হপ্তায় একবার কয়েক পেগ। কল্যিগরা রয়েছে। লাইকমাইন্ডেড যত...।
- এরা কারা? তুই ভালো আছিস?
- তুই নেই শুভেন্দু।
- এড়িয়ে গেছিস।
- তোর ফোন নম্বরটা সেই যে হারিয়ে গেল...। তোর ঠিকানাটাও...আর কারুর সঙ্গেই যোগাযোগ নেই যে তোর নম্বর...।
- লিপি?
- বছরদুয়েক আগে একবার...ওর নম্বর অবিশ্যি আছে।
- ওই গেল অরোরা বোরিয়ালিস জলে। তোর অ্যালার্ম বাজছে।

**

- হ্যালো।
- লিপি, হ্যালো। আমি...।
- আরে বাবু! তুই? কেমন আছিস? কী ব্যাপার বল দেখি? এদ্দিন পর? একটা ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে খুব মাতব্বর হয়েছিস, না?
- আমি বেশ আছি। তোরা কেমন আছিস? তোর মেয়ে কেমন আছে?
- খুব্ ভালো। সে এখন স্কুল যাওয়া শুরু করেছে।
- আইব্বাস। ইয়ে, একটা দরকার ছিল।
- কী দরকার?
- তোর কাছে শুভেন্দুর কন্ট্যাক্ট নম্বর আছে?
- কী ব্যাপার বল তো বাবু? ঠিক দশ মিনিট আগেই শুভেন্দু ফোন করেছিল তোর নাম্বার চেয়ে। আমার কাছে তোর নম্বর সেভ করা ছিল না তাই দিতে পারলাম না।

Saturday, January 21, 2017

ফতুয়া

মোহনবাবু রোজকার অভ্যাস মতই দিব্যি পায়চারি করছিলেন বাড়ির সামনের অন্ধকার গলিটায়। রাতে খাওয়ার পর একটু হাঁটাহাঁটি করলে ডাইজেশন ত্বরান্বিত হয়। এর মাঝে হঠাৎ কেন যে  পকেট থেকে সিগারেটের বাক্সটা বের করে একটা গোল্ডফ্লেক ঠোঁটে ঝোলাতে গেলেন।

ঠোঁটের ঝুলন্ত সিগারেটের ডগা তো আর ফস্‌ করে আপনা থেকে জ্বলে যাবে না। দেশলাই চাই। কিন্তু পকেটে দেশলাই নেই। অবশ্য পকেটে দেশলাই নেই বলে চিন্তা হচ্ছে না। মোহনবাবুর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ অন্য কারণে। সিগারেটের প্যাকেট তাঁর পকেটে এলো কী করে? সিগারেটের ধোঁয়া যে তাঁর অসহ্য লাগে।

সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর তিন দিন ধরে থেকে অচেনা রুমাল, বোরোলিনের টিউব, নস্যির ডিবে; এমন অসংখ্য খুচরো জিনিসপত্র মোহনবাবুর ফতুয়ার বাঁ পকেটে এসে জমা হওয়া শুরু হল। আচ্ছা ফ্যাসাদ। মোহনবাবুর বুকে সর্বক্ষণ ঢিপঢিপ, এই বুঝি ফের উটকো কিছু তাঁর পকেটে এসে উদয় হলো।

মোহনবাবু ফতুয়া পরা ছেড়েই দিলেন। বলা বাহুল্য, যে ছাড়তে বাধ্য হলেন। দু'টো দশটাকার নোট, ক্যারমের স্ট্রাইকার, হোমিওপাতির শিশি পর্যন্ত ঠিক ছিল। সেদিন দুপুরে ছাতে পায়চারি করার সময় আচমকা ফতুয়ার বাঁ পকেট থেকে বেরোলো একটা পোস্টকার্ড। "প্রাণের মৃন্ময়ী" বলে লেখা। হাতের লেখা গোলমেলে, তবে পড়তে অসুবিধে হয় না। প্রেমিক জানাচ্ছেন যে মৃণ্ময়ীকে না পেলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। মৃণ্ময়ীদেবীর ঠিকানাও লেখাই ছিল কিন্তু পোস্ট করা হয়নি। একবার ভাবলেন এই মৃন্ময়ী সান্যালের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে তদন্ত করে আসবেন। তারপর ভাবলেন "ধুর ছাই কাঁচকলা"। চিঠিটাকে তোষোকের তলায় কবর দিলেন মোহনবাবু। আর সেদিন থেকে ফতুয়া পরা ছাড়লেন। স্রেফ হাফ শার্ট। রাতে শোয়ার সময় স্যান্ডো গেঞ্জি।

কিউরিওসিটি কিল্‌স দ্য ক্যাট। ফতুয়াহীনতার তিন নম্বর দিনে আর কৌতূহল দমন করতে পারলেন না মোহনবাবু। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে অফিসের জামা কাপড় ছেড়েই লুঙ্গির সঙ্গে গায়ে চাপালেন তাঁর পছন্দের নীলে হলুদ ফুল ফুল ছোপের ফতুয়া। গড়িয়াহাটের ফুটপাথ থেকে কেনা। আধ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হল না। বাঁ পকেট থেকে এবার বেরোলো মানিব্যাগ। মানিব্যাগে ভিজিটিং কার্ড আর কোম্পানি আই কার্ড। ভাস্কর সামন্ত। বাড়ি গড়িয়া।

ভাস্করবাবু বেশ ঘাবড়ে গেলেন ফোনটা পেয়ে। কোথাকার কে মোহন দত্ত! সে জানলে কী করে যে তাঁর সিগারেট, নস্যির ডিবে, ক্যারমের স্ট্রাইকার হারিয়ে যাচ্ছে ? হারিয়ে যাওয়া মৃণ্ময়ীকে লেখা চিঠিটাই বা ও পেল কী করে? অবিশ্বাস করার কারণ নেই, পুরো চিঠিটা পাঠ করে শুনিয়েছেন সে ভদ্রলোক।

মোহন দত্তের সঙ্গে দেখা করে সবচেয়ে ভালো ব্যাপার যেটা হল সে'টা হচ্ছে যে এদ্দিনের ধন্দটা কেটে গেল। গোটা  ব্যাপারটা এখন ভাস্করবাবুর কাছে জলবৎ । যাক্‌। ফতুয়ার ডান পকেটে জিনিস রাখা মাত্রই হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছিল না। যা হোক, ব্যাপারটা এইবার সাফ। তবে এই মোহন দত্ত লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়। মৃণ্ময়ীকে লেখা চিঠিখানা পুরোটা পড়ার সাহস ও পায় কোথা থেকে?

মাঝেমধ্যেই এই ভূতুড়ে ব্যাপারটা আজকাল ঘটছে। মৃণ্ময়ী বুঝে উঠতে পারছে না এটা কেন হচ্ছে। এটা কি কোনও ব্যামো? কে জানে। তবে দুমদাম করে তার চোখের সামনে দিয়ে খুচরো সব জিনিস মুহূর্তের জন্য ভেসে যাচ্ছে। হুশ্‌ করে উদয় হয়ে ফুস্‌ করে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। অনবরত। কখনও বোরোলিনের টিউব, কখনও সিগারেটের বাক্স, কখনও পোস্টকার্ড। মাঝে দু'তিনদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু আজ আবার মৃণ্ময়ীর চোখের সামনে দিয়ে একটা মানিব্যাগ সাঁইসাঁই করে উড়ে চলে গেল। মানিব্যাগের চামড়ার রঙ আবার ক্যাটক্যাটে খয়েরী। ভাস্করের মানিব্যাগটার কথা মনে পড়ে গেল মৃণ্ময়ীর। ভাস্কর এমন ভাবে চুপ করে গেল কেন? এই তাঁর ভালোবাসা?

মৃন্ময়ী নামটা কিছুতেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না মোহনবাবু।

১০
ভাস্করবাবু জানেন যে তাঁর চোখ তাঁকে ঠকাবে না। কোয়ালিটি রেস্টুরেন্টের কেবিনে যার গায়ে বারবার হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছিলো মৃণ্ময়ী, সে যে ওই মোহন দত্তই, সে'টা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই ভাস্করবাবুর। ছ'টা টেবিল দূরে বসেও ব্যাপারটা তাঁর কাছে দিনের আলোর মত স্পষ্ট।

১১
টিউবলাইটের ফেলে দেওয়া লম্বা নলের মত প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিয়ে একটা ম্যাজিক সুড়ঙ্গ বানিয়েছিল বিট্টু। আর সেই সুড়ঙ্গের এক দিকে চোখ রেখে অদ্ভুত সব জিনিষ পত্রের ছুটে চলা দেখতে পারত সে। কী দারুণ। কোনও দিন নস্যির ডিবে, কোনও দিন ক্যারমের হলুদ স্ট্রাইকার। কোনও দিন পুরনো দশটাকার নোট, এমন কত কী।  সবকিছু বিট্টুর ম্যাজিক নলের মধ্যে ছুটে বেড়াতো। একদিন একটা বেঢপ খয়েরী মানিব্যাগও দেখতে পেয়েছিল সে। এ'টা কাউকে বলেনি বিট্টু, বাবা মাকেও না। ও জানতো ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু যে'দিন সাপটাকে দেখা গেছিল সেই যাদু সুড়ঙ্গে, সে'দিন সেই টিউবলাইটের কাগুজে প্যাকেট ফেটে সুড়ঙ্গ নষ্ট হয়ে গেছিল। সাপের ছটফটে বোধ হয়।

১৩
মোহনবাবু আর মৃণ্ময়ী দু'জনেরই মারা যাওয়ার কথা ছিল; যন্ত্রণায় বুক ফেটে। কিন্তু বিচিত্র জীবন। যন্ত্রণা বুকে নিয়ে টিকে থাকতে হল দু'জনকেই। এক মাত্র ছেলেটা শেষ পর্যন্ত সাপের কামড়ে মারা গেল? বিট্টুর ঘরে ওই বিষাক্ত কেউটে এলোই বা কী করে?

১৪
কালী সাপুড়ে সুনাম বদনাম দুইই আছে।  ওই কালকেউটেকে ছোঁয়ার সাহস ভাস্করবাবুর হয়নি। কালীই ঢুকিয়ে দিয়েছিল ভাস্করবাবুর ডান পকেটে। আর ম্যাজিকের মত, পকেটে পড়তেই সে সাপ গায়েব।

১৫         
কেউটেটা জলে যাওয়ার খুব আঘাত পেয়েছিলেন ভাস্করবাবু। তিনদিনের মাথায় ফের সেই কেবিনেই ওদের আবার দেখতে পাওয়া। ঢলাঢলি বেড়েছে বই কমেনি। সেদিন রাত্রের ট্রেনেই কলকাতা ছেড়ে হাঁফ ছেড়েছিলেন ভদ্রলোক।  

Friday, January 20, 2017

সুবিমলবাবু ও সারকাজম

সুবিমলবাবুর ঘেমেনেয়ে একাকার। আড়াই ঘণ্টা ধরে কম্পিউটর স্ক্রিনে চোখ রেখে বসে আছেন। হাতের আঙুলগুলো কীবোর্ডে জুড়ে খলবল করে চলেছে অথচ  ফেসবুকের স্টেটাস মেসেজের বাক্সটা খাঁখাঁ করছে।

আড়াই ঘণ্টা ধরে।

কালো কফি যথেষ্ট তেতো মনে না হওয়ার প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিসের মলাটের কোণটা খানিক চিবিয়ে নিলেন। তাতেও বিশেষ লাভ হল না। অ্যাশট্রে থেকে সিগারেটের পোড়া ফিল্টার তুলে অল্প চুষেও কোনও হেলদোল টের পাওয়া গেলনা। মাথার চুল ছিঁড়েও কিছুতেই একটা অ্যাসিড মাখানো লাইন মাথা থেকে বের করে ফেসবুকে ঠুসে দিতে পারছিলেন না সুবিমল সান্যাল।

কোয়াড্রেটিক ইকুয়েশনে তার ছোটবেলা থেকেই বিরক্তি। কিন্তু খটমট কয়েকটা ইকুয়েশন মনে করেও পর্যাপ্ত ভাবে মেজাজটাকে খিঁচড়ে দিতে না পেরে রীতিমত হাঁফিয়ে উঠলেন সুবিমলবাবু।

যে কোন বিষয়ে একটা সারকাস্টিক কিছু টাইপ করতে পারলেই এই অম্বল আর গলাবুক জ্বালাটা পাশ কাটিয়ে দেওয়া যেত।

উপায় না দেখে "ডিপ্রেসিং নিউজ টুডে" বলে গুগল সার্চ করে মিনিট দশেক কাটালেন। জ্বালাময়ী কিছু তবুও গলা বেয়ে উঠে এলো না, এ এক আচ্ছা জ্বালা হয়েছে।

তারপর ড্রয়ার থেকে খিস্তি অভিধান বের করে কয়েক মিনিট চোখ বুলোলেন। একটু উত্তেজনার সঞ্চার হলো বটে, তবে তাতে সারকাজমের হাঁড়ি গরম হওয়ার কথা নয়।

তখনই মায়ের ডাকে চমকে উঠলেন সুবিমলবাবু।

- এ কী! এত অস্থির কেন খোকা?
- এ কী! তুমি জ্যান্ত কেন মা?
- না না। আমি বেঁচে নেই। ভয় পাস না।
- মরে গেছ বলে ভয় পাব না নাকি মরেও কথা বলছ বলে ভয় পাব না?
- গুলিয়ে গেলো। মোদ্দা কথা ভয় পাস না। এটা জাস্ট স্বপ্ন।
- ওহ। আই সী।
- অমন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে আছে খোকা?
- আসলে...আসলে কিছুতেই...কিছুতেই...।
- কিছুতেই কী?
- কিছুতেই সারকাস্টিক কিছু মাথায় আসছিল না মা।
- বিদ্রূপাত্মক কিছু?
- বিদ্রূপ বললে ব্যাপারটা যথেষ্ট মজবুত হয় না মা। বিদ্রূপ কেমন আলুনি। যেন ফেনাভাতে ঘি পড়েনি। সারকাস্টিক হতে হবে। ফাউল কাটলেটে কাঁটাচামচের মত খচাৎ করে ঢুকে যাবে সে চীজ। বুঝলে মা?
- তোর মাথায় কত চিন্তা রে খোকা।
- প্রেশার মা। সেলস টার্গেটে এত চাপ নেই। বেহালার ভাঙা রাস্তায় রানিং মিনিবাসে উঠতে এত চাপ নেই। দুনিয়ার যত টেনশন শুধু একটাই ভাবনায়; যথেষ্ট সারকাস্টিক হতে পারছি তো? মাঝেমাঝে মনে হয় একটা গাইডবই হলে ভালো হত। সারকাজম মেড ইজি গোছের।
- গাইড বই জানিনা। তবে খোকা, সারকাজম রপ্ত করার জন্য একটা ক্র‍্যাশ কোর্স আছে। করবি?
- মাইরি মা? রিয়েলি?
- নিজের ডায়রেক্ট এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলছি।
- কী কোর্স বলো তো?
- বিয়ে। বিয়ে করে ফেল খোকা। দেখবি জিভে সারকাজমের চাষ হচ্ছে।
- উফফ! মরে ভূত হওয়ার পরেও আমার স্বপ্নে এসে "বিয়ে কর বিয়ে কর" বলে ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছ? তুমি মা না পিরামিড?
- দ্যাখ দ্যাখ খোকা, বিয়ের নাম শুনেই কেমন সারকাস্টিক বনে গেলি সহজে। তাই বলছি, এবারে বিয়ে কর।

**

ঝিমুনি ভাবটা কেটে যেতেই ফেসবুক স্টেটাস আপডেট লেখার বাক্সটা বন্ধ করে দিলেন সুবিমলবাবু। আজ হঠাৎ নীলাকে পিং করার ইচ্ছে হল। পার্সোনাল মেসেজ দিয়ে। মেয়েটা বড় ভালো, বড্ড স্নেহের। সারকাজমের কলার টেনে যদি ধরতেই হয়, তাহলে তার মধ্যে অল্পবিস্তর স্নেহ থাকলে মন্দ হয় না।