Wednesday, January 4, 2017

ক্যান্ডিডেট

- আপনার বায়োডেটা বেশ ইম্প্রেসিভ্‌।

- থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। ও'টা আমার নিজের হাতে টাইপ করা। বাড়ির কম্পিউটারে। প্রিন্ট নিতে অবশ্য সুপারনেট সাইবার ক্যাফেতে যেতে হয়েছিল। আমাদের বাড়ির পাশেই, জাস্ট আট দশ পা।

- ডিটেইলিঙের দিকে আপনার একটা ন্যাক আছে দেখছি।

- এইটে আমি পেয়েছি মূলত করবেট পড়ে। শিকারি মানুষ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এলিমেন্টের প্রতি ওঁর নজর বেশ সমীহ করার মত।

- করবেট আপনার প্রিয় মিস্টার সেন?

-  আমায় অমিয় বলেই ডাকবেন প্লীজ। আমি আপনার থেকে অন্তত বারো বছরের ছোট। নাকি তেরো? ডেফিনিটলি নট মোর দ্যান চোদ্দ।  অবিশ্যি, এজ গ্যাপটা আজকাল খুব ইলিউসিভ জায়গায় চলে গিয়েছে। যাক, করবেটের কথা বলছিললাম। তবে শুধু করবেট কেন? বিভূতিভূষণ টু বুদ্ধদেব গুহ; সমস্তই গুলে খাওয়া। আসলে জঙ্গল আমার বড্ড প্রিয়। অবিশ্যি আমার আর আপনার বাসও তো জঙ্গলেই। তাই না স্যার?

- জঙ্গল?

- কলকাতাকে জঙ্গল না বলে কোনও উপায় আছে?

- আচ্ছা, আপনি প্রোফাইলটা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল তো?

- পুরোপুরি। ইনফ্যাক্ট, আমার স্ট্রেন্‌থের সাথে খাপে খাপ। আই মিন, নিজেকে অপটিমাইজ করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

- কোনও রেকমেন্ডেশন লেটার টেটার...।

- বিনুদা নিজে লিখে দিয়েছেন।

- বিনুদা?

- বিনয় হালদার।

- এমএলএ বিনয় হালদার?

- প্লাস কয়লা টাইকুন। ওঁর কথাই বলছি।  ওর সুপারিশের চিঠি আমার বায়োডেটার সঙ্গেই অ্যাটাচ করা, বারো নম্বর অ্যানেক্সচার।

- গুড। কাজটা কিন্তু একটু সিরিয়াস। আর কনফিডেনশিয়াল।

- যে কোনও ব্যাপারেই অতিরিক্ত সিরিয়াস হয়ে যাওয়াটা আমার একটা বদরোগ স্যার। যেমন ধরুন, গোঁফ ছাটতে আমি স্কেল ইউজ করি। বা ধরুন ক্রিকেট দেখতে বসি ডায়রি নিয়ে, যাতে নিজে থেকে স্কোর রেকর্ড করতে পারি। চ্যানেলের স্কোরকার্ডকে অন্ধ বিশ্বাস করব এমন বান্দা আমি নই। আর কনফিডেনশয়াল ব্যাপারে আই অ্যাম লাইক আ ফায়ারপ্রুফ সেফ্‌। আমার শ্বাশুড়ি, বেলাগাছিয়ায় থাকেন আমার অডিটর শ্বশুরমশাই আর আমার প্রফেসর বড় শালার সাথে। এমনিতে নাইস লেডি। রান্নার হাত ফেলনা নয়, পোস্তটা তো রিমার্কেবল। যে'টা বলছিলাম। আমার মায়ের একটা স্পেশ্যাল রেসিপি আছে বুঝলেন। মাটন আলাদীন, একটু আরব্য ট্যুইস্টে অমৃত। তো আমার শ্বাশুড়ি আমায় দু'বছর ধরে পারস্যু করছেন রেসিপিটার জন্য। একবার তো পুজোয় আমায় স্যুইস ঘড়ি অফার করে বসলেন, ওভার অ্যান্ড অ্যাবভ আদ্দির পাঞ্জাবি। অফ কোর্স অ্যাস ব্রাইব। ঘড়িটা নিলেও রেসিপির ব্যাপারে মায়ের ট্রাস্ট বিট্রে করিনি। এমন কী মিসেস্‌কেও রেসিপীটা বলে দিইনি। বুঝতেই পারছেন স্যার, মা মেয়ের কেমিস্ট্রি কোনও কনফিডেনশিয়লিটির তোয়াক্কা করে না।

- আই সী। কোয়াইট অ্যাপ্রিশিয়েবল। দেখুন এখানে মাইনেকড়ি কিন্তু তেমন সুবিধের নয়। যে ছেলেটি ছেড়ে গেছে তার মূল গ্রিভান্স টাকাপয়সাতর ব্যাপারেই ছিল।

- মাইনেকড়ি নিয়ে মাথা ঘামানোর লোক যে আমি নই সে'টা আমার ফ্যামিলি ট্রি স্টাডি করলেই ধরতে পারবেন স্যার।  তিন জেনারেশন মিলে চার জন সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। বাবা নিজে সাত্যিক মানুষ ছিলেন, বেশি টাকার লোভ তাকে নকুলদানার ডিলারশিপ থেকে কেরোসিনের ডিপোর দিকে ঠেলতে পারেনি কোনওদিন। সেজকাকা নক্সাল করেছিল আড়াই মাস।

- আই সী। বেশ ইম্প্রসিভ। আপনার আগে অবিশ্যি আরও জনা দশেকের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়ে গেছে। ফাইনাল খবর আগামীকালের মধ্যে...।

- খুব ভালো করেছেন আমায় ছাড়াও অন্য ক্যান্ডিডেটদের ইন্টারভিউ নিয়ে। মুড়ি না চিবুলে মুড়কির স্বাদ টের পাবেন কী করে বলতে পারেন? মাসলোর পিরামিডের মাথায় তো আর হেলিকপ্টারে করে নামতে পারবেন না। নীচ থেকে ধাপে ধাপে উঠে যেতে হবে। হুড়োহুড়ি করেছেন কি ক্যালামিটি।

- বেশ। আপনার ইন্টারভ্যিউ এখানেই শেষ। আপনার কোনও প্রশ্ন না থাকল আপনি এখন আসতে পারেন।

- প্রশ্ন একটা ছিল স্যার।

- বলুন।

- আপনাদের ওয়াশরুমে হ্যান্ডওয়াশটা জল দিয়ে ডাইলুট করা আছে। সামান্য টু পাইস বাঁচাতে গিয়ে হাইজিনে কম্প্রোমাইজটা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে না?

- আমাদের অ্যাডমিন ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নেব। আপনি কাল ফোন করে বরং জেনে নেবেন, হ্যান্ডওয়াশটা ডাইলুট করা কেন হয়েছে।

- চমৎকার। সেকেন্ড হাফের দিকে ফোন করব তো স্যার?

- বেশ।

- তাহলে ওই আড়াইটে থেকে তিনটের মধ্যে করব। সাড়ে তিনটে থেকে একটা ম্যাটিনির টিকিট কাটা আছ।

- গুড বাই।

- ওকে। আসি স্যার। আর ইয়ে, চাকরীর কনফার্মেশনটা ফোনে নয়, চিঠিতেই দেবেন। কেমন? অন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট থাকলে সুবিধে। মিডল ক্লাস পারস্পেক্টিভ, বুঝতেই পারছেন।

- অফ কোর্স। এবার আসুন। পরের ক্যান্ডিডেট অপেক্ষা করছেন।

- ওহ হো। বটেই তো, বটেই তো। একবার ডেকে নেওয়া হয়েছে যখন ওদের ইন্টারভিউ না নিলে খারাপ দেখাবে। আপনি বরং সে পাট চুকিয়ে নিন। আমি আসি। আর হ্যান্ডওয়াশের গড়বড়টা একটু দেখবেন স্যার, কেমন? মনে একটা খুঁতখুঁত নিয়ে গেলাম।

Tuesday, January 3, 2017

অমন হয় মাঝে মাঝে

- এহ হে।
- উঁ।
- না শুনুন, এমন ক্যালামিটি আমি ইউসুয়ালি কখনও ফেস করিনি।
- ঠিক আছে। তুমি বাবু, তুমি এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? টাকা তো আমি নিয়েছি।
- না তবুও। তবুও। আমি বেশ রুদ্ধশ্বাস মোডে ঢুকে যাই সহজে। আজ কী যে হলো...।
- অমন হয় মাঝে মাঝে।
- সে কী। না না। আমার এমনটা মাঝে মাঝেই হয় না। ইন ফ্যাক্ট এর আগে কখনও হয়নি। আজই হলো। আসলে টাকা দিয়ে কোনওদিন এ'সব...।
- আমিই বোধ হয় গণ্ডগোল করেছি কিছু, পরের দিন আসবেন। অন্যভাবে করে দেব, দেখবেন ঠিক হচ্ছে।
- এই না! এ কী! আমি এ'ভাবেও খুব ভালো ভাবে করে থাকি। দীপিকা বলত আই ডু ইট লাইক আ হর্স। উফ। দীপিকার কথা আবার মনে পড়ে গেল।
- দীপিকা তোমার বউ ছিল? না গার্লফ্রেন্ড?
- গার্লফ্রেন্ড কে বিয়ে করার জন্য সব কিছুই রেডি ছিল।
- দীপিকা তো?
- না দীপিকার দিদি। আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল। ওকেই বিয়ে করার জন্য সব ঠিকঠাক, শুধু পাকা কথার দিন দীপিকাকে ছাত দেখাতে নিয়ে গেলাম। ছাতের ঘরে...গোলমাল হয়ে গেল। ঘটনাটা গোলমাল নয় অবিশ্যি। কিন্তু ছিটকিনি লাগাতে ভুলে যাওয়াটা গোলমেলে। ওর দিদি দুম করে..
- তুমি কী হারামি ব্যাটাছেলে গো...।
- এ মা না! আসলে আমি খুব সেনসিটিভ। দীপিকাও। আর আমাদের যাবতীয় সেনসিটিভিটির মেজর পোরশনটাই ওর দিদিকে সেন্টার করে। শুধু ও বুঝল না, বিয়েটা ভেস্তে গেল।
- তোমার নরকে স্থান হবে গো?
- নরক? স্বর্গ? এই বিজনেসে আমি তোমাদের অনেক বেশি প্র্যাক্টিকাল ভাবতাম। ক্লোজার টু মার্ক্স।
- ঢ্যামনা ব্যাটাছেলে। বেরো।
- এই সেন্ড অফ্‌টা কি আমার এই পারফরমেন্সের কথা মাথায় রেখে? বিশ্বাস করুন ব্যাপারটা অন্যরকম। আসলে এখানে আসার আগে আমি কাফকা, ডিমনিটাইজেশন, বগলের গন্ধের দূর করার ঘরোয়া টোটকা আর গ্যামাক্সিন মিলিয়ে একটা অদ্ভুত চিন্তাভাবনার দলা নিয়ে ড্যালা পাকাচ্ছিলাম। সে জন্যেই এখানে ঠিক...।
- উফ্‌! কী বাজে কথা বলতে পারে রে বাবা লোকটা। দিব্যি আকাশের তারা গুনছিলাম। আচমকা বউনির লোভে একটা অকালকুষ্মাণ্ডকে ঘরে ঢোকালাম। ধ্যেত্তের।
- তারা? ওই পশ্চিমের জানালা দিয়ে? তুমি জানো ওখানের অনেক এমন তারা আছে যাদের আলো এই দুনিয়ায় এসে পৌঁছতে কয়েক লক্ষ বছর লাগে? ওই যে একদম বাঁ কোণের তারাটা, সে তারা হয়ত তুমি আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আদতে সে তারা কয়েক হাজার বছর আগে নষ্ট হয়ে গেছে।
- ওই যে তারা, যে'টা আমি দেখতে পাচ্ছি, সেটা আদতে নেই?
- থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। নার্ভাস লাগছে না সে'টা শুনে?
- এই হারামি, এবার বেরো না।
- এ কী! বাইরে অন্ধকার যে। অন্ধকারে মাথার ওপর ছাদ না থাকলে আমার প্যালপিটেশন বাড়ে। গত পাঁচবছর ধরে হোমিওপাতির ওষুধ খাচ্ছি এই ফোবিয়া কাটাতে, কিন্তু তেমন লাভ পাইনি।
- রাতে আমি কিন্তু আর ছুঁতেও দেব না।
- অফ কোর্স। আপনার কাছে মৌরি আছে?
- জর্দা চলবে?
- জর্দায় আমার জিভ শুকিয়ে আসে। জিভের দেশে জর্দা অনেকটা ডেমোক্রেসির মত।
- ফের হাবিজাবি কথা! নাহ, তোকে আর সহ্য হবে না। বেরো। এখুনি বেরো। বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে শুয়ে থাক গে যা।
- বেশ। শুধু একটা কথা আর একটা প্রশ্ন। প্রথমে কথাটা বলি। দেখুন, ব্যাপারটা যা দেখলেন তা নয়। প্রয়োজনে দীপিকার ফোন নাম্বার আমি দিয়ে যাচ্ছি আপনাকে। জিজ্ঞেস করে নেবেন। ওই পজিশনে আমি এক্সেপশনাল। আমি ঠিক টারজানের মত, স্কচের মত, গরম রুটিতে নরম পাটালির মত। আর প্রশ্নটা হল, ভগবানের রেসপন্স পেয়েছেন কোনওদিন? মানে ঘরের একটা ঠাকুরের আসন পাতা দেখছি। ক্লায়েন্ট অ্যাকুইজিশনে মাসী বেশি হেল্প করে না ভগবান? আসলে অফিসে প্রমোশনটা নিয়ে এত ঝুলিয়ে রেখেছে। বড়সাহেবের প্রেফারেন্স ওই ব্যানার্জীর দিকেই। তাই ভাবছিলাম, অয়েলিংটা কোন দিকে ফোকাস করানো উচিৎ, বড়সাহেবের দিকে না ভগবানকে ইকুয়েশনে আনব। কমিউনিজমে আত্মার চিঁড়ে আর ভিজছে না বুঝলেন।
- তুই বেরোবি না পুলিশ ডাকব?

সিনেমা ঃ Shadows and Fog

Monday, January 2, 2017

কলকাতার মেসিয়াহ্ : তৃতীয় পর্ব

- আসুন।
- না মানে...।
- আসুন। বসুন।
- -আসলে...।
- আগে বসুন। তারপর না হয় আসল নকল শোনা যাবে।
- থ্যাঙ্কস।
- আমি বিপাশা।
- ও।
- ভালো?
- হুঁ?
- নামটা। ভালো?
- দিব্যি।
- পিপাসার সাথে ছন্দে মেলে।
- ঠিক। বিপাশার সাথে ছন্দে। পিপাসা কুয়াশা হতাশা আমাশা...।
- থামো। কী বিটকেল গো তুমি। সোহাগ করতে এসে আমাশা?
- আসলে আমি...।
- কী? আসলে কী?
- আমি ঠিক সে কারণে আসতে চাইনি।
- হুঁ? ইয়ার্কি হচ্ছে?
- না। সত্যি।
- টাকা দেবে তো?
- মাসী পাঁচশো বলেছিল। দিয়ে ঢুকেছি।
- তুমি বড় ডেঁপো। দু'শো ছাড়ো। আলাদা করে।
- এই যে।
- ও। রহিস মাল।
- মাল?
- বাবু বলব?
- আচ্ছা, মালই থাক।
- দু'শোর কথা আবার মাসীকে বলতে যেও না।
- আন্ডার দ্য টেবল। সেটা বুঝেছি।
- এবার বলো...।
- আমার নাম বিশ্বরূপ গঙ্গোপাধ্যায়।
- এই দ্যাখো। এখানে আবার কেউ নামধাম বলতে আসে নাকি। কাজ করো, করে ভাগো। দেখে তো মনে হয় কচি..।
- থার্ড ইয়ার।
- এসো, জলদি করো। বসিয়ে রাখলে রেট বাড়বে।
- শুনুন, আমি এসেছি অন্য দরকারে।
- ঠ্যাং ভেঙে দেব। ইয়ার্কি হচ্ছে?
- শুনুন। খুব জরুরী কাজ। আমার কাছে আরও একশো বাহান্ন টাকা আছে।
- কী দরকার?
- শম্পা মণ্ডলকে চেনেন?
- শম্পা মণ্ডল? সে কে?
- ওহ। আপনিও চেনেন না। আমার কাছে একটা ছবি আছে। দেখবেন? যদি চিনতে পারেন?
- তুই পুলিশের ছেলে নাকি? হারামজাদা লাশ ফেলে দেবো...।
- মাইরি বলছি সে'সব না। আমি কলকাতায় পড়াশোনা করছি। আমার কলেজে আইকার্ড দেখবেন?
- বেরো। এখুনি বেরো।
- পায়ে পড়ি দিদি। একটু হেল্প করবেন প্লীজ? বড় দরকার আমার শম্পাকে। আর মেয়েটাও বিপদে, ওর আমাকে দরকার।
- তোকে দেখে তো ভদ্র বলেই মনে হয়।
- শম্পার আমাকে বড় দরকার।
- শম্পা কে?
- ঝুড়িমতি গ্রামের মেয়ে। বীরভূম জেলা। আমাদের গ্রাম।
- তোর কে হয়?
- বিয়ে করার কথা ছিল। মানে। চাকরী পেলে। কিন্তু...।
- কিন্তু?
- আমরা বামুন। বাবার অনেক পয়সা। ওরা ছোট জাত। বাপ নেই। অভাব। কোনও বাজে বদনামে মা সুইসাইড করল। তারপর সব কেমন হুড়মুড় করে পালটে গেল। এই, বছরখানেক আগেই। না বলে কয়ে ও পালিয়ে গেল। গাঁয়ের কেউ আর ওকে দেখেনি। ঝুড়িমতির দারোগা খবর দিয়েছিল ও কলকাতায় এসে...এসে...।
- এসে?
- এসে...।
- লাইনে নেমেছে?
- এই প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটেই আশেপাশেই নাকি কোথাও এসে...।
- ও। আমাদের মত। লাইনের মেয়ে।
- ও বাধ্য হয়েছে। বিশ্বাস করুন। গাঁয়ে থাকলে ওরা ওকে ছিঁড়ে খেত।
- কে স্বেচ্ছায় আসে রে আপদ? তা, তুই ওকে খুঁজছিস কেন?
- ওই। বিয়েটা বাকি আছে।
- বাপ মা হুড়কো দিলে হিম্মত উড়ে যাবে।
- টিউশন করে মাসে হাজার টাকা পাই। সে টাকায় মাসে দু'বার এ পাড়ায় আসি। যদি দেখতে পাই ওকে। বা কেউ যদি খবর দিতে পারে। এক জায়গায় দু'বার আসি না। তবে জায়গাটা এত বড়...। বেশিরভাগ সময়ই সবাই টাকা নিয়ে খেদিয়ে দেয় পাগল ভেবে, আপনি তবু শুনলেন।
- শোন, এখানে এসে সবাই নতুন নাম নেয়, শম্পা আর নেই। ছবিটা দেখা।
- এই..এই যে। দেখেছেন একে?
- নাহ, চেনা ঠেকছে না। তবে...ছবিটা রেখে যাবি?
- যাব। মাঝে মাঝে আসব? খবর নিতে?
- নয়তো কি আমি যাব তোর বাড়ি বয়ে খবর দিতে?
- থ্যাঙ্ক ইউ বিপাশাদি। আমি টাকা দেব...।
- ঠ্যাং ভেঙে দেব।
- না মানে...।
- ওর খোঁজ পেলে কী করবি?
- পড়াশোনা ছেড়ে দেব। প্রচুর টিউশানি করব।  আমি খুব ভালো পড়াই গো। ক্লাস এইট থেকে ট্যুয়েলভ। তারপর একটা মাথা গোঁজার জায়গা। আর মন্দিরে বিয়ে।
- তুই পাগল।
- শম্পাও বলত।
- যদি ওর দেখা পাস, আমায় ডাকবি তোদের বিয়েতে?
- গড প্রমিস।
- বেশি ইংরেজি মারাস না। এই দু'শো টাকা রাখ। আর দু'হপ্তা পর আসিস। আর শোন, সন্ধ্যে বেলা বিজনেস। তুই দুপুরে আসিস।
-বেশ।

**

- আচ্ছা অজয়দা, বিশ্বরূপদার সাথে মেসের কেউ কথা বলে না কেন?
- আমি বলি তো।
- হ্যাঁ, কিন্তু তুমি ছাড়া আর কেউ...।
- তোকে দেখলাম পড়া বোঝাচ্ছে সেদিন। মানে তুইও কথা বলিস।
- বিশ্বরূপদা আমাদের যে কোন প্রফেসরের চেয়ে ভালো পড়া বোঝায়, জানো?
- দ্যাখ অরূপ, ছেলেটা ব্রিলিয়ান্ট।
- আর কী নম্র। কিন্তু মেসের বাকি ছেলেরা কেন বলে বিশ্বরূপদা অত্যন্ত খারাপ ছেলে? মিশলে গোলমাল হতে পারে?
- বিশ্বরূপের অত্যন্ত গোলমেলে জায়গায় নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সে সম্বন্ধে নিশ্চিত খবর আছে। আর খুব শীগগির ওকে মেসছাড়া হতে হলেও অবাক হব না।
- গোলমেলে জায়গা?
- প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট। রেগুলার ওকে ওদিকে যেতে দেখা যায়। চার্জ করলে অস্বীকারও করে না।
- প্রেমচাঁদ...বড়াল। ওই ব্র...ব্রথে...ব্রথে..।
- বৌয়ের বাজার।
- ওহ হো। বৌবাজার। কিন্তু বিশ্বরূপদা যে গোলমেলে...তা বিশ্বাস করতে কিছুতেই মন সরছে না।
- বিশ্বাস আমারও হয় না। তবে বিপুলা এ মেসের কতটুকুই বা জানি....বাদ দে। শিউলি মাসীকে একবার হাঁক দে,  ডিনার রেডি হল কিনা দেখ।

(চলবে)

কলকাতার মেসিয়াহ্‌ - দ্বিতীয় পর্ব

- ও অজয়দা!
- কী?
- গাঁজা খায় না, খিস্তি করে না। মদ কোনওদিন ছুঁয়েও দেখেনি। এমনকি আধুনিক কবিতাও লেখে না।
- কে?
- ওই যে। নতুন ছেলেটা।
- অরূপ।
- হুঁ। এমন নেতানো রুমমেট পেয়ে বড্ড চিন্তা হচ্ছে। সন্ধ্যে হলেই পড়তে টড়তে বসবে না তো?
- বসলে অন্তত তোর খানিকটা উপকার হবে রে বল্টে। পার্ট ওয়ানের রেজাল্টের পর বাড়িতে তিন মাস ঢুকতে পারিসনি। ভুলে যাস না।
- এ মেসই আমার বাড়ি। বাবার বুর্জোয়া সেটআপ আর সহ্য হয় না।
- বটে?
- নয়তো আর বলছি কী।
- তা মেসবাড়ির খরচটাও তো সেই বুর্জোয়া ফান্ড থেকেই আসছে খোকা।
- নিজেকে রবিনহুড হিসেবে দেখি। তখন আর চিন্তা থাকে না। বাপের অগাধ আছে। আর আমার বাবার টাকা মানে তো ব্যাঙ্কের ফুর্তি। তার থেকে মাসে হাজার খানেক আমার পিছনে গেলে দেশের মঙ্গল, দশের মঙ্গল।
- নিজেকে দেশ আর দশের সাথে ইকুয়েট করছিস?
- বাহ্‌! মেসের ফিফ্‌টি পার্সেন্ট সিগারেট কনসাম্পশনের সোর্স আমার প্যাকেট ঝেড়ে। সে'বেলা? বাপের টাকার বেনিফিট আমি একা ভোগ করছি, সে'টা তুমি বলতে পারলে?
- তা অবিশ্যি ঠিক। তবে দেখিস, অমন সোনার হাঁসের মত বাপের পেটটা হুট্‌ করে চিরে দিস না। মেসশুদ্ধ পথে বসতে হবে। তুই না থাকলে মাসের শেষ দিকে দেলখোসার কাটলেট জোটাবে কে? তাই বলছি। পার্ট ট্যু তে দয়া করে ভদ্রস্থ নম্বর জুটিয়ো।
- ভর সন্ধ্যে বেলা নম্বর তুলে কথা বললে অজয়দা?
- তা, নতুন সে শর্মাটি কোথায়?
- ছাদে।
- ছাদে?কেন?
- বাবুর ফ্রেশ এয়ারের দরকার বড় ঘনঘন পড়ে।
- ফ্রেশ এয়ার? তোকে বলেছে? যে ফ্রেশ এয়ারের জন্য ছাদে যায়?
- সিগারেট খায় না যখন এ রুমে ভ্যাপসা লাগাটা স্বাভাবিক। তবে প্রিসাইসলি সে দরকারেই ছাদে যায় কিনা সে'টা জিজ্ঞেস করিনি। ওর পাশের টেবিলে আমার পানু ওমনিবাস দু'দিন রেখে দিয়েছিলাম। ছুঁয়েও দেখেনি। খালিফা মাল। আর ওর তাক ভর্তি শুধু সিলেবাসের বই। ওকে খামোখা প্রশ্ন করার রিস্ক নিই না।
- রিস্ক না নিলে হবে? সিনিয়ররা যদি জুনিয়রদের গ্রুম করতে এগিয়ে  না আসে তাহলে তো এ মেস ভেসে যাবে!
- ওকে গ্রুম করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। সাংঘাতিক পিস।
- সাংঘাতিক? অরূপ?
- সাংঘাতিক বলে সাংঘাতিক? গভীর জলের ডলফিন। গতকাল মেসের ওই চালানি মাছের ট্যালট্যালে ঝোল দিয়ে চেটেপুটে ভাত খেয়ে বলে 'তোফা'।
- বটে?
- তা শুনে হেঁসেলের শিউলি মাসী স্ট্রেট ইপ্রেস হয়ে গেলো। আড়াই বছর ধরে মেসে আছি, এই প্রথম আমি শিউলি মাসীকে হাসতে দেখলাম।
- অ। তা প্রেমিকরা একটু অমন সাংঘাতিক হয়ে থাকে। ও নিয়ে ভাবার কিছু নেই। এ শর্মা মেসের প্রতিভা চিনতে ভুল করে না। অরূপ এ মেসে দিব্যি সেট হয়ে যাবে।
- অরূপ প্রেম করে? ওইটুকু ছেলেটার প্রেমিকা আছে?
- সবাই কি তোমার মত দেওয়ালে চে আর সোনালি বেন্দ্রের ছবি লাগিয়ে খতম হয়ে যাবে? ও ছেলের এলেম আছে।
- এলেম থাক। তাই বলে ওই দুধেভাতে ছেলের প্রেমিকা থাকবে?
- গা জ্বলছে?
- না তা না। তবে ইয়ে অজয়দা, তুমি শিওর? ও তোমাকে বলেছে?
- পার্সোনাল লেভেলে ডিসেক্ট করা হয়নি। তবে ও ছেলের অ্যাকাউন্টেন্সির বইয়ের ফাঁকে গোলাপি খাম। তার ওপর সোনালী স্পার্কেলের রঙে মেয়েলি হাতের লেখায় 'অরূ' লেখা।
- অরূ? সুখেন দাসের স্যান্ডো গেঞ্জি লেভেলের প্রেম তো।
- আঙুর ফল দিয়েই অবিশ্যি ওয়াইন হয়।
- যা বলেছ। দেশলাই আছে তোমার কাছে? আমার লাইটারটা বোধ হয় প্রদীপ্ত মেরে দিয়েছে।

(ক্রমশ)

কলকাতার মেসিয়াহ্‌ - প্রথম পর্ব

- তুমিই নতুন?
- হ্যাঁ। নতুন।
- নাম?
- অরূপ। অরূপ ভট্টাচার্য।
- মেদিনীপুর?
- না বর্ধমান জেলা। দুর্গাপুর।
- এখানে কোন কলেজ?
- গোয়েঙ্কা। ডে। ওই, বউবাজারের দিকে।
- কমার্স?
- হ্যাঁ।
- অ। তা বউবাজারে তো মেসবাড়ি কম নেই ভাই। ঠেঙিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট এলে মেসের খোঁজে?
- আসলে বাবাই দেখেশুনে...।
- ওহ্‌। ফাদার্স ওবিডিয়েন্ট সান্‌।
- ওই...।
- ভালো ভালো। ওবিডিয়েন্স ব্যাপারটা আমি খুব পছন্দ করি। ও বাই দি বাই, আমি অজয় মল্লিক। বিদ্যাসাগর। বটানি। তিন নম্বর ফাইনাল ইয়ারে।
- তিন নম্বর ফাইনাল ইয়ার?
- মানে দু’বার ড্রপ করেছি। এবারে দেব দেব করছি।
- ড্রপ?
- অমন ড্যাব ড্যাব করে সিনিয়রদের দিকে তাকাতে নেই ভাই অরূপ। শোনো ভায়া, আজ রাত্রে তোমার ইন্ট্রো হবে।
- ইন্ট্রো?
- মেসের বাকি ছেলেপিলেদের সাথে আলাপ করতে হবে না? তুমি ছাড়াও যে আরও চোদ্দ জন রয়েছে। টোটাল চারটে ঘর, তিনটে ঘরে চার জন করে আর ওই একদম কোণের ঘরে আমরা তিনজন। নেহাত দুপুরবেলা তাই মেসে কেউ নেই, প্রত্যেকে কাজে বেরিয়েছে। চারটের পর থেকে একে একে ঢুকতে আরম্ভ করবে। প্রেমিক মানুষরা আবার সামান্য দেরী করে ঢোকেন।
- আপনার কাজ নেই?
- মানে?
- না মানে অজয়দা, আপনি দুপুরে মেসে আছেন; আজ কলেজ ছুটি বুঝি?
- ছুটি? না! তবে তিন নম্বর থার্ড ইয়ারে অত কলেজ নিয়ে মায়া করতে নেই। তা উত্তরের জানালার কাছের বেডটা তুমি পেয়েছ দেখছি। দিব্যি। সী ফেসিং।
- সী?
- সী ফেসিং। সমুদ্র।
- মানে ঠিক, বুঝলাম না। সামনে তো ওই নীল দেওয়ালের বাড়ি।
- মফঃস্বল ছেড়ে ক্যালক্যাটায় পা রেখেছ, কোদালকে কোদালের বাইরে এসে চিনতে শেখো ভায়া। ও’টা স্রেফ বাড়ি নয়, আশ্বাস। যে একের পর এক এগজ্যামিনে গোল্লা পেলেও পৃথিবীটা এখনই রুখাশুখা হয়ে যায়নি। মনের ডেটল, বুকের বোরোলিন ওই বাড়ি। তাই তোমার বেডের পাশের এ জানলা সী-ফেসিং বলেই পরিচিত। সকালের দিকে আর রাতের দিকে এ জানালায় চোখ রাখতে ছেলেপিলেরা ভিড় জমায়।
- কেন?
- কেন? ওই যে ব্যালকনিটা দেখছ...ও’টা হচ্ছে প্রাইভেট লেডিজ হস্টেলের দিদিদের।
- ও।
- যাক গে, আজ রাত পৌনে এগারোটা। কেমন?
- পৌনে এগারোটায় কী অজয়দা?
- ভুলে গেলি? ওই যে বললাম! ইন্ট্রো।
- ও।
- সিনিয়ররা তোকে একটু বাজিয়ে দেখে নেবে আর কী!
- বাজিয়ে দেখবে?
- এ মেসের ডিএনএ’র সঙ্গে তুই খাপ খাচ্ছিস কী না, এ মেসের রিচ লেগাসির ভার বহন করার মত শক্ত কাঁধ তোর আছে কী না ইত্যাদি।
- ওহ্‌।
- ও কী! নার্ভাস হচ্ছিস নাকি?
- না না, তা নয়।
- আরে ক্যান্ডিড প্রশ্নোত্তর। আমাদের সবার পরিচয় দেওয়া হবে, তোর খবরাখবর নেওয়া হবে। আর দু’চারটে জেনারেল নলেজের প্রশ্ন।
- জেনারেল নলেজ?
- সাজেশন চাইছিস? বেশ। এই যেমন ধর, হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীত যেমন সময়ের সাথে সাথে পালটে যায়, মানে ভোরে ভৈরবী বা সন্ধেবেলা ইমন।  তেমনই ভোরের বেলা যদি কাউকে বোকাচোদা বলাটা সুইটেবল হয়, তাহলে গোধূলি লগনে তাকে কী গালাগালে বিভূষিত করলে যুক্তিযুক্ত হবে?
- মা...মানে?
- ভাবো। ভাবা প্র্যাক্টিস করো।
- আমি খিস্তি দিই না।
- তুমি তো এর আগে মেসেও থাকোনি চাঁদু। ‘জানি না’, ‘করি না’ ইজ নট অ্যান এক্সকিউজ ইন ইন্ট্রো। কেমন?
- আচ্ছা।
- শ্রীমান অরূপ ভট্টাচার্য। শুনে রাখো। নো পাকামি।
- আ...আচ্ছা।
- আর ইয়ে...প্রেমিকা টেমিকা আছে নাকি?
- ন...না।
- টিপসের দরকার হলে বলিস। সামান্য গোল্ডফ্লেক ফী নিয়ে কম ছেলের তরী পার করিনি।
- আচ্ছা।
- সিগারেট খাওয়া হয়?
- না।
- সে’টা অবশ্য ঠোঁটের রঙ দেখেই আন্দাজ করেছি। তা সিগারেট না খেয়ে কফি হাউসে গিয়ে গাল চুলকবে কী করে বাবা অরূপ?
- মানে...মানে ঠিক বুঝলাম না।
- নাহ্‌। তোকে দেখছি গড়েপিটে না নিলে ক্যালক্যাটা তোকে টপাত করে গিলে ফেলবে। দায়িত্ব বেড়ে গেল। সে যাকগে, ওই বয়ামে কী আছে ভাই?
- এ’টা? এ’টায় গজা। আমার মায়ের বানানো।
- ও’টা ওই তাকে রাখার কোনও দরকার নেই। তোর বেডের পাশে ও তাকে বড় পিঁপড়ে। ইনফ্যাক্ট এ গোটা ঘরেই বড্ড পিঁপড়ে। ও ডিবে বরং আমায় দে, আমার ঘরে আমি পিঁপড়েদের এন্টারেটেইনই করিনা একদম। তোর যখন ইচ্ছে হবে এসে বরং খেয়ে যাস। কেমন?
- আচ্ছা।
- আর ইয়ে, ঘরে নক করে ঢুকিস। কেমন? আমি সিনিয়র মানুষ তো।
- বেশ।
- কই! গজার ডিবেটা দে।
- এ...এই যে।
- নে, এবারে বেডিং-টেডিং গুছিয়ে নে। আর ট্রাঙ্কখানা বিছানার তলে ঢুকিয়ে দিস। কোনও দরকার পড়লে আমি ওই কোণের ঘরে আছি। আর রাতের ইন্ট্রোর কথা যেন ভুলে যাস না, কেমন?
- আচ্ছা।

(ক্রমশ)