Friday, December 30, 2016

ক্লিওপেট্রা

- এইয্যো। শুনুন।
- আমায় ডাকলেন ম্যাডাম?
- আপনার পিছনে আছে বলতে ওই গোবেচারি ল্যাম্পোস্ট। আপনিও যে গোবেচারি নন তা অবশ্য বলছি না, তবে ল্যাম্পপোস্ট আদৌ নন।
- কোনও দরকার আছে? ম্যাডাম?
- সে কী! দরকার আমার?
- মা...মানে?
- অমন ঘুরঘুর করছেন। পিছন পিছন। সেই কবে থেকে। আর দরকার নাকি আমার! বোঝো!
- আমি কিছুই বুঝছি না।
- সতেরো নম্বর বাস।
- আসলে...।
- শৈলেনবাবুর কাছে রেওয়াজ করতে যাই। বুধ, শুক্রু, রবি; সেখানে।
- হয়েছে কী...।
- মঞ্জুলাদের বাড়ির সামনের ফুটপাথে দাঁড়ালে আমাদের রিহার্সাল স্পষ্ট দেখা যায়, তাই না?
- বিশ্বাস করুন...।
- জানেন, আমি মেজদাকে জানালে ও আপনাকে জুতোপেটা করবে?
- কিন্তু আমি তো...।
- আপনি তো কী?
- আমি না...।
- আপনি ঘুরঘুর করেন না?
- ন...না।
- বেশ। তাহলে আমি জুতোপেটা করব।
- কী?
- ঘুরঘুরিয়া হলে মেজদা জুতোপেটা করবে। না হলে আমি। বেছে নিন।
- মেজদা..গোঁফটা বাদ দিলে বেশ অমায়িক।

অতঃপর নায়ক জুতোপেটা ফ্লেভারের মেঘে ভাসতে ভাসতে ল্যাম্পপোস্টের ডগার ওপারে গ্র‍্যাভিটির মায়া কাটিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেন।

এদিকে মেজদার ডাইরেক্ট করা নাটক থেকে অচানক বাদ পড়লেন নায়িকা। নায়িকাকে আচমকা ফিক্ হাসি রোগে পেয়েছে। ডায়লগ পড়তে গিয়ে হাসছে, প্রম্পট শুনে হাসছে, মেজদার ইন্সট্রাকশন শুনে গড়িয়ে পড়ছে। ক্লিওপেট্রার অমন ফিচেল হলে চলে না।

বাপ্

- বাবা।
- কী হল?
- এই। ফেসবুকে বাবাদের ব্যাপারে কিছু মুভিং কোটস পড়ছি।
- যেমন?
- যেমন। বাবা কে? যে নিজে ছেঁড়া জামা পরে থেকেও সন্তানের জন্য প্লে-স্টেশন কিনে আনে।
- বলছিস?
- লাইক অ্যান আইডিয়াল ফাদার। বা এই দেখো। বাবা কে? যে নিজে পটলের ঝোল খেয়ে ছেলেকে দামী রেস্তোরাঁয় খাওয়ার টাকা দেয়।
- রিয়েলি?
- রিয়েলি। এই হচ্ছে আইডিয়াল প্যারেন্টিং। বুঝলে বাবা?
- আই সি।
- তোমার কোর্স করেকশন প্রয়োজন। এই একটা কোটেশনও তোমার ক্ষেত্রে খাটছে না। এই কিছুক্ষণ আগেই আমায় দিয়ে চা করালে আর নিজে সোফায় পা নাচিয়ে শ্যামল মিত্তির শুনে গেলে।
- ধৃতরাষ্ট্র নিজে যাবতীয় খিস্তি হজম করে ছেলেকে জুয়া খেলার লাইসেন্স দিয়েছিল রে। তার চেয়ে ছেলের ঠ্যাঙ নিজেই কুপিয়ে দিলে দুর্যো বেচারির হিউমিলিয়েশন কম হত।
- কী রিডিকুলাস এগজ্যাম্পেল।
- শোন, ছেলেবেলায় গোটা দুনিয়া যখন তোকে অবন ঠাকুর, উপেন্দ্রকিশোরের বেবিস্টেপে ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছিল, তখন আমি নিজের পরশুরাম সমগ্র পেজমার্কে স্থগিত রেখে তোকে স্বপনকুমার পড়ে শুনিয়েছি। বাজপাখি সিরিজ। রক্তে কেরোসিন দেশলাই দেওয়া উত্তেজনা। ক'টা বাপ তেমনভাবে স্টেপ আউট করে রে?
- পয়েন্ট। বাবা কে? যে নিজের পরশুরাম সমগ্র তুলে রেখে ছেলেকে স্বপনকুমার রিডিং পড়ে শোনায়।
- আহা, আদর্শ। আদর্শ। বেড়ে বলেছিস। এই কোটেশনটাও লেখা আছে বাবু? ফেসবুকে?

Wednesday, December 28, 2016

মনোজ মাহাতোর ডায়েরি

পুরনো ডায়েরি। ১৯৭২ সালের। মাছের বাজারে কী'ভাবে এলো তা ঈশ্বরই জানেন। শোল মাছ দর করার সময় পায়ের কাছে নজরে এসেছিল। আশেপাশে কারুর নয়। এদিকে ডায়েরির প্রতি আমার একটা বিশেষ টান আছেই। তুলে সামান্য উলটো পালটে দেখলাম যে সে ডায়েরিতে ধোপার হিসেব নয়, বরং রীতিমত রোজনামচা লেখা রয়েছে। বাংলা হাতের লেখাটা মুক্তোর মত। শোল মাছের বদলে ডায়েরি আর হাফ ডজন হাঁসের ডিম নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে একা মানুষ, খবরের কাগজের বাইরে নতুন কিছু পড়ার পেলে অবজ্ঞা করি না কখনও।

২.

নাহ্। গাঁজাখুরির একটা সীমা আছে। ডায়েরিটা মনোজ  মাহাতোর। মনোজবাবু ১৯৭২ সাল জুড়ে এই ডায়েরি লিখেছিলেন। ঝরঝরে নির্ভুল ভাষা। চমৎকার ভাবে গতিশীল। বেশ তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়। সে'সবে সমস্যা নেই।

সমস্যা হল মনোজবাবু নিজেকে মাছ বলে মনে করেন। না, গল্প লেখার চেষ্টা নয়। সিরিয়াস আত্মজীবনী। আমতলা গ্রামের হরিহর দাসের পুকুরের  বেড়ে ওঠা বাইশ কিলোর রুই মাছের জীবনচরিত।

আপত্তির মূল জায়গা অন্য। আমতলাতেই আমাদের দেশের বাড়ি। হরিহর দাস আমার পিতামহ।

এ'টা কি কারুর বেআক্কেলে ঠাট্টা? কিন্তু তিনকুলে কেউ আর বেঁচে নেই। আমতলা, হরিহর দাসের খবর কেউ পাবে কী করে?

তাছাড়া ডায়েরি বেশ জীর্ণ আর লেখার কালি সত্যি বহু পুরনো।

৩.

এখন রাত দু'টো বেজে কুড়ি মিনিট। ঘুম গায়েব। মূল অসোয়াস্তি অন্য জায়গায়। ঠাকুমা গল্প করতেন যে আমার জন্মের দিন ঠাকুরদা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পুকুরের সবচেয়ে বড় মাছটা পাকড়াও করেছিলেন।

আমার জন্মে তেইশে ডিসেম্বর। ১৯৭২।
এ ডায়েরির শেষ এন্ট্রি বাইশে ডিসেম্বর।

এ'দিকে ঘরময় মাছের আঁশটে গন্ধ বেড়ে চলেছে।

বারান্দায় বসেও দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

৪.

অজ্ঞান হয়েছিলাম বোধ হয় ভোর চারটে নাগাদ। জ্ঞান যখন ফেরে তখন আমার ঘর বারান্দা সব হাওয়া। দিন তিনেক লেগে গেল বুঝতে যে আমি মাছে পেটের এক কোণে রয়েছি।

মারা গেছি বলে মনে হচ্ছে না তবে খিদে তৃষ্ণা বিলকুল গায়েব। ঘুমটুমও পাচ্ছে না।
এ'খানে আসবাব বলতে একটা টেবিল আর চেয়ার। সে টেবিলে রাখা একটা ডায়েরি আর খান চারেক কলম।

এই ডায়েরিটা অবিকল মাছের বাজারে খুঁজে পাওয়া ডায়েরিটার মত। শুধু এ'টা আনকোরা নতুন।

এখানে আমার ডায়েরি লেখা ছাড়া কোনও কাজ নেই। আর এক অবাক কাণ্ড! মাছের পেটে এসে আমার হাতের লেখাটা দিব্যি শুধরে গেছে।

Monday, December 26, 2016

এক্সমাস ২০১৬

রাত গভীর।
ক্রিসমাসবাবু দিব্যি ঘাটে থেবড়ে বসে ছিলেন। এগরোল শেষ হয়েছে খানিক আগে। হাতে এখন লেবু সরবতের গেলাস। মনে ফুরফুর। মুখে নদীর শীত মাখানো হাওয়ার ঝাপটা।
গলায় থেকে থেকে সুর খেলে যাচ্ছিল;
"আমার মন চলে আগে আগে,
আমি পড়ে রই রে বন্ধু..."।
চিন্তায় কচাত করে কাঁচি পড়লো পিঠে আলতো চাপড়ে। ঘুরে তাকাতেই হলো।
- কী রে, ক্রিসমাস! চিনতে পারছিস?
- চেনা চেনা লাগছে...।
- নামটা ভুলে গেছিস, তাই তো? সেই আগের মতই রয়ে গেছিস ভাই।
- একদম ভুলে গেছি। সরি।
- আমি দত্ত। সোমবার দত্ত। থার্ড ডিগ্রী। এ'বার মনে পড়েছে?

সব ভালো যার



সব ভালো যার শেষ ভালো।

**
মনোজ বটব্যাল মাসের শেষে খুঁজে পান ব্ল্যাকহোলিও গোপন পকেটে রেখে ভুলে যাওয়া তিনটে কড়কড়ে একশো টাকার নোট।

**
ধানবাদে পোস্টিং পাওয়া সমর দত্ত। ভদ্রেশ্বর থেকে আসা ইনল্যান্ড লেটারে খোকার স্কুল টিউশনির খবরের ফিরিস্তি শুনে হন্যে হতে হতে, চিঠির শেষ প্রান্তে এসে ভদ্রলোক খুঁজে পান লিপস্টিকের দাগ। টকটকে ছ্যাঁতছ্যাঁতে লাল।

**
বছরের শেষে এসে জিমে ভর্তি হয়ে হাঁফ ছাড়েন জিকো হালদার।  ডিসেম্বরের শেষ তিন সপ্তাহে তেত্রিশ গ্রাম হাওয়া। জাস্ট হাওয়া। বত্রিশ বছরে ভুঁড়ি ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার কথা। 

**
আলোয় আলোর শেষে কোলাহল থেমে যায়। হুল্লোড় ঝিমিয়ে আসে। সে আলোয় অনিন্দ্য সুলেখার হাত টেনে নেন।

- শাদি করেগা মুঝসে?
- করেগা নয়। করোগি।
- ধ্যাত্তেরি। উইল ইউ ম্যারি মি?
- বাঙলায় বলো না ভাইটি।
- বাঙালি প্রপোজ করে না। চিঠি লেখে, পোস্ট করে না।
- ন্যাকা।
- উইল ইউ?
- আর ক'বার করব?
- এক বার ইয়েস বোলকে দেখো। আর বাঙালি বিয়ে করব না।
- দেন?
- বাইকে চেপে আসব। হারলে।
- জিতলে?
- ধ্যেত্তের। ডেভিডসন। থুঁতনিতে বেল্ট আঁটা টোপর।
- রিয়েলি? ছেলেবেলায় তোমায় হারকিউলিস সাইকেলে দেখেছি।
- তুমি সাদা গাউন। সাহেবি বিয়ে। ডু ইউ টেক হার অ্যাজ ইওর বর অর বৌ? ইয়েস আই ডু। ইয়েস আই ডু। তারপর আংটি। তারপর চকাম, সবার সামনে।
- হীরের আংটি?
- আড়াইশো গ্রামের এক পিস হীরে। তোমার আঙুল টনটন করবে। 
- সী বীচে?
- সানরাইজের সময়। বিদেশী সমুদ্র। ক্যালেন্ডারি নীল। ও'দিকে চারিদিকে দামী শ্যাম্পেনের ফোয়ারা। 
- মন্দ না। তবে সাহেবী বিয়ে হলেও, রাতে ফিশ ফ্রাই, মাংস কষা আর বাসন্তি পোলাও। রাখবে তো?
- ওবামারা কেমন স্পাইসি খাওয়ার প্রেফার করে দেখতে হবে। দালাই লামার জন্য ভেজ অপশন রাখতে হবে কি?
- বটে? ভেবে দেখি।
- সো? উইল ইউ ম্যারি মি?
- ইয়েস।
- একটা কথা।
- কী?
- এই ব্যাটাচ্ছেলে ডাক্তারের তোমার প্রতি নজর আছে।
- কোন ডাক্তার?
- সেন। যে তোমায় অপারেট করবে। মতিগতি ভালো না। অতি বদ নজর। 
- সামান্য পালটা নজর আমিও দিয়েছি যে। 
- স্যুইটহার্ট। তোমায় যদি অপারেশন টেবিলে থেকেই ইলোপ করে?
- টূ টল, টূ হ্যান্ডসাম টূ রিফিউজ। নীল সমুদ্র, ওবামাদের বাসর জাগা নটউইথস্ট্যান্ডিং।
- হোয়াট দ্য হেল।
- নাও ফিরতে পারি অপারেশন থিয়েটার থেকে।
- ইয়েস। নাও ফিরতে পারো। হারামি ডাক্তার সেন।
- এ'টা দামী শ্যাম্পেন খাইয়ের ভাষা?
- ইউ সেড ইয়েস। ভদ্রলোকের এক কথা।
- দেখি,যদি ডাক্তার সেনের চার্ম কাটিয়ে ফিরতে পারি।
- হনিমুনে  আর পুরী নয়। প্রমিস। সেশেল্স। বা মরিশাস। বা মাসাই মারা।
- ডাক্তার সেনের চান্স আর একটু কমল।
- হেহ্।

সব ভালো যার, শেষ ভালো।