Saturday, December 3, 2016

এক ও অন্য

এক

ট্যাক্সি চলে যেতে ঘরে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন বিমল।
প্রত্যেকবার এমনই হয়।

ট্যাক্সিতে দেহকে বসিয়ে এই ওয়ান বিএইচকের কলকাতাটুকুতে এসে বসে হাঁফ ছাড়েন তিনি।

অন্য

মৃণাল ভৌমিকের জ্বলে ছাই হওয়া দেহটাকে অ্যাশট্রেতে ছুঁড়ে ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন গোল্ডফ্লেকবাবু।

মনের খচখচটা অবশ্য সম্পূর্ণ কেটে গেল সোফা থেকে ভেসে আসা মিস ক্লোরমিন্টের উড়ন্ত চুমুতে।

কিছুই কিছু নয়

- কোনও কিছুই কিছু নয় হে দত্ত।
- আমায় কিছু বললেন স্যার? দস্তুরের ফাইলে প্রচুর ফাঁকফোকর, খুব কনসেন্ট্রেট করতে হচ্ছে।
- দস্তুর?
- নতুন কনসাইনমেন্ট যারা পাঠিয়েছে।
- নতুন কনসাইনমেন্ট?
- যে'টা বম্বে থেকে এলো?  ডি এন দস্তুর! বান্দ্রার বান্দা।
- ওহ। সেই দস্তুর। তুমি দেখছি দস্তুরমত নিরেট।
- কেন স্যার?
- ফাইলে মুখ গুঁজে দিন কাবার করলে হবে দত্ত?
- বিজনেস আপনার স্যার, আমি তো কর্মচারী।
- বিজনেস। মুনাফা। ব্যালেন্স সিট। এ'টুকুই চিনলে দত্ত। কিন্তু কোনও কিছুই কিছু নয়।
- স্যার, স্যাড?
- দুঃখ ছাড়া কোনও লাস্টিং ইম্প্রেশন আছে দত্ত?
- ফিলসফি, ওহ। আমার আবার গত হপ্তায় যে রুট ক্যানালটা করিয়েছি সে'টা ঠিক খাপে খাপ হয়নি। একটা কনকন রয়ে গেছে।
- গ্রাউন্ড লেভেল দুঃখ নিয়েই নষ্ট হয়ে গেলে দত্ত।
- গ্রাউন্ড লেভেল দুঃখ?
- দাঁতের ব্যথা। ট্রেনে ভীড়। মাইনে নিয়ে ঘ্যানঘ্যান। ছেলের পরীক্ষার নম্বর। বৌয়ের থাইরয়েড। ধুর।
- ও। এ দুঃখ দুঃখ নয়?
- বাংলা কি মাল নয়? তাই বলে স্কচ চিনবে না  তা কী।করে হয় দত্ত?
- স্কচ লেভেলের দুঃখ?
- বেহালা বাজাতে পারো?
- না।
- পাথরে ছেনি হাতুরি ঠুকে নারী দেহ রূপে গুণে রসে ফুটিয়ে তুলতে পারবে?
- না।
- টপাটপ হাইকু লিখে প্রেম নিবেদন করতে পারবে?
- আমার স্টাইল ছিল অন্য। কাউকে পছন্দ হলেই বলতাম 'দুপুরের শোয়ের দু'টো টিকিট কেটে ফেলেছি'।
- ঘরের দুধ ছেঁকে রাবড়ি বানাতে জানো?
- না।
- এত না পারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ, দুঃখে ভেসে যেতে ইচ্ছে হয় না? দত্ত?
- বেহালা হাইকু এ'সব আপনি পারেন?
- আদৌ না। তবে আমার মধ্যে না পারার দুঃখ আছে। যে দুঃখ সাজানো বাগানের মত আমার অন্তর সুগন্ধে ভরে রাখে। তোমার মত নির্লিপ্ত নই, অন্তরে মৃত নই।
- আমার অন্তরের ডেডবডি আপনার বাগানের মাটি ফার্টিলাইজ করছে স্যার। দস্তুরের এ ফাইল সন্ধ্যের মধ্যে ক্লীয়ার না হলে আপনার বাগানে আলকাতরা বৃষ্টি হবে।  তখন সত্যিই বেহালা শিখে ফুটপাথে বসে বাজিয়ে টু পাইস কামাতে হবে।
- দত্ত, তুমি একটা প্লাস্টিকের টুকরো। আমি মাটির মানুষ। তুমি আমায় অনবরত কন্টামিনেট করে চলেছ।
- যা হোক। এ'বার এই ফাইলটায় একটা সাইন করে দিন। অমনি দস্তুরের পকেট থেকে কড়কড়ে আশি হাজার টাকা আপনার ট্যাঁকে ঝরে পড়বে। ভুল সাপ্লাইয়ের ইনডেমনিটি।
- আশি হাজারের উইন্ডফল? বলো কী দত্ত? চলো নরওয়ে ঘুরে আসি। মুড়ি চানাচুর চিবুতে চিবুতে অরোরা বোরিয়ালিস।
- ডিসেম্বরে শিউরি যান না কলকাতার চেয়ে শীত বেশি বলে। আর আশি হাজারে নরওয়ে? সাইকেলে যাবেন? তার চেয়ে আমায় ক্রিসমাস বোনাস হিসেবে ট্রান্সফার করে দিন।
- সামান্য ক্লোরোফিল তোমার মধ্যে রয়ে গেছে দত্ত। ইজি মানির সালফিউরিক অ্যাসিড ঢেলে তোমায় কোরাপ্ট করতে মন সরছে না। অগত্যা নিজের নামেই ফিক্স করে রাখব। টাকা জলে দেওয়ার জন্য ফিক্স করাই সেরা উপায়। একবার ফিক্স করলে তা আর ভাঙা যায় না। লোভ। মায়া। ভাঙবে পঞ্চভূতে, লুটবে অন্যে। থাম্ব রুল অফ ফিক্স ডিপোজিটস।
- স্যার। মাইরি। আপনার ইয়ে আছে বটে।
- ইয়ে? কোনও কিছুই কিছু নয় হে দত্ত। কোনও কিছুই কিছু নয়।

পার্পল রোজ অফ কায়রো- ২.০

সিনেমাটা দিব্যি চলছিল। টানটান প্লট। রোম্যান্টিক।

প্রেম অনুরাগ যখন তুঙ্গে, তখন। লাস্যময়ী নায়িকা খাট আলো করে শুয়ে, অনতিদূরে দাঁড়িয়ে প্রেম-বিহ্বল চুমুন্মাদ নায়ক, তাঁর দাঁতে চেপে ধরা একটা আগুন রাঙা গোলাপ। নেশা ধরানো চোখে যখন নায়িকা নায়ককে খাটে আসতে বললেন, তখন সিনেমা হলের প্রত্যেকটা সীটে হুহু। হু হু। হু হু। এই বুঝি প্রেমের ঢেউয়ে সমস্তই ভেসে যায়।

এই বুঝি। এই বুঝি।

কিন্তু কী বিপত্তি। নায়ক খাটের কাছে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বসলেন না। তাঁর মুখ সামান্য বিচলিত।

"কই গো, খাটে এসে বসো", নায়িকা বাধ্য হয়ে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে নামলেন।

নায়ক তবু গোঁয়ারতুমি ফলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন; তাঁর মুখ থেকে গোলাপ গেছে খসে, কপালে ঘাম।

"কই গো! পাশে বসবে না নাকি"?, নায়িকার মেজাজের পারদ চড়ছে। গোটা হল জুড়ে বিরক্তি দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে।

অগত্যা নায়ক বলেই ফেললেন "বসতে চাইলেই কি বসার উপায় আছে গো? কোনও ব্যাটাচ্ছেলে দর্শকাসনে বসে সেই তখন থেকে গুনগুনিয়ে জনগণ মন অধিনায়ক গেয়ে চলেছে। বসব কী করে মাইরি?"।

ডেন্সিটি

- হাই।
- হ্যালো।
- কদ্দিন?
- হুঁ?
- কদ্দিন ধরে হসপিটালাইজড?
- তিন হপ্তা।
- ক্যাডবেরি খাবেন?
- মুখে জ্বালা। গলাতেও।
- ওহ্। অ্যাডভান্সড।
- রীতিমত। আপনারও তো..।
- এখানে তো সবাই অন সেম বোট। অ্যাডভান্সড।
- সবাই অন টাইটানিক বলুন।
- হেহ্। আইসবার্গ।
- আইসকোল্ড।
- আমি মুকুল চ্যাটার্জি। সাউথ ক্যালক্যাটা।
- অভিনব মাইতি, নর্থ বেঙ্গল।
- ফ্যামিলি?
- বৌ, ছেলে। ক্লাস ফাইভে।
- সেম পিঞ্চ। শুধু আমারটা থ্রী'তে।
- ক্যাডবেরি দিন। এক কামড়।
- গলায় জ্বালা?
- ক্যাডবেরির অফার রিফিউজ করাটা বেশি ক্যাডাভেরাস।
- এই যে।
- থ্যাঙ্কস।
- কদ্দিন বলছে?
- ছ'মাস। মিনিমাম।
- নট ব্যাড। তবে আমি বেটার প্লেসড। এক বছর টেনে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
- জেলাস।
- আরও আছে কিন্তু । ক্যাডবেরি।
- গুড। আপনি আসার আগে এই বেডে যে ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি গতকাল গেলেন।
- রিলিজ?
- না। আইসবার্গ।
- আউচ।
- আমার কপালে আজ ক্যাডবেরি লেখা। খণ্ডাবে কে?
- হেহ্।
- ওয়েলকাম টু দ্য ল্যান্ড অফ নো হোপ মিস্টার সাউথ ক্যালক্যাটা।
- আশাহীন। অথচ বেশ নিশ্চিন্দি লাগছে। ওই ফোর্থ ইনিংসে তিনশো বাহাত্তর চেজ করতে নেমে বিরাশিতে আট উইকেট পড়ে যাওয়ার পর দশ নম্বর ব্যাটসম্যানের স্টেট অফ মাইন্ড। ক্রস ব্যাটে হুব্বা চালালে কেউ খিস্তি করার নেই।
- চালাবেন? ক্রস ব্যাটে?
- ক্রস ব্যাট? কী ভাবে?
- ক্যাডবেরির ঋণ। চাট্টিখানি কথা নয়। পে ব্যাক পছন্দ হয় কিনা দেখুন। এই যে।
- গোল্ডফ্লেকের বাক্স?
- ডক্টরড্ গোল্ডফ্লেক।
- হাউ?
- মালানা ক্রীম।
- গাঁ...গাঁজা?
- ইউ আর ওয়েলকাম।
- আমি কোনওদিন গাঁজা টাচ করিনি..।
- আহ রে, প্রিটি মিস ব্রাউন। টেস্টে দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছেন এর আগে?
- না মানে ডাক্তার...।
- ভি'তে খেলতে বলবে, আপনি চালাবেন ক্রস ব্যাটে।
- ওহ, তাই তো।
- তবে এ'টা আনুষঙ্গ মাত্র।
- আসলি চিজ কী? হেরোইন টেরোইন রেখেছেন নাকি?
- এ'টা আমার বালিশের তলায় থাকে। টুয়েন্টি ফোর সেভেন। ফার্স্ট কেমোর পর থেকেই।
- সুকুমার সমগ্র?
- কম্বিনেশনটা মারাত্মক। ডেনসিটি ম্যাক্সিমাইজ করতে অত্যন্ত জরুরী।
- ডেনসিটি?
- মাস অফ লাইফ ইকুয়াল টু ভল্যুম অফ লাইফ ইনটু ডেন্সিটি অফ লাইফ। ভল্যুম অফ লাইফে কোনও ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করতে পারবেন কি?
- তাই তো। হাতে রইলো ডেন্সিটি।
- আশি বছর বেঁচে যে মাস অর্জন করতেন, সে'টুকু কম্পেন্সেট করতে হবে স্যার। ডাক্তার ভিজিটে আসবে আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। তারপরেই আমরা মানে...ইয়ে...ডাবল শেয়ারিং রুমে এ'টাই সুবিধে।
- আইসবার্গের মুখে কেরোসিন।
- এই হলো কথার মত কত। এবারে আর এক প্যাকেট ক্যাডবেরি বার করুন দেখি।

Friday, December 2, 2016

অনির্বাণের অসুবিধে

দেখুন। লাইফ ইস আনফেয়ার। এই স্টেটমেন্টটা ভীষণ অপ্টিমিস্ট। জীবন তার চেয়েও বহুগুণ মন্দ কিছু একটা। মন্দ বলতে এগরোলে আপেল সেদ্ধ পুরে দেওয়ার মত গণ্ডগোলে। নির্মম।
 
চারিদিকে কোথাও ভালো কিছু নেই। গভর্নমেন্ট ধান্দাবাজ, অপোজিশন ধান্দাবাজি করার চান্স না পেয়ে বিপদজনক ভাবে খুনে। ও'দিকে নর্থ পোল গলে গলে বেহালায় নেমে আসছে। ধর্ম বিশ্বাসে মারছে, ডেমোক্রেসি কোরাপশানে ঝোলাচ্ছে আর কমিউনিজম ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ক্যানভাসে ঠোকাঠুকি করে যাচ্ছে। সোশ্যালিজম ক্যাপিটালিজম অমুকিজম তমুকিজম; যে কোনও ইজময়ের কনসেপ্ট মানেই ' কিউপিডের পৈতে ' গোছের ভাঁওতা।
 
এই ছাব্বিশ বছর বয়সে এ'টা নিশ্চিত বুঝেছি। সব নষ্ট। চারদিকের যা কিছু সমস্তই একটা দলা পাকিয়ে আসা মিথ্যে। কাদার স্প্রেড মাখানো স্যান্ডুইচ। 

ওহ। আমি অনির্বাণ। অনির্বাণ মিত্র। আর শুনুন, গেলাস ওই হাফ ফুল হাফ এম্পটি সব বাজে কথা। এ হল এক গেলাস বিষ মেশানো সরবত; মিন্ট ফ্লেভার। মিন্ট অবশ্য আমার অত্যন্ত প্রিয়।
 
তবে মিন্ট ফ্লেভারের আলোচনা এখন থাক। জিন্দেগী যে কী মন খারাপ করা একটা ব্যাপার, সে'টা নিয়ে বলছিলাম।  যেমন ধরুন এই যে এখন। আমি চমৎকার এই কফি শপে বসে। ঝকঝকে, অল্প আলো। আশপাশে সুখী  মানুষজন আর তাদের স্টেরিলাইজ করা গল্পের ফিসফাস। এই ছিমছাম পরিবেশে আমার টেবিলেই যত যন্ত্রণা। চেয়েছিলাম এস্‌প্রেসো, দিয়ে গেল আইরিশ কফি। ক্লাস সেভেনে বাবার কাছে কুকুরছানা চেয়েছিলাম, বাবা ক্যারম কিনে দিয়েছিল। সেই থেকে আমি কোনও কিছু রিফিউজ করি না। আইরিশ কফিই সই। তবে এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হল সুমনার আসার সময় হয়ে গেছে। আর তার চেয়েও বুক ফাটা ব্যাপার হলো এই যে ওকে বলতে হবে "দিস ইজ নট ওয়ার্কিং আউট"।
 
সুমনা। সুমনা চ্যাটার্জি।
একমাত্র এই একজনকে দেখেই মনে হয়েছিল বসন্ত মানেই কলকাতার ঘামাচি নয়। সুমনার চোখে একটা ধার আছে। ব্লেড-গোছের ধার না। মুচমুচে দামী ভিজিটিং কার্ডে দিয়ে চামড়ায় যেমন আঁচর কাটা যায়, কিছুটা তেমন। সুমনা অফিসে জয়েন করেছিল হিউম্যান রিসোর্স টিমে। হিউম্যান রিসোর্সের মানুষদের ঠিক সুমনার মত হওয়া উচিৎ। ও আমায় "চাকরী নট" বললেও মনে হবে আমার মগজের ঘিলু আনন্দ স্নান সেরে হয়ে টপটপ করে সুগন্ধি মোমের মত গলে হৃদয়ের পাত্রে জমা হচ্ছে। সুমনা ছুটি কাটা যাওয়ার মেল দিলেও মনে হবে সে মেলের প্রিন্ট নিয়ে শেষের কবিতার পকেট এডিশনে মলাট দিই।
সুমনা। সাজে, পোশাকে, হাসিতে, গালের টোলে, লিপস্টিকের রঙে, "ওহ রিয়েলি" বলা সাজানো আগ্রহে পরিপূর্ণ। টলমল। ভরাট অথচ বাড়তি নয়। আলাপী কিন্তু ঢলে পড়া নয়।
সুমনাকে দেখলেই মনে হয় চট করে গিটার ক্লাসে ভর্তি হই। মনে হয় নভেম্বর পড়লেই লিপ বাম ব্যবহার করব। বারোটা কিউবিকেলের ও'পাশে সুমনা বসে। তবু সে বসে আছে; এই জানাটুকুতেই গালিবের বাস।
 
সুমনা। ওকে দেখে মনে হয়েছিল সমস্তটাই একটা উন্মাদ প্রজাতির লম্ফঝম্প নয়। সিমেট্রি আছে জীবনে, পুরোটাই বেওয়ারিশ নয়।
 
সে’টুকুই ঠিক ছিল। একটা প্রবল নিশ্চিন্দি। অখাদ্য কাজ করেও, লো আই কিউ টিম মেম্বার্সদের হজম করেও অফিস আসাটা ভালো লাগতে শুরু করেছিল। কোথা থেকে, কী ভাবে, কেমন করে, কী সাঙ্ঘাতিক নিয়তির বাগাডুলি স্ট্রোকে যে এমনটা হয়ে গেল সে’টা বলা দায়।  আমার আর সুমনার প্রেম। আমাদের প্রেমে পড়া একদমই উচিৎ হয়নি। না। মানে। সুমনার আমার প্রেমে পড়া একদমই উচিৎ হয়নি। সুমনা ঋত্বিক ঘটক হয়ে ‘মেজবৌ’ ডাইরেক্ট করতে মাঠে নেমে পড়েছিল। ভুলটা ওর। আমার ভেসে যাওয়াটা যুক্তিযুক্তই ছিল।
 
সুমনা বলে কথা। আর। যেমন হয়। রোমহর্ষক ভাবে যেমনটা হওয়া উচিৎ। তেমনটাই হয়েছিল। সুমনার ফাঁকা ফ্ল্যাটে। ওল্ড মঙ্ক আর কাবাবের পর।
 
মানে। ভাবুন। সুমনা আমায় আদর করতে শুরু করেছিল। সুমনা, আমায়। আদর করতে শুরু করেছিল। সোফা। ভীষণ নরম সোফা। সুমনার এলোমেলো চুল। পারফিউম। ঘরের ম্যাটম্যাটে লালচে আলো। ওই যে চুমুটা। ঠিক যেন আমি অ্যাস্ট্র্যাল প্রজেকশনে নিজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের দেখছি, দেখছি আমরা চুমু খাচ্ছি। একটা পরমাণু বিস্ফোরণ আর আমি ওপেনহাইমারের কেত নিয়ে ফিসফিস করে বলছি “নাউ আই অ্যাম বিকাম ডেথ, দ্য ডেস্ট্রয়ার অফ ওয়ার্ল্ডস”।
 
সুমনা ইনিয়েবিনিয়ে টপের বোতামগুলো খোলার সময় মনে হচ্ছিল নদী হয়ে যাই। পৃথিবী পরিবেশ অর্থনীতি; এ সমস্ত কিছুর প্রতিই ইতিউতি ভালো লাগা রাখা যায় বলে মনে হচ্ছিল। টপ সরে যেতেই সেই দুর্বার আভাসটা ভেসে এসেছিল। সমস্ত বাঁক খাঁজ ছাপিয়ে উঁকি মারছিল সেই উল্কি। ব্রেসিয়ারে অবশ্য বেশিরভাগটাই ঢাকা থাকায় বোঝা যাচ্ছিল না।  অসংলগ্ন জাপটাজাপটি আর আদরে খসে পড়া ব্রায়ের হুকে আর সুমনার আবরণহীনতায় তোলপাড় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখনই স্পষ্ট হল সুমনার বুকের বাঁদিকের ট্যাটুটা চে গুয়েভারার। ফের অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন, তবে এবার আমি একা নই।
 
-   চে? আপনি চে?
-   তাতে কী?
-   তাতে কী মানে? এ’সব কী!
-   আপনার নাম কী?
-   অনির্বাণ! আর আপনার নাম চে না হয়ে হওয়া উচিৎ ছিল বাঁশ।
-   প্রবলেমটা কী আপনার অনির্বাণ? আর আপনার বডি পড়ে আছে সোফায় ওই মেয়েটার কোলে, এ’দিকে আপনি এসে আমার সাথে গল্প করছেন?
-   শখ করে এসেছি ভেবেছেন?
-   তাহলে এসেছেন কেন?
-   সুমনার বুকে...।
-   আপনার গার্লফ্রেন্ড?
-   হ্যাঁ, তো?
-   গার্লফ্রেন্ডের বুক নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে চাইছেন কেন?
-   মাইরি। ওর বুকে আপনার ট্যাটু।
-   ওহ। তো?
-   বুকে মানে, কাব্যিক সেন্সে বুকে নয়। হৃদয় টিদয় নয়। বুকে। লেফ্‌ট ব্রেস্টে আপনি।
-   আমি স্টাইল স্টেটমেন্ট। আইকন অফ রিভোলিউশন।
-   তাতে কী? আপনি ফুল নন, মাছ নন, চাঁদ নন, কবিতার লাইন নন; মোদ্দা কথা আপনি ট্যাটু হিসেবে ব্রেস্ট-ফ্রেন্ডলি নন। 
-   এ কী! কেন?
-   দাড়ি। আমার এখন এক মনে সুমনাকে আদর করার কথা। অথচ আমি দেখছি দাড়ি। চোখের সামনে কনস্ট্যান্ট দাড়ি দেখলে আমি আদরে মন দিতে পারব না।
-   বাট দ্যাট ইজ সিলি।
-   সিলি? হে ভগবান! ওহ সরি, আপনি বোধ হয় এথেয়িস্ট।
-   আমি জানি না। আমি আপনার ফিগমেন্ট অফ ইম্যাজিনেশন।
-   রাইট। কিন্তু ওই ট্যাটুটা রিয়ালিটি। ওর বুকে হাত দিলেই আপনার গাল ফুলে উঠছে। ম্যাগোহ্‌।  
-   এহ্‌।
-   আচ্ছা, এমন ব্রা আছে যার বাঁ দিকের কাপ না খুলে ডান দিকেরটা খোলা যায়? মানে, চাইলেও ডান দিকেরটা খোলা যাবে না! পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড গোছের কিছু হবে...।
-   আপনার প্রবলেম কি আমার দাড়ি নিয়ে? আমি ক্লীন শেভেন হলে সমস্যা হত না?
-   না না না। দাড়ি না থাকলে আপনি এত টিশার্টিও হতেন না।
-   আমার ছবি লোকে ট্যাটু করায় দাড়ির জন্য? রিভোলিউশনের জন্য নয়?
-   আরে ধুর মশাই, সুমনা হিউম্যান রিসোর্সে কাজ করে। রিভোলিউশন বলতে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বোঝে।
-   যাহ্‌ শালা।
-   সরি টু হার্ট ইওর ফিলিংস গুয়েভারাবাবু। কিন্তু দিজ ইজ বিগার ট্রাবল। আমার বডি ওখানে সুমনাকে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করছে অথচ আমি আমার নিজের মন হয়ে নিজের বডিকে ফেলে সোফা থেকে দশ হাত দূরে এসে আপনার সাথে গল্প করছি।
-   আই নো। আই আন্ডারস্ট্যান্ড।
-   উফফ! দুনিয়াটা এত অখাদ্য কেন বলতে পারেন? সুমনাকে আদর করা বৈপ্লবিক ব্যাপার হওয়া উচিৎ ছিল আমার জীবনে। মাঝখান থেকে...ধুস।
 
সেই থেকে সুমনার সাথে প্রত্যেক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সেই একই ঘটনা। দাড়িয়াল এসে আমায় সুমনার থেকে দূরে টেনে নিয়ে গল্প করবে। জীবনটাই বোগাস। ননসেন্স। সেক্সকে ভয় পেতে শুরু করেছি। এ যেন প্রত্যেকবার বিরিয়ানির বাক্স খুলেই দেখা এক মুঠো মুলোকুচি ছড়ানো রয়েছে। উফফ!
 
**
 
এক্সেলেন্ট। ফাটাফাটি। সুমনা আসছে না। এবং সে’টা জানলাম চারটে কফির পরে। এসএমএসে।
 
“অনি, সরি। আজ আসছি না। কালকের সিনেমার প্ল্যানও ক্যান্সেল। আসলে আমার বারবার শুধু মনে হচ্ছে তুমি আমার সাথে ইন্টিমেট হতে চাও না। আমার বারবার মনে হয় তোমার মন অন্য কোথাও পড়ে থাকে। আই ক্যান নট লিভ উইথ দ্যাট”।
 
-   কার এসএমএস ভায়া?
-   যে আসছে না তাঁর।
-   উহ, সরি।
-   সরি আবার কী! কিন্তু একটা কথা বলুন চেবাবু, আজকাল আপনি কি সুমনা না থাকলেও উদয় হবেন সামনে?
-   আই থিঙ্ক সো।
-   কফি খাবেন?
-   আমি আপনার কল্পনা। কফি খাই না।
-   আমি কেন এলাম জানেন অনির্বাণ?
-   কেন?
-   পাশের টেবিলের মেয়েটার পার্স পড়ে যাওয়ায় ও সে’টা তুলতে ঝুঁকেছিল। আপনি ও’ভাবে না তাকালেই পারতেন।
-   ডিসগাস্টিং। আপনি।
-   আনফরচুনেটলি। আপনি না চেয়েও চে কে পাবেন, যখনই আপনি...।
-   ডিসগাস্টিং টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। আমার জীবন...।
-   বরবাদ। আর এক কাপ খাবেন নাকি উঠবেন এখন?

http://www.bongpen.net/2016/12/blog-post.html