Monday, November 21, 2016

থিওরি অফ চলে যাওয়া

- আবার।
- আবার।
- উফ।
- ধুস।
- তবে তুই বড় হয়ে গেছিস। আর নাকেরজলে চোখের জলে এক হওয়া নেই।
- কোনওদিনও হইনি।
- আচ্ছা। বেশ। হোসনি।
- আমি তোর চেয়ে বড়। দু'দিনের।
- দিব্যি। ডেঁপো। ভিতরে ঘোড়ার ডিম।
- উফ। ফের মাতব্বরি।
- সাবধানে থাকিস বাবু।
- হুঁ। তুইও।
- চোখের আড়াল হলেই সাপের পাঁচ পা দেখিস না।
- হুঁ।
- আর কথা বলবি না?
- উঁহু।
- ট্রেন। ছাড়লো বলে।
- হুঁ।
- ক্যুইক। কিছু বল।
- উঁহু।
- চলে যাওয়াদের ভয় পেতে নেই। তাই না?
- হুঁ।
- জামার ওপরের বোতাম খুলে রেখেছিস কেন? লায়েক হয়েছিস?
- ভু..। ...লে।
- উফফ!
- সিগন্যাল। দিয়ে দিয়েছে।
- জানালা ছাড়।
- হুঁ।
- ছাড়। ট্রেন..।
- নড়ছে।
- লায়েক হাবভাব নিয়েই ঘোর, তোর আর বড় হওয়া হল না।
- ও কিছু না। শার্টের বোতাম খোলা ছিল। ঠাণ্ডাটা...আচমকা। বসে গেছে।
- আসি।
- আয়।

**
সদ্য নড়তে শুরু করা প্ল্যাটফর্মটা ঝুকুর ঝুকুর শব্দে ট্রেনটাকে ফেলে রেখে এগিয়ে গেলো। লিলুয়া পেরোলেই ঝুকুরঝুকুর ছেড়ে ঝমঝমে গতি ধরে প্ল্যাটফর্মগুলো।

**

এমন দড়াম করে ঘুম ভাঙাটা অ্যালবার্টের কাছে নতুন কিছু নয়। নতুন যে'টা সে'টা হচ্ছে ঘরের ডান দিকের জানালার সামনে রাখা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসা ভদ্রলোক। জার্মান বা আমেরিকান নন, নির্ঘাত ভারতীয়। গায়ে কালো কোট, মাথায় টুপি, শার্ট আর প্যান্ট ধবদবে সাদা। ভদ্রলোকের মুখে একটা হতচকিত ভাব।

- হু আর ইউ?
- মী সাহেব? টিকিট চেকার। অন কালকা মেল। প্রবলেম ওয়াজ। রিকুয়েস্টেড আ ইয়ং গার্ল ফর টিকিট-শোয়িং। বাট শি সেড, ট্রেন নট মুভিং, প্ল্যাটফর্ম মুভিং, সো হোয়াই টিকিট? গেট ডাউন অ্যান্ড আস্ক টিকিট ফ্রম প্ল্যাটফর্মওলাস। আই ওয়াজ কনফিউজড। আই স্ক্র‍্যাচড মাই হেড। বাট সাডেনলি আই অ্যাম হিয়ার সাহেব। ইজ ইট আ স্বপ্ন স্যার?
- স্বপ্ন?
- ড্রীম? ইজ ইট আ ড্রীম?
- মে বি। হাউ ডু আই নো? ইউ কাম ফ্রম আ প্লেস হোয়্যার প্ল্যাটফর্মস মুভ বাট ট্রেনস ডোন্ট।
- কী ঝামেলা।
- ইউরেকা!
- সাহেব? কেয়া হুয়া? হোয়াট হ্যাপেন্ড?
- লুক ব্রাদার। ইফ দিস ইজ আ ড্রীম, আই বেটার ওয়েক আপ। আই হ্যাভ আ নিউ থিওরি টু এস্ট্যাব্লিশ। থিওরি অফ রিলেটিভিটি।

Thursday, November 17, 2016

দীপু ও ডিফারেনসিয়েশন

সাইকেলটা ঘাটের বেঞ্চিটার কাছে দাঁড় করালো দীপু। দুপুরের এ সময় এ'দিকটা বিলকুল শুনশান। শীতের নরম রোদ, গাছগাছালির ছায়া আর নদীর ভেজা হাওয়া মিলে চারদিকে একটা ছ্যাঁতছ্যাঁতে ব্যাপার। ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে সাত নম্বর সিঁড়িতে বসে পিঠের ব্যাগটা নামিয়ে রাখলো। আর খান পাঁচেক সিঁড়ি ভাঙলেই জল।

আকাশটা সামান্য ফ্যাকাশে,তবে মেঘলা নয়। ও'পাড়ের জুটমিলের ভেঁপুতে সামান্য বিরক্ত হলো সে। নদীর ধারে গাছের পাতার খসখস আর পটাদাদার ঘটিগরম বানানোর খচরমচর ছাড়া কোনও শব্দই মানায় না। হাতঘড়িতে দেখলে; পৌনে তিন। অর্থাৎ আড়াইটে থেকে তিনটের মধ্যের যে'কোনও একটা সময়। দম দেওয়া এইচ-এম-টি'টা মেজদাদুর; সময়ের সাথে বিশেষ তাল রাখতে পারে না। কিন্তু দীপুর সয়ে এসেছে। পছন্দের কাজ থাকলে মিনিট পনেরো আগে পৌঁছে যায়। আবার বিপ্লববাবুর টিউশনিতে নিয়ম করে পনেরো মিনিট দেরী করে যায়। ঘড়িটায় ভরসা না থাকলেও, একটা বেড়াল-গোছের মায়া পড়ে গেছে।

খুব মন দিলে নদীর শান্ত স্রোতের শিরশির কানে আসে। পায়ের চটি খুলে বাবু হয় বসে বুকপকেট থেকে সল্টেড বাদামের প্যাকেট বের করে ছিঁড়লে সে। মিঠে হাওয়া আর বাদাম চিবুনো আরামে চোখের পাতা সামান্য ভার হয়ে এসেছিল। তখনই পিঠে একটা জমকালো থাপ্পড়ে ঘুরে তাকাতে হল।

- আরে, মামা? তুমি এ'খানে?
- কেন চাঁদ? নরসিমহা রাওকে এক্সপেক্ট করছিলে?
- না মানে...।
- দিদি বললো তুই জয়েন্ট স্টাডি করতে বেরিয়েছিস।
- হ্যাঁ...ওই অনিন্দ্যর সাথে। ডিফারেনশিয়েশনটা এত ভালো গ্রিপে রেখেছে ছেলেটা...।
- তা, গঙ্গার ধারে আজকাল জয়েন্ট স্টাডি হচ্ছে?
- প্রকৃতির সাথে ক্যালুকালসের নাকি নিবিড় যোগাযোগ, আইনস্টাইন না মিলটন কে একটা বলেছিল যেন।
- অনিন্দ্য, নাকি?
- পাতিপুকুরের দিকে থাকে। সেভেন থেকে আমার সাথে পড়ছে। ওর বাবার ধানবাদে প্লাইউডের ব্যবসা...।
- বসি খানিকক্ষণ..।
- উঁ।
- বাদাম দে দেখি দু'চারটে।
- এই যে।
- হ্যাঁ রে দীপু..।
- বলো।
- তুই চাকরীবাকরীতে উন্নতি করবি কী করে বল তো?
- তুমিও টেস্টের নম্বর নিয়ে খোঁটা দেবে মামা?
- নম্বর? আরে ধ্যুর। এগজ্যামিনের নম্বরের সাথে চাকরীর উন্নতির কোনও সম্পর্ক নেই। তবে মিথ্যে বলতে পারার সাথে আছে।
- মা...মানে?
- এত পুওর কোয়ালিটির মিথ্যে বলিয়ে হলে বস ম্যানেজ করবি কী করে? আর বস পকেটে না থাকলে যে তোকে বসে থাকতে হবে।
- ধুস।
- দীপু।
- মামা।
- স্টিমারে করে বা মধুকাকার নৌকায় করে কেউ কোনওদিন দিল্লী গেছে শুনেছিস?
- কী যে বলো! দিল্লী।
- এখান থেকে ট্রেনে হাওড়া, উসকে বাদ  কালকা মেল।
- তাতে আমার কী? অনিন্দ্য এসে পড়লো বলে।
- আমি যাচ্ছিলাম ক্লাবে। সমর ব্যাটার সঙ্গে ক্যারমে একটা ডুয়েল ছিল, বুঝলি? ঝড়ে বক দু'টো গুটি ফেলতে পারে বলে বড্ড মাতব্বরি বেড়েছে।
- তা ক্লাবে না গিয়ে এ'খানে এলে কেন?
- তুইও স্টেশনে না গিয়ে এ'খানে এলি কেন?
- আমি স্টেশনে গিয়ে কী করবে?
- আরে! দত্তবাড়ির ছোটমেয়ে কি মধুকাকার নৌকায় চেপে দিল্লী যাবে?
- দত্তবাড়ির...। তা'তে আমার কী?
- অনিন্দ্যর আত্মা শান্তি পাবে না রে।
- মামা!
- এ'টা রাখ।
- এ'টা কী?
- খাম। ভিতরে চিঠি হলেও হতে পারে।
- কার জন্য?
- বোধ হয় অনিন্দ্যর জন্য। ওই, যার ডিফারেন্সিয়েশনে দারুণ গ্রিপ।
- না মানে...।
- ভেবেছিল তুই আসবি।
- মানে...।
- বাড়ির লোককে ভুজুংভাজুং দিয়ে একাই প্ল্যাটফর্মে গেছিল ট্রেন ধরতে। ঢাউস দু'টো সুটকেস সমেত। এ তো আর দু'চার দিনের জন্য যাওয়া নয়।
- আসলে...।
- আজ ভজা ডুব দিয়েছে, বাড়িতে কাগজ আসেনি। স্টেশনে গেছিলাম আনন্দবাজারের এক কপি নিতে। ডাগর চোখ বুঝলি।
- ইয়ে...।
- আমি আবার ছলছল টলটল দেখতে পারি না।
- কিন্তু...।
- উপায়ন্তর না দেখে আমাকেই চিঠিটা দিয়ে দিলো।
- হয়েছে কী...।
- তুই থাক বরং ঘাটে। আমি আসি। অনিন্দ্য এলে বলিস ছোটমামার প্লাইউডের দরকার। ধানবাদ থেকে সস্তায় যদি কিছু...।
- তিনটের লোকাল ছিল। এতক্ষণে নিশ্চই...।
- তিনটের লোকাল? চলে গেছে।
- ও...।
- তবে সে আছে। বসে। একটা আনন্দমেলা মুখের সামনে মেলে; ডেফিনিটলি পড়ছে না। পরের ট্রেন চারটে দশ। তবে সে'টা মিস করার উপায় নেই, নয়তো হাওড়া থেকে কালকা মিস।
- মামা, তুমি বাইকে এসেছো, না?
- এই যে চাবি। তোর সাইকেলের চাবিটা আমায় দে।
- মানে, আসলে...।
- ডিফারেনসিয়েশনানন্দ অনিন্দ্য এলে আপ্যায়ন করতে হবে না? বাদামের প্যাকেটটাও দিয়ে যা।
- হেহ্। আসি মামা।
- গ্রিপ দীপু গ্রিপ। মেয়েটা ভালো, তুই সেমি-ভালো। সাবমিট। আর যা দিনকাল পড়েছে, প্ল্যাটফর্ম টিকিট কাটতে ভুলিস না।

ভালোবাসার যে'টুকু

চারদিকে খচরখচর।

প্রমোশনের জন্য এ ওর ঠ্যাং ধরে হকি খেলে চলেছে।
বাসের সীটের জন্য এ ওর পা মাড়িয়ে চোয়াল কিড়মিড় করে চলেছে।
দরদামের টানাটানিতে ক্রেতা বিক্রেতা দরদরিয়ে ঘেমে বিরক্তির দরিয়ায় বয়ে চলেছে।
পলিটিকাল খিস্তিখেউরে, লাল-সবুজ মিলেমিশে উলুখাগড়াদের পিঠ ঘামাচিতে ভরে যাচ্ছে।

বৌ ভাবছে বর মিচকে, বর ভাবছে বৌ বাতিকগ্রস্ত।
বাপ ভাবছে ছেলে বখে যাচ্ছে, চাবকানো দরকার। ছেলে ভাবছে 'পুওর ওল্ড চ্যাপ, ইগনোর করো'।
মা মেয়ের এসএমএস ইনবক্স ঘেঁটে বন্ড হতে চাইছেন।
মেয়ে ভাবছে 'বেচারি টিন্ডারের স্পেলিং জানেনা'।

টপাটপ যুদ্ধের জিগিরে মানুষ মৌরি-চমনবাহারের সুবাস পেয়ে চলেছে।
মাথায় কাঁঠাল ভাঙার শব্দে বাতাস হুহু।

এই গোলমালে।
এই কানে মনে বুকে ব্লেড চালানো মাতব্বরির যুগে।

এই ঝাপসায়।

রাত পৌনে একটার হাওয়ার নভেম্বরি ফুরফুর বিছানা। তার পাশে রাখা ছোট্ট টেবল।
সে টেবিলের ওপর রেডিও। ফিলিপ্সের। সাতপুরনো।

এই মচরমচর যন্ত্রণায় বোরোলিন স্নেহ বুলিয়ে যান তিনি।

এ' দগদগের যুগে নরম হয়ে ঝরে পড়েন।
এ' দাউদাউয়ের যুগে মিঠে হয়ে গলে পড়েন।
এ' মাতব্বরির যুগে বোতাম খোলা ফতুয়ার সাহসে ছাতে এসে দাঁড়ান।

ভালোবাসেন। রাখেন। ভালোবাসায়।
কাঁধে হাত রাখেন "এই যে"র আতর ঢেলে।

গেয়ে চলেন শ্যামল মিত্র;
"সেই বাসর নেই বাঁশরী নেই ভোর যে হয়ে গেলো"।

Monday, November 14, 2016

শিশু দিবস

বন্দুকটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে খোকা।

কাঠের আলমারিতে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। কালো চকচকে নল। কাঠের পালিশ করা বাট। ট্রিগারটা অল্প আলোতেও চকমক করে ওঠে। কার্তুজ ভরা নেই। বাবা যখন ছিল, তখন ও'তে কার্তুজ ভরা হত। দাদীর কাছে খোকা শুনেছে যে বাবা ওই বন্দুক হাতে লক্ষ্যভদে অব্যর্থ ছিল।

বাবা।
বাবা।

যাদের বোমায় খোকাদের বাড়িঘর সে'বার জ্বলে ছাই হয়ে গেছিল, সাথে পুড়ে মরেছিল মা; তাদের শায়েস্তা করতে এ বন্দুক পিঠে মরুভূমি পেরিয়ে যুদ্ধে গেছিল বাবা।

বন্দুকটার দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকে খোকা। দাদী কাঁদে।  আলমারির অন্য কোনে মায়ের কাজলের ডিবে।  বন্দুকের পালিশে আর কাজলের ডিবের চকমকে খোকা বাবা-মা'কে মনে করা চেষ্টা করে।

খোকার থেকে দু'হাত দূরে সে বন্দুক।
তার থেকে পাঁচ হাতে ডাইনে গেলে দাদীর ছোট্ট ঘরের ভাঙাচোরা বারান্দা।
সে বারান্দা পেরিয়ে আধ মাইল ধুলো মাখা পথ হাঁটলে ছোটা পাহাড়। সে পাহাড় খোকার বড় প্রিয়। স্কুল ভাঙার পর সে পাহাড়েই তার দুপুর কেটে যায়।

ছোটা পাহাড়ের ও'পারে মরুভূমি। শুখা, খটখটে। মাইলের পর মাইল। সে মরুভূমির ও'পার থেকে কারা যেন উড়ে এসে বোমা ফেলে যায়। তারা শত্রু।

শত্রু। খোকার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। শত্রু। বাবা মরুভূমি পেরিয়ে সে দেশে গেছিল, প্রতিশোধ নিতে। ওরা মাকে মেরে ফেলেছিল।

বাবা ফেরেনি, বাবার স্মৃতিমাখানো বন্দুকটা কীভাবে যেন ফিরে এসেছিল।

ছোটাপাহাড়ের ও'পাশের মরুভূমি পেরোলেই স্বপ্নের দেশ। সে স্বপ্নের গায়ে চাপ চাপ তাজা রক্ত। সে'খানে দেশনায়ক অশ্রুসজল কণ্ঠে আশ্বাস ঘোষণা করেন;

"ওরা আমাদের অসহায় ভাইবোনেদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। আমাদের ফুলের মত খোকাখুকুদেরও রেয়াত করেনি। সে অমানুষদের আমরা ছেড়ে কথা বলব না। তাদের উচিৎ শিক্ষা না দিয়ে আমরা জিরোব না। সহনাগরিকদের প্রতি এ আমার প্রতিশ্রুতি। তাদের আস্তানা যে ছোটা পাহাড়ের ও'পাশের গ্রামে, সে সম্বন্ধে আমাদের কাছে নিশ্চিত খবর রয়েছে। প্রতিশোধের যুদ্ধ এ'বার শুরু। আজ শিশু দিবসে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার যে এ দেশের আর একজন শিশুর জীবনও অকালে নষ্ট হবে না। হ্যাপি চিল্ড্রেন্স ডে"।

Sunday, November 13, 2016

এটিএম ও সিদ্ধার্থবাবু

বাবার ডেবিট কার্ড নিয়ে এটিএমের সামনে লাইনে দাঁড়য়েছিলেন সিদ্ধার্থ।  ইয়ং চ্যাপ। মুখে স্মিত হাসি। সম্প্রতি পাঁচশো হাজারের নোট বাতিল হওয়ায় লাইন একটু লম্বা তবে ঘাবড়ানোর কোনও কারণ নেই। মোবাইলে জিও কনেকশন ব্যবহার করে ইউটিউবে বেস্ট অফ হিমেশ রেশমিয়া চালিয়ে দিলেন তিনি।

পনেরো নম্বর গানের মাথায় সিদ্ধার্থ টের পেলেন তাঁর সামনের ভদ্রলোক অসুস্থ বোধ করছেন। মাথা ঘোরা, বমি ভাব। ভিড় আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং মাখানো নভেম্বর সহ্য করা চাট্টিখানি কথা নয়।

বত্রিশ নম্বর গানের মাথায় লাইনে দাঁড়ানো এক ছোকরা জানালে যে গত তিনদিন ধরে অন্তত আড়াইশো এটিএমের সামনে সে হত্যে দিয়ে পড়েছে কিন্তু প্রত্যেক বারই তাঁর সুযোগ আসার আগেই এটিএম খাঁখাঁ হয়ে গেছে। এ ট্রমায় নাকি তাঁর মনের বয়স অন্তত চল্লিশ বছর বেড়ে গেছে, ডায়াবেটিস হাইপারটেনশন কলার টেনে ধরল বলে। বাড়তি ট্রমা এড়াতে লাইন ছেড়ে বেড়িয়ে গেল সে ছোকরা।

প্লেলিস্টের বেয়াল্লিশ নম্বর গানের মাথায় লাইনে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোকের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও ক্যাশ পাব কি পাব না; সে টেনশন সহ্য করা মামুলি নয়।
চুরাশি নম্বর গানের মাথায় লাইন ত্যাগ করে যিনি বেরিয়ে গেলেন, সে ভদ্রলোকের মুখে স্মিত তৃপ্ত হাসি। "এটিএমে আমার পয়সা আছে, শান্তি তো নেই। বয়ে গেছে আমার লাইনে পচতে"। তাঁর মুখে সন্ন্যাসীসুলভ আভা।

রেশমিয়ার দু'শো বাহাত্তর নম্বর গানে পৌঁছেও জিওর ফোরজি ডেটার হাঁফ ধরেনি। এটিএমের সামনের লাইনও শুকিয়ে যায়নি।

কিন্তু ততক্ষণে সিদ্ধার্থের মনের মধ্যে তোলপাড় ঘটে গেছে। সে স্পষ্ট দেখতে পেরেছে যে এটিএম কাউন্টারের পাশের অশত্থ গাছের নিচে কে যেন পায়েসের স্টল দিয়েছে।
পায়েস। সে সুবাস নাকে আসতেই ডেবিট কার্ড, পিন নাম্বার, দু'হাজার টাকার নোট; সমস্ত কিছু সিদ্ধার্থর মাথা থেকে গেলো উবে।

মন্ত্রমুগ্ধের মত লাইন ছেড়ে পায়েশের স্টলের দিকে হাঁটা দিলেন সিদ্ধার্থ।