Tuesday, November 8, 2016

খোকার দায়িত্ব

- খোকা, শোন। সাবধানে।
- হুঁ।
- রাতে শোয়ার আগে বাড়ি দরজা জানালা বন্ধ হয়েছে কিনা ভালো করে দেখে নিস রোজ, কেমন?
- হুঁ।
- আর শোন, ছোট ভাইবোনগুলোকে দেখিস। এখন তুইই গার্জেন।
- এমন ভাবে বোলো না বাবা।
- মন শক্ত কর। বাপ মা এমনিতেই কি কারুর চিরকাল থাকে? খারাপ লাগছে এ বয়সেই তোকে ছেড়ে আমাদের দু'জনকেই চলে যেতে হচ্ছে। বড় গুরু দায়িত্ব তোর কাঁধে চাপিয়ে গেলাম বাপ। ব্যবসা, ঘরবাড়ি, বাজারঘাট; সমস্তই এখন তোর দায়িত্বে। অবশ্য তোদের জ্যাঠামশাই এসে পড়লেন বলে। কিন্তু যদ্দিন না আসছেন, তদ্দিন তোকেই ঠেলা সামলাতে হবে। হ্যাপা কিন্তু কম নয়। পারবি তো বড়খোকা?
- আমি চেষ্টা করব। কিন্তু তুমি আর মা কি কোনওদিন...?
- ফেরা হবে না রে। হুকুম তেমনই। বাবা, সাবধানে থাকিস। চারদিকে নজর রেখে, কেমন? ভুলে যাসনা একশো, তুই টাকা বংশের মাথা এখন। শক্ত হ, এ'টা ভেঙে পড়ার সময় নয়। আমরা আসি, কেমন?

Saturday, November 5, 2016

ল্যাপটপ

- আসুন। আসুন মিস্টার হালদার।
- ফাইলটা থ্রু হলো মিস্টার শাসমল?
- আরে আগে বসুন। চা টা খান।
- নষ্ট করার সময় আমার নেই শাসমল। ফাইল থ্রু হয়েছে কিনা কনফার্ম করুন। প্লীজ।
- বসুন না। রামরতন, সাব কে লিয়ে চায়ে লাও। নো মিল্ক  নো শুগার। আউর মেরে লিয়ে এক গিলাস পানি। বসুন মিস্টার হালদার।
- এবার বলুন।
- সিগারেট?
- ব্যাপারটা কী বলুন তো? কেঁচিয়েছেন?
- আসুন। ধরিয়ে দিই।
- থ্যাঙ্কস। এবার ঝেড়ে কাশুন দেখি।
- ফাইল...সানরাইজ ইলেক্ট্রিকালসের ফাইলটা তো?
- ঠাট্টা করছেন? আর কোন ফাইলের কথা হয়েছে আপনার সাথে?
- অলমোস্ট কাজ হয়ে গেছে বুঝলেন...।
- অলমোস্ট?
- অলমোস্ট।
- মিস্টার অরূপ শাসমল। দশ লাখ দিয়েছি আপনাকে। টেন ল্যাখস। আন্ডার দ্য টেবল। এ ফাইল যদি থ্রু না হয়..।
- হুইসল ব্লো করবেন?
- আঙুল বাঁকানোর অনেক বেটার টেকনিক আমার জানা আছে।
- উফ। অকারণে উত্তেজিত হচ্ছেন আপনি।
- অকারণ? অক্টোবরের মধ্যে ফাইল অ্যাপ্রুভ হওয়ার কথা। দিস ইজ নভেম্বর। লাখোটিয়া আমায় কী প্রেশারে রেখেছেন জানেন?
- জানি জানি। কিন্তু কোটি কোটি মুনাফা লুটবেন, অথচ সবুর করবেন না, তা কি হয়?
- সবুর?
- সামান্য। ডেফিনিটলি বাই নেক্সট উইকেন্ড। বড় সাহেব ছুটিতে গিয়েই গণ্ডগোলটা হলো। জার্মানিতে কী এক সাবস্টিটিউটের খবর পেলেন আর আপনার লাখোটিয়ার প্রপোজাল গেল ঝুলে। তবে সামলে এনেছি।
- শুনুন। ও'সব জার্মানির গল্পটল্প আমায় শোনাবেন না। কেমন? কাজ হলে বলুন, নয়তো আমায় অন্য রাস্তা দেখতে হবে।
- চা ঠাণ্ডা হচ্ছে মিস্টার হালদার।
- উম। দার্জিলিং। থ্যাঙ্কস।
- শুনুন। কাজ হয়ে যাবে। বাই নেক্সট বুধবার আপনার পকেটে অ্যাপ্রুভাল থাকবে। কনফার্ম।
- না হলে?
- না হলে দশ লাখ ওয়াপস। ভদ্রলোকের এক কথা, তবে...।
- তবে কী?
- ছেলেটাকে এমবিএ'তে অ্যাডমিশন করালাম। ফীস-টীজ দেওয়া হয়ে গেছে। তবে নতুন ল্যাপ্টপ কিনে দিতে হবে। বুঝতেই পারছেন..।
- শাসমল...।
- ক্যাশ না। ল্যাপটপ ডায়রেক্ট অনলাইনে কিনে দিলেই হবে। লেনোভোর, আমি লিঙ্ক পাঠিয়ে দেব। আর ডেলিভারির ঠিকানা।
- লাখোটিয়া এগ্রি করবে না...।
- মুনাফা ক্লায়েন্টের, কমিশন আপনার! আর বাই নেক্সট বুধবার। সে কমিটমেন্ট আমার।
- দিস ইজ ইওর লাস্ট চান্স।
- ফ্লিপকার্টের লিঙ্কটা আমি হোয়াটস্যাপ করছি।
- বুধবারের মধ্যে কিন্তু...।
- গ্যারেন্টি। কতবার বলব!
- হলে ভালো। যদি হয় নেক্সট উইকেন্ডে আপনার জন্য একটা ইন্সেন্টিভ থাকছে শাসমল।
- ইন্সেন্টিভ?
- শীলা ইজ গোয়িং টু বি ইন টাউন।
- ওহ। সেই স্পেশ্যাল স্পা!
- আপনি স্ট্রেস নিয়ে লাখোটিয়ার কাজ করে দেবেন। আর আপনার জন্য এ'টুকু ওরা করবে না? নেক্সট স্যাটারডে ইভনিং। গ্র‍্যান্ডে। রুম নাম্বার জানিয়ে দেওয়া হবে সময়মত।
- নেক্সট স্যাটারডে? সন্ধ্যে? ও'টা ফ্রাইডে করা যায় না?
- শীলা ইজ ইন টাউন অনলি ফর স্যাটারডে শাসমল।
- যাহ শালা।
- অন্য কারুর ব্যবস্থা করতে বলি?
- অন্য কেউ শীলা নয় মিস্টার হালদার।
- শনিবারে অসুবিধেটা কোথায়?
- আমার ছেলের জন্মদিন। ওর জন্মদিনের সন্ধ্যেটা সবসময় ওর সাথেই সেলিব্রেট করেছি। একবারের জন্যেও মিস হয়নি।
- নেক্সট টাইম দেন। ফর শীলা।
- মিস্টার হালদার লাখোটিয়ার কাজ বুধের আগেই হয়ে যাবে। তবে ল্যাপটপটা টপ মডেল চাই। আর লেনোভো টেনোভো নয়, ম্যাকবুক। আই ওয়ান্ট টু মেক মাই সন ভেরি হ্যাপি। আর স্যাটারডে ইভিনিং গ্র‍্যান্ডের রুম নম্বরটা সময়মত জানিয়ে দেবেন, কেমন?

ক্ষীরের কদম

মন খারাপ হলেই ক্ষীরকদমের কথা ভাবা উচিৎ।

মানে। এই ধরুন। অফিসের বড়বাবু আপনার আত্মবিশ্বাসের কলার টেনে বাঁইবাঁই করে ঘুরিয়ে আছাড় মেরে চলেছেন। অথচ আপনি ভেবে চলেছেন মনোহর স্যুইটসের শোকেসের মাঝের তাকের ডান দিকে রাখা ট্রেতে থরে থরে সাজানো ক্ষীরকদমের কথা।

ধরুন। প্রকাশকের ফেরত দেওয়া পাণ্ডুলিপির এনভেলপ আপনার হেরো হাতে আর আপনি ভাবছেন সেই সাজানো ট্রে থেকে এক জোড়া ক্ষীরকদম আপনার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শালপাতার বাটিতে। ফেল মারা লেখকের চোখের জল ডায়লুট করে দেওয়া বন্যা তখন আপনার জিভে।

বা ধরুন মাথায় বাজ পড়া খটখটে দুপুরে প্রেমিকা জানালেন আপনি অখাদ্য, আপনার সাথে প্রেম করা আর ম্যাগি ইন্সট্যান্ট নুডলকে সিমুই ভেবে তার পায়েস রাঁধা একই ব্যাপার। তখন। ভাংচুর বুক অগ্রাহ্য করে আপনি কল্পনায় একটা অশ্লীল রকমের বড় কামড় বসিয়েছেন ক্ষীরকদমের নরমে। ভেসে যেতে গিয়েও আপনি ভেসে যাচ্ছেন না এই ভেবে যে আর যাই হোক, এ জীবনে আপমার চুমুর অভাব ঘটবে না কোনওদিন।

Friday, November 4, 2016

উৎসব চিন্তা

পারিবারিক জমায়েত/উৎসব/নিমন্ত্রণ।
সে'খানে কম চিন্তা নিয়ে ঢুকতে হয় না।

চিন্তা ১।
অন্তত বারো রকম ফরম্যাটে "কেমন আছো?" প্লেস করতে হবে (খবর ভালো? / পরীক্ষা কবে? ইত্যাদি) । অন্তত বারো রকম ভাবে "ভালো আছি" বলতে হবে।

চিন্তা ২।
মোবাইল চার্জিং পয়েন্টওলা স্ট্র‍্যাটেজিক বসার জায়গা কোথায়?

চিন্তা ৩।
"তোমার মোবাইলে কী কী গেম আছে" গোছের ডেঁপো খোকাখুকুদের এড়িয়ে থাকা।

চিন্তা ৪।
"সবাই গান করছে। তোমাকে দিয়েও দু'কলি না গাইয়ে ছাড়ছি না" মার্কা টেররিস্ট এলিমেন্টদের গলা টিপে না ধরার আগুন-ইচ্ছেটাকে দাবিয়ে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। মেডিটেশন দরকার।

চিন্তা পাঁচ।
পলিটিক্যাল টেবিল চাপড়ানির আলোচোনা এড়িয়ে থাকা। নিজের স্বপ্নে পাওয়া মতামত যারা কাগজে খুঁজেপেতে আন্ডারলাইন করে পড়ে তৃপ্ত হন, তাঁদের আবার এই ডিবেটে আগ্রহ বেশি। তাঁরা নিজেদের খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল আর লিকার চায়ের প্রতি অনুগত। এই আলোচনায় খিদে কমে, গালের চুলকানি বাড়ে।

চিন্তা ছয়।
কী যুক্তিতে তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।

চিন্তা সাত।
"আরো দাও" "আরেক পিস" "তুমি লজ্জা পাচ্ছ না তো" মার্কা গার্জেনদের নজর এড়িয়ে খাওয়া। ওঁরা খাওয়ার শান্তি নষ্ট করেন।

চিন্তা আট।
কী যুক্তিতে খাওয়ার পরেই "আমার  একটু জরুরী কাজ রয়েছে" ভাসিয়ে সরে পড়া যায়। এস্যাপ আর কী।

খুনের গল্প

- ক'টা?
- কী ক'টা?
- বন্দুকে গুলি। ক'টা বাকি?
- চারটে। দু'টো চুনোপুঁটিতে নষ্ট হল।
- লাশ ইজ লাশ, তাঁকে চুনোপুঁটি বলে ছোট করতে নেই।
- যে আজ্ঞে।
- এ'বার শোন। এই যে চারটে গুলি, বুঝলে জনার্দন, সাবধানে খরচ করবে।
- আজ্ঞে।
- একটা আমার ডান কানে, একটা বাঁ কানে। বাকি দু'টো আমার মুখে নল গুঁজে। ইন দ্যাট অর্ডার। কেমন?
- আজ্ঞে।
- আর শোনো বাবা, আমার সিকুইরিটি দু'টোকে মাত্র দু'টো বুলেটেই নিকেশ করেছ বলে ভেবোনো যে আমার মত স্টলওয়ার্ট বডিতে মাত্র একটা বুলেট নিয়ে নিকেশ হবে। চারটেই আমার চাই, ডায়রেক্ট মগজে।
- আজ্ঞে দু'টো কানের মধ্যে দিয়ে আর দু'টো মুখের ভিতর দিয়ে।
- বাহ। বেশ ব্রাইট খুনি তো হে তুমি জনার্দন।
- উচ্চমাধ্যমিকে সেকেন্ড ডিভিশন ছিল আজ্ঞে।
- বেশ। তাহলে চালাও গুলি।
- আজ্ঞে, তার আগে একটা প্রশ্ন ছিল। যদি অনুমতি দেন।
- তোমার হাতে পিস্তল। আমার ঘাড়ে সিঙ্গেল মাথা। অনুমতি দিলাম।
- টাকা দিয়ে নিজেকে খুন করাচ্ছেন কেন?
- গুরুর আদেশ।
- গুরু সুইসাইড করতে বলেছেন?
- আলবাত। ঠিক এখনই, এই টুবয়েন্দাগো তিথিতে।
- টুবয়ে...য়ে...য়ে।
-  টুবয়েন্দাগো তিথি। আমার গুরু তিব্বতের মানুষ কিনা। তিনি এ'দেশে এসে রয়ে গেছেন স্রেফ মাটনের ঝোলের কোয়ালিটির জন্য। নয়তো বছর কুড়ি আগেই নাকি তার আজারবাইজানে চলে যাওয়ার কথা।
- তিনি সুইসাইড করতে বলেছেন?
- আত্মহত্যা মহাপাপ নরকে গমন, শুনিসনি? এ'টা তো খুন, তুই খুন। অতএব তুই পাপী। আরে দু'কানে একটা করে গুলি আর মুখে দু'টো বুলেট নেওয়া মৃত্যু অতি পবিত্র।
- আজ্ঞে, গুরুমশাই তেমনটা বলেছেন?
- আলবাত। তেমন ভাবে মারা গেলে পরজন্মে রোজ রোজ এবেলা ওবেলা ইলিশভাত। চোরাকারবার না করেও।
- পরজন্মে রোজ ইলিশ খাওয়ার জন্য নিজেকে খতম করছেন?
- তুমি কি ইলিশের আদত মূল্য আজও অনুধাবন করতে পারোনি জনার্দন? আমার বারোটা সিন্দুক ভরা হীরেতেও এ যুগে এবেলাওবেলা ইলিশ জোটানো যাবে ভেবেছ? বাজারের দরদামের খবর রাখো বাবা জনার্দন?

**

দীনবন্ধু শেঠ অতি ধুরন্ধর ক্রিমিনাল। চোরাকারবার, স্মাগলিং, তোলাবাজি; তিনি সর্বত্রস্থিত। তাঁর তিরিশ বছরের দৌরাত্ম্যে পুলিশও রাশ টানতে পারেনি। অথচ সমাজকে তাঁর শয়তানির মাশুল নির্মম ভাবে গুনতে হত অনবরত।

পুলিশের ব্যর্থতায় তিতিবিরক্ত বটু গোয়েন্দা বুঝেছিলেন যে তাঁকেই কিছু করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ায় অবশ্য তাঁর ঘোর আপত্তি কিন্ত দীনবন্ধুকে নিকেশ করায় বিলম্বটাও অসহ্য ঠেকছিল।

অতএব,
লড়াইয়ে মাঠে নামো রে।
তুখোড় মেকাপে সাধু সাজো রে।
শেঠের অশিক্ষা আর অন্ধবিশ্বাসে খেলে তাঁকে বশ করো রে।
ইলিশের লোভে তাকে সুইসাইডের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাও রে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা মেকআপ রিমুভ করার সময়ই টিভি নিউজে শেঠ দীনবন্ধুর খুনের খবর পেলেন বটুগোয়েন্দা।
"টুবয়েন্দাগো তিথির আইডিয়া বটু গোয়েন্দা ছাড়া কার মাথায়ই বা আসতো"?।
এ'সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হেসে খানিক গড়িয়ে পড়লেন বটু।