Sunday, October 23, 2016

স্পা

শুভ্রশঙ্খ মাস শুরু করে স্পা দিয়ে। শরীর মন ঝরঝরে হয়ে যায়। শিউলি বছরভর শহরে না থাক, অন্তত সে সুবাস মনের মধ্যে হুহু করে। জ্যান্ত লাফানো কইয়ের মত স্ফুর্তি থাকে বুকে।

আসল বিউটি ট্রিটমেন্ট তো মনকে মালিশ করেই শুরু, আর সে থিওরি মেনেই মাসের প্রথম রোববার সকাল সকাল নিউ সানফ্লাওয়ার সেলুনের বেঞ্চিতে এসে বসে সে।

স্পা স্রেফ ফেল কড়ি মাখো তেল কিস্সা নয়। হুড়মুড়ে মেজাজে অফিসটাইমে মিনিবাস ধরা যায়, স্পাতে তা চলে না।

সানফ্লাওয়ার সেলুনের বেঞ্চিতে বসার আগেই মনোকে ইশারায় নিজের উপস্থিতি জানান দেয় শুভ্রশঙ্খ। মনো, মানে মনোরঞ্জন মাইতি। কাঁচির কাইজার, মালিশ মারাঠা ইত্যাদি নানা উপাধি মনোরঞ্জনের পাওনা বলে শুভ্রশঙ্খর বিশ্বাস। কিন্তু বাঙালি যোগ্যতার দাম দিতে শেখেনি, তাই আজও মনোকে পুজোর বখশিশ চাইতে হয়।

বেঞ্চির সামনে রাখা নিচু কাঠের টেবিলে স্তুপ করে রাখা আনন্দলোক। আনন্দলোক হচ্ছে প্রি-স্পা রিল্যাক্সেশন টূল, শুভ্রশঙ্খ সে সম্বন্ধে অবগত। টুকরো টলিউডি গসিপ, ক্লাসিকাল যুগের উত্তম যোগ ব্যায়াম করছেন গোছের কিছু ছবি, কিছু চটুলরচনা, কিছু মনোগ্রাহী ছবি; এ'সবে নার্ভ আরামদায়ক ভাবে শীতল হয়ে আসে।

খান চারেক আনন্দলোকের পাতা ফরফরিয়ে উলটে যেতে না যেতেই মনের চিনচিন কমে আসে। অন্যদিকে এমপি থ্রি প্লেয়ারে কুমার শানুর গান একটানা বেজে চলে, আনন্দলোককে যোগ্য সঙ্গত দেয় সে'সব গান।

"তু পেয়ার হ্যায় কিসি অউর কা, তুঝে চাহতা কোই অউর হ্যায়,
তু পসন্দ হ্যায় কিসি অউর কি, তুঝে মাঙ্গতা কোই অউর হ্যায়"।

রিল্যাক্সিং মেলোডি।

হাঁটুতে তাল ঠুকে চলে শুভ্রশঙ্খ। মিনিট কুড়ির মাথায় মনোর ডাক আসে। "আসুন"!

চেয়ারে বসে শুভ্রশঙ্খ চোখ বুজে ফেলার মানে মনো জানে। দাড়ি, চুল কাটা নয়, মাথা মাসাজ। শুভ্রবাবু অবশ্য বলেন "হেড স্পা"।

মনোর স্ট্রেন্থ হলো যে যে তালুতে কম আর আঙুলে বেশি খেলে। ব্রুট স্টেন্থ নয়, শুভ্রশঙ্খ জানে যে ফিনেসটাই এ যুগে কোয়ালিটি আউউটপুটের মূলমন্ত্র।

"কত যে সাগর নদী"তে কুমারশানু ডুব দেওয়ার সাথে সাথে মনোর হাতের দুপদুপে অবশ হয়ে আসে শুভ্রশঙ্খ। নবরত্নের দু'টো ছোট পাউচ  কেটে মাথাময় বরফ
নির্বাণ ছড়িয়ে দেয় মনো। সে আরামে স্বয়ং ঈশ্বরও মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

হেড-স্পা করানোর পর দিন তিনেক আনন্দবাজার বা নিউজচ্যানেলগুলোকে এড়িয়ে চলে শুভ্রশঙ্খ।

অমরবাবুর রাত

"বাতি নিভিয়ে শুতে এসো"।

প্রত্যুত্তরে আচ্ছা বলাটাই ভদ্রতা। তেমনটাই বললেন অমরবাবু। "আচ্ছা"।

বাতি নেভালেন।
দু'কলি "হরি দিন তো গেলো গাইলেন"।

"আর কতক্ষণ গো? রাত দু'টো বাজতে চললো যে!

অতিশয়োক্তি। অমরবাবু জানেন। এখন সবে সোয়া একটা। এ'সব আবদারে ডাক। তবু। কানে দিব্যি লাগে এ ডাকের মায়াটুকু।

তারপরই খাটের বাঁ পাশ ঘেঁষে গা এলিয়ে দিলেন তিনি।

"এখন এতরাত্রে আর জ্বালিও না বাপু। ঘুমোও। কাল ভোর থেকে মেলা কাজ পড়ে"। খাটের ডান দিক থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর। নরম, মিঠে। কী প্রবলভাবে আদুরে।

মৃদু বিরক্তির "ত্যুত্ " শব্দে ভাসিয়ে দিয়ে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন তিনি। অন্যপাশে ফিরে নিজের পাশবালিশটা বুকে জড়িয়ে চোখ বুজলেন ভেন্ট্রিলোক্যুইস্ট অমর সমাদ্দার।

পাঁচ কুড়ি

- কোড বলুন।
- কোড..হ্যাঁ..ইয়ে..ইশ...এইমাত্তর মনে ছিল..।
- নেক্সট স্পার্মসেল প্লীজ।
- মিস এগ! মনে পড়েছে। "বাঁশঝাড়"।
- শর্টলিস্টেড। রিক্রুটমেন্ট ক্লোজড।

- আসুন।
- আজ্ঞে?
- আসুন।
- কিন্তু..।
- আসুন। উপায় নেই।
- শিওর?
- ট্রাক পিষেছে আপনাকে।
- তাই বলে নরক?
- ভেজ বিরিয়ানির প্যাকেট ছিল আপনার হাতে।

- জনাব!
- জনাবিয়ে বেগমজান।
- অর্জ কিয়া হ্যায়।
- অর্জাইয়ে।
- বোলিয়ে ইরশাদ।
- আচ্ছা। ইরশাদিয়ে।
- রাতে মাটন কষা। হ্যাশট্যাগ তিন শব্দের শায়রি।
- চুমু।
- চুমাইয়ে।

"মানুষের গল্প" পাঠ করা। হাজার ঝামেলা!
ঢোক গিললেন অনাদিবাবু।
বাতি জ্বালো রে,
দেরাজ থেকে মাথা বের করে চশমায় আঁটো রে...।

মানিব্যাগের দরজা খুলতেই অনিকেতকে ইশারায় ডেকে নিলেন একশোটাকারনোটবাবু।
পাঁচশোটাকাজ্যেঠু বারবার বলেছিলেন "ক'দিন জিরিয়ে নে"।
একশোটাকারনোটবাবুর একটাই উত্তর;

"টাইম ইজ পিপল"।

চিয়ার্স

- ধরুন...।
- হুঁ!
- ধরুন পৃথিবীতে আর কোনও মন্দ রইলো না...।
- ইউটোপিয়া?
- ইউফোরিক ব্যাপার। কেউ কারুর মাথায় কাঁঠাল ভাঙছে না। কেউ এগরোলে সস দিচ্ছে না। কেউ লোভে হন্যে হচ্ছে না। উইকেন্ডে সবাই কাহারবা নয় বলে মৃদু দুলছে কিন্তু কমোডে মুখ গুঁজে ওয়াক তুলছে না।
- অফিস টাইমের লোকালে ভিড় থাকছে না। প্রেমের চিঠিতে বানান ভুল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তো?
- আজ্ঞে! ধরুন তেমনটাই। দুনিয়াটা।
- তাতে কী?
- যদি তেমন হত মশাই...।
- তেমন হলে?
- তেমন হলে আয়না থেকে আপনার দিকে গেলাস তাক করে চিয়ার্স বলতে হত না।

নবাব ও বেগমজান

১.

সিলিং ফ্যান থেকে দড়ির মত করে ঝোলানো শাড়ি। ফাঁসটাও পোক্ত। নিখুঁত ব্যবস্থা।

খাটের ওপর মচমচে চেয়ারটা রেখে বেশ তৃপ্ত বোধ করছিলেন বিপাশা। চেয়ারে দাঁড়িয়ে সবে ফাঁসটা গলায় জড়াতে যাবেন..অমনি খচখচটা মাথায় এলো। বালুচরি কাঞ্জিভরম থাকতে সস্তা ছাপায় ঝুলবেন? সবচেয়ে ভালো হত আসাম সিল্কে ঝুললে।  অপূর্ব, যেমন খোলতাই সবুজ তেমন মসৃণ। কিন্তু এমন দরকারি দিনেই সে'টা নেই। কী কুক্ষণেই না লন্ড্রি কাচাতে দিয়েছিলেন।

২.

নন্দবাবুর মেজাজ গেল নিমতেতো হয়ে। একটা সুইসাইড করতে এত টালবাহানা, ভাবা যায়? গত হপ্তায় পুড়ে মরার প্ল্যানটা ক্যানসেল হল কলকাতায় বড্ড গরম পড়েছে বলে।
আজ ঝুলে মরার প্ল্যান ক্যানসেল হলো আসাম সিল্কের শাড়ি রাধাগোবিন্দর লন্ড্রিতে দেওয়া আছে বলে।
বৌকে নিয়ে এ এক মহাফাঁপর।

৩.

- আচ্ছা, জলে ডুবে মরলে কেমন হয়?
- কোথায়? গঙ্গায় যাবে?
- গেলে গঙ্গাই ভালো গো। আত্মহত্যার পাপ লঘু হবে।
- কাল অফিস যাওয়ার পথে ঘাটে নামিয়ে দিয়ে যাই। লাঞ্চের পরপরই ফেরত আসব, কেমন?

৪.

- আজ কী হল?
- মন কেমন করলো গো!
- মন কেমন?
- আর চাইলাম আর মরে গেলাম! তাও হয়? আমার মরব মরব গা করলো আর আমি অমনি সরে পড়লাম, খোলামকুচি নাকি? ও'দিকে তারপর তোমার গেরস্থালী মাথায় উঠুক।
- এমন উদ্ভট শখ পোষার সময় মনে ছিল না? সতেরো বছর ধরে ভেবে আসছি; তুমি মরবে আর আমি এই হারামির গাছ অফিসের মুখে লাথি মেরে বেরিয়ে আসব। বাড়িতে ঠোঙা বানাবো। রাজার হালে থাকব। সতেরো বছর ধরে তোমার খালি টালবাহানা আর টালবাহানা। এ'দিকে আমি রইলাম ঝুলে।
- এক কাজ করি চলো, পুরী ঘুরে আসি। কেমন? তা'তে তোমার আমার মন ভালো হবে। ফিরে এসে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ব'খন। ইঁদুরের বিষে অসাধ্য সাধন হয় শুনেছি। দিন সাতেক ঘুরে আসি পুরী, তারপর না হয় তুমি আমায় কয়েক প্যাকেট এনে দিও, কেমন?
- সতেরো বছরে এ নিয়ে বত্রিশ নম্বর পুরী ট্রিপ।
- টিকিট দেখো।
- সেই ভালো।