Sunday, October 23, 2016

চিয়ার্স

- ধরুন...।
- হুঁ!
- ধরুন পৃথিবীতে আর কোনও মন্দ রইলো না...।
- ইউটোপিয়া?
- ইউফোরিক ব্যাপার। কেউ কারুর মাথায় কাঁঠাল ভাঙছে না। কেউ এগরোলে সস দিচ্ছে না। কেউ লোভে হন্যে হচ্ছে না। উইকেন্ডে সবাই কাহারবা নয় বলে মৃদু দুলছে কিন্তু কমোডে মুখ গুঁজে ওয়াক তুলছে না।
- অফিস টাইমের লোকালে ভিড় থাকছে না। প্রেমের চিঠিতে বানান ভুল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তো?
- আজ্ঞে! ধরুন তেমনটাই। দুনিয়াটা।
- তাতে কী?
- যদি তেমন হত মশাই...।
- তেমন হলে?
- তেমন হলে আয়না থেকে আপনার দিকে গেলাস তাক করে চিয়ার্স বলতে হত না।

নবাব ও বেগমজান

১.

সিলিং ফ্যান থেকে দড়ির মত করে ঝোলানো শাড়ি। ফাঁসটাও পোক্ত। নিখুঁত ব্যবস্থা।

খাটের ওপর মচমচে চেয়ারটা রেখে বেশ তৃপ্ত বোধ করছিলেন বিপাশা। চেয়ারে দাঁড়িয়ে সবে ফাঁসটা গলায় জড়াতে যাবেন..অমনি খচখচটা মাথায় এলো। বালুচরি কাঞ্জিভরম থাকতে সস্তা ছাপায় ঝুলবেন? সবচেয়ে ভালো হত আসাম সিল্কে ঝুললে।  অপূর্ব, যেমন খোলতাই সবুজ তেমন মসৃণ। কিন্তু এমন দরকারি দিনেই সে'টা নেই। কী কুক্ষণেই না লন্ড্রি কাচাতে দিয়েছিলেন।

২.

নন্দবাবুর মেজাজ গেল নিমতেতো হয়ে। একটা সুইসাইড করতে এত টালবাহানা, ভাবা যায়? গত হপ্তায় পুড়ে মরার প্ল্যানটা ক্যানসেল হল কলকাতায় বড্ড গরম পড়েছে বলে।
আজ ঝুলে মরার প্ল্যান ক্যানসেল হলো আসাম সিল্কের শাড়ি রাধাগোবিন্দর লন্ড্রিতে দেওয়া আছে বলে।
বৌকে নিয়ে এ এক মহাফাঁপর।

৩.

- আচ্ছা, জলে ডুবে মরলে কেমন হয়?
- কোথায়? গঙ্গায় যাবে?
- গেলে গঙ্গাই ভালো গো। আত্মহত্যার পাপ লঘু হবে।
- কাল অফিস যাওয়ার পথে ঘাটে নামিয়ে দিয়ে যাই। লাঞ্চের পরপরই ফেরত আসব, কেমন?

৪.

- আজ কী হল?
- মন কেমন করলো গো!
- মন কেমন?
- আর চাইলাম আর মরে গেলাম! তাও হয়? আমার মরব মরব গা করলো আর আমি অমনি সরে পড়লাম, খোলামকুচি নাকি? ও'দিকে তারপর তোমার গেরস্থালী মাথায় উঠুক।
- এমন উদ্ভট শখ পোষার সময় মনে ছিল না? সতেরো বছর ধরে ভেবে আসছি; তুমি মরবে আর আমি এই হারামির গাছ অফিসের মুখে লাথি মেরে বেরিয়ে আসব। বাড়িতে ঠোঙা বানাবো। রাজার হালে থাকব। সতেরো বছর ধরে তোমার খালি টালবাহানা আর টালবাহানা। এ'দিকে আমি রইলাম ঝুলে।
- এক কাজ করি চলো, পুরী ঘুরে আসি। কেমন? তা'তে তোমার আমার মন ভালো হবে। ফিরে এসে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ব'খন। ইঁদুরের বিষে অসাধ্য সাধন হয় শুনেছি। দিন সাতেক ঘুরে আসি পুরী, তারপর না হয় তুমি আমায় কয়েক প্যাকেট এনে দিও, কেমন?
- সতেরো বছরে এ নিয়ে বত্রিশ নম্বর পুরী ট্রিপ।
- টিকিট দেখো।
- সেই ভালো।

কাফকাইস্টস

- খোট্টাগুলো ক্যালক্যাটাকে ছাতুর সরবতে গুলে খেয়ে ফেলবে মশাই।
- তাঁরা কী করলে?
- নুইসেন্স। রাস্তাঘাটে, সব জায়গায়। নোংরা, ক্লাসলেস। আর খবর নিয়ে দেখুন কলকাতায় ক্রাইম দুনিয়ায় তাঁদের প্রকোপ কতটা।
- অ। ওরা ছাতুতে ক্যালক্যাটা গুলে খাবে?
- আলবাত।
- কলকাতা গুলে খেতে চাইলে কলকাতার ফুটপাথ আর দেওয়ালগুলোও বোধ হয় গোলা হবে তাই না?
- মানে?
- মানে চিন্তা করবেন না। খোট্টারা বাঙালি কলকাতাকে ছাতুতে গুলে খেতে চাইলেও বেশি সুবিধে করতে পারবে না। অল্প সময়েই বমিতে উগরে দিতে হবে।
- কেন?
- ওই। কলকাতার রাস্তাঘাটে দেওয়ালে এত কালচারড  বাঙালি হিসি মিশে আছে যে সে ছাতুর সরবত খোট্টাদের রিক্সাটানা পেটানো পেটেও সইবে না। নিশ্চিন্তে খিস্তি করে যান। আরেকটা কফি বলি? কাফকা নিয়ে পড়ুন এবার খোট্টাদের ছেড়ে।

Wednesday, October 19, 2016

খোকার ঘুম

ধরুন দু'শো বত্রিশজন মিলে যদি নিজেদের মধ্যে টিনের ফাঁপা গদা আর অ্যালুমিনিয়ামের তলোয়ার নিয়ে খনখনাৎ করে যুদ্ধ শুরু করে; তার যে হইহইরইরই শব্দ।

সেই হইহইরইরইয়ের শব্দ ত-বাবু শুনতে পান যখন সাড়ে পাঁচ মাসের খোকাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিজের বুকে চেপে ধরেন।

ত-বাবু খোকা কোলে গাইলেন 'ঘুম যায় ও চাঁদ",  খোকা হৌহৌহৌ-খ্যেকখ্যেকখ্যেক করে জানান দিলে সে বেশ স্ফুর্তি অনুভব করছে।

ত-বাবু পায়চারির গতি ও ছন্দের ম্যাজিকে খোকার দুলুনি আর খ্যাক হাসিকে ঘায়েল করতে চাইলেন। খোকার চোখে চিকচিক ভেসে উঠলো। ও চোখ জোড়ায় খুঁজলে রাবণের স্যান্ডোগেঞ্জি পাওয়া যেতে পারে কিন্তু ঘুম? লেশমাত্র নেই।

"হরিদাসের বুলবুল ভাজা"র অন্তরায় এসে পায়চারীরত ত-বাবুর তন্দ্রা কাটলো খোকার ট্যাঁয়্যায়্যায়্যায়্যা শব্দে। আধ-ঘুমন্ত মানুষের পায়চারীর ট্র‍্যাজেক্টরিতে নিজের বিপদ আঁচ করেই গাঁকগাঁক করে চিল্লিয়েছিল সে।

ত-বাবু "ইয়ে কালি কালি আঁখে, ইয়ে গোরে গোরে গাল"য়ের কলিতে নিজের ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা শুরু করলেন।

অদ্ভুত। কাজ হল মাখনের মত। আকস্মিক।

"ম্যায় মিলি, তু মিলা"র আলাপ পেরোতেই খোকা নেতিয়ে পড়লে।

সেই চোখের পাতায় মেঘের ভেসে বেড়ানোর শব্দ পাওয়া  যায়। খোকার ঘুমে ল্যাতপেতে হয়ে আসায় শীতলপাটি পাতার যে মিহি হাফসেকেন্ডের শব্দ; তা স্পষ্ট অনুভব করতে পারেন ত-বাবু।

খোকার ঘুমন্ত মুখের ডাকনাম "বে অফ বেঙ্গল" দিয়েছেন ত-বাবু। ত-বাবু আজকাল মনেমনে নিজেকে  শ্রী স্বর্গদ্বার বলে ডেকে থাকেন।

Tuesday, October 11, 2016

বিজয়ার ছাত



- দীপু!
- উঁ।
- কী রে?
- কী?
- ঘাটে এলি না যে বড়?
- এমনি।
- এমনি? ইয়ার্কি হচ্ছে? নান্টুমামা রেগে ফায়ার! তোর কাছে নাকি তুবড়ির ব্যাগ ছিল!
- উঁ?
- তুবড়ির ব্যাগ! তোকে দেওয়া ছিল। আর তুই এই ছাদে এসে একলা বসে! ও'দিকে ঠাকুর ভাসানোর সময় হাহাকার! নান্টুমামা তোকে পরের পাঁচটা ম্যাচ সাত নম্বরের আগে ব্যাটিং দেবে না বলেছে।
- ওহ্।
- দীপু।
- উহ্।
- কী?
- উহ্।
- সিদ্ধি তোর সয় না।
- মাও। তাই বলে।
- তবু খেলি কেন?
- সয় না বলে।
- ও।
- ঢাকে কাঠি পড়লে কানে আঙুল দিস। তবু গোটা দিন মণ্ডপে পড়ে থাকিস কেন?
- ওই। ধুপুরধাপুর। সয় না। বাবা রে! উফফ!
- সয় না বলে পড়ে থাকিস? কিচি?
- মেজমামা বলেছে। স্কচ মিঠে সরবত হলে তার কদর রইত না।
- বেশ।
- দীপু।
- হুঁ।
- কলেজ গিয়ে খুব লায়েক হয়েছিস, না?
- হুঁ?
- চিঠি লিখিস না।
- হুঁ।
- চিঠি বুঝি সয়ে এসেছে? তাই লিখতে মন সরে না?
- ধুস।
- আমি সয়ে এসেছি?
- ধুস।
- তুই নিধিরাম সর্দার হলে তোর এই ধুস হলো তোর ঢাল-তলোয়ার।
- ঝিমঝিম করছে। দুলছে।
- দিব্যি, তাই না?
- ভাসছে। দ্যাখ। ছাদটা। ওই বাতিটা।
- বাবু।
- হুঁ।
- কাঁপছে কিচি।
- কেন খাস?
- সয় না যে। তাই।
- শরীর কেমন করছে?
- জিভের তলাটা শুকনো। কাঠ। জানিস। আর বুকের ভিতরে...।
- ভিতরে?
- দিদার মাথায় জবাকুশুম তেল, তাতে সিঁদুর থ্যাবড়ানো সিঁথি। আঁচল কী ঘুচিমুচি নরম! সমস্ত মিলে একটা দলা পাকানো গন্ধ। বুকের ভিতরে। দিদার সেই গন্ধটা। গুলি পাকিয়ে ঘুরছে। ঘুরছে। দ্যাখ। ওই ডিশ অ্যান্টেনাটা দ্যাখ। ওই খানে ভূতের ভয়।
- এ নিয়ে তিন নম্বর পুজো।
- দিদা ছাড়া। করেক্ট। তুই মনে রাখিস।
- ঘরে চ' বাবু।
- পরে।
- কান ধরব?
- হিঁড়হিঁড় করে টেনে নামাবি?
- শরীর খারাপ লাগছে?
- নামাবি? হিঁড়হিঁড় করে?
- কী হয়েছে?
- তোর পায়ে রক্ত বাবু।
- আলতা।
- রক্ত।
- বেশ। তো?
- ভয় কিচি। ভয়! সয়ে আসবে কী করে?
- ভয়? শুধু ভয়? ছেলেবেলা থেকে হোমিওপাতি ওষুধে বড় হয়ে উঠলে খোকারা এমনই নেদু হয়।
- কিচি।
- হুঁ?
- অর্জুনদা বড় ভালো।
- বড্ড পেকেছিস।
- আইআইটি কিচি। আইআইটি। কোথায় আইআইটি আর কোথায় মোতিঝিল। কাকুর অর্জুনদার সাথে ইন্টারেস্টিং সব সাব্জেক্টে কথা হয়, ফিজিক্সের নোবেল, গড পার্টিকল কত কী! আর আমার সাথে বছরে একবার কথা "পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা আর এদিকে চাঁদা চাইতে আসা হয়েছে"। এবারেই দ্যাখ। বিল কাটলাম আড়াইশো। মাধ্যমিকের নম্বর নিয়ে খোঁটা দিয়ে রফা করলেন পঁচিশ টাকায়। তাও পাঁচটাকার খুচরো ছিল না তাই ডিউ স্লিপ রেখে দিয়ে যেতে বললেন।
- তো?
- অর্জুনদা চাঁদা চাইতে বেরোয় না।
- বড্ড বাতেলাবাজ। অত ধুপুরধাপুর কথা সহ্য হয় না।
- ঢাকও তো তোর সহ্য হয় না। তবু মণ্ডপে পড়ে থাকিস। ওর বাতেলাও সয়ে যাবে।
- কবিরাজি তোর নাকি সইত না। কলেজ কেটে, পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ কামাই করে তিন্নির সাথে গিয়ে ফিশ কবিরাজি তো দিব্যি গিলে যাচ্ছিস। দিনের পর দিন।
- দু'দিন।
- পিঠের চামড়া তুলে নেব।
- পাঁচ দিন।
- পাঁচ?
- কিচি! হাত ছাড়!
- জুডোওয়ালির সাথে বাওয়ালি?
- আট দিন।
- গুণধর।
- অর্জুনদা তোকে কথোপকথনের পুরো সেট দিয়েছে।
- তাই? তাই আমি সয়ে এসেছি? কিন্তু তিন্নির সাথে বাবুঘাট সয়নি?
- হাত। কিচি! ছাড়!
- নুন হলুদ লাগাতে পারবে? তিন্নি?
- অর্জুনদার ওয়ালেটে তোর ফটো!
- মিথ্যে কথা।
- এই দেখ।
- এ'টা কী!
- অর্জুনদার মানিব্যাগ।
- তুই পকেট কেটেছিস?
- মণ্ডপে তোর ছবি মানিব্যাগ থেকে নিজের বন্ধুদের দেখাচ্ছিল। রাস্কেল। ভাসানের ভিড়ে পকেট থেকে ঝেড়ে পালিয়ে এসেছি।
- ও আইআইটি, তুই মোতিঝিল। ওর মানিব্যাগ আর তোর পকেট কাটা। ছিঃ বাবু।
- মর তুই।
- কত আছে?
- কী কত?
- ন্যেকু। মানিব্যাগে। কত টাকা?
- রহিস। দেড়!
- আমাদের ছয় মাসের কাটলেট আর বাবুঘাট। তিন্নি বাদ, কেমন? বাবু?
- মরে যাস না কেন?
- তোর সিদ্ধি সয় না, তাও খাস। আমার মতিঝিলওলাদের সহ্য হয় না, তবু তোকে ধরে রাখতে হয়। মরে যাব কই?
- ও। হুঁ।
- বাবু, ঠোঁট সয়?
- বদ মেয়ে।
- সয়?
- না।
- শুভ বিজয়া।
- আমি তোর চেয়ে দু'দিনের বড় কিচি। প্রণাম কর।