Sunday, October 23, 2016

কাফকাইস্টস

- খোট্টাগুলো ক্যালক্যাটাকে ছাতুর সরবতে গুলে খেয়ে ফেলবে মশাই।
- তাঁরা কী করলে?
- নুইসেন্স। রাস্তাঘাটে, সব জায়গায়। নোংরা, ক্লাসলেস। আর খবর নিয়ে দেখুন কলকাতায় ক্রাইম দুনিয়ায় তাঁদের প্রকোপ কতটা।
- অ। ওরা ছাতুতে ক্যালক্যাটা গুলে খাবে?
- আলবাত।
- কলকাতা গুলে খেতে চাইলে কলকাতার ফুটপাথ আর দেওয়ালগুলোও বোধ হয় গোলা হবে তাই না?
- মানে?
- মানে চিন্তা করবেন না। খোট্টারা বাঙালি কলকাতাকে ছাতুতে গুলে খেতে চাইলেও বেশি সুবিধে করতে পারবে না। অল্প সময়েই বমিতে উগরে দিতে হবে।
- কেন?
- ওই। কলকাতার রাস্তাঘাটে দেওয়ালে এত কালচারড  বাঙালি হিসি মিশে আছে যে সে ছাতুর সরবত খোট্টাদের রিক্সাটানা পেটানো পেটেও সইবে না। নিশ্চিন্তে খিস্তি করে যান। আরেকটা কফি বলি? কাফকা নিয়ে পড়ুন এবার খোট্টাদের ছেড়ে।

Wednesday, October 19, 2016

খোকার ঘুম

ধরুন দু'শো বত্রিশজন মিলে যদি নিজেদের মধ্যে টিনের ফাঁপা গদা আর অ্যালুমিনিয়ামের তলোয়ার নিয়ে খনখনাৎ করে যুদ্ধ শুরু করে; তার যে হইহইরইরই শব্দ।

সেই হইহইরইরইয়ের শব্দ ত-বাবু শুনতে পান যখন সাড়ে পাঁচ মাসের খোকাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য নিজের বুকে চেপে ধরেন।

ত-বাবু খোকা কোলে গাইলেন 'ঘুম যায় ও চাঁদ",  খোকা হৌহৌহৌ-খ্যেকখ্যেকখ্যেক করে জানান দিলে সে বেশ স্ফুর্তি অনুভব করছে।

ত-বাবু পায়চারির গতি ও ছন্দের ম্যাজিকে খোকার দুলুনি আর খ্যাক হাসিকে ঘায়েল করতে চাইলেন। খোকার চোখে চিকচিক ভেসে উঠলো। ও চোখ জোড়ায় খুঁজলে রাবণের স্যান্ডোগেঞ্জি পাওয়া যেতে পারে কিন্তু ঘুম? লেশমাত্র নেই।

"হরিদাসের বুলবুল ভাজা"র অন্তরায় এসে পায়চারীরত ত-বাবুর তন্দ্রা কাটলো খোকার ট্যাঁয়্যায়্যায়্যায়্যা শব্দে। আধ-ঘুমন্ত মানুষের পায়চারীর ট্র‍্যাজেক্টরিতে নিজের বিপদ আঁচ করেই গাঁকগাঁক করে চিল্লিয়েছিল সে।

ত-বাবু "ইয়ে কালি কালি আঁখে, ইয়ে গোরে গোরে গাল"য়ের কলিতে নিজের ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা শুরু করলেন।

অদ্ভুত। কাজ হল মাখনের মত। আকস্মিক।

"ম্যায় মিলি, তু মিলা"র আলাপ পেরোতেই খোকা নেতিয়ে পড়লে।

সেই চোখের পাতায় মেঘের ভেসে বেড়ানোর শব্দ পাওয়া  যায়। খোকার ঘুমে ল্যাতপেতে হয়ে আসায় শীতলপাটি পাতার যে মিহি হাফসেকেন্ডের শব্দ; তা স্পষ্ট অনুভব করতে পারেন ত-বাবু।

খোকার ঘুমন্ত মুখের ডাকনাম "বে অফ বেঙ্গল" দিয়েছেন ত-বাবু। ত-বাবু আজকাল মনেমনে নিজেকে  শ্রী স্বর্গদ্বার বলে ডেকে থাকেন।

Tuesday, October 11, 2016

বিজয়ার ছাত



- দীপু!
- উঁ।
- কী রে?
- কী?
- ঘাটে এলি না যে বড়?
- এমনি।
- এমনি? ইয়ার্কি হচ্ছে? নান্টুমামা রেগে ফায়ার! তোর কাছে নাকি তুবড়ির ব্যাগ ছিল!
- উঁ?
- তুবড়ির ব্যাগ! তোকে দেওয়া ছিল। আর তুই এই ছাদে এসে একলা বসে! ও'দিকে ঠাকুর ভাসানোর সময় হাহাকার! নান্টুমামা তোকে পরের পাঁচটা ম্যাচ সাত নম্বরের আগে ব্যাটিং দেবে না বলেছে।
- ওহ্।
- দীপু।
- উহ্।
- কী?
- উহ্।
- সিদ্ধি তোর সয় না।
- মাও। তাই বলে।
- তবু খেলি কেন?
- সয় না বলে।
- ও।
- ঢাকে কাঠি পড়লে কানে আঙুল দিস। তবু গোটা দিন মণ্ডপে পড়ে থাকিস কেন?
- ওই। ধুপুরধাপুর। সয় না। বাবা রে! উফফ!
- সয় না বলে পড়ে থাকিস? কিচি?
- মেজমামা বলেছে। স্কচ মিঠে সরবত হলে তার কদর রইত না।
- বেশ।
- দীপু।
- হুঁ।
- কলেজ গিয়ে খুব লায়েক হয়েছিস, না?
- হুঁ?
- চিঠি লিখিস না।
- হুঁ।
- চিঠি বুঝি সয়ে এসেছে? তাই লিখতে মন সরে না?
- ধুস।
- আমি সয়ে এসেছি?
- ধুস।
- তুই নিধিরাম সর্দার হলে তোর এই ধুস হলো তোর ঢাল-তলোয়ার।
- ঝিমঝিম করছে। দুলছে।
- দিব্যি, তাই না?
- ভাসছে। দ্যাখ। ছাদটা। ওই বাতিটা।
- বাবু।
- হুঁ।
- কাঁপছে কিচি।
- কেন খাস?
- সয় না যে। তাই।
- শরীর কেমন করছে?
- জিভের তলাটা শুকনো। কাঠ। জানিস। আর বুকের ভিতরে...।
- ভিতরে?
- দিদার মাথায় জবাকুশুম তেল, তাতে সিঁদুর থ্যাবড়ানো সিঁথি। আঁচল কী ঘুচিমুচি নরম! সমস্ত মিলে একটা দলা পাকানো গন্ধ। বুকের ভিতরে। দিদার সেই গন্ধটা। গুলি পাকিয়ে ঘুরছে। ঘুরছে। দ্যাখ। ওই ডিশ অ্যান্টেনাটা দ্যাখ। ওই খানে ভূতের ভয়।
- এ নিয়ে তিন নম্বর পুজো।
- দিদা ছাড়া। করেক্ট। তুই মনে রাখিস।
- ঘরে চ' বাবু।
- পরে।
- কান ধরব?
- হিঁড়হিঁড় করে টেনে নামাবি?
- শরীর খারাপ লাগছে?
- নামাবি? হিঁড়হিঁড় করে?
- কী হয়েছে?
- তোর পায়ে রক্ত বাবু।
- আলতা।
- রক্ত।
- বেশ। তো?
- ভয় কিচি। ভয়! সয়ে আসবে কী করে?
- ভয়? শুধু ভয়? ছেলেবেলা থেকে হোমিওপাতি ওষুধে বড় হয়ে উঠলে খোকারা এমনই নেদু হয়।
- কিচি।
- হুঁ?
- অর্জুনদা বড় ভালো।
- বড্ড পেকেছিস।
- আইআইটি কিচি। আইআইটি। কোথায় আইআইটি আর কোথায় মোতিঝিল। কাকুর অর্জুনদার সাথে ইন্টারেস্টিং সব সাব্জেক্টে কথা হয়, ফিজিক্সের নোবেল, গড পার্টিকল কত কী! আর আমার সাথে বছরে একবার কথা "পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা আর এদিকে চাঁদা চাইতে আসা হয়েছে"। এবারেই দ্যাখ। বিল কাটলাম আড়াইশো। মাধ্যমিকের নম্বর নিয়ে খোঁটা দিয়ে রফা করলেন পঁচিশ টাকায়। তাও পাঁচটাকার খুচরো ছিল না তাই ডিউ স্লিপ রেখে দিয়ে যেতে বললেন।
- তো?
- অর্জুনদা চাঁদা চাইতে বেরোয় না।
- বড্ড বাতেলাবাজ। অত ধুপুরধাপুর কথা সহ্য হয় না।
- ঢাকও তো তোর সহ্য হয় না। তবু মণ্ডপে পড়ে থাকিস। ওর বাতেলাও সয়ে যাবে।
- কবিরাজি তোর নাকি সইত না। কলেজ কেটে, পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ কামাই করে তিন্নির সাথে গিয়ে ফিশ কবিরাজি তো দিব্যি গিলে যাচ্ছিস। দিনের পর দিন।
- দু'দিন।
- পিঠের চামড়া তুলে নেব।
- পাঁচ দিন।
- পাঁচ?
- কিচি! হাত ছাড়!
- জুডোওয়ালির সাথে বাওয়ালি?
- আট দিন।
- গুণধর।
- অর্জুনদা তোকে কথোপকথনের পুরো সেট দিয়েছে।
- তাই? তাই আমি সয়ে এসেছি? কিন্তু তিন্নির সাথে বাবুঘাট সয়নি?
- হাত। কিচি! ছাড়!
- নুন হলুদ লাগাতে পারবে? তিন্নি?
- অর্জুনদার ওয়ালেটে তোর ফটো!
- মিথ্যে কথা।
- এই দেখ।
- এ'টা কী!
- অর্জুনদার মানিব্যাগ।
- তুই পকেট কেটেছিস?
- মণ্ডপে তোর ছবি মানিব্যাগ থেকে নিজের বন্ধুদের দেখাচ্ছিল। রাস্কেল। ভাসানের ভিড়ে পকেট থেকে ঝেড়ে পালিয়ে এসেছি।
- ও আইআইটি, তুই মোতিঝিল। ওর মানিব্যাগ আর তোর পকেট কাটা। ছিঃ বাবু।
- মর তুই।
- কত আছে?
- কী কত?
- ন্যেকু। মানিব্যাগে। কত টাকা?
- রহিস। দেড়!
- আমাদের ছয় মাসের কাটলেট আর বাবুঘাট। তিন্নি বাদ, কেমন? বাবু?
- মরে যাস না কেন?
- তোর সিদ্ধি সয় না, তাও খাস। আমার মতিঝিলওলাদের সহ্য হয় না, তবু তোকে ধরে রাখতে হয়। মরে যাব কই?
- ও। হুঁ।
- বাবু, ঠোঁট সয়?
- বদ মেয়ে।
- সয়?
- না।
- শুভ বিজয়া।
- আমি তোর চেয়ে দু'দিনের বড় কিচি। প্রণাম কর।

Monday, October 10, 2016

হাত

- ম্যানিকিওরের চার্জেস কত?
- টু হান্ড্রেড রুপিজ অনলি।
- শিওর?
- মানে?
- ক্লায়েন্ট দেখে রেট পালটে ফেলবেন না তো?
- কুড়ি বছরের বিজনেস ম্যাডাম। চীফ মিনিস্টার হোক কি পিসীমা, ফিক্সড প্রাইস।
- কেসটা একটু অন্যরকম স্যার। ম্যানিকিওর আমার মা করাবেন।
- ওই। টু হান্ড্রেড রুপিজ পার ম্যানিকিওর। আপনার মা হোন বা জ্যেঠিমা।
- শিওর?
- ধ্যার রে বাবা। বললাম তো। ফিক্সড।
- নড়নচড়ন যেন না হয়।
- উফফ!
- বেশ। মা আসছেন।
- ওনার নাম? রেজিস্টারে লিখে রাখি।
- দুর্গা!
- ড্যাম!


সাধারণ বোলার উইকেট পাওয়ার পর:

বাকি দশজন ফিল্ডার তাঁকে ঘিরে ধরে।
তারপর;
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ।

**

মিস দুর্গা উইকেট পাওয়ার পর:

বাকি দশজন ফিল্ডার তাঁকে ঘিরে ধরে।
তারপর;
হাই ফাইভ
হাই ফাইভ।

Sunday, October 9, 2016

পুজোর আমি

বয়স বাড়ছে।
ভিড়ে তিতিবিরক্ত লাগে।
পুজোবার্ষিকী পত্রিকাগুলো নিরস লাগে।
পুজো এলেই পকেটে যন্ত্রণাময় টান পড়ে।
Peer প্রেশার আর পিয়ার প্রেশারে হিমাচল কাশ্মীর প্ল্যান করে নাভিশ্বাস উঠে যায়।
বারবার গজরগজর করে যাই- আলসে বাঙালির এ সেন্টিমেন্ট ঝুঠা।
বারবার বুক ঠুকে বলে যাই 'কিস্যু ম্যাটার করে না, আলটিমেটলি বিজয়ার ওপারে অফিস। এন্ড অফ স্টোরি'।

তবু।
অষ্টমীর সন্ধ্যেয়। প্রবাসের এই অচেনা পুজো মণ্ডপে এসে একটা নধর 'তবু' দাঁত বের করে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।

**

দিল্লীতে বেমক্কা ঘুরে বেড়াচ্ছি। কারণ পুজোর গোটাদিন সোফায় শুয়ে বসে থাকলে পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে। চিত্তরঞ্জন পার্কের অষ্টমীরল ভিড়ের বহর দেখে স্রেফ পিঠ বাঁচিয়ে সরে পড়া। তবে সন্ধ্যের আগে অষ্টমীতে বাড়ি ফিরলে লোকে কাপুরুষ বলবে।

অতএব ভিড়ের দমবন্ধ করা দাপট বাঁচিয়ে খুঁজেপেতে পৌঁছলাম কাশ্মীরিগেটের পুজোয়। ভিড় রয়েছে, তবে বেসামাল নয়। খালি চেয়ার দিব্যি গড়াগড়ি যাচ্ছে এ'দিক ও'দিক। চায়ের কাপ হাতে বসে জিরিয়ে নেওয়া যায়। মণ্ডপে ততক্ষণে সন্ধিপূজার আবহ।

ধূপ ধুনোর গন্ধ, পুরোহিতের ব্যস্ততা, ভলেন্টিয়ারদের অমায়িক দৌড়ঝাঁপ। গৌতম ভট্টাচার্যের চোখ থাকলে দেখা যেত পঞ্চপ্রদীপের আলোয় দেবীমুখের হাসি যেন আজ সামান্য বেশি চওড়া।

তারপর। ঢাকের কুড়কুড়কুড়কুড় যে মুহূর্তে গোটা মণ্ডপের বাতাসে মিশে যেতে শুরু করল, সে মুহূর্তে সেই 'তবু' সামনে ঝপাৎ করে এসে পড়লে।

যতই যা কিছু গোল্লায় যাক।
'তবু'। পুজো তো।

**

মফস্বলে বেড়ে ওঠা। কলকাতার থীম দূরঅস্ত। পাড়ার পুজোর বাইরে এলাকার অন্য পুজোও তেমন ভাবে দেখা হয়ে উঠত না। দেখার প্রয়োজন হত না।

পুজো কনসেন্ট্রেটেড হয়ে থাকত পাড়ার মণ্ডপে।
আর পুজো পুজোতে কনভার্ট হত চব্বিশ ক্যারাটের ইয়ারদোস্তদের সান্নিধ্যে। পুজোর মত সুগভীর বন্ধু-ফিল্টার খুব কম পেয়েছি।

ষষ্ঠী টু দশমী। জলখাবারের পর থেকে দুপুরের মাংস ভাতের আগে পর্যন্ত আস্তানা ছিল পাড়ার মণ্ডপ। দুপুরের আড্ডা কোনও এক বন্ধুর বাড়িতে। বিকেল থেকে ফের মণ্ডপে। সকালের প্রসাদ, বিকেলের ভোগ কোনওটা বাদ যেত না। পাড়ার নাটক, জলসা; সবেতেই রুদ্ধশ্বাস ব্যাপারটা দপদপ করে থাকত।

খান ছয়েক চেয়ার গোল করে পেতে গল্প হত। বই ক্যাসেট হাতবদল হত। কন্ট্র‍্যাব্যান্ড এ'দিক থেকে ও'দিক হত।  আর রইত খাওয়াদাওয়া। তখন সকলের পকেটেই চ্যারিটির টু'পাইস। আলুর দম টু ফুচকা টু ঘুগনি টু রুটি তড়কা; সে'টুকুই। বড়জোর বরাতজোরে একবার স্টেপ আউট করে দি গ্রেট শাহাজাদী রেস্তোরাঁর ফ্রায়েড রাইস ও দু'প্লেট চিলি চিকেনে ছ'জনের ডাইভ। কিন্তু ওই। অমৃত ইজ আ স্টেট অফ মাইন্ড।
খোকাবেলা থেকে কলেজ, পুজোর রুটিন এদিক সেদিক হয়নি একবারও।

তেমনই এক পুজোর দুপুরেই প্রথম বিভূতিভূষণ ধরিয়েছিলে এক বন্ধু। ক্লাস ফোর। চাঁদের পাহাড়।

পুজোর বিকেলে গঙ্গার ঘাটে প্রথম সিগারেট। সম্ভবত অষ্টমীতেই।

প্রথম "মৌ মেয়েটাকে তোর কেমন লাগে?"। আমি বললাম "দিব্যি", সে'দিন সপ্তমী। বন্ধুটি স্নেহের সাথে মাথা নাড়লে। সে বন্ধুই নবমীর দুপুরে বললে "তোর সাথে মৌ দেখা করতে চেয়েছে। ওদের বাড়ির পাশে কলতলায়। এখুনি। সিক্রেট কিন্তু"। বুকে হাতুড়ি, হাতের তালুতে ঘাম। বন্ধুর সাথে হাজির কলতলায়। দুপুর তিনটে। মৌকে দেখিয়ে আমায় এগিয়ে দিলে বন্ধুটি।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মৌয়ের চাবুক "তুমি আমার সাথে একলা দেখা করতে চেয়েছ কেন? মতলবটা কী?"।
গলা শুকিয়ে কাঠ। বলতে চাইলাম "আমি ডাকিনি, মাইরি"। মুখ দিয়ে বেরোল "সরি"। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম গুলসম্রাট হাওয়া।

পুজোর কোনও এক বিকেলে শোনা এক ভদ্রলোক স্রেফ একটা গিটার নিয়ে গাইছেন। গাইছেন এমন একজনকে নিয়ে  যে একটা বেঢপ সাইজের ব্যাগ নিয়ে একটা ছুটন্ত বাসের ফুটবোর্ডে ওঠার জন্য মরিয়া। তাকে নিয়ে গান হয়? এ সুর এমন অন্য কেন? এক বন্ধুর বাড়ির ছাতের ঘরে সন্তোষ স্টিরিওতে প্রথম শোনা সেই গান। সেই। পুজোর বিকেলে।

পুজোর দুপুরেই হাতেখড়ি ট্যুয়েন্টি নাইনে। আলসের গ্ল্যাডিয়েটরগিরি। মসৃণ, বাতেলায় মেদুর, রঙের খেলা। আহা।

পুজোয় প্রথম নেশার রঙ চেনা।
আবছায়া রাত। কুচোনো শসা আর বাদাম ভাজার মুচমুচে স্বাদে মিলেমিশে যাওয়া ওল্ড মঙ্ক। মাথা বুকের ভিতরের রিমঝিম।
সিদ্ধি বানানোর দুপুর। বিজয়ার টলে যাওয়া পা মাথার সন্ধ্যে। তারপর পেটে গুজিয়া পড়লে আর রক্ষা নেই। "ভাই তোরা আছিস তাই আছি, ছেড়ে যাস না"। এক পা ফেলতে দুই পা এগোনো। হাসলে হাসি থামে না, অথচ মাঝেমাঝে কান্না ভসভসিয়ে বুক বেয়ে উঠে আসে।

কত গল্প, কত গল্প, কত গল্প। কত জমে থাকা গল্প ঝুলি থেকে বের করে আনার পুজো। পুজো। পুজোর সন্ধ্যে। জ্বলজ্বলে পাড়ার মণ্ডপ। সন্ধ্যারতির শেষে শালপাতার দোনায় খিচুড়ি লাবড়া। সকলের মুখ আলো আলো। ঢাকে কাঁসরঘণ্টায় মেহফিল গুলজার। কত ভালোবাসার সে'সব সন্ধ্যে।

**

সমস্ত আলসেমি ও তিতিবিরক্তিকে ছয় গোল দিয়ে নাকে পুজোর সে গন্ধ ফিরে এলো।
এই আধচেনা শহরের বেপাড়ার পুজোয়। আজ সন্ধ্যায়।

এই কাশ্মীরি গেটে কত মুখকে পরিচত মনে হল। ইয়ারদোস্তের দল। শশব্যস্ত পাড়াকাকুদের দল। ভোগ বিতরণ সুপারভাইজ করার দাপুটে কমিটিদাদা। হাতে হাত রেখে ঘুরঘুরের ছেলেমেয়েরা।

সমস্ত দুদ্দাড় করে ফিরে এলো। আমার পাড়া। আমার বন্ধুরা। আমার পুজো।

জলে যাক পুজোবার্ষিকী। সেভিংস গোল্লায় যাক। পানমশলার হোর্ডিঙে শহর ছেয়ে যাক। বাঙালির ফাঁপা কালচার বাতিকে প্রাণ ওষ্ঠাগত হোক।

তবু। আমার পুজো আমার থাক। আমার পুজো আমার পাড়ায় থাক। আমার পুজো আমার বন্ধুদের ছুঁয়ে থাক।

আমি পুজো ভালোবাসি, এন্ড অফ দ্য স্টোরি।