Monday, October 3, 2016

ছাত ও সিগারেট

- আসুন।
- এ'টা কোথায়?
- ছাদ। আমাদের বাড়ির।
- মিস দত্ত, ওয়েট। আপনার বাড়ি খড়দা। আমি বারুইপুর। দাঁড়ান। দাঁড়ান।
- অত ভেবে করবেনটা কী?
- আমি শুতে গেলাম বারুইপুরের ফ্ল্যাটের শোওয়ার ঘরে। তখনও টিভি চলছিল..। আচমকা আমার চোখ লেগে আসে...।
- আপনি বড় বাজে চিন্তা করেন।
- এ'টা চিন্তার সাব্জেক্ট নয়?
- এ'টা আমার স্বপ্ন। হল?
- ওহ। আই সী।
- এই নিন মিস্টার বোস। গোল্ডফ্লেক।
- ও কী! আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি তো।
- আমার স্বপ্নে ছাড়েননি।
- সর্বনাশ!
- নিন। জ্বালান। আমার কাউন্টার।
- অগত্যা!
- এ'সময়টা বড্ড মন কেমন করা মিঠে হাওয়া আসে ছাদের এ'দিকটায়। গঙ্গার সরসরে শব্দটা শুনতে পারছেন?
- মফস্বলের ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটবাড়ির মানুষ। ছাদের গঙ্গার হাওয়া ইন্টারসেপ্ট করার কান আমার নেই মিস দত্ত।

**

- শুনুন!
- এ কী! মিস দত্ত! এখানে? এ'সময়?
- ইউ টেল মি মিস্টার বোস! আমি কোথায়?
- মানে? ঠাট্টা করছেন? এ'টা আমাদের বারুইপুরের পাড়া। রাতবিরেতে একটাই মাত্র সিগারেটের দোকান খোলা থাকে। ভজাদার পান স্টল। কিন্তু আপনি এত রাত্রে খড়দা ছেড়ে এখানে? কোনও আত্মীয়টাত্মীয়র বাড়ি? বন্ধুবান্ধব?
- একদম বাজে কথা বলবেন না!
- মানে?
- মানে, দিব্যি খড়দার বাড়ির ছাদে মাদুর পেতে বসেছিলাম। একটু ঢুলুনি এসেছে কি দেখি ছাদে আপনি।
- হুঁ? মানে?
- স্বপ্ন ছিল! অবভিয়াসলি!
- আপনার স্বপ্নে আমি? মাইরি?
- ন্যাকা সাজবেন না। আমি আপনাকে সিগারেট অফার করলাম, আপনি বললেন ক্যুইট করেছেন। আমি ইনন্সিস্ট করলাম। কারণ স্বপ্নটা আমার ছিল।
- কিন্তু আমি সত্যিই সিগারেট ছেড়েছিলাম।
- তাহলে এত রাত্রে আপনি সিগারেট খুঁজতে বেরিয়েছেন কেন?
- জানি না। টিভি দেখতে দেখতে চোখ লেগে এসেছিল। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে মনে হল যেন প্রবল গোল্ডফ্লেকের নেশা চাগাড় দিয়ে উঠেছে। আনন্যাচুরাল। কিন্তু ওই, অগত্যা!
- আপনার ঘুম ভাঙেনি।
- মানে?
- মানে আমি কোনভাবেই এ'সময় বারুইপুরে আসতে পারি না। ইট হ্যাস টু বি আ ড্রীম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে...।
- কী বলে যাচ্ছেন বলুন তো?
- প্রশ্ন হচ্ছে, স্বপ্নটা কার?
- ধুস। গুলিয়ে যাচ্ছে। সিগারেট ধরাই আগে। পরে ভাবব। আপনার তো চলে...।
- কাউন্টার দিলেই হবে।

**

- কী বুঝছেন?
- ভজাদার সিগারেটের দোকান। এইখানে। আর এইটা, আপনাদের বাড়ি।
- আমাদের খড়দার বাড়ি।
- আর ভজাদার দোকান আমাদের বারুইপুরের পাড়ায়।
- কাজেই এ'টা স্বপ্ন মিস্টার বোস?
- বিলকুল! কিন্তু কার? কার স্বপ্নে কে আছে?
- আমি আপনার খড়দার বাড়ি দেখিনি। আপনি ভজাদার দোকানের খবর জানেন না।
- বাড়ি খুব জেনারেল ব্যাপার। সবার থাকে। কিন্তু ভজাদার দোকান খুব স্পেসিফিক ইনফরমেশন।
- তাহলে বলছেন আমারই স্বপ্ন?
- মনে হচ্ছে তাই মিস্টার বোস!
- ওহ।
- গশ্! আমি ফ্রী!
- ওহ! ওহ!
- চুমু খাবেন?
- আ...আ...আ...।
- আচার চাই?
- আমি যে কেউ না মিস দত্ত! আপনার মধ্যে আকাশী রঙ আছে। আলো আছে। চোখের চিকচিক। হাসি মিস দত্ত! আপনার হাসি! আমার তো ফিফথ ডেসিমাল প্লেসের মত ভেসে যাওয়ার কথা।
- খুব চালিয়াতি,  না?
- মাইরি। আমি কিছু না। আপনি সমস্ত। আমি আপনার "ওগো হ্যাঁগো"র যোগ্য নই। ডেস্পারেশন ভাবুন। স্বপ্নে সিগারেট কিনতে এসে আপনাকে টেনে এনেছি।
- আমায় আপনার স্বপ্নে যখন এনেইছেন, তখন আসুন আমাদের বাড়ির ছাদে। এইত্তো, বারুইপুরের ভজাদার দোকানের পাশেই আমার খড়দার বাড়ি আর তার ছাদ। আসুন।
- মিস দত্ত...। আমার ভূতের ভয়। আপনার পায়ে আলতা। আমার আলতা পায়ের ভয়। আপনার ভয়। ছোট টিপ। শিরশির। আর এইভাবে স্বপ্নে এসে দাঁড়ানো হয়নি আগে। আমি খুব সহজে ভেসে যাই।
- আমি খুব ভালো সামলে রাখতে পারি, কেমন?
- আচ্ছা।
- বিয়ে করতাম। আপনার স্বপ্ন না হলে। পুরুষমানুষের স্বপ্নে বিশ্বাস করতে নেই।
- আচ্ছা।
- আসুন। ছাদে।

**

তমাল বোসের ঘুমটা যখন ভাঙলো তখন তিনি টের পেলেন যে টিভি, ঘরের লাইট সমস্ত অন রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

আচমকা একটা দলা পাকানো গোল্ডফ্লেক সুখটানের ইচ্ছে প্রবল ভাবে মাথার ভিতর নাড়া দিল। সিগারেট ছেড়ে দিব্যি আছেন আজ বছর চারেক হল অথচ এমন অদ্ভুত নেশার চাড় আগে কোনওদিন অনুভূত হয়নি। অথচ এখন প্রায় রাত বারোটা। এ'সময় খোলা আছে শুধু স্টেশনের কাছে ভজাদার সিগারেটের দোকান। ভজাদার কথা মনে আসতেই সদ্য দেখা স্বপ্নটা দড়াম করে মনে ফিরে এলো।

মিস দত্ত!
উফ! সে কী কাঁপুনি। আর টেলিপ্যাথির বাবা হয়ে তখনই ব্যাপারটা ঘটলো। আচমকা পিং শব্দে মোবাইল হাতে নিয়ে এসএমএস চেক করলেম বোসবাবু।

মিস দত্ত লিখেছেন;

"এ'সময়টা বড্ড মন কেমন করা মিঠে হাওয়া আসে ছাদের এ'দিকটায়। গঙ্গার সরসরে শব্দটা শোনাতাম আপনাকে, যদি থাকতেন এ সময়টা পাশে। আর পারলে আপনাকে একটা গোল্ডফ্লেক খাওয়াতাম। জানি আপনি ছেড়ে দিয়েছেন। তবুও"।

Thursday, September 29, 2016

ক্যাপ্টেন ও খোকা

- খোকা।
- উম।
- তোমার জন্য কী এনেছি দেখো।
- উম।
- দেখবে না?
- না।
- এ'দিকে দেখই না একবার।
- কই। কী এনেছ?
- গুড বয়। এই দেখ। ইয়াব্বড় লাল এরোপ্লেন। এ'টা এই রিমোট দিয়ে ওড়ানো যায়।
- উম।
- তুমি নেবে না?
- মা বারণ করে। কারুর থেকে কিছু নিতে।
- আমি কিন্তু তোমার মাকে বলে এসেছি।
- থ্যাঙ্ক ইউ।
- তোমার ভালো লেগেছে?
- হুঁ।
- এ'টা তোমার টেডি খোকা?
- ও টেডি নয়। ওর নাম গুবলু। আর ওর পাশে...।
- ওই মিকি মাউস?
- ও মিকি নয়। ওর নাম অভ্র। আমার দেওয়া নাম।
- বাহ। দারুণ নাম তো।
- তোমার নাম কী?
- আমি? আমি ক্যাপ্টেন রয়।
- তুমিই...।
- হুঁ। তোমায় কে বলেছে?
- মা। মা আমায় সব বলে।
- তোমার মা খুব ভালো।
- মা আমায় আইস্ক্রিম খেতে দেয়না।
- ওহ। তোমার আইসক্রিম খুব ভালো লাগে?
- বাটার স্কচ। বাবা আমায় খেতে দিত।
- খোকা।
- আমার বাবা খারাপ লোক ছিল?
- না খোকা।
- তুমি খারাপ লোক?
- সরি।
- সবাই বাবাকে খারাপ বলে।
- মা কী বলে?
- মা বলে বাবারা ভালো হয়।
- তোমার বাবা খুউব ভালো ছিলেন।
- বাবা আইসক্রিম খেতে দিত। বইতে মলাট দিত। আমায় সিন্ড্রেলার গল্প বলত।
- বাবা গল্প বলত?
- সিন্ড্রেলা, পিনোকিও, মহাভারত, টিপু সুলতান...।
- বাহ।
- মা ভালো গল্প বলে না। মা গান করে। বাবা বাজে গাইত।
- ওহ।
- আমার গল্প বেশি ভালো লাগে। বাবা...।
- সরি খোকা।
- তুমি কেন মারলে বাবাকে?
- আমাদের যুদ্ধ হচ্ছিল। আমি মারা যেতে পারতাম। আমার একটা মেয়ে আছে খোকা। তার নাম টুসি।
- টুসিকে আইসক্রিম খেতে দাও?
- স্ট্রবেরি।
- গল্প?
- হুঁ। তবে তোমার বাবার মত অত গল্প জানি না।
- বাবা মিশরের গল্প জানত। ফ্যারাও, পিরামিড।
- খোকা।
- ক্যাপ্টেন কাকু...।
- হুঁ?
- কেন মারামারি করছিলে?
- বড়রা করে। বড়দের করতে হয়।
- আমার বাবা বড় না হলে কী ভালো হত। ভোর বেলা বাবার সাথে আমি আর লুসি বাগানে যেতাম।
- লুসি কে?
- পাগ। তুমি লুসিকে সরি বলবে?
- খোকা। সরি। লুসিকেও বলব। কেমন?
- আমার খুব। খুব। কষ্ট হয়।
- সরি। খোকা।
- বাবা যুদ্ধে কেন যে গেল।
- যেতে হয়। তোমার বাবা গেছিলেন। আমায় যেতে হয়
- কাকু। আমার প্লেন চাই না।
- আচ্ছা। বেশ। তুমি আমার ওপর খুউব রেগে?
- খুউব।
- সরি।
- বাবা খারাপ ছিল না কাকু। গড প্রমিস। বাবা ঘুড়ি ওড়াতে পারত।
- খোকা। তুমি যখন বড় হবে, তখন মনে রাখবে যে আমি তোমায় সরি বলেছি?
- আমি বড় হলেও টুসিকে মারব না।
- বড় হোস খোকা। কেমন? আজ আসি।

***

- ক্যাপ্টেন! ক্যাপ্টেন ব্যানার্জি! ইয়েস! তুমি পেরেছ! ওদের জেনারেল তোমার বুলেটেই খতম হয়েছে। যুদ্ধ ঘুরে গেছে।
- হুঁ!
- আমরাই জিতছি ক্যাপ্টেন!
- হুঁ!
- ক্যাপ্টেন তুমি দৈত্যবধ করেছ। কে জানে কত নারকীয় হত্যাকাণ্ড ওই জেনারেল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ঘটিয়েছে। কত অসহায় মানুষকে জবাই করেছে ও।
- হুঁ।
- তুমি এত বিমর্ষ কেন ক্যাপ্টেন? গোটা দেশ উৎসবে ভেসে যেতে বসেছে। আর যার মধ্যমণি হয়ে থাকার কথা, এ উল্লাস যার নামে, সে কিনা এই অন্ধকার ঘরে ঘাপটি মেরে বসে?
- শত্রুপক্ষের খুনে জেনারেলকে মারতেই হত। নয়তো আমরা ভেসে যেতাম হয়ত। কিন্তু...।
- কিন্তু কী?
- মৃত্যু তো মৃত্যুই। তাই না স্যর? মারকুটে শত্রুকে মেরে ফেলে স্বস্তিতে জিরোনো যায়, কিন্তু উল্লাস? ঘরে বসে টেবিল চাপড়ে যারা যুদ্ধের সুবাস পেতে চায় তারা আনন্দ করুক, উৎসবে হুল্লোড়ে ডুবে যাক। কিন্তু আই অ্যাম আ সোলজার স্যর। মরণভয়ে পালটা মারতে হয়, মারি। দেশের জন্য। দশের জন্য। কিন্তু মৃত্যু নিয়ে উৎসব?  সংবর্ধনা? মৃত মেজরের ওয়ালেট আমার কাছে। তাতে যে খোকাটির ছবি তার বয়স আমার মেয়ের মতই। সে দেশে গিয়ে খোকার সাথে একবার দেখা করা যায় স্যর? সেই খোকা! সেই খোকার আজ বড় কষ্ট। সে কিনা এখনও বড় হয়নি,কাজেই  সে এখনও আমাদের শত্রু নয়। যায় না? দেখা করা?

Tuesday, September 27, 2016

সঞ্জীববাবু আর ভূত

সন্ধ্যে ৬টা ১০।
ড্রয়ার খুলে কবিতার ডায়েরীটা বের করলেন সঞ্জীববাবু।
 
 
রাত ১টা ১০।
গঙ্গার ঘাটে পৌঁছে পকেট থেকে রিভলভার বের করে হাতের মুঠোয় ধরে সামান্য আশ্বস্ত বোধ করলেন গোকুল চৌধুরী।
 
 
রাত ১টা ১৭।
চার নম্বর পাতা ছিঁড়ে চার নম্বর নৌকোটা বানিয়ে খানিক জিরিয়ে নিলেন সঞ্জীববাবু।
 
 
রাত ১টা ৪২।
রাতের এ দিকটায় বাতাসের ছ্যাঁতছ্যাঁতে শীতটা বাড়ে, গায়ের আলোয়ানটা শক্ত করে জড়িয়ে পায়চারীর গতি বাড়ালেন গোকুল চৌধুরী।
 
 
রাত ১টা ৫৭।
ডায়েরীটা পকেটে পুরে নিশ্চুপে ছাতের পাইপ বেয়ে বাড়ির পিছনের উঠোনে নেমে এলেন সঞ্জীব হালদার।
 
 
রাত ২টো ১২।
দূর থেকে হ্যারিকেনের আলোর দুলুনি চোখে পড়তেই গোকুলবাবুর হাতটা আপনা থেকে চলে গেল বাঁ পকেটে রাখা রিভলভারের বাটে।
 
 
রাত ২টো ১৭।
"ডায়েরীটা কই? একদম ওপর চালাকি নয়"।
 
 
রাত ২টো ২২।
গুলিটা লেগেছে পায়ে, শিশিরভেজা ঘাস কাদায় লুটোপুটি যাচ্ছিলেন সঞ্জীববাবু, তাঁর কানে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে শুধু শোনা যাচ্ছিল "ওই চারটে কবিতা কই? কই ওই চারটে কবিতা?"।
 
 
রাত ২টো ৩৫, ১২ সেকেন্ড।
 
"চারটে কবিতা...চারটে কবিতা...ভেসে গেছে..."।
"সঞ্জীববাবু! আপনি কবি নন, ও চারটেয় এত লোভ"?
"অ-কবির কবিতা! আহ। তার মায়া"।
"যন্ত্রণা হচ্ছে?"
"হাঁটুর নিচে ঠিক। বড্ড"।
"আর আমারটা? সঞ্জীববাবু? আমার যন্ত্রণাটা?"।
"কবিতাগুলো আমার"।
"মানুষটা আমার"।
"মানুষ?"।
"নয়?"।
"ভূত। ভূতের ভয়। ভূতের কবিতা। আহ। যন্ত্রণা"।
"ভয় পান? তাঁকে?"।
"ভূতের ভয়। বললাম তো। বন্দুকে ভয় তেমন নেই গোকুলবাবু"।
"ওই কবিতাগুলো আমার চাই"।
"কেন? আপনি কি কবি?"।
"না, ভূতের বর।ভূত যার কবিতা তার"।
"ও। সে কবিতার কথা...জানলেন কী করে? সেও জানে না যে। আমার কবিতার ডায়েরীর খোঁজ কেউ জানে না"।
"ভূতেরা সব জানে। জোনাকিরা তাঁদের চোখ হয়ে উড়ে বেড়ায়, হুঁ হুঁ বাবা। ওপরচালাকি নয়"।
"ও কবিতায় কাঁচকলা আছে"।
"বাঙাল ভূত। ইলিশে কাঁচকলা ফেলে খায়"।
"কবিতা দেবেন? তাঁকে?"।
" না ভাসিয়ে দেব"।
"ওহ। ভেসেছে। তারা ভেসে গেছে"।
"ফের ধান্দাবাজি, এ'বার বাকি পাঁচটা বুকে ঠুকব"।
"কবিতার ওপর রাগ? আপনি উন্মাদ গোকুলবাবু"!
"অ-কবির কবিতার লোভের প্রতি রাগ। সে আমার"।
"আপনারই তো"।
"কবিতা ওয়াপিস দিন"।
"হয় না। সেগুলো তাঁর নয়"।
"মিথ্যে"।
"ভাসিয়েছি। চারটে কাগজের নৌকা। ওই দিকে"।
 
 
রাত তিনটে পাঁচ।
সঞ্জীববাবুর রক্ত নদীতে মেলানোর আগেই ডুবেছিল চারটে কাগুজে নৌকা। গঙ্গা ছাড়া সে কবিতাদের উপায়ন্তর ছিল না।
 
 
তখন ঘড়ির টিকটিক ছিল না।
 
- আপনি কবিতা লেখেন?
- পাগল?
- আপনি বরাবরই এমন? গা ঘিনঘিনে ন্যাকা? মেয়েলি?
- উফ!
- নাম দিয়ে যাই? 
- কার?
- আপনার না লেখা কবিতার।
- ধ্যের।
- কান মুলে শোনাব? না ভদ্রভাবে শুনবেন?
- ক..কান?
- এক নম্বর, এক ফালি মেঘ। দুই, এক ফোঁটা জল। তিন, রঙ ধনুকের একটি কণা!চার, একটি নিমেষ।
- এ তো...!
- চুপ! একটা জবরদস্ত ডায়েরী কিনবেন। কেমন? চামড়ার বাঁধাই, লাল বর্ডার, সোনালীতে লেখা পার্সোনাল ডায়েরী। কেমন? প্রথম চার পাতার মাথায় চারটে কবিতার নাম। মনে থাকবে?
- ধুস। যত্তসব। আমি আসি। আসি?
- আসুন। আমি আসি?
- আলবাত।
 
সন্ধ্যে ৬টা দশ।
ড্রয়ার খুলে কবিতার ডায়েরীটা বের করলেন সঞ্জীববাবু। চার পাতায় মাথায় চারটে লাইন।চারটে না-লেখা কবিতার নাম। চার পাতা জুড়ে রকমারি নৌকা আঁকা। সঞ্জীববাবু আঁকতে বড় ভালোবাসেন। সঞ্জীববাবু শুধু নৌকো আঁকতে পারেন। ডায়েরী খুললেই নূপুরের মিহি রিনরিন, খুব নরম; কান পাতলে তবেই অল্প চুইয়ে আসে।
 
রাত তিনটে পাঁচ।
ভূতের স্বপ্নে সে’দিন অজস্র নৌকোডুবি।
হুড়মুড়িয়ে সোজা ছাদে। নূপুরের মিহি রিনরিন। ছাতের উঁচু পাঁচিলের এ’দিকে নয়নতারার টবগুলো, পাঁচিলের ওপর থুঁতনি, ও পাশে গঙ্গা। আঁচলে, চুলে, সমস্ত এলোমেলো। নদীর অন্ধকারে চোখ নামালেন ভূত। 
 
 
***
 
সে দৃশ্যটাই ভাবতে ভাবতে সময় যখন অন্যমনা, 
সেই সময়ের শরিক হতেই আমার এমন কাঙালপনা। 
তোমার চোখেই আলোকবর্ষ করবে যখন গান রচনা,  
তখন তোমার রাত্রি ছুঁতেই আমার গানের ... কাঙালপনা। 

Monday, September 26, 2016

তানসেন ও আউরাঙ্গজেব

"পেয়ার মুঝসে যো কিয়া তুমনে তো কেয়া পাওগি"র সুরে জানপ্রাণ লড়িয়ে মোড়া আলো করে বসেছিলেন মিয়াঁ তানসেন।

তার স্যান্ডো গেঞ্জিতে ট্যাংরা টেস্ট করা ঝোলের ছিটে। তার পায়জামা আল্ট্রা ঢলঢলে। তানসেনের কোলে আমতেল দিয়ে মাখা মুড়ির বাটি। তানসেনের গলায় দরদ;
"মেরি হালাত কি আঁধি মে বিখর যাওগিইইই...ইইই"।

"ইইইশ, ছ্যাহ্"!
মুড়ি বাটি চলকে ওঠে,
তানসেনের সুর কেঁপে যায় ব্যালকনি কাঁপানো হুঙ্কারে।

তানবাবুর গাইবার কথা ছিল;
"খোয়াব ক্যিউ দেখু উয়ো জিস্পে মে শরমিন্দা হুঁ,
ম্যায় যো শরমিন্দা হুঁ, তো অউর তুম ভি শরমাওগিইইই..ইইই"।

কিন্তু আউরাঙ্গজেবি ধমক অতি বিষম বস্তু। কথায় কথায় ধ মুণ্ড আলাদা হয়ে যায়, কথায় কথায় বন্দী। কথা ও সুর মিয়াঁর গলার কাছটায় থেবড়ে বসে রইলে, উঁকিঝুঁকি দেওয়ার সাহস করলে না।

"এ'টা গান হচ্ছে?", আউরঙ্গজেব তেলে-বেগুনে-কেরোসিনে,  "কর্পোরেশনে বলে কয়ে একটা গান গেয়ে কুকুর তাড়ানোর চাকরী জুটিয়ে নিলেই হয়"!

তানসেন অভিমানী।  মুড়ি বিস্বাদ হয়ে এলো, সাউথ ফেসিং ব্যালকনিটাকে মন হলে অফিসটাইমের বজবজ লোকালের ভেন্ডর কম্পার্টমেন্ট। কিন্তু তানবাবু পান্নালালের শিফ্ট করার আগেই  পা টিপে এগিয়ে এলেন তিনি। অ্যানাক্রনিসমের স্কেল ডিঙিয়ে মোড়ার পাশে ঘেষে এসে দাঁড়ালেন আউরাঙ্গজেব স্বয়ং।

নিখুঁত মখমলি সুরে ব্যালকনির মেজাজ জলসার জৌলুসে বাঁধলেন আউরাঙ্গজেব;

"কিউ মেরে সাথ কোই অউর পরেশান রহে
মেরি দুনিয়া হ্যায় তো জো ভিরান তো ভিরান রহে"।

সুরের ধর্মই ওই। এক চাঁই পাথররের মত পাহাড় চূড়া থেকে দিক মেপে গড়িয়ে দিলেই হল।

ট্যাংরার ঝোলে বড়ির বড়াইয়ের মত জেগে উঠলেন মিয়াঁ তানসেন;

"এক ম্যায় কেয়া অভি আয়েঙ্গে দিওয়ানে কিতনে
অভি গুঞ্জেঙ্গে মহব্বতকে তরানে কিতনে
জিন্দেগি তুমকো সুনায়েঙ্গে ফসানে কিতনে..."

আউরাঙ্গজেব তখন মোড়ার পাশে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে। তাঁর লাল পেড়ে হলুদ শাড়ির সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে মুড়িমাখার আধখালি বাটি।

আউরঙ্গজেবের পায়ের আলতার কাঁচা লালে ভূতের ভয়, জানেন মিয়াঁ তানসেন। গলার কাঁপুনিতে তুলির শেষ টান দেন তিনি;

" কিউ সমঝতি হো মুঝে ভুল নহি পাওগি?
পেয়ার মুঝসে যো কিয়া তুমনে তো কেয়া পাওগি?"।

Sunday, September 25, 2016

ভাবনা

- ভাবুন...।
- ভাবব?
- ভাববেন না?
- ভাবান।
- ভাবুন..আপনি মারা গেছেন।
- ভাগ।
- ভাগছেন কোথায়? শুনুন।
- ভাগব না। বেশ। বলুন।
- ভাবুন আপনি মারা গেছেন।
- ভাবলাম।
- ভাবুন আপনার চারিদিকে একটা হালকা নীলা আলো।
- ভাবলাম।
- ভাবুন আপনার কানে গুনগুন করছেন পান্নালাল।
- ভাবব?
- ভাববেন। অবশ্যই। যেথা আছে শুধু ভালোবাসাবাসি সেথা যেতে প্রাণ চায় মা।
- ভেবে চললাম। বেশ। সকলই ফুরায়ে যায় মা।
- ভাবুন আরও ভাবুন। চারিদিকে ছাতিমের সুবাস। চোখে নীল ঝিমিঝিম ভাব। কানের মেঝেতে মাদুর পেতে পান্নালাল হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছেন। অনেক কেঁদেছি, কাঁদিতে পারি না।
- ভাবনার ভার বাড়ছে। বুক ফেটে ভেঙে যায় মা।
- ভাবুন আচমকা সেই নীল আলোর ঝিমুনি কাটিয়ে তাঁকে দেখা গেলো।
- ভাবায় ধন্ধ। তিনি?
- ভাবুন। নীল আঁচলের খসখস। ছোট কালো টিপ। সরু গোল ফ্রেমের চশমা। তাঁর বাঁ হাতের কবজিতে হাতঘড়ি মিনিট পাঁচেক এগিয়ে।
- ভাবনা স্পষ্ট হল।
- ভেবে চলুন।
- ভেবে চললাম।
- ভাবনা ভেদ করে তিনি আপনার পাশে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর নাকছাবিতে একটা খুনে ব্যাপার ছিল।
- ভাবনায়। ভাবনায়।
- ভাবনায় তিনি এসে দাঁড়াতেই কানের মেঝে থেকে পান্নলালবাবু উঠে চলে গেলেন। হারমোনিয়াম পড়ে রইলে যে কে সেই।
- ভাববার বিষয়।
- ভাবনা হাতড়ে দেখুন। এক থালা নীল আলোর মধ্যে আপনি দাঁড়িয়ে,  পাশে ভ্যানিটি ব্যাগ কাঁধে তিনি সপ্রতিভ।
- ভাবনার পরের ধাপ?
- ভাবনা পেরিয়ে আপনার কানে নেমে আসা তাঁর ঠোঁটজোড়া। ফিসফিস; এবার অন্তত আমার নারায়ণ দেবনাথ সমগ্র তিনখানা ফেরত দিন। বছর পার হতে চললো!
- ভাবুন কাণ্ডখানা! এখনও ভোলেননি?
- ভেবে লাভ নেই। আপনি মারা গেলেও ভুলবো না। কেমন?