Friday, September 16, 2016

টু ব্রেক ইট আপ

- নাহ। মুশকিলে পড়া গেলো।
- ব্রেক আপ ইজ আ গুড থিং। বিশেষত মেয়েটাকে যখন তোর আর ভালো লাগছে না।
- কিন্তু, শুধু ব্রেক আপ করতে চাইছি বললে তো আর হয় না। জাস্টিফাই করতে হবে।
- জাস্টিফাই?
- একটা যুতসই কারণ না হলে...বলব কী করে?
- তোর ওকে আর ভালো লাগছে না। মিটে গেল।
- রিলেশনশিপ ডিপ্লোমেসি তুই বুঝবি না রে। ব্রেক আপ এমন হতে হবে যে'খানে সাপ উইল ডাই আবার হাতের লাঠির পালিশও নষ্ট হবে না। এবং সব চেয়ে বড় কথা; ব্রেক আপের কারণ স্যানিটাইজড হতে হবে।
- স্যানিটাইজড কারণ?
- সেক্সিস্ট হলে চলবে না। প্যাট্রিয়ার্কির গন্ধ থাকলে চলবে না। রেসিস্ট হওয়া যাবে না। এটসেটেরা।
- তুই কি তেমন কোন কারণে...?
- আমি কী ভাবছি তাতে কী এসে গেলো। তার কানে যাতে কন্ট্রোভারসাল না ঠেকে।
- ও।
- হুঁ।
- একটা সাজেশন আছে।
- সাজেশন?
- একটা ইস্যু তুলতে হবে। তা'তে ব্রেক আপ আপনা থেকেই হওয়া উচিৎ।
- যে ইস্যুতে মিউচুয়াল ব্রেক আপ?
- গ্যারেন্টেড!
- বল ভাই। আমিনিয়ায় নিয়ে যাব তোকে।
- শোন। ওকে জিজ্ঞেস কর ঘটক না সত্যজিৎ। উত্তরে যাই বলুক, তুই উলটো দিকে দাঁড়িয়ে পড়। হপ্তা কাটার আগেই রিলেশনশিপ গিলোটিনে।
- ব্রিলিয়ান্ট। তবে একটা ডাউট।
- কীসে?
- সে যদি বলে যে সে দু'দিকেই ডিসিন্টারেস্টেড?
- একজন ঘটকে-সত্যজিতে সামগ্রিক ভাবে নিঃস্পৃহ। তার সাথে আদৌ প্রেম করা উচিৎ?  ব্রেক আপের জন্য এর চেয়ে বড় আল্ট্রা-স্যানিটাইজড কারণ আর জুটবে ভেবেছিস?

Thursday, September 15, 2016

রাইটার্স ব্লক

দিবাকর ক্রমাগত খারাপ লিখে চলেছিলেন।
সিগারেট বাড়ছিল।
বাড়ছিল প্রকাশকের বিরক্তি।

কিন্তু চেনা অস্বস্তি আর রাগ ছাপিয়ে দিবাকর রাত চিনতে শুরু করেছিলেন। স্তুপাকার ছেঁড়া কাগজে বিছানা ভার হয়ে যেত শেষের রাতে। ভোরের আগের সে অন্ধকারের ওজনই আলাদা, সে অন্ধকারকে আকাশ সহজে ধরে রাখতে পারে না। চুইয়ে নামে কালো, আকাশ থেকে জানালার শিক বেয়ে বিছানা বালিশে মিশে একাকার হয়ে যায়।

খারাপ লেখা দিবাকরকে রাতের টনটনে  দিকটায় টেনে নিয়ে  যেতে শুরু করেছিল।


**

সুতপার চিন্তা বাড়তে থাকে। চোখের সামনে দিবাকর ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। দিবাকর অফিস যাওয়া বন্ধ করেছে আজ মাস চারেক হলো। দিনরাত হিজিবিজি লিখে চলেছে, পাতা ছিঁড়ে খাট মেঝেময় ছড়িয়ে চলেছে।  

রাতে ঘুম নেই।

জিজ্ঞেস করলেই শুধু একটাই কথা;
"পাবলিশারের তাগাদা আসছে। এবারে আমি একটা জুতসই উপন্যাস না দিলে ওদের কাটতি থাকবে ভেবেছো গো"?

**

আসলে দিবাকর বুঝতে পারে একটানা লিখে যাওয়াটাই তার জন্য এক মাত্র থেরাপি। আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে সুতপার প্রবলেমটা টের পাওয়া যায়। অনেক কিছু গুলিয়ে যায় ওর। ওর মনে থাকে না যে দিবাকর একজন লেখক। সুতপার মনে থাকে না যে ও সুইসাইড করেছে বছর দুয়েক আগেই। সে ভুলে যায় যে সে দিবাকরের জ্যান্ত বৌ নয়। দিবাকর মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না। যে নেই তার মুখের ওপর তুমি নেই বলার মত খারাপ কাজ হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ভূতকে তো আর সাইকিলোজিকাল থেরাপিতে পাঠানো যায় না।

** 

"কে বলেছে তোমায় যে ভূতের মনোবিদ হয় না"?
মনোজিতের কথায় একটু ভরসা পেল দিবাকর। মনোজিতের সাথে আলাপটা নতুন। কিন্তু ভদ্রলোক এত অল্প সময়ে এত কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে; ভাবতেই বড় ভালো লাগে দিবাকরের। অমায়িক,  সপ্রতিভ। 

"আছে? তুমি ঠিক জানো মনোজিত"?

"না জানলে আর বলছি কেন? সামনের সপ্তাহে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করি। কেমন"?

"বাঁচালে ভাই। আসলে সুতপা মেয়েটা এত ভালো...ওকে এমন ভাবে সাফার করতে দেখলে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে"।

"চিন্তা কোরো না। সে হয়ে যাবে। তোমার লেখালিখির খবর বলো বরং"।

"ওই। ব্লকটা কাটতে চাইছে না। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। পাব্লিশাররা যে ভাবে চাপ দিচ্ছে, একটা কিছু না দাঁড় করাতে পারলেই নয়"। 

**

" দিবাকরকে কেমন দেখলে এবার মনোজিত"?

"ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে, ওর সেই ধারণাগুলো আমার হাজার কাউন্সেলিঙেও কাটছে নানা, বরং বদ্ধমূল হচ্ছে। তোমায় শক্ত হতে হবে সুতপা। তোমার সাপোর্টের ওপর সমস্তটা নির্ভর করছে"।

"আমার সাপোর্ট? মনোবিদ তো তুমি"।

"ইউ আর দ্য কী"।

"আমরাই ওর এ অবস্থার জন্য দায়ী। বিশেষত আমি"।

"নিজেকে অকারণে দোষ দিচ্ছ"।

"অকারণে? আমি দিবাকরের স্ত্রী, তাও তোমায় ভালোবেসেছি"।

" ভালোবাসা সিনেমার ডেফিনিশনে লিনিয়ার নয় সুতপা। আমিও ভালোবেসেছি তোমায়। কিন্তু দিবাকরের কথা ভেবে আমরা এক পাও এগোইনি কোনওদিন। ওর জানতে পারাটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট"।

"হি লাভড মি মনোজিত। পাগলের মত। আর ওই জানতে পারাটাই ব্রোক হিম। তুমি জানো সে জন্যেই দিবাকর আজ..."।

"ও'টা একটা দুর্ঘটনা ছিল সুতপা"।

**

জ্বরে দিবাকরের কপাল পুড়ে যাচ্ছিল, গোঙাচ্ছিল সে। যন্ত্রণায়। জলপট্টির শেষে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সুতপা। 

**

দিবাকরের অবাক লাগে। রাতের অন্ধকার উপচে ঘরের ভিতরটা কেমন নরম হয়ে এসেছে। আবেশে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, কথার জড়িয়ে যাওয়াটায় রাত, লেখা আর স্নেহ খুঁজে পেলে সে।

কপালে সুতপার হাত কী ভালোই যে লাগছিল। ছোটবেলার বিকেল যেমন। শুধু সুতপার আঙুলগুলো বরফ শীতল। ও তো বেঁচে নেই, তাই অমনটা।

সুতপার জন্য বড় কষ্ট হয় দিবাকরের; আহা, মেয়েটা বড় ভালো। ভোর রাতের আবছায়ার মত স্নেহ। সুতপার এটুকু থাকাই বা কম কী?

উপন্যাস নয়, দিবাকর জানে যে এ রাইটার্স ব্লক কাটবে কবিতায়। তবে দিবাকর এও জানে যে কোনও লেখকই বাজারের চাহিদার হিসেবের ওপরে নয়। 

Monday, September 12, 2016

বারণ

একদিন হয়েছে কী, ফাইনডাইনিঙবাবু রাস্তায় হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন। মাথায় হ্যাট। গায়ে কোট। হাতে চুরুট আর পকেটে ন্যাপথলিন।

ও মা।
হাওয়া খাবেন কী? গাছের একটা পাতাও নড়ছেন না। চারদিকে থমথম।
আধ-মাইল হেঁটে জিভ বেরিয়ে এলো বাবুর।
কোটের ভিতরে গেঞ্জি ভিজে গামছা। বাবু বিচলিত।


বাবুরা বিচলিত হয়ে থাকেন, কিন্তু তাই বলে মচকাতে পারেন না। বাবু পকেট থেকে বার করলেন ইয়েলোপেজেস হাই সোসাইটি পকেট এডিশন। তা'তে দিব্যি লেখা আছে যে গঙ্গার ঘাটে এ’সময় প্রচুর পরিমাণে হাওয়ার মিঠে ফুরফুর।


ব্যাস। অমনি বাবু জুড়ীগাড়ি হেঁকে চলে এলেন গঙ্গার ধারে।
ওমা।
হাওয়া খাবেন কী? ঘাটে ঢোকার মুখে কৌপীন পরে প্যাকাটি মার্কা চেহারার বেয়ারা দাঁড়িয়ে।


- রুকো বাবু! আপনার ঘাটে যাওয়া বারণ!
- বারণ করার তুই কে রে নেংটি?
- বারণ।
- আইনে আছে? আইন দেখা।
- আইন আবার কী? বলছি তো। আপনার ঘাটে যাওয়া বারণ!
- জানিস আমি কে? আমি ফাইনডাইনিঙবাবু।
- বারণ।
- আমি মামলা করব।
- বারণ।
- আমি দারোগা লাগাবো।
- বারণ।
- আর্‌রে ধ্যের। যেতে দিবি না কেন?
- আপনার জাঙ্গিয়ায় ফুটো আছে।
- মিথ্যে কথা।
- বারণ। কোট, চুরুট আর জাঙ্গিয়ায় ফুটো নিয়ে গঙ্গার ঘাটে যাওয়া বারণ।
- প্রমাণ কর হারামজাদা। যে আমার জাঙ্গিয়ায় ফুটো।
- প্যান্টালুন খুলে নেব?
- আমি সরকার বাহাদুরকে বলে গঙ্গার ঘাট সমেত তোকে হাজতে পুরব।
- বারণ। ফাইনভদ্রতার চৌহদ্দিতে জাঙ্গিয়াফুটো-ফাইনডাইনিঙবাবুদের ঢোকা বারণ। বারণ।



Saturday, September 3, 2016

হাসিরশ্মি


- এ'টা সেই প্যানেল?

- ইয়েস প্রাইমমিনিস্টার।

- ডক্টর দত্ত, আপনি জানেন আপনি কী বলছেন?

- আলবাত জানি। ইনফ্যাক্ট প্রমাণতো আপনি নিজেই দেখছেন।

- প্রমাণ?

- এই গবেষণাগারের সমস্ত আলো, পাখা, এসি, পাম্প চলছে এই আড়াই ফুট বাই দুই ফুটের সামান্য প্যানেলের তৈরি করা বিদ্যুতের ওপর ভর করে। ইনফ্যাক্ট তার পরেও বিদ্যুৎ বাড়তি হচ্ছে। আমাদের স্টাফ কোয়ার্টারেও এখান থেকেই বিদ্যুৎ যাচ্ছে।

- আমেজিং।

- সমস্তটাই এই ইউএস-ফটোভল্টেয়িক সেল বসানো প্যানেলের কামাল।

- বিজনেস এন্ডটা দেখেছেন?

- হাইড্রোইলেক্ট্রিসিটির চেয়ে অন্তত পঞ্চাশগুণ সস্তা। আসলে টেকনোলজি তো অতি পাতি। সোলার এনার্জির মত তাবড় ইনভেস্টমেন্টও নেই। পরিবেশ দূষণের বালাই নেই। সবচেয়ে বড় কথা সূর্যের দিকে ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকা নেই। তাছাড়া সোলার এনার্জির চেয়ে এই ইউএস ফটোভল্টেয়িক সেল থেকে উৎপন্ন হওয়া এনার্জির পরিমাণ হাজার গুণ বেশি, অন্তত একশো গুণ কম খরচায়। মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, পৃথিবীর ইতিহাস পালটে দেবে এই টেকলোজি।

- টেকনোলজিটা ডেমোন্সট্রেট করবেন বলেছিলেন ডক্টর দত্ত।

- এখুনি করব। ভেরি সিম্পলি। এই ইউএস ফটোভল্টেয়িক সেল ফিট করা প্যানেলের সার্কিট স্যুইচ অন করে তারপরএর সামনে সামনে রাখা স্ক্রিনে সেই সিনেমাগুলো চালিয়ে দেওয়া। অমনি তরতর করে এই ইউএস ফটোভল্টেয়িক সেল ওই স্ক্রিন থেকে হাসিরশ্মি শুষে নিয়ে বিদ্যুতে পরিণত করবে। সিম্পল।

- সিনেমা? কার সিনেমা?

- যার হাসিরশ্মি শুষে সোলার এনার্জিলে কিস্তিমাত,  অবভিয়াসলি তারই সিনেমা স্ক্রিনে চালাতে হবে প্রাইমমিনিস্টার। এমনি এমনি এইই ম্যাজিক এনার্জি সেলগুলোর নাম উত্তম স্মাইল ফটোভল্টেয়িক সেল দেওয়া হয়নি।

Monday, August 29, 2016

রাগ অভিমান

- বাবা! ও বাবা!
- কিছু বলার আছে তোমার বৌমা?
- নয়তো এলাম কেন?
- যা বলার বলে ফেলো।
- ওষুধের ডিবেতে লেবেল করে রেখেছি। জলখাবারের পরে আর রাতে খাওয়ার পরে। ভুল হলেই কিন্তু প্রেশার আবার হাই।
- আমার প্রেশার। আমার ওষুধ। আমি বুঝবো।
- আলমারির চাবি, বিছানার তোষকের নিচে। ওই মাথার দিকে।
- চাবি তোষকের তলে থাক। পাতালে থাক। তোমার কী?
- কমলাকে রান্নায় তেলের মাপ বুঝিয়ে দিয়েছি। চিন্তা নেই। শুধু সময় করে ডিনার সেরে নেবেন। দশটা বাজে না যেন।
- তেলে চুপচুপে বেগুন ভাজা খাবো রাত বারোটার পর। তা'তে কার কী? যে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় তার গালভরা কথা শুনতে আমি রাজী নই। তোমার আর কিছু বলার আছে?
- রাগ করেছেন?
- আমি কে ? রাগ করার?
- বাবার অধিকার নেই? মেয়ের ওপর রাগ করার?
- বাপ? কীসের বাপ! যে বাপকে এমন দুম করে ছেড়ে চলে যেতে বাধে না, সে আবার কীসের বাপ? আর খবরদার! আমায় প্রণাম করতে এসো না। যেতে হলে এখুনি বিদেয় হও বাজে কথা না বাড়িয়ে।
- আমার যে আর থাকার উপায় নেই বাবা।
- কেন? উপায় নেই কেন?
- যার হাত ধরে এ বাড়িতে আসা, সেই যখন আর মেনে নেয় না...আমি থাকি কোন অধিকারে? কোন নিয়মে?
- কী বলছো মা! সে ভুলেছে ভুলুক, আমি তো তোমায় ভুলিনি। এ সংসার তো তোমায় ভোলেনি মা। বরং তুমি আছ বলে তাও তাঁর সাথে যোগাযোগের রেশটুকু আছে। তুমিও যদি চলে যাও, স্মৃতির শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়বে।
- না গিয়ে আমার উপায় নেই বাবা।
- সে তো আলাদা হয়ে সব ভুলেছে অনেকদিন হল। তবে এদ্দিন পরে তোমার সে বেদনা অনুভূত হল কেন?
- আমি তো মনে করতে চাইনি। যেতে চাইনি। হঠাৎ এদ্দিন পরে চারদিক দিয়ে লোকে বলতে শুরু করেছে। আর লোকের কথা একবার যখন শুরু হয়েছে তখন আমি মুখ বুজে থাকি কী করে? আমায় যেতে দাও বাবা। যেতে দাও।
- কিছুতেই থাকবে না মা? আমার এ বাংলা ঘর আলো করে, থাকবে না কিছুতেই?
- পূর্বের হাত ধরে পশ্চিম হয়ে এ ঘরে এসেছি। পূবের পাশে পশ্চিম, পশ্চিমের পাশে পূব, চিরকালের নিয়ম। তা পূবই যখন নেই, তখন পশ্চিম হয়ে থাকি কী করে আর বাবা? আমায় যেতে দাও। সময় হয়ে এলো।