Friday, August 19, 2016

এমনি


সকালটা রীতিমত মন্দ লাগল হালদারবাবুর।
আকাশ গোমড়া। বাতাস ভ্যাপসা। জলখাবারে পরোটার সাথে লাউয়ের তরকারি। জলখাবারে লাউ? এর চেয়ে লাউসি কিছু হতে পারে? তারপর পাশের বাড়ির মনমোহন সাঁতরা সকাল সকাল “রাশিফল চেক করেই দিয়ে যাচ্ছি” বলে আনন্দবাজার নিয়ে সেই যে গায়েব হলেন আর অফিস বেরোনো পর্যন্ত ভদ্রলোকের দেখা মিললো না। জুতোয় একটা কাঁকড় ঢুকেছে, বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে খতরনাক খোঁচা মেরে চলেছে তখন থেকে। অথচ মিনিবাসের ভিড়ে জুতো খুলে বিস্তর ঝাড়াঝাড়ি করেও কাঁকড়টাকে ফিল্টার করে বের করা গেল না। বাঁ পায়ে কড়কড় নিয়ে বাসে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো।
কন্ডাক্টর এরই মধ্যে বার তিনেক পা মাড়িয়ে এলেন গেলেন। রাগের চোটে বিবাদী বাগের বদলে হাওড়ার টিকিট নিলেন হালদারবাবু। ট্রেনের দুলুনিতে নাকি মনের জট খুলে যায়। অফিস যেতে আজ আর মন সরল না।


টিকিট কাউন্টারের পাশে লাগানো ফেয়ার চার্ট জরীপ করে “বেগমপুর” নামটাই মনে ধরলো হালদারবাবুর।


বেগমপুরে যখন হালদারবাবু নামলেন তখন বেলা সোয়া বারোটা। আকাশ তখনো গুমোট কিন্তু বাতাসের দমবন্ধ করা ভাবটা বিলকুল গায়েব। ঘনঘন রুমাল বের করে কপাল মোছার দরকার পড়ছে না। গত আধ ঘণ্টায় গলা বেয়ে কোন লাউয়ের তরকারির ঢেঁকুর ওঠেনি। আনন্দবাজারটা আর দরকারি মনে হচ্ছে না। জুতোর কাঁকড়টা মোটামুটি পা-সওয়া হয়ে গেছে।
সব চেয়ে বড় কথা। মিনিবাসের ভিড়ের বদলে চারিদিকে আলস্য ভরা। বড্ড মন কেমন করা নিরিবিলি। ছোট্ট স্টেশন। দু’টো প্ল্যাটফর্ম। প্ল্যাটফর্মে চারটে করে কংক্রিটের বেঞ্চি। হালদারবাবু গুনে দেখলেন; জনা ছয়েক লোক আর খান পাঁচেক কুকুর প্ল্যাটফর্মে। তাঁর মনের ভিতরে রাখা কলকাতার জ্বরো কপালে কেউ জলপট্টি লেপতে শুরু করেছিল যেন। মেঘলা হাওয়ার শিরশির, দুপুরের থমথমে নরম আর চারপাশের সবুজ মাটি মাটি যে ব্যাপারটা, সবকিছুই শীতলপাটির মত আরামের। বেঞ্চে থেবড়ে বসে আয়েস করে অফিসের টিফিন বাক্স খুললেন হালদারবাবু।


-   দেশলাই আছে?
-   আমি স্মোক করি না।
-   অ। ক’টা বাজে? আমার ঘড়িটা আবার গতকাল হাত থেকে পড়ে গিয়ে...।
-   সোয়া চারটে।
-   কলকাতা থেকে আসা হয়েছে বুঝি?
-   আজ্ঞে।
-   বেগমপুরে কোন কাজ ছিল?
-   না।
-   অ। আজকেই ফেরা?
-   হ্যাঁ।
-   আমি অবিশ্যি এখানেই থাকি। ফাইভ মিনিট্‌স ওয়াক ফ্রম দ্য স্টেশন।  
-   হুঁ।
-   আপনাকে বিরক্ত করছি না তো?
-   না।
-   আমার নাম অমল সামন্ত।
-   আমি নিরুপম হালদার।
-   আপিস?
-   ওই। একটা প্রাইভেট ফার্ম। ম্যাঙ্গো রোডে অফিস।
-   তা, বেগমপুর কী মনে করে?
-   এমনি।
-   ইউরেকা। যাক! ঠিক ধরেছি তাহলে।
-   ঠিক ধরেছেন?
-   আজ্ঞে।
-   কী ঠিক ধরেছেন?
-   ওই। আপনারও এমনি রয়েছে।
-   বুঝলাম না। আমারও এমনি রয়েছে মানে?
-   ওই। নিশির ডাক। কিছু ভালো না লাগা। কোন কারণ ছাড়া। কন্সট্যান্ট মনে হওয়া ‘ছিটকে চলে যাই, ছিটকে চলে যাই’। এমনি এমনি। ছিটকে যেতে আপনার কোনও কারণ লাগে না। এমনিই। ছিটকে চলে যেতে পারেন। আপনার ‘এমনি’ রয়েছে। যেমন আমার হয়েছিল।
-   এমনি?
-   দিব্যি শিলিগুড়িতে করে খাচ্ছিলাম। হঠাৎ এমনি এমনি জেনারেল কম্পার্টমেন্টে বসে হাওড়া। সেখান থেকে বর্ধমান কর্ডলাইনের লোকালে চেপে পড়ে বেগমপুর। কোন কারণ ছাড়া। কমপ্লিটলি এমনি। নিজেকে এমনি এমনিই এম্পটি মনে হত। তাইতেই চলে এলাম বেগমপুর। নয় নয় করে সতেরো বছর হয়ে গেল।
-   ওহ। আমার অবশ্য এমনি-ভাব কেটে যাবে কিছুক্ষণেই। বিকেলের ট্রেনেই ফিরছি। ফেরার পথে আজ আবার গোবিন্দভোগ চাল নিয়ে ফেরার কথা।
-   হেহ্‌।
-   হাসির কী হল?
-   আপনার এই ‘এমনি’ ভাব আপনাকে মঙ্গোলিয়ায় টেনে নিতে পারত, প্রিন্সেপ ঘাট ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারত, বৈদ্যবাটি নিয়ে গেলেও কিছু বলার ছিল না। কিন্তু আপনি এসেছেন বেগমপুরে।
-   তাতে কী? বেগমপুর না মশাগ্রাম, কী এসে গেল তাতে?
-   বুঝতে পারছেন না এখনও?
-   কই! কী বুঝবো?
-   ডেস্টিনি বোঝেন?
-   ভাগ্য?
-   বলতে পারেন। তবে, এ’টা ভাগ্যের চেয়ে অনেক বেশি সার্টেন। আপনার ব্রেনের সার্কিটের প্রোগ্রাম আপনাকে এখানে টেনে এনেছে। এই ‘এমনি’ নিতান্ত এমনি এমনি নয় হালদারবাবু, এই ‘এমনি’ হলো ইলেক্ট্রনিক মন-খারাপ নিউরোলজিক্যালি ইনডিউস্‌ড। ই এম এন আই।
-   কী’সব বলছেন। আর মিনিট পনেরোর মাথায় ট্রেন আসছে।
-   ফেরত যাওয়ার জন্য কি বেগমপুর আসা?
-   ধুত্তোর।
-   আপনার ব্রেনের প্রোগ্র্যাম আপনাকে এখানে টেনে এনেছে “এমনি” মডিউল রান করে। আপনার আমার মাদার সার্ভার বেগমপুরে হালদারবাবু। সেই মাদার সার্ভারের টানে আপনি এখানে এসেছেন। আর ফেরার উপায় নেই।
-   কী সব হাবিজাবি বলছেন।
-   যে’টা আপনি বুঝতে পেরেও বুঝতে চাইছেন না।
-   কী বোঝার?
-   যে আপনি বেগমপুরের রেডিয়াস ছেড়ে আর বেরোতে পারবেন না।
-   আলবাত বেরোব।
-   প্রোগ্রাম অ্যালাউ করবে না।
-   প্রোগ্রাম আবার কীসের! আমি কি কম্পিউটার না রোবট? আমি মানুষ। আমি প্রোগ্রামে চলতে যাব কেন?
-   মানুষ। হেহ্‌।
-   ও কী! হাসছেন কেন?
-   মানুষ। বাঙালি আবার মানুষ!  
-   এর মানে কী?
-   আমাদের সার্ভারটার নাম জানেন কী?
-   কীসের সার্ভার?
-   যে সার্ভার আমাকে আপনাকে আর বাকি সমস্ত বাঙালিকে কন্ট্রোল করছে। সেই সার্ভার। তার নাম জানা আছে?  
-   সার্ভার আমাদের কন্ট্রোল করছে?
-   নেটওয়ার্কড কম্পিউটারদের তো সার্ভার থাকেই হালদারবাবু।
-   ছাইপাঁশ। যতসব আজে বাজে কথা।
-   এই কথাগুলো আজেবাজে? আর ও’দিকে আপনি দিব্যি আলু চচ্চড়িকে সকাল থেকে লাউয়ের তরকারি বলে চোপা করে গেলেন। সে’বেলা কিছুই আজেবাজে নয়।
-   মানে? লাউ...মানে...।
-   ‘এমনি’ একটা সিস্টেম-বাগও বটে। জিভের সার্কিটে গোল্লা পাকিয়ে দেয়। তাই হয়েছে।
-   পাগলের প্রলাপ যত।
-   মিস্টার হালদার। প্রথমবার যখন আমি ব্যাপারটা ঠাহর করতে পেরেছিলাম তখন আমিও এমনই বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম । ইট ইজ ন্যাচারাল। আদত বাঙ্গালিরা আসলে মানুষ নয়, সক্কলে সার্ভার কন্ট্রোল্‌ড রোবট; এই খুনে সত্য হজম করা চাট্টিখানি কথা নয়। আমিও পারিনি।   
-   আমি মানুষ নই? ইয়ার্কি হচ্ছে? জানেন আমার বার্থ সার্টিফিকেট আছে? জানেন আমার বৌ বাচ্চা আছে?
-   আমি নিজে বাঙালি। আমি জানি যে আমরাই হচ্ছে একমাত্র সফিস্টিকেটেড রোবটের জাত হু ক্যান পারফর্ম অল হিউম্যান ফাংশন্‌স। ইনক্লুডিং প্রোক্রিয়েশন অ্যান্ড ডেথ্‌।
-   বটে! আর আমাদের তৈরি কে করলে?
-   আমাদের সৃষ্টিকর্তারা কি আর এ গ্রহে পড়ে থাকবেন মিস্টার হালদার? সে নিশ্চই হাজার বছর আগের ঘটনা। আমিও এ’সব জেনেছি বেগমপুরে এসেই, সার্ভারের সান্নিধ্যে।
-   সব মানুষই তো তাহলে রোবট হতে পারে। সবই যখন এক।
-   আজ্ঞে না। পারে না। আমাদের...মানে রিয়েল বাঙ্গালিদের সার্কিটে ডারউইনের থিওরি নেই, আছে হাজার অলোকবর্ষ দূরের কোন স্বপ্নরাজ্যের মায়াবী টেকনোলজি। তবে...তবে...।
-   তবে কী?
-   তবে ওই, রোবট বাঙ্গালি-হিউম্যান ক্রস ব্রিডিংয়ে বাঙ্গালির প্রগ্রাম্‌ড রোয়াব আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। কম্পিউটারাইজ্‌ড সুপিরিওরিটি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। আর ক্রস ব্রিডিঙয়ে উৎপন্ন বাঙালিদের ওপর সার্ভারের কন্ট্রোল ক্রমশ কমে আসে। ক্রস ব্রিডিং যত বেড়ে চলে সার্ভারের আধিপত্য তত মিইয়ে যায়। ক্রস ব্রিডিঙের জন্যই ক্রমশ বাঙালিরা নিজের দুরন্ত প্রোগ্রামিং ছেড়ে মানুষ হয়ে চলেছে।
-   কিন্তু ফারাকটা কী? মানুষে আর বাঙালি রোবটে?
-   বাঙালি রোবটে “এমনি” মডিউল চালানো যায়, সে মডিউল চালিয়ে তাদের বেগমপুরে ডেকে আনতে পারে সার্ভার। তবে শুধু পিওর বাঙালির সার্কিটেই “এমনি” ইঞ্জেক্ট করা যায়।
-   অর্থাৎ কমপ্লিট রোবট?
-   আজ্ঞে হ্যাঁ। পিওর বাঙালি রোবট; যার সাথে হিউম্যান মিক্সিং খুব একটা হয়নি। যেমন ধরুন আপনি আমার মত পিওর বাঙালি, কাজেই সার্ভার কাজ করছে আপনার ওপর। আপনাকে ‘এমনি’ দিয়ে টেনে আনা গেছে। কিন্তু আপনার বৌ মিক্সড ব্রিড, তাঁর মধ্যে মানুষেপনা বড্ড বেশি চলে এসেছে। পরিণতিতে আপনার ছেলেও কন্টামিনেটেড।
-   ওহ।
-   এই পিওরিটি নষ্ট হওয়া নিয়ে সার্ভারের বড় দুঃখ। বড় দুঃখ। সেদিন দুঃখে সার্ভার হৃদয় বিদারক ভাবে এটা নোটিফিকেশন দিলে, আমরা যে ক’জন বেগমপুরে আছি- তারা পড়লাম।
-   কী নোটিফিকেশন?
-   কোটি কোটি সন্তানেরে হে মা জননী, রেখেছ মানুষ করে বাঙালি করনি।
-   ওহ্‌। যাক গে।
-   মিস্টার হালদার। “এমনি” ইঞ্জেক্ট করে আপনাকে সার্ভার এমনি এমনি টেনে আনেনি। পিওর ব্রিড আর বেশি নেই। আমি, আপনি আর সামান্য ক’জন। সবাইকে সার্ভার টেনে নিচ্ছেন। এই বেগমপুরে। আমাদের এক হতে হবে। হতেই হবে।
-   আপনার কি ছিট আছে? মাথায়?
-   মাথায় সার্কিট। ছিট, ঘিলু; কোনও কিছুরই স্কোপ নেই। ফিজিওলজিকালি যে’টা দেখা যায়, সে’সব ডিসেপশন। সমস্ত কিছুই; জন্ম মৃত্যু সব। আমরা যারা পিওর বাঙালি, তাদের এক মাত্র রিয়েলিটি হচ্ছে সার্ভার। সেই সার্ভার যে’টা আমাদের কন্ট্রোল করে। আমাদের মধ্যে “এমনি” ইঞ্জেক্ট করে।
-   আচ্ছা, আপনাদের...থুড়ি...আমাদের এই সার্ভারের কী একটা নাম আছে বলছিলেন, তাই না?
-   অফ কোর্স আছে। সার্ভারের নাম পিপুফিশুল্যাদ।
-   অ। হুঁ। বুঝলাম। বেশ। আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগলো। ট্রেন ঢুকছে মনে হয়। আমি আসি।
-   “এমনি” টেনে এনেছে আপনাকে। ফেরত যাওয়ার বোধ হয় আর হবে না আপনার। বেগমপুরে আপনি ভালো থাকবেন হালদারবাবু।
-   আসি। ওই যে। ট্রেন।


চেন টেনে ট্রেন দাঁড় করানোর অভিজ্ঞতা এই প্রথম হলো হালদারবাবুর। ট্রেনের লোকেদের হইহইরইরই করে কারণ জানতে চাওয়াকে পাত্তা দেওয়ার কোনও মানে হয় না। “কারণ ছাড়াই ‘এমনি’ চেন টেনে ট্রেন দাঁড় করিয়েছি” বললে পিঠের ছাল ছাড়িয়ে নেবে পাবলিক।
ট্রেন থেকে নেমেই পকেট থেকে মোবাইল বের করে হালদার বাবু দেখলেন বিরাশিটা মিস্‌ড কল, সব কটাই বাড়ি থেকে। মোবাইলের ব্যাটারি আলগা করে রেললাইনের অন্য প্রান্তে ছুঁড়ে ফেললেন তিনি।
লাইন ধরে হালদারবাবু যখন বেগমপুরের দিকে হাঁটা শুরু করছেন তখন আকাশ জুড়ে মন ভালো করা সন্ধ্যের লালচে আকুলিবিকুলি। 

Tuesday, August 16, 2016

জিমনাস্টিকের কবলে

সে'বার। বলা নেই কওয়া নেই।

১৯৮৩র অলিম্পিকে দীপা১, দীপা২, দীপা৩, দীপা৪, দীপা৫, দীপা৬, দীপা৭, দীপা৮, দীপা৯, দীপা১০ আর দীপা১১ চমকে দিয়ে জিমনাস্টিকে সমস্ত মেডেলগুলো জিতে নিলেন। এর আগে দু'একটা টুকরোটাকরা জিমন্যাস্টিকস মেডেল যে এ দেশে আসেনি তা নয়, কিন্তু অলিম্পিকের সমস্ত মেডেল এক সাথে?

ব্যাস। গোটা দেশ হুমড়ি খেয়ে পড়লে জিমন্যাস্টিক্সে। খোকার ঘরের দেওয়ালে দীপা১য়ের পোস্টার, বিজ্ঞাপনে দীপা২, খবরের কাগজ আলো করে দীপা৩ ইত্যাদি।পাড়ায় পাড়ায় দীপাদের সংবর্ধনা। এর ওপরে জুটলো এসে বিসিজিআই, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর জিমনাস্টিকস ইন ইন্ডিয়া। তারা করলে কী একটা মজবুত ব্যবসা ফেঁদে বসলে। ব্যবসা ফাঁদলে যা হয়, জিমন্যাস্টদের পকেটে টু পাইস এলো, তাদের রোয়াব বাড়লো। আর সস্তা পয়সায় কী না হয়? মানি বিগেটস মোর মানি অ্যান্ড সাকসেস। পয়সার জোরে, ব্যবসার জোরে জিমন্যাস্টিক্সে আরও সাফল্য আসতে লাগলো।

ফলত, তেলা মাথায় তেল। জিমনাস্টিকে টপাটপ মেডেল আর শিরোপা। নজর দিচ্ছি ভাববেন না ভাইটি, জিমনাস্টিকে পয়সা থাকুক, বিজ্ঞাপন থাকুন, সাফল্য থাকুক, কিন্তু সে সাফল্যের ট্যাক্স হিসেবে যে বাকি খেলাগুলো ধুয়ে মুছে যেতে বসেছে।

আমরা খুব সহজে নাম ভুলে যাই।  খুব সহজে। দুরন্ত মারাঠা শচীন তেন্ডুলকারকে মনে আছে? সেই যে সে'বার ২০০০য়ের বিশ্বকাপে টিমকে প্রায় একটা ম্যাচ জিতিয়ে ফেলছিল ছেলেটা। প্রায়। প্রায় জিতে ফেলেছিল আর কী! মনে রেখেছেন তার স্ট্রাগেলের কথা? কী খাটাখাটনি করে ছেলেটা কত অল্প বয়স থেকে ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিল। না।

আপনারা মনে রাখেননি। কারণ আপনাদের মন জুড়ে জিমন্যাস্টিক প্রিমিয়ার লিগের রোশনাই। হিংসে করছি না জিমনাস্টিককে। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি।

জিমনাস্টিক বজ্জাতি করে স্রেফ সাফল্য আর ব্যবসা দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছে আপনাকে আমাকে সবাইকে। অথচ ভিভিএস লক্ষণের যুদ্ধটা কেউ বোঝে না। কেউ না। হতে পারে তার তেমন কোনও সাফল্য আসেনি, কিন্তু তাই বলে তার স্ট্রাগলটা মিথ্যে হয়ে যাবে? সেই যে'বার তার বদান্যতায় ভারত পাপুয়ানিউগিনিকে হারিয়েছিল, সে'টা আজ আমরা কী সহজে ভুলে গেছি! আমরা মনে রাখিনি যে ক্রিকেটের স্বল্প সাফল্য ইজ নট বিকজ অফ আওয়ার সাপোর্ট বাট ডেস্পাইট আওয়ার অ্যাপাথি। কী ইনফ্রাস্ট্রাকচার দিয়েছি আমরা লক্ষণ শচীনদের? শুধু জিত দিয়ে ওদের বিচার করা যায়?

জিত। এই জিতের নেশায় আমাদের বুঁদ করে রেখেছে সর্বনাশা জিমন্যাস্টিকস। চার বছরে একবার ক্রিকেট বিশ্বকাপ এলে আমাদের শচীন প্রেম উথলে উঠবে আর বাকি সময়টা দীপাই আমাদের ভগবান। বছরের অন্য সময়টা শচীন মুখে রক্ত উঠে মারা গেলেও আমাদের কিছু এসে যাবে না কারণ ভারত আগামী ক্রিকেট বিশ্বকাপের মূলপর্বের জন্য কোয়ালিফাই করতে পারেনি।  খেলাটাকে আমরা চিরকাল হারজিতেই দেখে আসব, স্ট্রাগলটুকুর রোম্যান্স বুঝবো না কোনওদিন।

শচীনরা বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং রাউন্ডে হেরেছে কিন্তু বুক চিতিয়ে লড়াই করে। আমার কাছে শচীন একজন চ্যাম্পিয়ন,  সে বিশ্বকাপ খেলতে পারুক বা নাই পারুক।
দীপা শুধু মাত্র একদল ব্যবসাদারের ঘুঁটি, যার খাতায় সাফল্য হলো একমাত্র অস্ত্র; রোম্যান্সের যেখানে কোনও জায়গা নেই।

এ পোড়া দেশে ক্রিকেট নিজের দোষে মারা যাচ্ছে না, মারা যাচ্ছে টপাটপ জিমন্যাস্টিকস মেডেলগুলোর জন্য। মেডেলই সব নয়, জিতটুকুই শেষ কথা নয়। দীপার ভগবান হয়ে থাকাটাই শেষ কথা নয়।

শচীন না জিতুন, উনি প্যাডেল স্যুইপে বিশ্বের মন জয় করেছেন। ওনার স্ট্রাগল আমরা ভুলবো না। সে'টাই রোম্যান্স, জিমন্যাস্টিক্সের মত সসর্বগ্রাসী ব্যবসা নয়।

জয় হিন্দ।

Monday, August 15, 2016

বালিশবাবুর অফিসে - ২

- এস ও এস। এস ও এস।
- এ কী! বলা নেই কওয়া নেই, এমন জরুরী তলব?
- 'এ কী' বলে তো আমার চমকে ওঠা উচিৎ। চেয়ার থেকে উলটে পড়া উচিৎ।
- চেয়ার থেকে উলটে পড়া? রিয়েলি?
- আই মিন, চমকে আমার ঘাড় লেতকে যাওয়া উচিৎ। মুখ দিয়ে এক গাদা থুতু বেরিয়ে আসা উচিৎ। 
- কেন! হলটা কী?
- এ'টা আমার গায়ে কী?
- জামা!
- ধেত্তের! এমন বিদঘুটে রঙচঙে কেন?
- বিদঘুটে? ট্রাইকলর তো!
- ট্রাই কী?
- তেরঙ্গা। ঝন্ডা উঁচা রহে হমারা।
- এ'সব কী?
- ভারতের পতাকার রঙের জামা। বুকে গেরুয়া। পেটে সাদা। নাভীতে অশোক চক্র। কোমরে সবজে। আজ দেশের স্বাধীনতা দিবস।
- সাদাটা ঠিক ছিল। গেরুয়া আর সবুজে চোখে কি ঝিলিক দিচ্ছে জানেন? ব্রেনে চাপ পড়ছে জানেন? ম্যাগোহ্‌!
- ব্রেনের কন্ডিশনিং দরকার। দেশকে চেনা দরকার।
- দেশ কে?
- কান্ট্রি। যেখানে আপনার জন্ম!। আমার জন্ম!। আপনার মায়ের জন্ম!
- দেশ হাসপাতাল?
- ম্যাক্রো লেভেলে যেতে আপনার সময় লাগবে।
- আপনার স্বপ্নে আমার অঢেল সময়। বলুন। কেয়া হ্যায় দেশ? দেশের জন্য চোখে ফোস্কা পড়া জামা পরব কেন?
- শাট আপ! স্টপ বিং ইনসেন্সিটিভ।
- জামায় বাহাত্তরটা রঙ থাকলে বেশি সেন্সিটিভ হত?
- এই ট্রাইকলর সিম্বলিক। আপনার দেশের। আপনার পরিচিতির।
- তাই তো জিজ্ঞেস করছি। দেশ কী? যেখানে আমার জন্ম? কলকাতার উডল্যান্ডস নার্সিংহোম?
- নাহ্। যে মাটিতে জন্ম। জননী জন্মভূমিশ্চ...না কী যেন।
- অপারেশন থিয়াটারে মাটি ছিল?
- ধ্যাত্তেরি। যে মাটিতে আপনার বাড়ি, হাসপাতাল! যে মাটিতে আমি টু পাইস করে খাচ্ছি, আপনাকে খাওয়াচ্ছি। বেসিক্যালি যে মাটি আপনাকে খাওয়াচ্ছে। সেই মাটি হচ্ছে দেশ।
- দেশের ব্রেস্ট মিল্ক আছে?
- মেটাফরিকালি আছে।
- রাইট অ্যান্ড লেফ্‌ট, বোথ?
- ইয়ে। টেকনিক্যালি। অ্যান্ড অলসো মেটাফরিক্যালি। ইয়েস।
- তো। দেশ হচ্ছে একটা এনটিটি যাকে মিল্ক করা যায়। রাইট আর লেফ্‌ট ইয়ে থেকে।
- না। ওয়েট। ভুল দিকে টানছেন।
- টানতে হয়। না টানলে ইট ডাজ নট ফ্লো।
- শাট আপ।
- এ কী! ফিজিক্স পড়েননি? আমিও পড়িনি। তবে আপনি দামড়া। যাক গে। রিফ্রেজ করছি। দেশ হচ্ছে লাইক আপনার ওয়াইফ।
- আরেকবার রিফ্রেজ করুন। নিজের মাকে বারবার 'আপনার ওয়াইফ' বলে ডাকাটা অসভ্যতা।
- উনি আপনার ওয়াইফ নন?
- আগে আপনার মা!
- আপনার বিয়ের আগেই আমি জাইগোটে ছিলাম?
- সরি। ইউ আর রাইট। দেশ হচ্ছে আপনার বাবার বৌ। করেক্ট।
- অরিজিনাল ব্রেস্ট মিল্কের জন্য আমায় হাবিজাবি কিছু পরতে হয় না। মেটাফোরিকাল মিল্কের জন্য অ্যাকচুয়াল চোখে সার্ফগুঁড়ো দেওয়া জামা পরতে হবে?
- উফ। জামাটা হচ্ছে আ টোকেন অফ রেস্পেক্ট।
- ফিজিকাল টোকেন অফ রেস্পেক্ট ফর সামথিং মেটাফরিকাল?
- ও'টা আমাদের পতাকা।
- নতুন টার্ম টেনে আনছেন স্যার।
- বাবা বলে ডাকতে পারেন।
- বাবা ডাক ফোটেনি এখনও আমার মুখে।
- বাতেলা ফুটেছে।
- বাঙালি হয়েছি আপনার দোষে। পতাকা কী?
- দেশের প্রতীক!
- বেশ। আমি আমার দেশের প্রতীক হিসেবে হালকা আকাশী নীল রঙ ঠিক করলাম। ও'টাই আমার দেশের রঙ। এবার আমায় ওই নীল জামাটা পরিয়ে দিন। বুকের প্যালপিটেশনটা কমুক একটু।
- না না। ইট ডাজ নট ওয়ার্ক দ্যাট ওয়ে।
- কেন?
- পতাকার রঙ প্রি ডিসাইডেড!
- কে করলে? কেন করলে? দেশ আমার, পতাকা আমার। মাহ্‌ লাইফ মাহ্‌  দেশ, মাহ্‌ রুলস মাহ্‌ পতাকা।
- নো স্যার।
- নো মানে? মগেরমুলুক নাকি?
- আরে এ'সব ন্যাশনাল আইডেন্টিটির ব্যাপার।
-ন্যাশনাল কী?
- দেশ সম্বন্ধীয়।
- দেশ কার?
- আমার। আপনার। সবার।
- আমারটুকুর পতাকা ফতাকা আমি বুঝে নেব।
- আরে বাবা তা হয় না। দেশের সবার পতাকা এক।
- কন্সেপ্টে গলদ আছে। আপনার পতাকা আমার কাছে ক্যাটক্যাটে। আমার দেশকে আমি ও পতাকায় স্ক্যান্ডালাইজ হতে দেব না। আমি বরং ভাবছিলাম স্কাই ব্লু ব্যাকগ্রাউন্ডে নেভি ব্লু ফ্লোরাল ডিজাইন। মাঝে মাঝে কার্টুন ডাইনোসর।
- এই ভাবে হয় না বস্ ।  আপনার মধ্যে ন্যাশনাল প্রাইড ইঞ্জেক্ট করার দরকার আছে। জন গন মন।
- জন গন মন কী?
- জাতীয় সঙ্গীত।
- তাতে কী?
- দেশের গান। দেশের পতাকার মত। জাতীয় গর্বের আধার।
- আমার দেশের গানও আমায় ঠিক করতে হবে।
- আরে বাবা আপনার দেশের গান পতাকা সবই ঠিক করা আছে। আগে থেকে। সবুর করুন, গর্ব জেনারেট হলো বলে।
- দেশের গান পতাকা নিয়ে গেল কাকে, আমি কাকের পিছনে দৌড়ব? তা'তে গর্ব হবে?
- নিয়ম।
- নিয়ম করে গর্ব?
- নিজের দেশ। গর্ব করবেন না?
- লে হালুয়া।
- লে হালুয়া কে শেখাল?
- দেবু কাকা।
- দেবুর কোনও সেন্স নেই। রাস্কেল।
- আজ আরেকটা শব্দ প্রথম শুনলাম। শিখলাম।
- কী?
- রাক্সেল।
- না। চোপ।
- রাস্কেল। রাস্কেল। এবার বলুন। দেশ কে নিয়ে কীসের গর্ব? আরও আছে তো? অন্য দেশটেশ?
- আলবাত। শয়ে শয়ে দেশ। কিন্তু সকল দেশের সেরা, আপনার দেশ।
- সকল দেশের সেরা? কে বলেছে? আমি বলিনি।
- গুনীজনে বলেছেন। সারে জঁহা সে অচ্ছা।
- বেসিস?
- ভায়ের মায়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ! গান আছে। শুনে দেখবেন, বুক চিনচিন করবে।
- দেবুকাকা ইয়ে কালি কালি আঁখে গাইলে আমার বুকে চিনচিন হয়।
- দেবুটা হারামি।
- আর একটা শব্দ। শিখলাম।
- উফফ। শুনুন। আপনি দেশকে ভালোবাসবেন। সে ভালোবাসা তৈরি করা আমার রেস্পন্সিবিলিটি।
- আলবাত ভালোবাসবো দেশকে। কিন্তু শয়ে শয়ে দেশ। একটু বুঝেশুনে নিতে হবে না?
- কী বুঝে নিতে হবে?
- কোন দেশকে ভালোবাসা দরকার। মানে..কার পতাকা ভালো, চোখে জ্বালা করে না। কার জাতীয় সঙ্গীতের সাথে কালি কালি আঁখের মিল আছে। সেই দেশ বেছে নিয়ে গর্ব করব'খন।
- আরে ধ্যার রে বাবা। ইট ডাজ নট ওয়ার্ক দ্যাট ওয়ে। আপনার দেশ ফিক্সড। পতাকা ফিক্সড।  ন্যাশনাল অ্যান্থেম ফিক্সড। গর্ব জেনারেট যা করার এই নিয়েই করতে হবে।
- হারামি। রাস্কেল।
- চোপ। চোপ। এ'টা কী হল?
- না মানে, দেশের চয়েসেও ফ্লেক্সিবিলিটি নেই?
- নেই।
- মানে। জাস্ট লাইক চয়েস অফ ফাদার।
- রাইট।
- লে হালুয়া।
- চোপ।
- জাইগোটেই মনে হচ্ছিল সামথিং ইজ অ্যামিস।
- সরি।
- ইটস ওকে। এই ক্যাটক্যাটে তেরঙ্গা নিয়ে তো আপনাকেও দাঁত বের করে চোখ ছলছল করে থাকতে হয়।
- না মানে, এত মিল্ক করছি, এ'টুকু অ্যাডজাস্ট করব না?
- হুঁ। তবে শুনুন। এবারে আমার অফিস ছেড়ে বেরোন। সোফায় ফিরে যান, যেখানে আমা কোলে নিয়ে বসে ঢুলছিলেন। এমার্জেন্সি।
- এক নম্বর? দুই?
- বমি। গেরুয়া সবুজ মিলে ব্রেন এমন ঘেঁটে গেল। জাগুন। জাগুন। জয় হিন্দ।

- ক্রমশ-