Sunday, August 14, 2016

জানালা ধরে

- ও মশাই। লোয়ার বার্থটা আপনার?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা। আমার আপার বার্থ, এই আপনার মাথার ওপরেরটাই।
- আই সি।
- একটা কথা ছিল।
- কী?
- বলছিলাম যে, এই লোয়ার আপনার, কিন্তু জানালার সিট আমার। কেমন?
- নাহ। তার দরকার দেখছি না। লোয়ারও আমার, জানালার পাশের সিটেরও আমার।
- নাহ্।
- না মানে? আলবাত আমার। আমি জানালার সিটে বসে আছি বলে আমার। আপনি বরং এই পাশে এসে বসুন।
- পাশে?
- আজ্ঞে। পাশে।
- অর্জুন গাণ্ডিব ছেড়ে গদা নিয়ে কেরদানি দেখাচ্ছে, তেমনটা কোনও দিন শুনেছেন?
- আপনি অর্জুন? এই জানালা গাণ্ডিব?
- এখন একটা কুরুক্ষেত্র বাধলে তার ডেমোন্সট্রেশনও পেয়ে যাবেন।
- শুনুন। জানালার পাশে আমি বসে আছি। এবং আমি উঠব না। আপনার বসতে না হলে বসবেন না।
- আহ। আপনি জানালার পাশে বসে থাকলে তবে তো উঠে যাওয়ার প্রশ্ন। আপনি তো জানালার পাশে বসেই নেই। শুধু একটু সরে আসুন, নয়তো আমার ও জানালার পাশে বসা হবে না। আর ট্রেনের জানালার পাশে কেউ না বসলে বেচারি জানালাদের প্রাণে কেমন মার্ডারাস বজ্রপাত হয় জানেন?
- আমি সশরীরে জানলার পাশে বসে আছি, আর আপনি বলছেন আমি জানালার পাশে নেই?
- আপনি জানালার পাশে নয়, জানালা অবস্ট্রাক্ট করে বসে আছেন।
- মানে? হাউ?
- এমন মন কেমন করা ফুরফুরে হাওয়া, মন কেমন করা আকাশ!  দিব্বি সবুজ চারপাশ হুশহাশ বয়ে যাচ্ছে জানালার ও পাশে, আর আপনি খবরের কাগজ চোখের সামনে মেলে বসে আছেন। অমন ভাবে ট্রেনের জানালাদের থার্ড ডিগ্রি দিতে নেই মশাই। আসুন। সরে আসুন। আমি জানালাটার পাশে গিয়ে বসি, বেচারি একটু স্বস্তি পাক।

Thursday, August 11, 2016

দু'জন

প্রথম দৃশ্য

সকালের শশব্যস্ত ফুটপাথ। জায়গাটা ঢাকুরিয়া হতে পারে, টালিগঞ্জ হলেও কিছু আটকাবে না।
এক ভদ্রলোক একটা ঠেলার পাশে দাঁড়িয়ে ঘুগনির স্টিলের প্লেট চেটে সাফ করছিলেন।বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। গালে খোঁচা দাড়ি, নাক দৃষ্টিকটু ভাবে বাঁকা,  কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পরনে হালকা নীল হাফ শার্ট আর খয়েরী ট্রাউজার। পায়ে চামড়ার চটি।এমন সময় পিঠে একটা হালকা টোকা পেতে ভদ্রলোক ফিরে তাকালেন।

পিছন ফিরতেই দেখলেন সেই ভদ্রলোককে।বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। করছিলেন।বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। গালে খোঁচা দাড়ি, নাক দৃষ্টিকটু ভাবে বাঁকা,  কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পরনে হালকা নীল হাফ শার্ট আর খয়েরী ট্রাউজার। পায়ে চামড়ার চটি। মুখের মিলটাও চোখে পড়ার মত, তবে সম্ভবত অবিকল নয়।   



দ্বিতীয় দৃশ্য

শহরের কোন একটা পার্ক। দেশপ্রিয় হতে পারে, অন্যকিছুও। একটা বেঞ্চি; কাঠের না হয়ে লোহার হওয়াই ভালো।
দুই ভদ্রলোক পাশাপাশি বসে।
-   দিলেন তো অফিসটা মাটি করে। ধুস!
-   কী আশ্চর্য! আপনিও তো আমার অফিস মাটি করলেন।
-   আরে আমার অনেক কাজ ছিল।
-   আমায় দেখে মনে হয় আমি ফাঁকিবাজ? আমি অফিসে ঘুমোই?
-   না। আপনাকে দেখে আমার মতই মনে হয়।
-   সে’টাই তো সমস্যা। বাস সিগনালে দাঁড়িয়ে আর আমি বাসের জানালায়, হাতে আনন্দবাজার। ফুটপাথের দিকে নজর যেতেই বুকে ধড়াস। দেখলাম আমি ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ঘুগনির প্লেট চাটছি। দু’সেকেন্ড পরে বুঝলাম, আমি বাসেই। ঘুগনির আমি আমি না। তাই হুড়মুড় করে নেমে এলাম।
-   অসোয়াস্তি অন্য জায়গায়।
-   কোন জায়গায়?
-   জামা কাপড় চটির এমন ভাবে মিলে যাওয়া। আচ্ছা, আপনার পকেটে রুমাল আছে?
*পাশের ভদ্রলোক পকেট থেকে কালচে নীল রুমাল বের করলেন*
*দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপর ভদ্রলোক নিজের রুমাল বের করে অন্যজনের সামনে মেলে ধরলেন, অবিকল এক কালচে নীল রুমাল*।
- আচ্ছা, আপনার মানি ব্যাগে কত আছে?
- আমার মানিব্যাগে?
- কত আছে?
*মানিব্যাগ বের করে গোনা শুরু*
- ছ’শো বত্রিশ। আপনার কাছে?
*মানিব্যাগ বের করে গোনা শুরু*
- আহ্‌! যাক। এগারোশ বত্রিশ। আমার কাছে। যাক। তাহলে সব মিলে যায়নি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো মশাই। তাহলে...ওঠা যাক।
- এক্সকিউজ মি ঘুগনীবাবু।
- কী হল?
- আমি একটু কশাস।
- তো?
- মানে আমার প্যান্টের একটা চোরা পকেট আছে। ওখানে আমি সিকুইরিটি মানি রাখি। *নিজেকে আড়াল করে প্যান্টের গোপন অঞ্চলে হাত চোরা পকেট হাতড়ানো আর বের করে আনা একটা পাঁচশো টাকার নোট*। ছ’শো বত্রিশ প্লাস পাঁচশো। টোটাল এগারোশো বত্রিশ।
*অন্য ভদ্রলোকের ধপ্‌ করে বসে পড়া*
- যাহ্‌ শালা!
- অদ্ভুত। তাই না?
- আপনার মোবাইলটাও দেখলাম নকিয়ার। পুরনো মডেল।
- এগারোশো। মডেল নাম্বার।
- না বললেও হত। আমারটাও তাই।
- আমার কিন্তু দিব্যি লাগছে জানেন!
- কচু দিব্যি! অসোয়াস্তি হচ্ছে না?
- তা ঠিক না। তবে অবাক লাগছে। ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার। আচ্ছা আপনার বাড়িতে কে আছে?
- আমি একা। আপনারও তাই কেস নিশ্চই? বাপ মা অল্প বয়েসে হাওয়া? মামার কাছে মানুষ? বিয়ে থা করা হয়নি?
- কে বললে? বাড়িতে বাবা, মা, ছোটবোন, মেয়ে বাবলি ক্লাস টু তে পড়ছে, দিব্যি রাইম্‌স বলছে।
- ওহ! যাক।



তৃতীয় দৃশ্য

পাড়া। বিকেলের পরিচিত ইতিউতি শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে চারদিকে। এক ভদ্রলোক একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছিলেন। বয়স এই তেত্রিশ চৌত্রিশ। গালে খোঁচা দাড়ি, নাক সামান্য  কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পরনে হালকা নীল হাফ শার্ট আর খয়েরী ট্রাউজার। পায়ে চামড়ার চটি।
একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে জড়িয়ে ধরবে ভদ্রলোককে।
-   বাবা, তোমার অফিস আজ তাড়াতাড়ি ছুটি হল?
-   হল।
-   তুমি আমার জন্যে নতুন পেন্সিল বক্স আনোনি?
-   এ বাবা! নাহ্‌!
-   তুমি বলেছিলে আনবে।
-   একদম ভুলে গেছি। কাল ঠিক আনবো দেখিস।
-   ভুলবে না তো?
-   কদম নাতোর মা কোথায় রে বাবলি?



চতুর্থ দৃশ্য

শোওয়ার ঘর। বাবলি নামক মেয়েটা চওড়া বিছানার এক কোণে ঘুমিয়ে কাদা।
ভদ্রলোক খাটের এক কোণে বসে। ভদ্রমহিলা ঘরের অন্যপ্রান্তে। জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। বয়স ছাব্বিশ কি সাতাশ, মুখে শ্রান্তি, বিহ্বলতা। চোখ অস্বস্তিকর ভাবে স্থির। পরনে হলদে ছাপার শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ।
ভদ্রলোক সামান্য কেশে বলতে শুরু করলেন;
-   তুমি গত এক ঘণ্টায় কিছুই বলোনি মিনু।
-   আমায় মিনু বলে ডাকবেন না দয়া করে। তুমিও বলবেন না। আপনি ও নন।
-   আমি সরি বলেছি।
-   এ’টা সরি বলার মত ঘটনা? আমাদের জীবন শেষ করে দিয়ে বলছেন সরি?
-   আসলে আমি চিরকালের একলা। তার মধ্যে ভদ্রলোকের সাথে মিলগুলো দেখে এমন ভেবড়ে গেছিলাম যে মাথা কাজ করছিল না। আচমকা এই ভরা সংসারের গল্প শুনে ঠিক...মানে...মাথায় কী যে হলো! আমি খুন করতে চাইনি।
-   কিন্তু করেছেন। আমার বরকে খুন করেছেন। আর সে’টা আমাদের বিছানায় বসে আমায় জানাচ্ছেন।
-   আমি সংসারটা ম্যানেজ করে নেব মিনু। এই খুনটা ভুলের, কিন্তু কেই কিচ্ছুটি টের পাবে না।বাবা,মা এমনিতেই বয়সে অথর্ব।বাবলি সোনার এইটুকু বয়স... আমি সব...।
-   প্লিজ আমায় ও নামে ডাকবেন না। ওঁদের বাবা মা বলে ছোট করবেন না। বাবলিকে সোনা বলবেন না।
-   আমি ম্যানেজ করে নেব।
-   আপনি কি মানুষ?



পঞ্চম দৃশ্য

মিনু টিফিনবাক্স রেডি করে অফিসের ব্যাগে ভরছিল। ভদ্রলোক জড়সড় হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে। পরনে আকাশী কালো চেক হাফ শার্ট আর কালো প্যান্ট।
অসোয়াস্তি কাটিয়ে মিনু বললে;
-   টিফিনে আজ নিরামিষ। সকালে তো আর বাজার গেলে না। আর ফেরার পথে আজ বাবলির পেন্সিল বাক্সটা আনতে ভুলো না। গতকাল মেয়েটা খুব দুঃখ পেয়েছিল। কেমন?  


ষষ্ঠ দৃশ্য

অফিস টাইমের শহর। চারপাশে ভিড় আর ঘামে হাঁসফাঁস অবস্থা। শহরের হুড়মুড়ে ব্যস্ততা এ সময়ে যেন কানের মধ্যে একটানা গিজগিজ করে চলে।
ফুটপাথের এক পাশ আলো করে দাঁড়ানো ঘুগনি পাউরুটির ঠেলাটার পাশে দাঁড়িয়ে; আকাশী কালো চেক হাফ শার্ট আর কালো প্যান্টে পরা ভদ্রলোক দিব্যি ঘুগনির প্লেটে লাগা ঝোলের শেষ রেশটুকু জিভে মাখিয়ে নিচ্ছিলেন।
প্লেটের বিটনুন লেবু ছোঁয়ানো অন্তিম পেঁয়াজ কুচিটুকু চেটে নেওয়া মাত্রই চোখ গেল লাল সিগন্যালে দাঁড়ানো মিনিবাসটার দিকে। অসহ্য বুকের ধড়ফড়ের মধ্যেও বাসের দরজায় বাদুড় ঝোলা হয়ে থাকা লোকটার আকাশী কালো চেক হাফ শার্ট আর কালো প্যান্ট চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না তার।

Tuesday, August 9, 2016

আলোচনা

- বলেন কী মশাই, সুইসাইড?
- ইচ্ছে আছে।
- হঠাৎ?
- ইচ্ছে হল।
- চাকরী নট?
- প্রমোশন হচ্ছে এবার।
- প্রেম?
- বেড অফ রোজেস।
- কবিতা লিখছেন?
- দাঁতে ব্যথা।
- লাঞ্চে লাউ ছেঁচকি ছিল?
- কাতলার কালিয়া। সাথে হাফ কোয়া লেবু। গতকাল ছিল পাঁঠা। আজ ফিরব গড়িয়াহাট হয়ে, পাবদা মনে টান দিচ্ছে।
- তবে?  রশখ?
- স্রেফ।
- নিহিলিস্ট?
- ডেফিনিশন জানি না।
- এক্সট্রিম ল্যাদ?
- হতে পারে।
- লাগবে না?
- কীসে?
- মারা যেতে? লাগবে না? ঝাঁপ, ঝুলে পড়া, পোড়া...।
- আমার আবার সেন্সিটিভ স্কিন। সে'টাই বদার করছে।
- কোন ভাবে স্পেসে গিয়ে স্পেস্ক্র‍্যাফট থেকে ফ্লোট করে বেরিয়ে যেতে পারলে বেশ হত.. ভাসতে ভাসতে এক্কেরে গ্র‍্যাভিটি পুলের বাইরে..কাজ হতে পারে।
- লাইক ক্যাপ্টেন্ড হ্যাডক? তবে ওই...বর্দ্ধমান ইউনিভার্সিটি। বিকম। অনার্স বাদে। নাসা নেবে? নাহ!
- ঘুমের ওষুধ?
- থ্রিল নেই। টুপটাপ মরে গেলেই হল? ইম্প্যাক্ট চাই। মেট্রো আটকে যাবে। বাড়িতে আগুন। মেঝেতে রক্ত।
- চা খাবেন?
- দুধ চা ভাই। আড়াই চামচ চিনি।
- ওয়েটার ভায়া, এদিকে। হাঁ, দু'টো চা। বাড়তি চিনি দিয়ে যাবেন। আর চিকেন ওমলেট দু'টো। নহি। অউর কুছ নহি। হুঁ। এবার বলুন।
- কী বলব?
- সুইসাইড। হঠাৎ এমন ইচ্ছে হল কেন?
- শখ। বললাম যে।
- এমন শখ কেন?
- শখের প্রাণ গড়ের মাঠ, শোনেননি?  শখ থ্রাইভস অন বেসলেসনেস।
- কিন্তু এই যে আপনার ডেলি প্যাসেঞ্জারি থাকবে না, আলুর চপ থাকবে না, নিউজচ্যানেল থাকবে না, চায়ে আড়াই চামচ চিনি থাকবে না, মন খারাপ হবে না?
- ধুরধুর। সব বিষ। বিষ।
- প্রেমিকা থাকবে না। মায়ের ভাত বেড়ে দেওয় থাকবে না।
- প্রেমিকার নতুন প্রেমিক হবে, তার অনার্স থাকবে। মা দাদাকে ভাত বেড়ে দেবে।
- হুঁ। তাহলে ডিসাইডেড?
- কনফার্ম। টোটালি।
- মেথড?
- চায়ে আড়াই চামচ করে। প্রত্যেকবার। দিনে দশবার। ক্রমশ রক্ত ক্রিস্টালাইজ করে যাবে।
- সিরিয়াসলি?
- সিরিয়াসলি? মাথায় আসছে না। মানে প্রসেসটা সাংঘাতিক কিছু হওয়া উচিৎ।  সাপও মরবে আবার লাঠিও দিব্যি চুরমার হবে  গোছের।
- বুঝলাম না।
- মানে ধরুন, একটা এক্সপ্লোশন! সে'টা একটা অর্গ্যাজম হতে পারে, জিভে একটা দুরন্ত স্বাদ হতে পারে, অবিস্মরণীয় কোনও দৃশ্য হতে পারে। এমন একটা বিস্ফোরণ যাতে হৃদযন্ত্র যাবে আটকে।
- কিন্তু তার জন্য আপনার আমায় দরকার হল কেন? এমন হুড়মুড় করে আমায় এই কেবিনে ডেকে আনার কী মানে? আমি কী করে সেই বিস্ফোরক সুইসাইড টেকনিক আপনাকে বাতলে দেব?
- আপনি বাতলে না দিলে কে দেবে? আপনার মত অ্যাপ্টিচিউড বা সেনসিটিভিটি আমার চেনা আর কারুর আছে বলে মনে হয় না।
- ফ্ল্যাটার্ড। কিন্তু ইউটোপিয়ান সুইসাইডের টিপ দেওয়া আমার কাজ নয়। বললাম তো।
- অমন ডিসমিস করে দেবেন না। বড় আশা করে আপনাকে ডেকেছি।
- আচ্ছা আপনার ব্যাপারটা কী বলুন তো? প্রত্যেক মঙ্গলবার কোন না কোন অদ্ভুতুড়ে সাব্জেক্ট আলোচনা করতে আমাকে ডাকেন এই কফি কেবিনে। কোনওবার সিরিয়াল কিলার হওয়ার ব্যাপারে সাজেশন চান, কোনওদিন প্ল্যানচেট নিয় গল্প, কোনওদিন অর্গি, কোনওদিন জিরাফ পোষার প্রস অ্যান্ড কনস। আজ সুইসাইড। আরে মশাই আপনি পেয়েছেনটা কী বলুন তো?
- চটবেন না প্লিজ। চটবেন না। আপনি ছাড়া আর কে আছে বলতে পারেন? যে শুনবে? যে বুঝবে? যার মুখোমুখি বসে দু'চারটে মনের কথা আগুপিছু না ভেবে বলা যায়? আছে কি কেউ? নেই। নেই। নেই। আপনি চটবেন না প্লিজ।

**

ওয়েটার ১ -  এগারো নম্বর টেবিলে ফের সেই মাল এসেছে! ওই যে! ছিটগ্রস্ত!

ওয়েটার ২ - ওই সেই উদ্ভট স্যাম্পলটা তো? ওই একটানা বিড়বিড় করে যাওয়া ভদ্রলোক? প্রতি মঙ্গলবার এসে যে নিজের জন্য জোড়া চা আর জোড়া অমলেট অর্ডার করে?

Saturday, August 6, 2016

সিন্দুক

- কেমন আছেন স্যার?
- কেমন দেখছো অনিকেত?
- এক্স রে বলছে বারোটা ফ্র‍্যাকচার।
- তেরো নম্বরটা ডিটেক্ট করতে পারেনি।
- তেরো?
- কনফিডেন্স।
- আমি সেক্রেটারি। ছোট মুখে বড় কথা আমার সাজে না। আপনি যাকে বলে; ফিল্দি  রিচ...। এ বয়েসে নতুন কিছু শেখার শখ হয়েছে। ভালো কথা। হর্স রাইডিং শিখুন, চাইনিজ শিখুন। তাই বলে পাইপ বেয়ে উঠে চুরি? এ'টা কোন শেখার শখ হলো?
- তুমি এত ডিসকারেজিং কেন হে ছোকরা?  সব ব্যাপারেই এমন পেট রোগা মুখ করে ওপিনিওন দাও কেন?
- বেশ। বলবো না। তবে ওই। বারোটা ফ্র‍্যাকচার জুড়ে যাবে। তেরো নম্বরটা খুবলে থাকলেই আপনার মঙ্গল।
- তোমার স্যালারি আমি দিই।
- আজ বারোটা হাড় ভেঙেছেন। কাল খুলি গুঁড়ো হলে কীসের স্যালারি, কীসের কী?
- আরে গণ্ডগোল হত না। তরতর করে পাইপ বেয়ে উঠে গেছিলাম চার তলা। আর এক তলা বাইলেই ঢনঢনিয়ার পাঁচ তলার অ্যাপার্টমেন্টের খোলা জানালা। কী মনে হল, পকেট থেকে ক্লোরোফর্মের ন্যাকরাটা বের করে শুঁকে দেখতে গেলাম ঠিকঠাক রেডি কি না। তারপর জ্ঞান ফিরতে দেখি এখানে শুয়ে। সে'বার কোল্ডস্টোরেজের ব্যাবসায় নুকসান করে এমন পেটখালি একটা ফিলিং এসেছিলো।
- ঢনঢনিয়া সাহেব দেখে গেছেন আপনাকে। তখনও আপনি অজ্ঞান। ইন ফ্যাক্ট, উনিই আপনাকে হস্পিটালে নিয়ে আসেন।
- ছি! ছিঃ! কী বেইজ্জতি। একটা চুরি করতে পারলাম না।
- চুরি করারই যখন শখ চেপেছিল তখন সামন্তবাবুর রিকুয়েস্টে ভোটে দাঁড়ালেই পারতেন। পাইপ বেয়ে ওঠা, ক্লোরোফর্ম, এ'সব আপনাকে মানায় না।
- সেক্রেটারি হিসেবে এত বাজে কথা বলাও তোমায় মানায় না। আমায় কবে ছাড়বে বলছে?
- দেড় মাস। মিনিমাম।
- সে কী! আগামী শনিবারে দাসগুপ্তর বাড়ির সিন্দুকে চড়াও হব ভাবছিলাম।
- দাসগুপ্ত?
- অনুপ দাসগুপ্ত।
- আপনি ছাড়া আর ক'টা অনুপ দাসগুপ্ত আছে স্যার?
- জানি। ভাবের ঘরে চুরি।
- নিজের বাড়িতে চুরি করবেন?
- তিন তলার ঘরে সিন্দুক। জলের পাইপ বেয়ে তিন তলার বারান্দায়। তারপর তার দিয়ে ঘরের তালা খুলে..এন্ট্রি। আমার গোপন সোর্স আমায় সিন্দুকের কম্বিনেশন ইতিমধ্যেই জানিয়ে রেখেছ।
- সিন্দুক আপনার। কম্বিনেশন আপনার। আপনার সোর্স আপনিই।
- আমি কি এলাবোরেশন চেয়েছি তোমার কাছে? সেক্রেটারি,  সেক্রেটারির মত থাকবে।
- তা বেশ।
- হুঁ। খালি দাসগুপ্তর ডোবারম্যানগুলোকে নিস্তেজ করে রাখতে হবে।  সে হবে'খন।
- স্যার।
- অনিকেত।
- চোদ্দ নম্বর ফ্র‍্যাকচারটা সবচেয়ে পুরোনো, না?
- চোদ্দ?
- চোদ্দ। অনেক পুরোনো, না বাবা?
- বড় চাকরী বা ব্যবসা তো দূর অস্ত। সেক্রেটারির কাজও তোমার দ্বারা হলো না কোনওদিন। স্যার বলে ডাকবে।  বাবা নয়। স্যার।
- আসি। কেমন?
- এখনই? ভোর হয়ে গেছে?
- হলো বলে। আই হ্যাভ টু গো।
- ওই সিন্দুক তোর মা আগলে রেখেছে। ঢুকতে দেয় না সে ঘরে আমায়। ঢুকতে দেয় না। সিন্দুক ছুঁতেও দেয় না। তোকে দেখব কী করে? তাই তো। তাই তো চুরি প্র‍্যাক্টিস করতে চাইছি। চাইছি। পারছি না।
- বাবা। সেদিন অ্যাক্সিডেন্টের পর আমার বডিটাকে শ্মশানে না নিয়ে গিয়ে কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করে সিন্দুকে পুরে রাখাটা যতটা বোকামি, এই তোমার চুরি প্র‍্যাক্টিসও ততটাই।
- খোকা।
- অনিকেত বলুন স্যার। সেক্রেটারি মানুষ বলে কথা।
- হে হে। রাইট। অনিকেত।
- আসি স্যার। ভোর হল বলে। আর...উম...হাউ ইজ শি?
- সিন্দুকের ভিতরে একটা লাশ। আর বাইরের লাশটা তোর মায়ের। নেহাত এখনও শ্বাস নেয়, তাই তোর সাথে সিন্দুকে ঢুকে বসে থাকতে পারে না।

Tuesday, August 2, 2016

বালিশবাবুর অফিসে - ১

প্রথম পর্ব

- আপনিই তাহলে সে?
- আজ্ঞে।
- দাঁড়িয়ে কেন? বসুন। বসুন।
- থ্যাঙ্ক ইউ।
- থ্যাঙ্ক ইউ তো আমার বলা উচিৎ মিস্টার মুকর্জী। ফর দ্য স্পার্ম।
- ওহ ইট ইজ নাথিং রিয়েলি..ইট ইজ জাস্ট আ স্মল..।
- স্মল কেন? মাইক্রোস্কোপিক বলুন। তবে আমি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। আই মিন, ইট মেন্ট আ লট টু মি।
- অফ কোর্স ইট ডিড। আই মিন, অ্যাম গ্ল্যাড ইট ডিড।
- চা খাবেন?
- আপনার অফিসে চা আছে?
- থাকা উচিৎ না?
- না মানে, আমার আপনার অফিসটা তো আমার স্বপ্নে। আর আমার স্বপ্নে তৈরি অফিসে চা থাকা উচিৎ নয়। কারণ আমি চা খাই না।
- আপনার স্বপ্ন হতে পারে। কিন্তু অফিস তো আমার। আমি আপনাকে ডেকেছি। ফর আ ম্যান টু ম্যান চ্যাট। কারণ আমার মনে হয়েছে যে আইস-ব্রেকিংয়ের খুব দরকার। আর এদিকে আপনি স্পার্ম ভাঙিয়ে ইম্পোজিশন অলরেডি চালু করে দিয়েছেন?
- সরি। সে'ভাবে বলতে চাইনি। ইয়ে। এক কাপ চা চলতেই পারে। পঞ্জিকায় তো আর বারণ করা নেই। হেহ।
- পঞ্জিকাটা অ্যাটেম্পটেড হিউমর ছিল?
- না মানে..ওই আর কী!
- ওহ নো।
- কী হল?
- ওহ। ইট ইজ ডিপ্রেসিং। আমার হিউমর কতটা ইনহেরিটেড আর কতটা কন্ডিশনড হবে কে জানে।
- পঞ্জিকার অ্যাটেম্পট ওয়াস ফাইন। চা বলুন এক কাপ।
- চা? চা তো নেই।
- লে হালুয়া। চা নেই? তাহলে জিজ্ঞেস করলেন কেন?
- বেসিক কার্টসি। এখানে শুধু বেবিফুড। আর ব্রেস্ট মিল্ক দু'রকমের। কোনটা চাই?
- দু'রকমের?
- রাইট আন্ড লেফট। কউনসা মঙ্গাউ?
- জাস্ট দ্য চ্যাট শুড বি গুড। আপনি আমায় কেন ডেকেছেন যদি খোলসা করে বলেন। ও, তার আগে বলি, টাইটেলটা মুকর্জী নয়, মুখার্জী।
- এ'টাই আপনার বাবা হিসেবে ছেলের প্রতি প্রথম সাজেশন?
- এতে ভুলটা কোথায়?
- আপনি সিগারেট খান?
- খেতাম।
- এখন?
- রেয়ারলি দু'একটা।
- আমার মনে হয় সিগারেটের গন্ধ সহ্য হয় না।
- আপনার আড়াই মাস। তা'তে আবার সহ্য অসহ্য কী?
- বয়স নিয়ে আপনি খুব জাজমেন্টাল তো। লিস্টে আর কী কী আছে?
- কীসের লিস্ট?
- আপনার জাজমেন্টালপনার।
- কাজের কথায় আসুন।
- এ'টা রীতিমত কাজের কথা। যে বয়সে গিয়ে আমার ফুর্তি করা উচিৎ,  সে বয়সে যদি আমায় আমার ইনকনসিডারেট বাপের বায়োপ্সি রিপোর্ট হাতে দৌড়ঝাঁপ করতে হয় সে'টা ঠিক হবে?
- আমি আপনার ওপর ডিপেন্ডেন্ট থাকবো, সে'টা কে বললো?
- রাখুন মশাই বাতেলা। সব বুঝি।
- কী বোঝেন?
- শুনুন মিস্টার মূকর্জি। আপনি নিজের আর ও আই ম্যাক্সিমাইজ করতে এই যে দড়াম করে একটা প্রডাক্ট লাইফ সাইকেল ইনিশিয়েট করলেন, লং রান হ্যাপা সব সামলাবে কে?
- মানে? আমি আছি। আপনার মা আছেন।
- মা? মানে..।
- রাইট লেফট। ইয়েস।
- উনি তাহলে আপনার মিসেস?
- হ্যাঁ, কেন?
- না। দেখে বিশেষ মনে হয় না। যে উনিই মিসেস।
- এ কি ভাই বোন নাকি? যে দেখে মনে হতে হবে?
- নীলোৎপল রবিনসন কী বলেছেন জানেন?
- কে নীলোৎপল রবিনসন?
- কেউ হিমসাগর আম অফার করলে আপনি হিমসাগরের এটিমোলজি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন না কি খোসার খোসবু স্টাডি করেন?
- কী বলেছেন রবিনবাবু?
- বন্ড অফ মাসকাবারি ইজ মাইটিয়ারর দ্যান দ্য স্ট্র‍্যান্ডস অফ জিনস।
- এ'টা বানালেন?
- অন্তত পঞ্জিকা জোক তো ক্র‍্যাক করিনি।
- আরও কিছু বলার আছে?
- কত কিছু বলার আছে। সে'সব ক্রমশ প্রকাশ্য। আজ শুধু একটা অব্জার্ভেশন শেয়ার করার আছে।
- করুন।
- আপনার গালের খোঁচা দাড়িতে একটা অদ্ভুত আনইন্টেলেকচুয়াল ব্যাপার আছে জানেন।
- মানে?
- আপনাকে দাড়িতে দরকচা ঠেকে। দাড়ি কাটতে দেরী রীতিমত অদরকারি।
- এ'টা বলতে আমায় আপনার অফিসে ডেকেছেন বালিশবাবু?
- যে'টা বলতে চাইছি। সে'টা হলো। গালে খোঁচা দাড়ি নিয়ে ব্যাবাগো সোনাগো বলে গালে গাল লেপ্টে আদর করা বন্ধ করুন। খিস্তি এখনই শেখার দরকার দেখছি না।
- ও।
- আজ আসুন। আপনার এ বাপমিটিঙের রিভিউতে নম্বর হচ্ছে হচ্ছে পাঁচে তিন। সাড়ে তিন পেতেন। কিন্তু ওই পঞ্জিকা জোক মনে পড়লেই মনে হচ্ছে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসবে।
- অন্নপ্রাশন?  আপনার অন্নপ্রাশন হতে এখনও ঢের দেরী। ঢের।
- হুঁ? ও। ওহ। দেঁজাভু। এখন আসুন। আমার বিস্তর কাজ। হিউমরের জেনেটিক ভাঁড়ারে ডেফিসিটের ব্ল্যাক হোল। অনেক কাজ। আসুন। আসুন।  আর নিজের বা ওই ভদ্রমহিলার ঘুমটা এ'বার ভাঙান মশাই। ডাইপারে যে এখন ডল্ফিনেও সাঁতার দিতে পারবে।

( ক্রমশ)