Thursday, July 28, 2016

ট্র্যাভেল প্ল্যান

- দেবী, শোনো!
- বলো!
- মন দিয়ে শুনতে হবে কিন্তু।
- অফ কোর্স। অফ কোর্স। মন দিয়ে।
- কন্সেন্ট্রেট করতে হবে। কল্পনাকে প্রলিফারেট করতে দিতে হবে।
- হবে। হবে। তাই হবে।
- তার জন্য চোখ বুজে ভাবতে হবে।
- চোখ বুজলাম। আমি কল্পনা-প্রস্তুত। এবার বলো।
- বলি?
- বলো!
- মনে করো...সবুজ ঢেউ খেলানো একটা পাহাড়। পাহাড়ের বুকের কাছে মেঘ জমে। ।
- বাহ্‌। বাহ্‌। চমৎকার! স্পষ্ট দেখতে পারছি।
- সেই পাহাড়ের মাথায় একটা কটেজ! মন খারাপ করা পুরনো গন্ধ সে কটেজের গায়ে। কাঠের মেঝে, স্নেহের জানালা। 
- মিঠে রোদ সে কটেজের বারান্দায় লেজ গুটিয়ে নেমে আসে... তাই না?
-এইতো দেবী। তোমার কল্পনা ফ্লোট করতে শুরু করেছে।
- তারপর?
- সে কটেজ থেকে পঞ্চাশ মিটার মত হেঁটে গিয়ে একটা সবুজ কাঠের বেঞ্চি। সে বেঞ্চি থেকে সামান্য এগোলেই খাদ। 
- দারুণ! আমার হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে। 
- চোখ খুলো না তাই বলে! সেই আদুরে বেঞ্চি আলো করে তুমি বসে। তোমার হাতে আশাপূর্ণা দেবী।তোমার হাতে কফির কাপের ধোঁয়াময়তা। 
- আনন্দে গলে যাবো তো গো।
- আরও আছে, সবুজ পাহাড়ের অন্য প্রান্তের সুদূর সফেদ করে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা। 
- দারুণ! দারুণ! আমার লাফাতে ইচ্ছে করছে!
- দুরন্ত না?
- বিলকুল। 
- তাহলে বাঁধো বাক্স প্যাঁটরা আর চলো কার্শিয়াং। 
- কবে?
- পরশু রাত্রের ট্রেন। 
- টিকিট?
- তৎকাল, ট্র্যাভেল এজেন্ট। জুটে যাবে। 
- থাকা?
- ওই যে! কটেজ! আমার সমস্ত দেখা আছে! না বোলো না! প্লীজ!
- কদ্দিনের জন্য?
- চার দিন দেবী!
- টিকিট, থাকাখাওয়া! সব মিলে, অন্তত দশ হাজার?
- ওই আর কী! হয়ে যাবে। 
- কহা সে? ব্যাঙ্কে তো আড়াই। দু'জনেরই মাইনে পেতে আরও অন্তত এক হপ্তা। 
- সান্যালের থেকে লোন নেবো!
- ধারের কটেজ আর কার্শিয়াং? 
- হোয়াই নট? স্যালারি ইন! লোন ওয়াপিস!
- হে মোর দেবতা!
- দেবী! ডু নট ডিজ্যাপয়েন্ট। টাকা আজ আছে কাল নেই।  
- না না! ডিজাপয়েন্ট করব কেন? আমার বেটার প্ল্যান আছে।
- গ্যাংটক দেবী? 
- না!
- অরুণাচল?
- কচু! আরও ভালো! 
- কী?
- বলবো! কিন্তু চোখ বুজতে হবে। কল্পনাকে খেলতে দিতে হবে। 
- জরুর। জরুর। এই! বুজলাম চোখ! বলে যাও।
- ভাবো! এই ধরো রাত ন'টা! 
- দিব্যি। দিব্যি। অতঃকিম?
- আমাদের ছাদের উত্তর কোণে, নয়নতারার টবগুলো ঘেঁষে; পাতা মাদুর। 
- মনে মনে এই ছিল দেবী?
- চোখ খুললে হবে?
- হবে না?
- কল্পনা তো সবে ফ্লোট করা শুরু করছে। চোখ বুজেই রাখো। আমি বলে যাই। তো, সেই মাদুর আলো করে এক জোড়া পাশবালিশ! 
- হুঁ। গো অন!
- মাদুরের উত্তর মেরুতে ফতুয়াম্যান তুমি, দক্ষিণে আমার শাড়ির লটপট! 
- ঠিক হ্যায়! নট ব্যাড। উসকে বাদ?
- জুঁইয়ের গন্ধে মঁমঁ ছাদ। সে সুবাসে নিচের পরশের দোকান থেকে ডিম তড়কার গন্ধ মিশে গিয়ে ছাদের হাওয়া ভারী করে তুলেছে।
- অহো! দেবী! অহো!
- মাদুরে রাখা একটা স্টিলের বাটি, একটা স্টিলের থালা আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি। সে স্টিলের বাটিতে কিমা ঘুগনি, আর থালায় আলু কাবলি। 
- স্নেহ। দেবী। স্নেহ।
- গোপন প্রেমের মত অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে তালের বড়া।
- মার দিয়া কেল্লা! দেবী! চোখ না খুলেই দাবী রাখি? কল্পনার স্বার্থেই।
- অফ কোর্স। বলো। বলো। আর কী চাই?
- সামান্য ওল্ড মংক। ওই নিপ্‌ হলেই চলবে। চার টুকরো গোল্ডফ্লেক। সন্ধ্যেয় সামান্য সেনসুয়াসনেস্‌ জুড়ে দেওয়া জরুরী। 
- আলবাত। আলবাত। তাই থাকবে!
- শুধু একটাই যা আফসোস! 
- কী?
-  চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা টিমটিম করবে না। সন্তুদের বাড়ির ব্যালকনিতে পুরনো পেটির ভিড় আর নমিতাদের বাড়ির ছাদে মেলা সায়া ব্লাউজ! ধ্যুত! সে'টা কোনও দৃশ্য হলো? 
- ওকে। কাঞ্চনজঙ্ঘা? সে ব্যবস্থাও হয়ে যাবে!
- এই কসবার বাড়ির ছাদে? কাঞ্চনজঙ্ঘার ব্যবস্থা?
- পার্ফেক্ট সাবস্টিটিউট রয়েছে আমার হাতে!
- কী'রকম?
- ছাদের বাল্বের আলোয় ঝলমলে সুকুমার রচনা সমগ্র। তুম পড়েগা, হম শুনেগা।
- ওহ!
- কেমন? 
-ম্যাজিক। কাঞ্চনজঙ্ঘা লাভ জানতে পারে, আবোলতাবোলের মত লাভ মেকিং সে গ্রিপ করবে কী করে?
- অতএব! হে মোর দেবতা! কার্শিয়াং না ছাদের কোণ? লোন না আলুকাবলি? লাভ না লাভমেকিং?
- হেহ্‌! হেহ্‌! ছাদ গুনে গুনে ছয় গোল দেবে। কার্শিয়াং কে। 

Wednesday, July 27, 2016

ঘিলুপাড়ার পোস্টমাস্টার

-          পোস্টমাস্টারদা। ও পোস্টমাস্টারদা। শুনছেন? বলি ও...।
-          ধ্যাত্তেরি। দুপুরের বেলায় অল্প জিরিয়ে নেবো তারও উপায় নেই। কী চাই?
-          আমি হৃদয়পুর থেকে আসছি।
-          অ। হৃদয়পুর থেকে আসা হয়েছে? তবে তো ভারি কাণ্ড করলে দেখছি। বলি মাথায় কুলো ঠেকিয়ে বরণ করতে হবে নাকি? মুড়ি বাতাসা জল দিয়ে দাওয়ায় বসাতে হবে?
-          আহ! চটছেন কেন! এই দুপুর রোদে কেই বা সাধ করে বারো মাইল পথ ঠেঙিয়ে ঘিলুপাড়া পোস্টাপিসে আসতে চেয়েছিল। নেহাত বড়বাবু পাঠালেন, জরুরী তার। এখুনি না করলেই নয়।
-          তার? টেলিগ্রাম?
-          আর্জেন্ট।
-          অ। তা নর্মাল আর্জেন্ট না সুপার আর্জেন্ট?
-          সুপার। যত তাড়াতাড়ি যায় আর কী।
-          ডবল দাম লাগবে।  সত্যি না সাজানো?
-          আজ্ঞে?
-          বলছি তারের বয়ান সত্যি না সাজানো?
-          সাজানো।
-          বটে? চারগুণ দাম লাগবে।
-          চারগুণ?
-          চারগুণ। আর ইয়ে, সাজানো বয়ান লেখা আছে না কি আমায় সত্যি থেকে বদলে সাজিয়ে নিতে হবে?
-          আমি চিরকুটে সত্যিটা লিখে এনেছি। আপনি একটু সাজিয়ে দেবেন’খন।
-          সাজিয়ে দেওয়া? পাঁচগুণ দাম।
-          পোস্টাপিস না কালু ডাকাতের ডেরা গো?
-          না পোষালে সত্যি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দাও। ল্যাঠা চুকে যায়।
-          ও বাবা! বাবু পইপই করে বলে দিয়েছেন, যত দাম লাগে লাগুক। সাজানো তার পাঠানো চাই, আর্জেন্ট। সত্যি তার গেছে কী চিত্তির।
-          অ। কই দেখি।
-          কী?
-          বয়ানটা! সত্যি বয়ান। যে’টা পালটে সাজিয়ে তার হবে। কী মুশকিল।
-          ওহ্‌। এই যে!
-          দেখি। “যাও মত, টিকিট ক্যান্সেল কর লো! বাবু! যাস না! প্লীজ। কেউ না দেখুক, তুই তো জানিস! আমি খতম হয়ে যাই। কেউ দেখতে পায় না। আমি খতম হয়ে যাই। টিকিট ক্যান্সেল কর লো। মত যাও”। এই হচ্ছে অরিজিনাল বয়ান, তাই তো?
-          আজ্ঞে। এ’টা সত্যি। এবারে সাজিয়ে দিন।
-          বেশ। অরিজিনাল বয়ান ছিল “যাও মত, টিকিট ক্যান্সেল কর লো! বাবু! যাস না! প্লীজ। কেউ না দেখুক, তুই জানিস! আমি খতম হয়ে যাই। কেউ দেখতে পায় না। আমি খতম হয়ে যাই। টিকিট ক্যান্সেল কর লো। মত যাও”। এ’টা সাজিয়ে যে’টা দাঁড়ালো, সে’টা হল; “রিটার্ন টিকিট পরশুর তো? বেশ। সাবধানে যাস। পৌঁছে কল করিস। না ধরতে পারলে জানবি অফিসে ব্যস্ত আছি। টেক্সট ড্রপ করে দিস”। ঠিক আছে? গড়বড় লাগছে না তো কানে?
-          ঘিলুপাড়ার পোস্টমাস্টারের কলমে কি ভুলে থাকতে আছে? দিব্যি হয়েছে। এবার সুপার আর্জেন্ট করে পাঠিয়ে দিন।
-          পাঠিয়ে দেব? পাঁচগুণ দাম লাগবে কিন্তু।
-          অ।
-          সাজানো আর আর্জেন্ট না হলে স্রেফ দীর্ঘশ্বাসে হয়ে যেত। এখন তার ওপরে লাগবে চোখ কটকট, নাকে অল্প সর্দি, বুকের হুশহাশ আর পেটে মোচড়। চলবে?
-          অগত্যা। পাঠিয়ে দিন।
-          দিলাম।

**

-          গুডনাইট বাবু।
-          গুডনাইট।
-          কী রে, আরও কিছু বলার ছিল?
-          আমি? কই?
-          কিছু বলবি বাবু?
-          উঁ...রিটার্ন টিকিট পরশুর তো? বেশ। সাবধানে যাস। পৌঁছে কল করিস। না ধরতে পারলে জানবি অফিসে ব্যস্ত আছি। টেক্সট ড্রপ করে দিস। 

মৃণালবাবুর শেষ স্বপ্ন

নমস্কার। আমি মৃণাল দত্ত।

আমি ঠিক আপনার সাথে কথা বলছি না। নিজের মধ্যে বিড়বিড় করছি। ওহ, বলে রাখা ভালো যে আমি নিজের মধ্যেই রয়েছি। এই যে লাল দেওয়ালের ঘর দেখা যাচ্ছে, এটা আমার সাবকনশাস্‌। এই সোফাটা, যেটায় আমি বসে আছি; সে’টা সম্ভবত সিমলার পি ডাবলু ডি গেস্ট হাউসের ড্রয়িং রুমে রাখা ছিল; কালো চামড়ার, বড় আরামের। নাইনটি সিক্সে ঘুরতে গেছিলাম; সেখানকার সোফা যে এইভাবে মরমে পশেছিল সেটা আজ মালুম হচ্ছে।

যাক সে’সব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। হাতে সাত মিনিট আছে স্বপ্নে জীবন রিভিউ করার জন্য। আচ্ছা আমি কি বলেছি যে আমি মারা গেছি? এই জাস্ট! ভুগছিলাম। এক্সপেক্টেড ছিল। কিন্তু সে’সব এখন আননেসেসারি ডিটেইলস। মোদ্দা কথা হচ্ছে মগজের একদম ভেতরটা এখনও সক্রিয় রয়েছে। থাকবে আরও সাত আট মিনিট। সে জন্যেই এই সোফা আর লাল দেওয়াল। ওই সাদা আলোর ফোকাসের সোর্সটা ধরতে পারছি না; চোখে পড়ছে বটে কিন্তু অস্বস্তি হচ্ছে না। সাবকনশাসে মনে হয় সিগারেটের প্রয়োজন নেই। পকেটে বাক্স নেই দেখলাম।
যাক গে। হাতে যে কয় মিনিট আছে তাতে জীবনকে রিভিউ করে দেখে নিতে হবে। ইন দ্য ডিপেস্ট ড্রিম। না, না! এটা আমার শখ নয়। সায়েন্স। সাইকোলজি। বিভিন্ন আর্টিকেলে আমিও পড়েছিলাম। মরণোত্তর মগজের ভিতর স্বপ্নের সিনেমা রোল হয়, হাই লাইট্‌স চলে। একশো ওভারের ম্যাচ কয়েক মিনিটে। ইম্পর্ট্যান্ট শটগুলো, উইকেট আর টার্নিং পয়েন্টস।
কথায় সময় নষ্ট করছি কেন তাও বুঝতে পারছি না। হাতে সময় যখন এত কম। আর এত লম্বা জীবন ফিরে দেখার আছে। বিয়াল্লিশ বছর। চাট্টিখানি কথা নয়।

অবশ্য বুঝতে পারছি না বলা ভুল। স্মৃতি রোমন্থন ঠিকঠাক শুরু করতে পারছি, যার জন্যই এই আজেবাজে বকে মনকে বাগে আনার চেষ্টা।

কিছুতেই পারছি না। মন কে বাগে আনতে পারছি না। অবশ্য এটা তো আমার সাবকনশাসের মেজানাইন ফ্লোর। আমি কথা বলছি নিজের সঙ্গে। বৌ নেই, পাশের সিটে সহযাত্রী নেই; ভয়টা কীসের আমার!

বলছি।

উফ। গুছিয়ে বলতেও বা পারছি কই! সেই একই দৃশ্য ড্যালা পাকিয়ে ভেসে উঠছে। ইন ফ্যাক্ট সাদা আলোর ফোকাসও দৃশ্যটাকে ভাসিয়ে দিতে পারছে না।

আসলে হল কী; মরার ঠিক আগের মুহূর্তে বুকে অসহ্য যন্ত্রণা। যাকে বলে অসহ্য। চারিদিকে থেকে সক্কলে আমার ওপর ঝুঁকে। আমার বৌ রুমা, ডাক্তার সামন্ত, ছেলে অনিন্দ্য, আমার পিসতুতো বোন ইন্দু আর প্রতিবেশী দাসগুপ্তবাবু। সবাই কান্নাকাটি চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছিল। দিব্যি যেমন হয় আর কী। এই গেল, সেই গেল একটা ইয়ে। কেউ মারা গেলে যেটুকু হইহইরইরই হয় সেটুকুই হচ্ছিল!। দিব্যি ছিল সব কিছু। আমি হন্যে হয়ে সক্কলের মুখের দিকে চাইছিলাম। ব্যথা বাড়তে বাড়তে পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ভিতরটা জাস্ট ঠাণ্ডা হয়ে এলো। আচমকা। নো যন্ত্রণা, নাথিং।

তারপর থেকে আমি এই ঘরে। থুড়ি। সাবকনশাসে। স্পষ্ট টের পাচ্ছি এই ঘরটা আবছা হতে শুরু করেছে। স্বপ্নকে এই বেলা রোল না করালেই নয়। তবু। পারছি না। সমস্ত আটকে আছে ওই এক মুহূর্তে।

মরার আগে ডেস্পারেটলি সবার মুখের দিকে তাকালাম, শেষ দেখাটুকু খামচে নেওয়ার জন্য। অথচ এখন টের পাচ্ছি সে সময়ের কারুর মুখই মনে নেই। মনে আছে একটা মাত্র দৃশ্য, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের দেখা। এ সোফায় এসে বসার আগে টেরও পাইনি যে সে দৃশ্য মনে আদৌ দাগ কেটেছে। সাবকনশাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে সে দৃশ্যের কথা বলতেও পারব না, তবে এ সোফায় বসে কিছু এসে যায় না।
এক কী দুই সেকেন্ড বড় জোর। বড় জোর। ঘর জুড়ে সবে হাহাকার উঠেছে, সবাই আমার ওপর ঝুঁকে পড়েছে; ঠিক সেই সময়। ঠিক সেই সময়, ইন্দুর বুক থেকে হলুদ সবুজ পেড়ে তাঁতের আঁচল খসে গিয়েছিল। সবুজ ব্লাউজের অসতর্ক উঁকিতে বেরিয়ে এসেছিল ক্লিভেজ। ক্লিভেজের বাংলা অবিশ্যি আনন্দবাজার বলে বক্ষ-বিভাজিকা, তবে আমার মনে হয় এর ট্রান্সলেশন দাঁড়ায় না। মরার আগে সব কিছু এত ঝাপসা ছিল অথচ সোফায় বসে স্পষ্ট টের পাচ্ছি যে ওর ব্লাউজের প্রথম হুকের স্টিল-চমক থেকে বিভাজিকা নদীর শুরুতে রাখা অসংলগ্ন তিল পর্যন্ত; সমস্ত কিছু মনে স্পষ্ট গেঁথে রয়েছে। তিলে খয়েরী কম ছিল, লালচে আভা বেশি। তিলটা এতই ছোট যে আমার মাইনাস ছয় পাওয়ারের চোখের গোচরে আসা উচিৎই না। তবে এই সোফার বসে বুঝতে পারছি চোখের নাগাল পাওয়া অপথ্যালমোলজিস্টের কম্ম নয়।

কী? ইন্দু আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট? আমার নিজের পিসির মেয়ে? অফ কোর্স। আমি জানি। স্পষ্ট জানি। জীবনে এক ইঞ্চি গড়বড়ে চিন্তাও ইন্দুর হয়ে মনে ঢুকে পড়েনি কোনদিন। আমি নিশ্চিত।

হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত। আর নয়তো এ সোফায় বসে নিজের সঙ্গে তর্ক জুড়ব নাকি? যত্তসব। ইট ইজ জাস্ট আ সিচুয়েশন। জাস্ট আ সিচুয়েশন। 

যাকগে। হাতে সময় কম। এখন জীবনটাকে একটু গুটিয়ে দেখে নিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়ার দরকার।

বিহারের কটিহারে রেলের কোয়ার্টারে বাবার চাকরী সূত্রে কিছুদিন ছিলাম। লাল দেওয়ালের বাড়ি। বড় সুন্দর ছিল সমস্ত কিছু। ইন্দুর বুকের তিলটাও লালচে, বড় সুন্দর।
এই। এই হচ্ছে গণ্ডগোল। কটিহার ভাবতে গিয়েই ভুলটা করলাম। ননসেন্স। এদিকে সময় কম। মরণোত্তর স্বপ্ন যে এখনও শুরুই করতে পারলাম না।

দাদু। দাদুর কথা ভাবা দরকার। মানুষটা কত ভালো কোয়ালিটি আমার মধ্যে ইঞ্জেক্ট করে গিয়েছিলেন। নিজে ছিলেন সৎ পরিশ্রমী স্কুল মাস্টার। আমার মধ্যে গল্পের বইয়ের নেশা তো উনিই ঢুকিয়েছেন। ঋষি-সুলভ সারল্য তাঁর চেহারায় সর্বক্ষণ লেগে থাকত। তাঁকে চিরকাল দেখেছি ধবধবে সাদা ফতুয়া আর সাদা ধুতিতে। এমনকি দাদুর মাথার চুলও ধবধবে সাদা ছিল, অন্তত আমি যবে থেকে দেখছি তাঁকে। ইন্টারেস্টিংলি, ইন্দু আজ এতটাই অসাবধান ছিল যে সাদা ব্রায়ের স্ট্র্যাপ যে ব্লাউজ ছাপিয়ে সামান্য বেরিয়েছিল সেটাও খেয়াল করেনি।
ধুস।
ডিসগাস্টিং। না, না। অপরাধ বোধ নয়। আমি বদ নই, আমার কাছে ইন্দু কত স্নেহের। কিন্তু সময় এত কম। কত কিছু ভাবার রয়েছে। কত ছুঁয়ে যাওয়া সব স্মৃতি। সে’সব স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখারেই তো শেষ সুযোগ এ'টা। কত গনগনে দুঃখের দুপুর সহ্য করতে হয়েছে।

সেই যে দুপুর। আমার উচ্চমাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা। মা পাটনার হসপিটালে মারা গেলেন। মনে হয়েছিল সমস্ত ভেসে যাবে। সমস্ত আলগা হয়ে যাবে। বাবাকে দেখে মনে হয়েছিল আমার চেয়ে উনি বেশি অসহায় বোধ করছেন। মাকে যখন ওয়ার্ড থেকে বের করে হসপিটালের উঠোনে শোয়ানো হল, তখন মনে হয়েছিল বুকের ভিতর কেউ যেন গরম আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে। হসপিটাল বাড়ির সেই হলুদ দেওয়ালের বিভীষিকা আজও মনে তাজা। অথচ ইন্দুর খসে পড়া তাঁতের আঁচলের হলুদে সামান্য ভয়ও ছিল না; ছিল সাবলীল এক মায়া। যে মায়াকে বুকে টেনে নিতে হয়, কিন্তু বাঁধতে নেই।
বোঝ। বোঝ। বোঝ কাণ্ড। 

এহ! এবারে আমার রীতিমত খারাপ লাগছে। রীতিমত। হাতে আর সময় নেই। বিলকুল নেই। একদমই নেই।  ঘেন্না হচ্ছে নিজের গোঁয়ার্তুমির জন্য। ইন্দুর বুক থেকে আঁচল খসে পড়াটাই যেন সব! ষোল বছর বয়েসে ভনতওয়াং ঝর্না দেখাতে নিয়ে গেছিল ছোটমামা। ছোটমামা তখন মিজোরামে ফরেস্ট অফিসার। আহ! সে কী দৃশ্য। দু’পাশে সবুজে সবুজ চিরে নেমে আসছে চঞ্চলা, যেন তার মায়ায় ভেসে যাওয়াটাই জীবনের লক্ষ। দু’দিকের পাহাড়কে স্তিমিত করে গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঝর্নার মাতানো গতি। ইন্দুর বুকের খাঁজও বেহিসাবি ভনতওয়াংয়ের মত অতলে টেনে নিচ্ছে যেটুকু যা মনে আছে, দু’পাশে অনাবিল আকাশচুম্বী স্তব্ধতা। তন্বী বলতে অভিধান যা বোঝে, ইন্দু তার চেয়ে সামান্য বেশিই স্পষ্ট।

ঠিক সে মুহূর্তেই সোফা থেকে গড়িয়ে পড়তে হল। টের পেলাম। সোফাটা আর নেই। তার জায়গায় এসে গিয়েছে একটা প্রকাণ্ড স্টিলের ব্লাউজের হুক। প্রকাণ্ড।

সাবকনশাসে বমি করার রেওয়াজ বোধ হয় নেই। তবে একটা ঝড় এসে সাদা আলোর ফোকাসটাকে তছনছ করে ফেলেছে দেখছি।

যাক, স্বপ্নের টালবাহানাটাকে পাশ কাটানো গেল। লাল দেওয়াল ততক্ষণে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।

Tuesday, July 26, 2016

নতজানু

চোখের জ্বালাটা ফের ফিরে আসছিল। বুকে পিঠের চামড়ায় অসোয়াস্তিকর চিটচিট। গলার ভিতরটা শুকিয়ে কাঠ। পায়ের গোড়ালি থেকে নিয়ে হাঁটু পর্যন্ত  অসহ্য টনটনে ব্যথা। কিন্তু হাঁটার গতি কিছুতেই কমাতে পারছিল না লোকটা। 

পরনের ধবধবে সাদা জামায় ঘামে আঁকা ক্লান্তিস্তানের সাহসী মানচিত্র। গোটানো হাতার পরিসর ছাপিয়ে ক্লান্ত হাতের মুঠো সপাটে এগিয়ে, সে মুঠো আলগা হয়ে আসে না। পথের ধুলোয় ট্রাউজারের নিচের দিকটা লটপট। তবে এ হাঁটা অসাবধানতার, এ অসাবধানতা যন্ত্রণার। হাঁটার গতি শ্লথ হতে দেওয়া যায় না। 

হাঁটার গতি কমার সাথে সাথে মাথার ভিতরের টিমটিমে ব্যথার টুকরোগুলো ফের জড়ো হয়। ফের। বুকের ভিতর থেকে একটা হাওয়ার দলা পাকাতে পাকাতে পাঁজরা বেয়ে গলা বুকে ছড়িয়ে পড়ে। 

পায়ের পাতায় ব্যথা বাড়ার সাথে সাথে হাঁটার গতি বাড়তে থাকে, সাথে বুকের ধড়ফড়ানি। থামলে চলবে না। গঙ্গার পাশের রাস্তাটা কালচে হলুদ অন্ধকার থেকে অন্ধকারের নীলে মিশে যায়। অবিরাম। লোকটা থামতে পারছিল না কিছুতেই।  কিছুতেই না। যন্ত্রণাটাকে ক্যাপিটালাইজ করে দম ফুরিয়ে আসার সৎসাহসে গা ভাসিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল লোকটা। 

**

- শাদি করোগি মুঝসে?
- বাজে কথা হিন্দিতে বলিস কেন?
- হিন্দি মে বাত হি কুছ অলগ। কনফিডেন্স হি কুছ অলগ।
- বাবু। শাট আপ। চাউমিন খাও। 
- শাদি করোগি মুঝসে?
- চিলি সস্‌ নেই। দিতে বল। 
- ওয়েটারদাদা, চিলি সস্‌ ইধর। প্লিজ। হ্যাঁ,তা যা বলছিলাম। শাদি করোগি মুঝসে?
- বাবু। প্লিজ। 
- প্লিজ। প্লিজ। ম্যায় ভার্চুয়াল নতজানু-নেস অফার করতা হু। নেহাত চাউমিন কা প্লেট হ্যায় সামনে। নহি তো লিটারেলি কর সকতা থা। 
- ইডিয়ট। খা। 
- ওয়াপিস মত যাও। 
- ওয়াপিস যাব না? তোর সাথে থাকবো?
- নহি। ম্যায় রহুঙ্গা তুমহারে সাথ। মাসকাবারির লিস্টকে উপর ঝগড়া করেগা। হম বোলেগা মার্গো, তুম বোলেগা লাক্স। হম বোলেগা বোরোলিন তুম বোলেগা ম্যাগোহ্‌। হাম বোলেগা অনলি চাল, তুমি বোলেগা হাফ চাল হাফ আটা। অন্যদিকে কিচেন মে; হম কুচি করেগা পেঁয়াজ, তুমি ভাজেগা মামলেট। তুম ধোয়েগা কাপড়, হম করেগা ইস্তিরি। তুম করেগা যত কাজ, আমি পায়ে পায়ে ঘুরঘুর।
- এগুলো কেন বলিস?
- সিরিয়াস। মায়ের দিব্যি। নারায়ণ দেবনাথের দিব্যি। 
- থাম!
- ওয়াপিস মত যাও। ম্যারি মি।
- মাঝে অনেকটা তফাৎ বাবু। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আর হয় না।
- দিব্যি হয়। ট্যুয়েন্টি নাইনে ফুলহ্যান্ডের মতো। ট্রামে সেকেন্ড ক্লাসের মত। লোকাল ট্রেনে হাওয়ার অপোজিটে বসার জানালার মত। মে মাসের ব্যালকনির আধভেজা গামছার ফুরফুরের মত। 
- লস্যি বল। 
- ওয়েটার ভায়া, একটা লস্যি। একটা পেপসি। ইধর প্লিজ। অউর দেবী, আপ যরা শুনিয়ে! ম্যারি মি প্লিজ। 
- উফ! 
- প্লিজ। প্লিজ। ডু নট গো।
- তুই লস্যি না বলে পেপসি বললি কেন?
- তুই না থেকে কাটছিস কেন?
- আমার ছেলে জন্মদিনে ঢাউস কেক কাটলো। আমি পায়েস রান্না করলাম। তুই এলি না কেন?
- যাসনা। যাসনা বাবু। পকেটে জ্বলজ্বল করছে এক মুঠো গন্ধরাজ। সেই গাছের। 
- ফুল এনেছিস? পাড়ার মাঠের গাছের? বাবু?
- ফুল? এনেছি। তারা সক্কলের পাড়ার মাঠের গাছের নয় অবশ্য।
- ধ্যেত। 
- যাস না। 
- যাব না। খুশি? তুই পারবি সমস্ত সামলে নিতে?
- আলবাত। স্যান্ডো গেঞ্জি আর গামছার জার্সিতে আমি অসাধ্য সাধন করতে পারি। এভারেস্টের মাথায় কলপ করে দিতে পারি। ভিক্টোরিয়ার চাতালে বসে ক্যারম খেলতে পারি। 
- হয়েছে। 

 **

লোকটা যখন টলতে টলতে রাস্তার পাশের কালভার্টটায় থেবড়ে শুয়ে পড়লো তখন রাত ন'টা পেরিয়েছে। আর যাই হোক, বয়ে আনা ক্লান্তিতে আকাশ নিভিয়ে দেওয়া যায় না। চিন্তার বরফকুচিতে সমস্ত ঢেকে যাবেই। প্যান্টের বাঁ পকেট হাতড়ে বেরোলো গোলফ্লেক। আর বুকপকেট থেকে বেরোলো গন্ধরাজ। 

গোল্ডফ্লেক গন্ধরাজ মিলে যে মণ্ড, সে গন্ধের গুঁড়োরা পিঁপড়েদের মত সার বেঁধে ভদ্রলোকের গলায় বুকে ছড়িয়ে পড়লো। বাতাসে তখন সুরেলা শোঁশোঁ ; "মাঝে অনেকটা তফাৎ বাবু। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আর হয় না। আর হয় না। আর হয় না"। 

Friday, July 15, 2016

ফেরত


ভরদুপুরের গন্ধটা মনে করার চেষ্টা করছিল দীপু। কাজটা সহজ তো নয়। এখন রাত। ছাদে পাতা মাদুরে বছরের এ'সময়টা দানা দানা শিরশির জমতে শুরু করে। বাতাসে ইতিউতি ভাসে পাশের বাড়ির মুসুরির ডালের ফোঁড়ন আর নিচ থেকে উড়ে আসা রিক্সার ক্যাঁচরম্যাচর  পোঁপাঁ।

এ সময়ে এ মাদুরে গা এলিয়ে মনের মধ্যে দুপুর টেনে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। তবু। দীপু চেষ্টা করছিল। ছোটমামার পাল্লায় পড়ে গত আড়াই মাস ধরে যোগব্যায়াম করছে দীপু। দিনে আধঘণ্টা করে। যোগার্জিত যাবতীয় কন্সেন্ট্রেশন মুঠো করে ধরে রাতের ছাদে দুপুর নামাতে চাইছিল দীপু।

রাতের ছাদের শীতমনস্কতা অনেকটা পাশ কাটিয়ে দিতে পেরেছিল সে। বিলুদের মেজানাইন ফ্লোরের ঘরটার রোদ্দুর পিঠ অনুভব টানতে চাইছিল দীপু।

আনন্দবাবু কেমিস্ট্রির মাস্টার হলেও, মিস্ট্রিতে তার মাস্টারি কম ছিলনা। তিনি বলেছিলেন "স্মৃতির বাজার! বুঝলে হে দীপুকুমার। বাপ মা বন্ধুরা সেখানে আনাজপাতির মত ঝুড়িতে ঝুড়িতে গিজগিজ করছে। এ মুহূর্ত হাঁকছে 'ইধর আইয়ে, ফ্রেশ হ্যায় সব কুছ"। তো ও মুহূর্ত স্মৃতির আনাজে জল ছিটিয়ে বলে "এদিকে আসেন কত্তা। দ্যাখেন! দ্যাখেন! টাটাকা কাকে বলে"। সে বাজারে। বুঝলে দীপুকুমার, সেই স্মৃতিবাজারে, সেরা বাজারের থলি হচ্ছে দুপুর"।

দীপু দুপুর টানছিলে। যোগবল অতি তাগড়াই জিনিস। এ রাতেও দুপুরে রোদের চিড়বিড় অনুভূত হতে শুরু হয়েছিল তার স্যান্ডো গেঞ্জি ভেদ করে।

ছাতের অবয়ব পালটে অন্যমনস্ক বারোয়ারী তলা ভেসে উঠছিল। দীপু ধুকপুক টের পাচ্ছিল। ছোটবেলা আর পরিপাটি শাড়ির কুচির অমিল চড়াত চড়াত করে ঝিলিক মারছিল গলা বুক দিয়ে। আজকের হঠাৎ দুপুর দিব্যি রাতের ছাদের প্ল্যাঞ্চেটে গোঁত্তা খাচ্ছিল।

বেমক্কা টেনে ধরা আঙুলের ডগায় অঙ্ক পরীক্ষার হলের বেয়াদপি সুবাস টের পাচ্ছিল দীপু।

"আমি এদ্দিন পর এলাম। এসেই দুপুর পালিয়ে দেখা করতে এলাম তোর সাথে। তুই খুশি হসনি বাবু?"।

দীপু অসহায় অর্জুনের মত নীল গোলাপি আঁচলের ফুরফুরের দিকে তাকিয়ে নতজানু বোধ করে।

হাওয়ায় তিরতির ভেসে যায়
"তুই খুশি হসনি বাবু?"
"তুই খুশি হসনি বাবু?"

অর্জুন না দেওয়া চিঠির গাণ্ডীবে মুখ ঢাকে, তার বলা হয়ে ওঠে না যে "এদ্দিন পরে আসা"র গাছ-আকাশ-পাখি তার দেখতে নেই। দীপার্জুনের শ্যেনচক্ষুতে রয়ে যায় শুধু অব্যক্ত  "রিটার্ন টিকিট কবে? রিটার্ন টিকিট কবে?"।

বাতাসে ওদিক  গামছা নরমে ভেসে বেড়ায়
"তুই খুশি হসনি বাবু?"
"তুই খুশি হসনি বাবু?"।