Friday, July 15, 2016

ফেরত


ভরদুপুরের গন্ধটা মনে করার চেষ্টা করছিল দীপু। কাজটা সহজ তো নয়। এখন রাত। ছাদে পাতা মাদুরে বছরের এ'সময়টা দানা দানা শিরশির জমতে শুরু করে। বাতাসে ইতিউতি ভাসে পাশের বাড়ির মুসুরির ডালের ফোঁড়ন আর নিচ থেকে উড়ে আসা রিক্সার ক্যাঁচরম্যাচর  পোঁপাঁ।

এ সময়ে এ মাদুরে গা এলিয়ে মনের মধ্যে দুপুর টেনে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। তবু। দীপু চেষ্টা করছিল। ছোটমামার পাল্লায় পড়ে গত আড়াই মাস ধরে যোগব্যায়াম করছে দীপু। দিনে আধঘণ্টা করে। যোগার্জিত যাবতীয় কন্সেন্ট্রেশন মুঠো করে ধরে রাতের ছাদে দুপুর নামাতে চাইছিল দীপু।

রাতের ছাদের শীতমনস্কতা অনেকটা পাশ কাটিয়ে দিতে পেরেছিল সে। বিলুদের মেজানাইন ফ্লোরের ঘরটার রোদ্দুর পিঠ অনুভব টানতে চাইছিল দীপু।

আনন্দবাবু কেমিস্ট্রির মাস্টার হলেও, মিস্ট্রিতে তার মাস্টারি কম ছিলনা। তিনি বলেছিলেন "স্মৃতির বাজার! বুঝলে হে দীপুকুমার। বাপ মা বন্ধুরা সেখানে আনাজপাতির মত ঝুড়িতে ঝুড়িতে গিজগিজ করছে। এ মুহূর্ত হাঁকছে 'ইধর আইয়ে, ফ্রেশ হ্যায় সব কুছ"। তো ও মুহূর্ত স্মৃতির আনাজে জল ছিটিয়ে বলে "এদিকে আসেন কত্তা। দ্যাখেন! দ্যাখেন! টাটাকা কাকে বলে"। সে বাজারে। বুঝলে দীপুকুমার, সেই স্মৃতিবাজারে, সেরা বাজারের থলি হচ্ছে দুপুর"।

দীপু দুপুর টানছিলে। যোগবল অতি তাগড়াই জিনিস। এ রাতেও দুপুরে রোদের চিড়বিড় অনুভূত হতে শুরু হয়েছিল তার স্যান্ডো গেঞ্জি ভেদ করে।

ছাতের অবয়ব পালটে অন্যমনস্ক বারোয়ারী তলা ভেসে উঠছিল। দীপু ধুকপুক টের পাচ্ছিল। ছোটবেলা আর পরিপাটি শাড়ির কুচির অমিল চড়াত চড়াত করে ঝিলিক মারছিল গলা বুক দিয়ে। আজকের হঠাৎ দুপুর দিব্যি রাতের ছাদের প্ল্যাঞ্চেটে গোঁত্তা খাচ্ছিল।

বেমক্কা টেনে ধরা আঙুলের ডগায় অঙ্ক পরীক্ষার হলের বেয়াদপি সুবাস টের পাচ্ছিল দীপু।

"আমি এদ্দিন পর এলাম। এসেই দুপুর পালিয়ে দেখা করতে এলাম তোর সাথে। তুই খুশি হসনি বাবু?"।

দীপু অসহায় অর্জুনের মত নীল গোলাপি আঁচলের ফুরফুরের দিকে তাকিয়ে নতজানু বোধ করে।

হাওয়ায় তিরতির ভেসে যায়
"তুই খুশি হসনি বাবু?"
"তুই খুশি হসনি বাবু?"

অর্জুন না দেওয়া চিঠির গাণ্ডীবে মুখ ঢাকে, তার বলা হয়ে ওঠে না যে "এদ্দিন পরে আসা"র গাছ-আকাশ-পাখি তার দেখতে নেই। দীপার্জুনের শ্যেনচক্ষুতে রয়ে যায় শুধু অব্যক্ত  "রিটার্ন টিকিট কবে? রিটার্ন টিকিট কবে?"।

বাতাসে ওদিক  গামছা নরমে ভেসে বেড়ায়
"তুই খুশি হসনি বাবু?"
"তুই খুশি হসনি বাবু?"।

Thursday, July 14, 2016

সেল্‌স

**প্রথমত**

- হ্যালো টিএসএম নম্বর ওয়ান!
- হ্যালো বস্‌। ইয়ে, কতবার বলেছি আমায় টিএসএম বলে না ডাকতে?  প্রেসিডেন্ট বলুন। সক্কলে আমায় প্রেসিডেন্ট বলে ডাকে।
- উফ। এই ডেসিগনেশন ডেসিগনেশন করেই গেলে তোমরা। বলি এদিকে সেল্‌স ফিগার তো অল ডাউন সাউথ!
- না মানে ইয়ে..., বস...মানে...ইয়ে...। 
- ইয়ে মানে কী হে? ইয়ে মানে কী? স্টকের অবস্থা দেখা আছে? গোডাউন ভরাট, এক ইঞ্চি জায়গা নেই। সেল্‌স ফিগার প্রতি মাসে ওয়ান ওয়ে বাঞ্জি জাম্প দিচ্ছে। 
- না মানে ইয়ে...।
- বোঝ! আবার ইয়ে!।  শোন। ইনভেন্টরি কস্ট কোথায় গিয়ে ঠেকছে কোন আইডিয়া আছে?
- ইয়ে...।
- আর একবার ইয়ে বললে কোতল করব! 
- ইয়ে...সরি। 
- মনে দিয়ে শোন টিএসএম ওয়ান...। 
- প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট বলে ডাকুন না। 
- ধেত্তেরি ছাই। প্রেসিডেন্ট! মনে দিয়ে শোন। হাজার হাজার বোমায় ঘুণ, জং, ধুলো পড়ছে। বোমা ফ্যাক্টরিতে স্টকলস আমি বরদাস্ত করবো না। নেক্সট কোয়ার্টারের মধ্যে সেল্‌স ফিগার ইম্প্রুভ না করলে...চাকরী নট্‌ করতে হেসিটেট করব না কিন্তু। ডিয়ার প্রেসিডেন্ট...। মনে থাকে যেন!  
- অমন কথায় কথায় থ্রেট কেন স্যার! 
- থ্রেটের এ আর কী দেখলে! ব্যাটাচ্ছেলে প্রেসিডেন্ট, বলি নতুন মার্কেটগুলোয় ডেমোক্রেসি ছড়িয়ে দেওয়ায় দিকে তোমার মন নেই কেন? কতলোক হাহাকার করছে চাদ্দিকে; থোড়া ডেমোক্রেসি লাও, দো বুঁদ ডেমোক্রেসি লাও! ডেমোক্রেসির এত ডিম্যান্ড, তবুও আমার বোমা ফ্যাক্টরি স্টক তুমি ক্লিয়ার করতে পারছ না প্রেসিডেন্ট? 
- এই কোয়ার্টারে আপনাকে ডিজ্যাপয়েন্ট করছি না স্যার। একটু সবুর করুন না। পাইপলাইনে ডেমোক্রেসি গিজগিজ করছে। মার্কেট ইজ অল সেট। 
- বলছো?
- কমিট করছি। স্টক লস ফস নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন তো। ক্যাচলাইন তো আছেই; ফেলো বোমা, মাখো ডেমোক্রেসি। 

**দ্বিতীয়ত**

- হ্যালো টিএসএম নম্বর টু!
- হ্যালো বস্‌। ইয়ে, কতবার বলেছি আমায় টিএসএম বলে না ডাকতে?  গুরু। সক্কলে আমায় গুরু বলে ডাকে।
- এই এক রোগ! গাধা কে গাধা বলা যাবে না! আর ধেত্তেরি! বলি আমার বন্দুক কোম্পানি যে লাটে উঠতে চললো! গত দুই কোয়ার্টারের সেল্‌স অ্যাট অল টাইম লো! গুদামঘর উপচে পড়ছে। বন্দুকে জং, কার্তুজের খোলে আরশোলা জমছে। বলি ধর্ম-টর্মর এত অবাধ মার্কেট, চাদ্দিকে এত হাহাকার কয়েক লিটার ধর্মের জন্য! অথচ এই তামাম মার্কেট থাকতেও আমার বন্দুক কারখানায় স্টক লস! গুরু, এ আমি বরদাস্ত করব না। কিছুতেই না। 
- এই কোয়ার্টারে আপনাকে ডিজ্যাপয়েন্ট করছি না স্যার। একটু সবুর করুন না। পাইপলাইনে ধর্ম উথলে উঠছে। মার্কেট ইজ অল সেট। 

Sunday, July 10, 2016

অর্ডার

- মাটন কষা আর কাজু কিসমিস পোলাও।
- সাথে আর কিছু স্যার?
- সাথে?
- আজ্ঞে?
- ইয়ে। সাথে। মানে। আর এক বাটি।
- এক বাটি কী স্যার?
- মাটন। অবভিয়াসলি।
- তার আগে স্টার্টারে কিছু?
- স্টার্টার?
- ইয়ে স্যার...। তন্দুর বা...।
- বাটি। ওয়ান মোর। আগে এক বাটি দিয়ে যান। পরে এক প্লেট পোলাও আর তার সাথে দু'বাটি।
- ও। আচ্ছা। অর্ডারটা একবার রিপিট করছি স্যার। তিন বাটি মাটন। এক প্লেট পোলাও। 
- এক বাটি আগে। পরের দু'বাটি অ্যালং উইথ পোলাও।
-  আর ইয়ে...ডেজার্টে স্যার...আমাদের এখানের হট গুলাবজামুন বেশ পপুলার। কিংবা টুটিফুটি, জলেবি উইথ রাবড়ি...।
- হেহ্‌।
- স্যার? নো ডেজার্ট।
- হেহ্‌।
- সেখানেও বাটি? 
- ওয়াটের সাহেব। বাটি ছাড়া। সমস্তই। ডেসার্ট। 
- শুরুতে এক বাটি। পোলাওয়ের সাথে দুই। শেষ পাতে এক। রাইট স্যার?
- ইউ ক্যান নেভার গো রঙ। ক্যুইক ক্যুইক। প্লিজ। 

স্পেশ্যাল স্কিল্‌স

- আইয়ে। 
- আমি?
- জী! সাহাব বুলায়ে হ্যায়।
- আপনি শিওর? আমাকেই ডেকেছেন?
- আপ হি অনির্বাণ মিত্রা, নহি?
- হ্যাঁ, আমিই। কিন্তু...। কিন্তু আমার ইন্টারভিউটা খুবই খারাপ হয়েছিল। আমার সেকেন্ড রাউন্ডে চান্স পাওয়ারই কথা নয়...। 
- অন্দর যাকে বোল দিজিয়ে। ওহি বাত।
- আমাকেই ডাকা হয়েছে তো?
- আইয়ে। 

**
- অনির্বাণ...। 
- আজ্ঞে মিত্র। মিট্টার লেখা, ইংরেজিতে। 
- আপনি জানেন আপনাকে কেন ডেকেছি?
- না। জানি না। ইন ফ্যাক্ট আর্দালিবাবুকেও তাই বলছিলাম। আমার সেকেন্ড রাউন্ডে চান্স পাওয়ারই কথা নয়।
- এ'টা সেকেন্ড রাউন্ড অফ ইন্টারভিউ নয় অনির্বাণবাবু। 
- তবে?
- চা না কফি?
- আজ্ঞে?
- চা না কফি? না কোল্ড ড্রিঙ্কস?
- চা। 
- দুধ, চিনি? 
- সমস্ত চলে। এবারে বলুন। চাকরী দেবেন না, কিন্তু তবু আমায় সকাল থেকে বসিয়ে রেখে দুপুরে আবার ডাকার মানেটা কী?
- সেকেন্ড রাউন্ড ইন্টারভিউ নেব না বলেছি। চাকরী দেব না কে বলেছে?
- মানে?
- মানে দিজ জব ইজ ইওর্স। 
- মাইন? আমার? হাউ?
- আপনি বায়োডাটাতে স্পেশ্যাল স্কিল্‌সে লিখেছেন...আপনার ডানা আছে। আপনি প্রয়োজনে উড়তে পারেন।
- ট্রু। কিন্তু এই কাজে...। 
- ট্রু হোক না হোক। আপনি এই কাজের জন্য টোটালি সুইটেব্‌ল।
- হুম?
- উড়তে পারাটা বলিউড গসিপ রিপোর্টারদের জন্য একটা ফেনোমেনাল কোয়ালিটি অনির্বাণ। অবিশ্যি উড়ন্ত কেউ এই ফ্র্যাটারনিটিতে কখনও আগে জয়েন করেনি। তবে উড়তে পারা ডেফিনিটলি ভালো জিনিস। উড়লে ভালো কিছু হবে বলেই মনে হয়। 
- ওহ্‌। রিয়েলি? তবে...।
- তবে কী? অনির্বাণবাবু? এই নিন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। ওয়েলকাম টু  আনন্দকল্লোল ম্যাগাজিন। 
- না মানে...এ'টা যদি সত্যি না হয়? আমার ডানা দেখতে চাইবেন না? আমি উড়ি কিনা, টেস্ট করে দেখবেন না?
- অনির্বাণ মিত্তির। শুনুন। ডানা থাকলে আপনি উড়বেন, বঢিয়া বাত। ড্রোন হয়ে গসিপ জোগাড় করে আনবেন। আর আপনার ডানা না থাকলে? আপনি উড়তে না পারলে? অউর ভি বঢিয়া। ট্রুথ ফ্লাইজ, বাট সাকসেস্‌ ফ্লাইজ হাইয়ার। নিজের বায়োডেটায় এত বড় বোমা ফাটাতে পেরেছেন, সে গাঁজা ঝাড়ার সাহসের জন্যেই এ চাকরী আপনারই। এই কাজে এই তো চাই। এ ফলস বোমার দাম এ ক্ষেত্রে হাজার খানা ডানার চেয়েও বেশি মিত্তিরবাবু। আসুন, এই অফার লেটারটা অ্যাকনোলেজ করে দিন এবার।  

Sunday, July 3, 2016

মাসাজ

নবরত্ন তেল দিয়ে পাড়ার সেলুনে মাথা মাসাজ করাচ্ছিলেন দত্তবাবু।
বিধুর হাতের তালু আর আঙুলে তালবোধ আছে, মাথা থেকে আরাম উপচে ঘাড় বেয়ে নেমে আসে।

প্রত্যেক শনিবার সন্ধ্যের রুটিন।

দত্তবাবুর শুধু মনে হয় বিধুর বডি আর দুই হাতের সঙ্গে মাথাটাও যদি আসতো এ পোড়ো সেলুনে, তবে বেশ হতো।

ওদিকে বিধুর আবার ঘোর আফসোস,  দত্তবাবু শুধু নিজের ঘাড় মাথা নিয়েই দুলতে দুলতে হাজির হন ফি শনিবার। বডি আনলে কী এমন ক্ষতি হত? মালিশ করতে করতে ঘাড় থেকে দিব্যি পিঠে নেমে আসা যেতো।

**

নিমতলা বাজারের স্টাইলিশ জেন্টস সেলুনের মালিক বিধু দত্ত রেলে এমন ভাবে কাটা পড়েছিলেন যে মুণ্ডু উড়ে পড়েছিল দেড়শো মিটার দূরে। ফলে সে মুণ্ডু খুঁজে পাওয়া যায়নি, চিতায় চড়েছিল মুণ্ডুলেস ধড়।

**

শেষ কাস্টোমারের খেউরি করে মাথা মালিশ করছিলেন বিধু দত্ত, তখনই বুকটা হুহু করে উঠলো।
"আহা, কেউ আমায় যদি এমন নবরত্ন তেল দিয়ে মালিশ করে দিত হপ্তায় একবার। এমনটাই। যত্ন করে"।
বুকের হুহু তাড়িয়ে মালিশে মন দিলেন বিধু দত্ত। আজ সকালে আবার তাড়াহুড়োয় বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় টর্চটা ফেলে এসেছেন তিনি, ফেরার সময় অন্ধকার রেলগেট পেরোতে বড় ঝকমারি।