Saturday, June 4, 2016

বিপ্লববাবুর শনিবার

শনিবারের হাফ অফিসের শেষে বিপ্লব সমাদ্দারের হাফ শার্টের আড়ালে হাফ ডানা গজায়। অবশ্য তার হাঁটাচলায় অল্প উড়ুউড়ু ভাবটা অফিসপাড়ার ভিড়ের মধ্যে কেউ ইন্টারসেপ্ট করতে পারে না।

উইকেন্ডের প্রতি সমীহটা বিপ্লববাবুর মজ্জাগত।

বিকেল চারটে নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়েই অজিতের দোকান থেকে একটা গোল্ডফ্লেক। সপ্তাহে ওই একটাই। সামান্য ইনডালজেন্স। বিপ্লববাবু বিশ্বাস করেন যাদের নেশা নেই তাদের উইকেন্ডে ধক্ নেই।

বয়স থাকতে বার দু'য়েক টু পাইস এক্সট্রা খরচ করে বারে ঢুঁ মেরেছেন বিপ্লববাবু, তবে মদের নেশা বয়ে হাওড়া থেকে ভিড় কাটোয়া লোকালে ওঠাটা যন্ত্রণাময়। গত সাতবছর ধরে শনি-সিগারেটের আখরি সুখটান ঝেড়ে ফেলে বিপ্লবপবাবু রিমিকিঝিমিকি মেজাজে এসে দাঁড়ান সুখলাল কচৌরিওলার কাছে। সেখানে ছয় পেগ কচুরি সাথে ডাল-সবজি আর জিলিপির চাখনা।

হাওড়া স্টেশন থেকে সেই কদ্দিন আগে কেনা হিন্দি গজলের বাংলায় লিরিক্স লেখা বই। সেখানে একশো একটা গজল ছিল, বেশির ভাগই জগজিৎ সিংহ বা পঙ্কজ উদাসের গাওয়া। এদ্দিনে প্রতিটা গানই তাঁর প্রায় মুখস্ত। কচুরির সাথে থাকে বিপ্লববাবুর গুনগুন "হম তো হ্যায় পরদেশ মে, দেশ মে নিকলা হোগা চাঁদ"।

এক কচুরি শেষে অন্য কচুরিতে কামড় পড়তেই আসে নতুন গজল; কখনও জিলিপির কামড়ে মিশে যায় ইম্প্রোভাইজেশন;

"এক তুহি ধনবান হ্যায় কচৌরি, বাকি সব জঞ্জাল"।

Friday, June 3, 2016

মধুময়বাবুর ছাদ

মাঝরাতে ছাতে উঠে মনেমনে নিজের নাম পালটে নেন মধুময়বাবু।

**

স্পেসে  এসে এমন কালোজাদুর পাল্লায় পড়তে হবে সে'টা স্বপ্নেও ভাবেননি গ্যাগারিন। অপার ভ্যাকিউমে নয়নতারা, শ্যাওলা আর রাতের কলকাতার গন্ধ আসছে কোথা থেকে?

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে কিছুতেই রাশিয়ান ভাষায় ভাবতে পারছেন না তিনি, কী সব আগডুম বাগডুম ভাষায় মাথায় চিন্তা ভিড় করছে।  নিজের রাশিয়ান নামটাও কিছুতেই মনে করতে না পেরে নিজের নাম মধুময় রাখলেন গ্যাগারিন।

**

নিচ থেকে গিন্নীর আকাশ ছেঁড়া চিৎকারে চিন্তার সুতো কাটে মধুময়বাবুর।

"বলি এ কেমন ভীমরতি?  মাঝরাত্তিরে ছাদে পায়চারি!  যত্তসব!  তুমি নিচে নামবে  না টেনে নামাবো"?

স্মিত হেসে সাড়া দেন মধুময়বাবু;

"গিন্নীকভস্কভি, অত রাগস্কভ কেনোস্কি? আমি নিচেস্কু আসোকভ! এক্ষুনিস্ক! এক্ষুনিস্ক"।

অঘোরবাবুর মানিব্যাগ

বাস থেকে নামতেই অঘোরবাবু টের পেলেন পকেটের মানিব্যাগ হাওয়া। অবশ্য কত টাকাই বা ছিল সে'টায়।

**

বুকের ধুকুরপুকুর থামতেই চাইছিল না মৃণালের। প্রথম চেষ্টাতেই কিস্তিমাত। আনন্দে ভেসে যেতে চাইছিলে সে। অবিশ্যি বাসের অফিসটাইমের ভিড় কাজটা সহজ করে দিয়েছিল অনেকটা। দু'পায়ে দাঁড়ানোটাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, পাশের লোকের মুখটাই যেখানে দেখা দায়; সে'টাই তো আদর্শ পিকপকেটিও পরিবেশ। বারোর সি বাই দুই রুটেই কাল ফের বেরোবে বলে মনস্থ করলে সে।

**

সকালবেলা পাঞ্জাবিটা গায়ে গলাতেই চমকটা টের পেলেন অঘোরবাবু! ডান পকেটে দিব্যি মানিব্যাগের ওজন। তবে কি পকেটমারে ব্যাপারটা উনি ভুল বুঝলেন? তবে কি পকেটে মানিব্যাগটার উপস্থিতি এমন বেমক্কা ভাবে টের পাননি তিনি? তবে  দু'শো বাইশ টাকা ফেরত পেয়ে মন্দ লাগছিল না তার, স্মৃতি বিভ্রমটা বিশেষ গায়ে মাখলেন না অঘোরবাবু।

**

- হ্যাঁ রে মিনু, গোটাদিন থাকিস কোথায়? চেহারার কি অবস্থা হয়েছে দেখেছিস?
- কতবার বলেছি বাবা, পার্টির কাজ। দু'পয়সা আসছে তো।
- কী যে করিস, তুইই জানিস।
- বলছিলাম বাবা,  ভিড় বাসে রোজ যাতায়াত না করে অটো ধরে যেতে পারো তো।
- বাড়তি পাঁচটাকা খরচ...।
- হোক না, আমি কিছু টাকা আয় করছি তো। বারোর সি বাই দুই এবার তুমি ছাড়ো। এ বয়েসে অত ভিড় সহ্য করার মানেই হয় না।
- কিন্তু...।
- কোন কিন্তু নয়...তোমার অটো খরচ আমি দেব।
- তুই সত্যিই আয় করা শুরু করেছিস মিনু?

Wednesday, June 1, 2016

জয়দ্রথ বধ

অর্জুনের মুখ চুন। ঘনঘন হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন আর কপালের ঘাম মুছছিলেন। ও'দিকে জয়দ্রথ আড়ালে বসে দিব্যি নখ চিবুচ্ছিলেন আর কিশোরভারতী পড়ছিলেন। ও'দিকে আকশে সূর্য নরম হয়ে আসছিল।

উপায়ন্তর না দেখে ধুতির পকেট থেকে মোবাইল বের করে এয়ারটেল ফোর-জি'তে ইউটিউব চালালেন কেষ্টকুমার। তাতে উত্তমের লিপে হেমন্ত গুনগুন শুরু করছেন;
"সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক বেশ তো..."।

অমনি আকাশ থেকে সূর্য হাপিশ।
আর তক্ষুনি জয়দ্রথ গঙ্গম মেজাজে অর্জুনের সামনে এসে লাফালাফি করতে শুরু করলেন। জয়দ্রথকে দেখতে পেয়েই ভিডিও পজ্ করলেন কেষ্টা।

মিচকি হেসে কবচের মধ্যে থেকে লাক্স কোজি গেঞ্জির ডগা টেনে বের করে তাতে একটা আলতো চুমু খেলেন অর্জুন; "গাণ্ডীব ফাণ্ডীভ যাই থাক। আপনা লাক পহেনকে চলাই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ"।

Tuesday, May 31, 2016

অস্ত গেলেন রজনী

উত্তমবাবু বিড়বিড় করে চলছিলেন। একটানা।

"রজনী নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই উত্তম যিনি চলেন তফাতে"।

ডিনারে ইলিশের পেটি রিফিউজ করে আর এক রাউন্ড কাঁচকলার ঝোল চাইলেন তিনি।

**

- কী হয়েছে বলো তো উত্তমবাবুর? কাজে মন নেই। সে'দিন অ্যাকশন বলতেই দেখি চমকে উঠলেন। কথাটা প্রথম শুনছেন যেন।

- জনশ্রুতি,  ভদ্রলোক ভূত দেখেছেন।

- আহ। গুজব!

- হবে হয়তো। তবে মরা হাতি আর ছিটগ্রস্ত উত্তম...।

- লাখ টাকা?

**

উত্তমবাবু লিপস্টিক আর বাইকের যোগসাজশ নিয়ে সুতীব্র ভাবনাচিন্তা করছিলেন। বেআক্কেলে লোকটা মাঝেমাঝেই "অ্যাকশন" বলে চিন্তার সুতো ছিঁড়ে দিচ্ছিল। মহা আপদ।

**

- কুছু কোরেন। কুছু কোরেন। পিলিজ।
- এতো হাইপার হচ্ছেন কেন বলুন তো?
- হাইপার হোবে না? গজব কা মুসিবত। উর উপরে আমার থার্টি ল্যাখস রাইড কোরছে। থার্টি। অউর সিরিফ আমার পরেশানি নহি। বাজার মে ক্রোর ইনভেস্টেড আছে।
- হুঁ। ব্যাপারটা এতটাই সিরিয়াস?
- ভেরি সিরিয়াস। কল হামি স্কচ অফার করলেম, উ বললে চাখনা মে রোস্টেড কচু কঁহা?
- রোস্টেড কচু?
- জি হাঁ।
- ব্যাপারটা সিরিয়াস যা বুঝছি।
- বহুত। সিরিয়াস। কন্সট্যান্ট বড়বড়; উত্তম রজনী, রজনী উত্তম। ননসেন্স।
- রজনী?
- আপনি চিনেন?
- ব্যাপারটা এতক্ষণে স্পষ্ট।  আর সাবজেক্টটা ননসেন্সিকাল নয় আগরওলাজী। তবে চিন্তা নেই, আমি সল্ভ করে  দেবো।
- করিয়ে দিবেন?
-   দিব'খন। দেখি। এ'বার রজনীর সাথে মোলাকাতটা সেরে নিতে হবে।

**

হাসির ঝলমল আর ইলিশে সোয়াদ একসাথে ফেরত পেলেন তিনি। নায়কের গায়ে ফের মহা মহা গন্ধ।

ওদিকে।

রজনী বসেছিলেন নদীর পাশে। পাথরে জলের ছলছল, আকাশে নরম সুরের নিশ্চুপ। বুকে বাউল গোছের সুড়সুড়ি। রজনী নদীর কুলকুলের তালে তাল মিলিয়ে গাইছিলেন;

"রেখেছো রজনী করে, রবি ঘোষ করোনি"।