"স্যার, রিয়েলি সরি! হনু এমন বিটকেল কাজ করবে সে'টা ভাবতে পারিনি। রিয়েলি ইনকনসিডারেট অফ হিম। কাঁচা ঘুম ভাঙলো বুঝি দুলালবাবু?"
"সে তো ভাঙলই। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক..."।
"আমি জাম্বু। জাম্বুবান "।
"অ। তা আমার এখানে কী মনে করে নিয়ে আসা হলো?"।
"লক্ষণবাবু রীতিমত অসুস্থ। শুনেছি আপনার কাছে মোক্ষম দাওয়াই রয়েছে। ওই মিরাকিউরল না কী নাম যেন?"।
"আরে ও নাম তো তিলু দিয়েছে। অবিশ্যি সে রাইট আমিই ওকে দিয়েছি। ভিভিএস বাবু অসুস্থ বুঝি?"
"ভিভিএস? না না। এ মিডিওকার লক্ষণ! রামের ব্রাদার"।
"অসুস্থ?"।
"ক্রিটিকাল, তাই তো আপনার সে সঞ্জীবনীর খোঁজ করছিলাম"।
"এক ডিবে আছে বটে, ওতেই হয়ে যাবে"।
"অরিজিনাল তো?"।
"আমার দুনিয়াটাই ফ্লিপকার্ট-সম জাম্বুবাবু। ইহা পে সির্ফ অরিজিনাল। ভালো করে দেখুন, এই ডিবেটার গায়ে আমার ছবি ও সই রয়েছে। প্লাস এই দেখুন, জেনুইন তালগাছের স্কেচ"।
- আপনিই...?
- নীলু সেন। নমস্কার।
- নমস্কার। আমি দিবাকর ঘোষ।
- শ্যামনগরের বামুনপাড়ায় বাস। জগদ্দলের ডালমিয়া মিলসে ক্লার্ক।
- এত কিছু তো আমি আপনাকে জানাইনি।
- এ লাইনে ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করার আগেই আমাদের সব খোঁজ খবর নিয়ে নিতে হয় দিবাকরবাবু। খৈনি চলে?
- নাহ।
- ওহ। ভদ্দরলোক তো। এবার কাজের কথা বলুন...।
- ইয়ে মানে...কাজটা..আসলে...।
- অত আমতাআমতা করছেন কেন? এত রাত্রে নদীর ধারে কে কান পাতবে? টাইম নেই। অ্যাসাইনমেন্ট কম আছে হাতে? ক্যুইক। মার্ডার না সিরিয়াস প্যাঁদানি?
- মার্ডার নীলুবাবু।
- চল্লিশ।
- হাজার?
- লাখা বললে পারবেন? চল্লিশটা বেস প্রাইস। পুলিশ হলে রেট ডবল। পলিটিকাল নেতা হলে আড়াই লাখ।
- না না। নেতা বা পুলিশ নয়। সাদামাঠা মানুষ।
- ভাই? বাড়ির শেয়ার চাইছে?
- নাহ।
- তবে?
- মিনু দাস।
- মেয়েছেলে?
- হ্যাঁ মানে...।
- পোষা মেয়েমানুষ?
- না না।
- তবে কে? অবশ্য বলতে না চাইলে ঠিক আছে। প্রাইভেসি রেস্পেক্ট না করে এ লাইনে থাকা যায় না।
- এই খামে ছবি আর ঠিকানা আছে।
- থ্যাঙ্কস। ইয়ে, বিশ অ্যাডভান্স।
- কাল দিলে চলবে?
- কাল রাত সাড়ে দশটা, এখানেই।
- আচ্ছা। বেশ।
***
- বাবা, তুমি এত রাত্রে? টাকা এনেছো?
- না রে মা, পাঁচ লাখ জোগাড় করা কি মুখের কথা?
- বাবা গো! কতবার বলেছি টাকা না নিয়ে এখানে এসো না। ও রাগ করে। ভীষণ।
- রাগ করে তোকে মারে মা?
- বাবা! বাবা গো!
- খুব মারে মা? পিঠটা দগদগ করে, তাই না মা?
- বাবা, তুমি এসো এবারে। ও দেখলে রক্তারক্তি হবে'খন।
- পালিয়ে চ' না মা। বাড়িতে মা তোর জন্য কেঁদে মরছে।
- ত হয় না বাবা। তুমি এসো এখন। তোমার পায়ে পড়ি।
- বেশ। চলি।
- বাবা গো! বড় মারে বাবা; বাড়ির সকলে মিলে! আর খুন্তির ছ্যাঁকা।
- মা রে!
- পাঁচ লাখ টাকা কোনওভাবে জোগাড় করো না গো বাবা! আমি একটু ঘরসংসার করে বাঁচি। ও বাবা! বাবা গো!
- চেষ্টা করছি তো রে মা।
- কত জমেছে এখনও পর্যন্ত বাবা?
- সবে চল্লিশ হাজার জমেছে রে মিনু মা। সবে চল্লিশ হাজার।
ছাদের উত্তর কোণে খান চারেক টবে নয়নতারার ভিড়; তাদের পাপড়িতে টুপটুপে জল। ফ্যাকাসে খয়েরী আকাশ টলটল করতো। দাদুর ধবধবে ফতুয়ার ওপর বাটিক ছাপার পাতলা চাদর জড়ানো, ধুতি লুঙ্গির মত করে পরা। দাদুর চোখে নরম হাসি; চিরকালের। মানুষটা বকতে শেখেননি, টেবিল চাপড়াতে শেখেননি। নয়নতারাদের গালে এমনভাবে হাত বুলিয়ে দিতেন; তাদেরও আরাম হত বুঝি। তখনও দীপুবাবু হাফ প্যান্টে, তখনও দীপুবাবুর হাত দাদুর হাতে।
ভোর ঘাসের মত জড়িয়ে ধরতো তাদের দু'জনকে; ভালোবাসা ঝিরঝির করতো ভোরের বৃষ্টিমাখা মিহি হাওয়ার তালে তালে। দাদু বলতেন এ সময়টা ভৈরবীর, ছাতের পাঁচিলে ঠুকতেন দাদ্রা।
"দাদুভাই, একদিন যখন অনেক বড় হবে তখন দেখবে; নজরুল হিসেবের বাইরে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। এই ধর চায়ের কাপের পাশে বা ভাঁজ করে রাখা গল্পের বইয়ের শিয়রে। সেদিন আর অঙ্ক কষে তাকে পাশে সরিয়ে রাখতে পারবে না। সে'দিন সাবমিশন। বুঝলে দীপুবাবু? সে'দিন ভালোবাসা"।
দীপু ঠাহর করতে পারতো না। সে অপেক্ষায় রইত। এই বুঝি দাদু গুণগুণ শুরু করবেন;
"তুমি আমার সকালবেলার সুর
হৃদয় অলস–উদাস–করা অশ্রু ভারাতুর"।
ভোরের নীলচে আলো ঘন হয়ে আসতো। কিচিরমিচির ভেসে আসতো ইতিউতি। দাদু দীপুর হাত ছেড়ে দিয়ে হাত রাখতেন দীপুর কাঁধে।
নজরুল ভোরের পোস্টকার্ডে ঘষঘষ করে ঠিকানা লিখতে শুরু করতেন। দাদু এগিয়ে যেতেন।
"ভোরের তারার মত তোমার সজল চাওয়ায়,
ভালোবাসার চেয়ে সে যে কান্না পাওয়ায়
রাত্রি–শেষের চাঁদ তুমি গো বিদায়–বিধুর"।
ভৈরবীর সমঝদার হবে দীপু? তাহলেই হয়েছে। সে বয়েসেই তার বারবার মনে হত এ গান রাতের, দাদু যেন সে গানকে হাত ধরে ভোরের ছাদে টেনে এনেছেন।
"শিশির–নাওয়া শুভ্র–শুচি পূজারিণীর তুল।
অরুণ তুমি, তরুণ তুমি, করুণ তারও চেয়ে
হাসির দেশে তুমি যেন বিষাদ–লোকের মেয়ে
তুমি ইন্দ্র–সভার মৌন–বীণা নীরব নূপুর"।
"বিষাদ-লোকের মেয়ে"; দীপুর মনে মনে আউড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতো বারবার। দীপু ভোরের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা রাতের গল্পটুকু শুষে নেওয়ার চেষ্টা করতো। বারবার।
দাদুর ভোর নিয়ে চলে গেছেন। দীপু রাতের পরতে পরতে বেড়েছে। চিনেছে। রাতের বৃষ্টির ছলছল ছুঁয়ে দেখেছে। কিন্তু সমস্ত ছাড়িয়ে নজরুল হিসেবের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক যেমন ভাবে দাদু বলেছিলো। স্নেহে, অতর্কিতে।
স্কুল পেরিয়ে যেদিন কলেজ-ছোঁয়ানো-চুমু জড়িয়ে ছিলে মেঘলা আকাশ আর ছাদের অন্ধকারে; কোথা থেকে যেন নজরুল আগলে ধরেছিলেন কিচিকে। কিচির চোখ ভরিয়ে এসেছিলেন নজরুল, দীপুর বুকে ছ্যাঁত ছুঁইয়ে ঝুপ করে নেমে এসেছিলে "বিষাদ-লোকের-মেয়ে"।
- অপ্টিমিজম একটা অসুখ।
- ব্যারাম তোমার মাথায় শুভ্র। উফ।
- কী এমন ভুল বলেছি?
- অপ্টিমিজম অসুখ? আশাবাদী হওয়া অসুস্থতার লক্ষণ? অপরাধ?
- অপরাধ আমি বলিনি মিতা। ডেলিরিয়াস হওয়াটা অপরাধ নয়।
- শুভ্র। প্লিজ। গো।
- তোমার ডেট এখনও এসে পৌঁছায়নি। রিল্যাক্স। আর পার্ক স্ট্রিটে যে জ্যাম দেখলাম ওর আসতে মিনিমাম আরও আধ ঘণ্টা।
- অনিকেত তোমায় দেখলে তোমার চোয়াল ফাটিয়ে দেবে।
- এ জন্যেই আমি অবাক হয়ে যাই। তুমি মিলটন ভক্ত। আর তুমি প্রেম করছ এমন একজনের সাথে যার স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেশন অফ প্রটেস্ট হচ্ছে চোয়াল ফাটানো ঘুষি। তবে ইন আ ওয়ে ইউ কনফর্ম টু মাই থিওরি।
- প্রথমত। আমার ফিয়ন্সের ব্যাপারে ননসেন্স শুনতে আমি রাজী নই। দ্বিতীয়ত, কোন থিওরি?
- যে লাইফ হ্যাস নাথিং পসিটিভ টু অফার। জীবন মানেই অন্ধকারে ড্রেনের পাশে বসে মিইয়ে যাওয়া মুড়ি পচা রসগোল্লার রসে মেখে খাওয়া।
- শুভ্র। শাট আপ। ইউ আর ডিসগাস্টিং।
- আমি ডিসগাস্টিং? আমি? তোমায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সত্যিগুলো বলি বলে ডিসগাস্টিং?
- তুমি উঠবে না আমি ওয়েটারকে ডেকে কমপ্লেন করব?
- ওয়েটারকে ডাকতেই হলে আমার জন্য একটা পেগ বলে দাও। ওয়ান ফর দ্য রোড।
- ইউ আর টু মাচ।
- পৃথিবীটা শেমফুলি হোপলেস। সে'টা মানতে তোমার অসুবিধে কোথায়? নিজেকে ঠকাতে এত ভালোবাসো কেন?
- কারণ পৃথিবীতে আশা আছে। ইটস বিউটিফুল।
- টেল মি ওয়ান গুড রিজন।
- বিকজ দেয়ার আর গুড পিপল।
- গুড পিপল? আলাইভ? আর ইউ কিডিং মি??
- অফ কোর্স দেয়ার। আর গুড পিপল।
- উই আর অল থাগস। অনিকেতকে বেঞ্চমার্ক করে কারুর প্রশংসা করতে যেওনা। অন অ্যান অ্যাভারেজ, উই আর হারামি টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। ইনফ্যাক্ট দ্যাট ইজ হাউ ইকনমিজ ওয়র্ক। প্রত্যেকটা মানুষ ধান্দাবাজ, এই বেসিক প্রিন্সিপ্যালে ভর করে অর্থনীতি চলছে।
- একসময় তোমায় পলিটিক্যালি অ্যাওয়ার ভাবতাম। তুমি যে এতটা নচ্ছার...।
- পলিটিক্স? কে আছে? কোন পলিটিকাল ইডিওলজি মাথায় কাঁঠাল না ভেঙে সার্ভাইভ করছে? দেশেই দেখো না। বিজেপি টু কঙ্গ্রেস টু তৃণ টু কম্যুনিস্টস; সবাই ফ্রিঞ্জ বেনেফিটস আর রেটোরিক ছুঁড়ে নিজেদের ল্যাক অফ ফারসাইটকে ঢাকছে।। আদ্দামড়াদের দল; অথচ কারুর গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপর সাসটেনেবল পলিসি আছে? সমস্ত ফ্রিঞ্জ ইস্যু নিয়ে লাফালাফি। শেমফুল।
- আর্ট?
- আহ। আর্ট। একটা স্পেশি পলিটিক্যালি সুইসাইড করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাদের থেকে তুমি আর্ট এক্সপেক্ট করছ? আর্ট দ্যাট উইল ট্র্যান্সেড টাইম? অন্তত বাঙালি হয়ে এ সময়ে আর্টের বড়াই করতে এসো না। এক্সেপশন কোট করে ভয়েডকে ডিফেন্ড করতে যেও না।
- তুমি বলছ বাঙালির শিল্প সাহিত্য কিস্যু নেই?
- ছিল। কিন্তু বর্তমান ডায়রেকশনটা সুইসাইডাল, বলছি তো। অবশ্য খোরাক বনে যাওয়ার যুগ, শুধু বাঙালি কেন; কেউই আর পিছিয়ে থাকবে না।
- তাহলে এই বস্তাপচা দুনিয়ায় তুমি বেঁচে আছো কেন শুভ্র? সুইসাইড করছ না কেন?
- কারণ আমি সুইসাইড করলে দুনিয়ার অ্যাভারেজ আইকিউ সামান্য হলেও কমে যাবে।
- শুভ্র। জাস্ট গো অ্যান্ড ডাই। অনিকেত ঢুকলো বলে। প্লীজ।
- এই। এই হচ্ছে কারণ আমার সুইসাইড না করার, খামোখা দুনিয়ায় অনিকেতদের প্রপোরশন বাড়িয়ে দিয়ে কী লাভ?
- হে ভগবান। আই ফিল লাইক কিলিং মাইসেল্ফ নাও।গশ! শুভ্র! ইউ আর সো ফ্রিকিং নেগেটিভ।
- রিয়েলিস্ট ইজ দ্য ওয়ার্ড। আর এ দুনিয়া এতটা জঞ্জালপূর্ণ যে প্রতেকটা বুদ্ধিমান মানুষেরই মনে হওয়া উচিৎ যে মরে যাওয়াই ভালো। তবে ওই, তুমি সুইসাইড করলেও এ দুনিয়ায় বুদ্ধিমান মানুষদের প্রপোরশন কমে যাবে। তোমার অনিকেতদের পোয়াবারো হবে। ওহ, এটা খেয়াল করে দেখেছো কি যে বোকাদের মনে বাড়তি ফুর্তি থাকে? টেক অনিকেত ফর এগগজ্যাম্পল...।
- উফফফ। মা গো!
- একটা সলিউশন আছে।
- কী সলিউশন শুভ্র? প্লীজ টেল মি।
- দু'জনে মিলে সুইসাইড করি চলো। ঢাকুরিয়ায় আমাদের ফ্ল্যাটের পাশেই রেললাইন। সেখানে একটা ফ্যান্টাসটিক স্পট দেখা আছে আমার। রাত পৌনে বারোটা নাগাদ একটা ট্রেন যায়। এখনও ট্যাক্সি নিলে কচুকাটা হতে অসুবিধে নেই।
- দু'জনেই সুইসাইড করলে দুনিয়ার অ্যাভারেজ আইকিউ কোথায় গিয়ে নামবে ভেবেছো?
- মিতা। যে দুনিয়ায় আমি তুমি দুজনেই নেই, সে দুনিয়াটা থিওরেটিকালি অ্যাবসার্ড। আমরা দু'জনেই সরে পড়লে জেনো এ দুনিয়ার দুনিয়াত্বও গায়েব হয়ে যাবে। তখন বুদ্ধিমান আর বোকাপাঁঠায় ফারাক থাকবে না।
- অনিকেত টেক্সট করেছে, পাঁচ মিনিটে ঢুকছে।
- বেশ। আমি উঠলাম।
- শুভ্র। সুইসাইড স্পটটা, আজ অ্যাভেলবল আছে?
- হুঁ?
- এখন ট্যাক্সি নিলে, সুইসাইড স্পটে রাত পৌনে বারোটার মধ্যে পৌঁছতে পারবো না, তাই না শুভ্রবাবু?
- একান্তই দেরী হয়ে গেলেও চিন্তা নেই, আমার ফ্ল্যাট খালি পড়ে রয়েছে। আজ রাতটা না হয় জিরিয়ে নেবে'খন। আমি রুটি তড়কা প্যাক করিয়ে আনবো। ডিম তড়কা। মাখন দেওয়া। তাছাড়া ফ্রিজে জলভরা রয়েছে।
- ইউ আর ডিসগাস্টিং শুভ্র।
- সো ইজ দ্য ওয়ার্ল্ড।
- লেটস গো।
- ক্যুইক।