Saturday, May 7, 2016
চার জন
রেজাল্টের পরে
ছাত ও মেজানাইন
মাথায় অল্প মিঠে ঝিমঝিম ভাব, চোখে আবছা হলুদ নীল মেশানো অন্ধকার। ছাদের গন্ধ কি রাতের এদিকটায় বদলে যায়? ঠাহর করা যাচ্ছিল না। পাঁচিলে ঠেস দিয়ে বসেছিল দীপু, দুই পা ছড়িয়ে।
জিভ গলা শুকিয়ে আসছিল, বুকের ফড়ফড়ানিটা অবশ্য বেশ মিষ্টি। বেশ।
"গাঁজা খেয়েছিস? স্কাউন্ড্রেল, গলা কেটে নেব"!! কিচির মুখটা পতপত করে চোখের সামনে ভাসছিল। ওর ঠোঁটের ডান কোণ ঘেঁষে ঝাপসা একদানা তিল, মোমের আলোর মত ভাসছিল।
মেয়ের গন্ধরাজ প্রিয়, মেয়ে অতুলপ্রসাদে কাঁদে; সে কিনা বলে গলা কেটে নেবে। ছাতটা দুলে ওঠে; সামান্য। স্নেহ তিরতিরিয়ে ওঠে। দীপু ভয় টের পায়।
ছাতে তো সে একা। বাবা মা মালদা গেছে, দিদাকে দেখতে। দীপু বাপ্পার বানানো কল্কের আকাশে, ভাসমান। নয়নতারার টবগুলো জ্বলছে নিভছে, দীপু এক্স অ্যাক্সিসে ডিগবাজি খেয়ে ওয়াই অ্যাক্সিসে গিয়ে রিবাউন্ড খাচ্ছে। এফোঁড় ওফোঁড় হচ্ছে।
অবভিয়াসলি কিচির গনগনে মুখটা কল্কে জেনারেটেড।
গন্ধটা স্পষ্ট যদিও, বোরোলিনের মত খটখটে। অথবা অঙ্কের খাতা আর ক্যাসেটের ইনলে কার্ড মেশানো একটা তিরিক্ষি ব্যাপার মিশে। কিচির ঠোঁট ফেটেছে অসময়ে। ঠোঁটের ডান কোণে ঝাপসা এক দানা তিল, মোমের আলোর মত ভাসছিল। কিচির মুখ ফের পতপত করে ভেসে উঠলো; "স্কাউন্ড্রেল, গাঁজা খেয়েছিস? এই তোর উচ্চমাধ্যমিকের ফোকাস?"।
কিচির গন্ধে গলা ভেজে। ওকে বলা যায় না। শুধু বলা যায় দিদার বায়োপ্সি রিপোর্ট খারাপ। কিচির না থাকা ছাদে এসে জমা হয়। জমা হয় দিদার বায়োপ্সি রিপোর্ট। কিচির ঠোঁটের পাশে আবছা কালো তিল, লাস্ট স্টেজ। কিচির গন্ধরাজ প্রিয়।
বারোয়ারীতলার মাঠের পেট বরাবর পার্পেন্ডিকুলার কাটলে, বিস্কুট রঙের বাড়ির মেজানাইন ফ্লোরের ছোট্ট ঘরে কিচির নাইট ল্যাম্প। সবজেটে।
কিচির কান্নায় বালিশ ভেজে। দীপুকে বলা যায় না। কাকীমা কাকু স্রেফ দিদার রিপোর্ট শুনে আজ ছুটে যাননি। দীপুর কাল উচ্চমাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষা খতম হলে তবে জানবে যে ছোটবেলা খতম।
কিচি নিজের ওষ্ঠ কামড়ে ধরলে আবছায়ার তিল ডুবে যায়। দীপু জানে। কিচিকে বলা যায় না। বড় হওয়াগুলো কিচিকে বললে সে গলা কেটে নেবে।
Friday, May 6, 2016
শাসমলবাবুর কাণ্ড
- ডাক্তার, আমায় নিয়ে এ'সব কী শুরু করেছেন বলুন তো?
- এখনও কিছুই শুরু হয়নি শাসমলবাবু। এ তো কলির সন্ধ্যা। আগামীকাল ইউরোপিয়ান ভাষাবৈজ্ঞানিকদের দল আসছে আপনাকে দেখতে। আপনার সাথে কথা বলতে, আপনাকে স্টাডি করতে। পরশু আসছে জাপানীরা। আমি তো একপ্রকার নিশ্চিত, আমেরিকানরা এ হপ্তার মধ্যেই একটা টিম পাঠাবে। দুনিয়া জুড়ে আপনাকে নিয়ে একটা সেনসেশন তৈরি হয়ে গেছে। শেষ এমন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, আমার যদ্দুর মনে পড়ছে ফর্টি সিক্সে; যে'বার চাঁদে শিমুলগাছের চাষ করলেন জন ফোগার্ট।
- না মানে...সবাই একটু ইয়ে...ওভার রিয়্যাক্ট করছে না? ঘটনাটা কিন্তু অতি সামান্য ডাক্তার...।
- সামান্য? কী বলছেন? গড়িহাটের ভিড় ফুটপাথে এক ভদ্রলোক বেমালুম আপনার পা মাড়িয়ে দিলে আর আপনি তাকে বললেন 'দাদা, আপনি আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন'। এ'টা সামান্য ঘটনা?
- সামান্যই তো...উনি পা মাড়িয়ে দিলেন, আমিও তাই বললাম।
- আমেজিং। ইনক্রেডিবল। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, একজন আপনার পা মাড়িয়ে দিল আর তাকে আপনি শুধু বললেন 'আপনি আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন'। একটা খিস্তিও না জুড়ে আপনি এই সাংঘাতিক কথাটা কমিউনিকেট করতে পারলেন। চারক্ষর নয়, ইংরজির অমুকহোল তমুকহোল নয়, জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কিউরিওসিটি নয়, এমনকি কানা-ইয়েও না জুড়ে আপনি দিব্যি নিজের উষ্মা প্রকাশ করে ফেললেন। আর নিজের রাগ শুধু প্রকাশ করতে পেরেছেন তা নয়, পা-মাড়িয়ে ভদ্রলোককে দিয়ে আপনাকে সরিও বলিয়ে নিয়েছেন। কমিউনিকেশনের ইতিহাসে এমন বিপ্লব আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে আগে ঘটেছে কী?
- ঘটেনি?
- নেভার।
- না মানে...ইনফরমেশনটা কমিউনিকেট করতে পারা নিয়ে কথা...।
- সেটাই তো! অভাবনীয়, অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য! খিস্তি ছাড়া যে ইনফরমেশন বা সেন্টিমেন্ট কনভে করা যায়, গত দুই শতকে এমন কোনও এগজ্যাম্পল নেই যে! বিষেকানন্দকেও শিকাগোতে বললে হয়েছিল "মাই আমেরিকান ঢ্যামনাস অ্যান্ড ঢেমনিস"। মোহন গন্দিকেও মরার আগে আর্তনাদ করতে শোনা গেছিল "হে হারামি"।
সাবাস বসুও সে'বার পাবলিককে মোটিভেট করতে বলেছিলেন "ধুর বাল রক্ত ফক্ত না পেলে কী ছিঁড়ব?"। শাসমলবাবু আপনার একটা কথা "দাদা, আপনি আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন"; একদিন পৃথিবী পালটে দেবে। দেবেই!