Tuesday, April 19, 2016

কল্পনা যন্ত্র

যন্ত্রটার দিকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলেন বিপিনবাবু। কল্পনা যন্ত্র। কালে কালে এও আবিষ্কার হবে তা কে জানতো?

যন্ত্রটা মানুষ সমান লম্বা আর ভেন্ডিং মেশিনের মত চেহারা। সে যন্ত্রের ওপরের দিকে বড় স্ক্রিন। যন্ত্রের কোমরের কাছে একটা ফোঁকর, চিরকুটে যে কোন কল্পনার কথা লিখে সে ফোঁকরে গুঁজে দিলেই স্ক্রিনে ভেসে উঠবে কল্পিত চিত্রপট।
ভাবা যায় না। রোমহর্ষক অনুভূতি যে ঠিক কী, তা জীবনে এই প্রথম টের পেলেন বিপিনবাবু।

প্রথমেই চিরকুটে খসখস করে লিখলেন “ইউনিকর্নে টানা টাঙ্গা” এবং গুঁজে দিলেন যন্ত্রে। ফশ করে কালো স্ক্রিন জ্বলে উঠলো; সেখানে দেখা গেলো দু’টো ইউনিকর্ন একটা পেল্লায় টাঙ্গা টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টোরিয়ার সামনে দিয়ে। একটা ইউনিকর্ন সবুজ রঙের, অন্যটা গোলাপি-নীল চেক চেক

উত্তেজনার লাফিয়ে উঠলেন বিপিন সমাজপতি।
চট করে নতুন চিরকুট টেনে লিখে ফেললেন দ্বিতীয় কল্পনা; পার্কস্ট্রিটে এভারেস্ট। যেই না সে চিরকুট পড়েছে যন্ত্রে; অমনি স্ক্রিন জুড়ে সাদা বরফের মোড়ক, তারই মাঝে টিমটিম করে জ্বলছে পিটার ক্যাটের বেড়াল চোখ আলো।

আনন্দাশ্রুর কথা বিপিনবাবুর জানা ছিল। আনন্দঘাম এই প্রথম এক্সপিরিয়েন্স করলেন।
সাহসও সামান্য বেড়েছে বইকি।

তৃতীয় চিরকুট হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ কলম চিবলেন তিনি। এভারেস্ট ইউনিকর্নে কল্পনা আটকে থাকার কোন মানে হয় না। অবশেষে মিনিট চারেক পর অনেক ভেবেচিন্তে লিখলেন
“হাফ প্যান্ট পরা মেয়ে, ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট”।

লিখেই কেঁপে উঠলেন বিপিনবাবু। এ কল্পনা সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে গেছে! সমস্তটাই। চিরকুটে লেখার দিকে তাকিয়েই চোখ বুজে ফেলতে ইচ্ছে করছিল তাঁর।
তবু। বুক ভরে লম্বা দু’তিনটে শ্বাস নিয়ে, কপাল ঠুকে কল্পনা যন্ত্রে তিন নম্বর চিরকুট পুরে দিলেন বিপিনবাবু।

তখনই ঘটল ঘটনাটা। মেশিন থেকে গোঁগোঁ শব্দ বেরোতে লাগল আর স্ক্রিন হয়ে গেলো ফ্যাকাসে নীল! গোঁগোঁ শব্দটা ক্রমশ দুম পটাশ ফট আওয়াজে পরিণত হল। বিপিনবাবু বুঝলেন মেশিনটা গরম হতে শুরু করেছে; স্ক্রিনের চারপাশ দিয়ে গলগল করে বেরোতে শুরু করেছে ধোঁয়া।

বিপদ বুঝে সোজা দৌড় লাগালেন বিপিন সমাজপতি। সবে দশ পা এগিয়েছেন; ঠিক তখনই কান ফাটানো বুম্‌ম্‌ম্‌ শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি দেখতে পেলেন সেই অত্যাধুনিক কল্পনা-যন্ত্র প্রবল বিস্ফোরণে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মেঝে জুড়ে শুধু ভাঙ্গা কাঁচ, স্প্রিং, ফাইবার আর পোড়া চিরকুটের বিশ্রী গন্ধ।  


অপটিমিজ্‌মের উপন্যাস



নিবারণবাবু গেলাসের দিকে তাকিয়ে ঘাবড়ে গেলেন।



অপ্টিমিজ্‌ম প্র্যাক্টিস করতে নিয়মিত টাইপরাইটার বয়ে নিয়ে ছাদে উঠে যান অমল সেনগুপ্ত। 



মৃদু খটখট যেটা কানে আসছে সে'টা গেলাসের মধ্যে থেকেই আসছে; নিবারণবাবু নিশ্চিত। 



পাঁচশো বত্রিশ নম্বর "আজ মেঘ করবে" টাইপ করে খানিক থমকালেন অমলবাবু; আর চারশো আটষট্টি লিখলেই ল্যাঠা চুকে যায়। 



খটখটটা ক্রমশ অসোয়াস্তিকর জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছিল;  কড়ে আঙুলে ফতফত করে কান চুলকে চেয়ার ছেড়ে সোজা দেরাজের দিকে হেঁটে গেলেন নিবারণবাবু। 



অল্প মেঘ জমছিল যেন, আচমকা দমকা হাওয়ায় সাফ হয়ে গেল; গজগজ করতে ফের টাইপে মন দিলেন বিকেল রোদে ঘর্মাক্ত অমলবাবু।



এটা কি ভয় না আশা; সে ভাবনায় মশগুল হয়ে না জ্বালিয়েই ঠোঁটের সিগারেট টানতে লাগলেন নিবারণবাবু।



সাতশো বাহাত্তর নম্বর "আজ মেঘ করবে"তে এসেও আকাশে মেঘের কালো দানা না বাঁধায় খানিক দমে গেলেন অমলবাবু; আজও নামবে না কি?

৯ 

"নাহ", ফুঁসে উঠলেন নিবারণ,"বড় কাজ ফেলে রাখতে নেই"; বলে সাহস করে দেরাজ খুলে সলিউশনের শিশিটা নামিয়ে ফের টেবিলে রাখা গেলাসটার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। 

১০

টাইপিংয়ের স্পিড বাড়িয়ে দিলেন অমলবাবু, আজ দু'এক পশলা না নামালেই নয়। 

১১

দু'চামচ সলিউশন, আধ গেলাস গেলাসে গুলে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলা ;এ জঘন্য দুনিয়ায় অনেক হয়েছে- এবার নিবারণ মুক্তি চান। 

১২

আটশো বিরানব্বুই নম্বর "আজ মেঘ করবে" টাইপ করতেই আকাশের এক নিপাট ভালোমানুষ কোণে কালশিটে নজরে পড়লো অমলবাবুর। 

১৩ 

মৃদু খটরখটর শব্দটা গেলাস থেকেই আসছে আর নিবারণবাবুর গা জ্বালিয়ে দিচ্ছে; কিন্তু এখন সময় চুমুকের - সাত পাঁচ ভেবে ধানাইপানাইয়ের নয়। 

১৪

আকাশের কালো উপচে এলো হঠাৎ; ন'শো তেপ্পান্নর মাথায় লাফিয়ে উঠলেন অমলবাবু। 

১৫

চুমুক দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই নিবারণবাবুর মনে হল যেন খটখট থামলো বোধ হয়; বাঁচা গেল, এবার নিশ্চিন্তে মরা যাবে। 

১৬ 

ঝপাৎ করে বাকি "আজ মেঘ করবে"গুলো টাইপ করে ফেলতে বসে পড়লেন অমলবাবু।


১৭

চুমুক দেওয়ার সময় নিবারণ স্পষ্ট টের পেলেন খটখট বিশ্রী শব্দটা গেলাস থেকে গড়িয়ে তার গলা বেয়ে বুকে নেমে গেল; সলিউশনের সাথে। 

১৮

অপ্টিমিজিমের তাগতে মুগ্ধ হলেন অমলবাবু; তবে ভিজে কাক হওয়ার আগে মাথার ওপর ছাতাটা মেলে ধরা কর্তব্য বলে মনে করলেন তিনি। 

Sunday, April 17, 2016

হিউমর

- অমন হাঁ করে তাকিয়ে কী দেখছ?
- পেন্টিংটা।
- পেন্টিং?
- পেন্টিং। মাস্টারক্লাস।
- জুয়োচুরি? এ তো সাদা ক্যানভাস। একটা আঁচড়ও নেই।
- তুমি দেখতে পারছ না।
- পেন্ট করা আছে অথচ দেখতে পারছি না?
- না।
- ইয়ার্কি হচ্ছে?
- অন দ্য কন্ট্রারি। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সিরিয়াস। পেন্টিংটার নাম কী জানো?
- কী?
- হিউমর।
- হিউমর?
- হিউমর।
- আমি তাহলে সাদা ক্যানভাস দেখছি কেন?
- কারণ hue মরে গেছে।

রেস্ট্রিকশন

- বলুন দাদু।
- বলছিলাম...স্পেশ্যাল মোগলাইটা স্পেশ্যাল কেন?
- এক্সট্রা ডিম।
- ওহ। আর কষা মাংস।
- হাফ না ফুল?
- হাফে ক'পিস? আর ফুলে?
- চার পিস, আট পিস। হাফ দিই?
- ফুল দাও।
- স্পেশ্যাল মোগলাই আর কষা মাংস, তাই তো?
- থাম্‌স আপ দিও। একটা।
- তিনশো এমএল না দু'শো?
- তিনশো।
- মেনুটা নিয়ে নিই?
- থাক্‌ না এখন।
- আচ্ছা।
- একটু তাড়াতাড়ি দিও।
- দশ মিনিট লাগবে দাদু।
- পাঁচ মিনিটে হবে না?
- অত তাড়া দিলে হবে না দাদু। কাস্টোমারের ভিড় দেখছেন তো!
- একটু দেখো না বাবু, যত তাড়াতাড়ি হয়। আমার বড় তাড়া। হসপিটালে যেতে হবে যে।
- হসপিটালে দাদু?
- মাংস তেলে রেস্ট্রিকশন আই সি ইউতে ভাই।
- মানে?
- ডাক্তার বলে দিয়েছে। এখন তখন।
- কার এখন তখন? আপনার?
- আমি কী আইসিইউ তে?
- না আপনি এখানে। তবে কার?
- চল্লিশ বছর ভাইটি। আমার রেস্ট্রিকশনই যদি না থাকে, তাহলে আর আমার রেস্ট্রিকশনে কাজ কী বলো? একটা মোগলাই। স্পেশ্যাল। একটা মাংস কষা। ফুল। একটা থাম্‌স আপ। তিনশোর। ক্যুইক। ক্যুইক।

Thursday, April 14, 2016

আঁচ

- কী রে শিউলি...হাসিতে ডগমগ যে! ব্যাপার কী?
- বলি ডুলিদি?
- না বললে ছাড়ব কেন? হাসিতে কেমন গোলমেলে আভাস পাচ্ছি। 
- গোলমালই তো। গোলমাল, গড়বড়, গুবলেট। সমস্ত। 
- প্রেম?
- হি হি হি হি। 
- সে কী!
- হি হি হি।
- নায়কটা কে?
- বলব ডুলিদি?
- না বললে ছাড়ব কেন?
- অনুপদা।
- দত্ত বাড়ির ছোকরা? 
- হুঁ!
- এ আবার কেমন কথা! গত পুজোর এই অনুপই না তোকে ভালোবাসি বলাতে তুই চটি হাতে তাড়া করেছিলি?
- সে তো অনেক আগের ব্যাপার। তখন কি আর জানতাম ছাই অনুপদা এতটা গভীর? 
- বটে? অনুপ দত্তর গভীরতার আঁচ পাওয়া হয়ে গেছে?
- গেছেই তো। নয়তো আমি অত সহজে প্রেমে পড়ার মেয়ে নাকি? 
- তা গভীরতার আঁচ কী ভাবে পাওয়া গেল?
- গতকাল পাড়ার থিয়েটারের রিহার্সাল দেখতে এসেছিল অনুপদা। 
- তো?
- সেখানে ভুলে নিজের টিউশনের ব্যাগ ফেলে গেছিল।
- তো?
- তো সেই ব্যাগে ফিজিক্সের নোটের খাতা ছাড়াও ছিল একটা বই।
- কী বই?
- শেষের কবিতা।
- তাতেই আঁচ পেলি? অনুপের গভীরতার?
- নাহ্‌। আমি অত সহজে ভোলার মেয়ে? অনুপদার কতটা দম রাখে নিজের কলজের মধ্যে, কতটা গভীরে গিয়ে ভাবতে পারে; তার প্রমাণ পেলাম শেষের কবিতার মধ্যে গুঁজে রাখা বুকমার্কটা দেখে।
- বুকমার্ক?
- বিমল পান মশলার ছেঁড়া প্যাকেট, বত্রিশ নম্বর পাতার মাথায়।