Thursday, April 14, 2016

আঁচ

- কী রে শিউলি...হাসিতে ডগমগ যে! ব্যাপার কী?
- বলি ডুলিদি?
- না বললে ছাড়ব কেন? হাসিতে কেমন গোলমেলে আভাস পাচ্ছি। 
- গোলমালই তো। গোলমাল, গড়বড়, গুবলেট। সমস্ত। 
- প্রেম?
- হি হি হি হি। 
- সে কী!
- হি হি হি।
- নায়কটা কে?
- বলব ডুলিদি?
- না বললে ছাড়ব কেন?
- অনুপদা।
- দত্ত বাড়ির ছোকরা? 
- হুঁ!
- এ আবার কেমন কথা! গত পুজোর এই অনুপই না তোকে ভালোবাসি বলাতে তুই চটি হাতে তাড়া করেছিলি?
- সে তো অনেক আগের ব্যাপার। তখন কি আর জানতাম ছাই অনুপদা এতটা গভীর? 
- বটে? অনুপ দত্তর গভীরতার আঁচ পাওয়া হয়ে গেছে?
- গেছেই তো। নয়তো আমি অত সহজে প্রেমে পড়ার মেয়ে নাকি? 
- তা গভীরতার আঁচ কী ভাবে পাওয়া গেল?
- গতকাল পাড়ার থিয়েটারের রিহার্সাল দেখতে এসেছিল অনুপদা। 
- তো?
- সেখানে ভুলে নিজের টিউশনের ব্যাগ ফেলে গেছিল।
- তো?
- তো সেই ব্যাগে ফিজিক্সের নোটের খাতা ছাড়াও ছিল একটা বই।
- কী বই?
- শেষের কবিতা।
- তাতেই আঁচ পেলি? অনুপের গভীরতার?
- নাহ্‌। আমি অত সহজে ভোলার মেয়ে? অনুপদার কতটা দম রাখে নিজের কলজের মধ্যে, কতটা গভীরে গিয়ে ভাবতে পারে; তার প্রমাণ পেলাম শেষের কবিতার মধ্যে গুঁজে রাখা বুকমার্কটা দেখে।
- বুকমার্ক?
- বিমল পান মশলার ছেঁড়া প্যাকেট, বত্রিশ নম্বর পাতার মাথায়।


হালখাতা

- ই তো হিউজ সারপ্রাইজ হলো মিস্টার মিত্তির।
- আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে পারা চাট্টিখানি কথা তো নয় মগনলালজি।
- সারপ্রাইজ-উরপ্রাইজ তো ঠিক হ্যায়। লেকিন জেলে দেখা কোরতে এলেন...ইয়ে তো আজিব বাত।
- মিষ্টি খাওয়াতে এলাম।
- কেনো? এলএসডি মিক্স করিয়েছেন?
- আমি সস্তা মজার মানুষ নই। আপনি জানেন। আজ পয়লা বৈশাখ। আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে আসা। আফটার অল, আমার বিজনেসে আপনারাই মূলধন। বিশেষত আপনি।
- বিজনেস? পহেলা বইশাখের মিঠাই? হাল খাতা কই? নো হালখাতা, নো বিজনেস!
মিচকি হেসে পকেট থেকে নীল ডায়েরীটা বের করে মগনলালের চোখের সামনে মেলে ধরলেন ফেলুদা।

বিনুর মা

- এহ্ হে।
- কী হল?
- আঙুলের ডগাটা গেল কেটে।
- দাড়ি?
- রেজারে বসানোর আগেই তো...।
- দেখলি তো, কেত দাড়িতে নেই। সরঞ্জামে।
- উফ! বাবা! ফার্স্ট এড বাক্সটা কই?
- ফলস ফার্স্ট এড বাক্সটার কথা বলছিস না গীতবিতান?
- আহ! বাবা। বেশ কেটেছে কিন্তু।

- বস!
- আমায় বস বলে ডাকছ কেন?
-  ডিভোর্স দিয়েছি, বসবাজি ছাড়ার লাইসেন্স দিইনি।
- ন্যাকামো করতে ফোন করলে?
- শোন না!
- কী?
- ডিভোর্সটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
- শাট আপ।
- আই উইল। কিন্তু তুমি না থাকলে চলছে না।
- এই আদেখলাপনাগুলো বাদ দিলে হয় না? আমাদের ডিভোর্স দু'দিন আগে হয়নি সৃজন। ষোলো বছর কেটে গেছে।
- সো হোয়াট? তোমায় এখনই সবচেয়ে বেশি দরকার। জানো কী কাণ্ড? আজ ফার্স্ট এড বাক্সটাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
- তার দরকার কেন পড়ল? কী হয়েছে?
- বিনু আজ প্রথম দাড়ি কামাতে গেছিল, ব্লেড রেজারে  লাগাতে গিয়ে সে রক্তারক্তি ব্যাপার।
- সৃজন, এমন কেন করছ?
- সে কী রক্ত নিভা!
- বিনু নেই। নেই। নেই।
- শাট আপ! শাট আপ! খচ্চর মেয়েছেলে কোথাকার! শাট আপ! শাট আপ!
- সৃজন, শান্ত হও। প্লীজ। প্লীজ।
- যা ভাগ! মর!  মর! মর!

- বাবা! বাবা!
- বি...বিনু....।
- তুমি ফোনের রিসিভারে কী গজরগজর করছিলে?
- মা! তোর মাকে ফোন করেছিলাম।
- বাবা! কেন এমন পাগলামি কর?
- তোর মা ফিরে আসতে চায় না।
- বাবা। মা নেই। মারা গেছে।
- হারামজাদা। চোপ!
- আমাদের ল্যান্ডলাইন কাটা আজ বহুদিন বাবা!
- তোর গলা কেটে ফেলব! বাপ কে মিথ্যেবাদী বলা! রাস্কেল!

সৃজনের চোখ আবছায়ায় ঢেকে যায়। বিকেলের আকাশ তিরতির করে চলে একটানা। নদীটার নাম কী?
নদীর জল কী জ্বলজ্বলে! ঘাসে কী নরম স্নেহ। বোতাম ছেঁড়া জামায় বড় হাওয়া খেলে যায়, বুকে মেঘ মেঘ ছাপ  লেগে থাকে।
যন্ত্রণা সামান্য স্তিমিত হয়ে আসে। দপ্ রাগ ডানা গুটিয়ে অপেক্ষা করে।

অপেক্ষা। রক্ত ধুয়ে যাওয়ার অপেক্ষা।

এ নদীর জল খুন ধুয়ে দেবে? দেবে?
নিভা চলে যেতে চেয়েছিল; ওকে নিয়ে। রাগ হবে না? হবেই।
তবে কি রাগ বেহিসেবি হয়েছিল?
হয়তো, সে খুন তো আর হিসেবের নয়।

ও কে ছিল? বিনু? না বিনি? নিভা জানতে দিল না। রাগ বড় বেহিসেবি হয়ে গেছিল। বড়।

Tuesday, April 12, 2016

বালিশের পরে

বালিশ আবিষ্কার শেষে থুতনি চুলকোতে চুলকোতে পায়চারি করছিলেন ঈশ্বর।
এমন মার দিয়া কেল্লা আবিষ্কার;
এমন মাখনে ছুরি চিজ;
ব্যবহার হবে কী করে?
তখনই হাওয়ায় ভাসলো ইউরেকা।
নয়া আবিষ্কারের ঝিলিকে লাফিয়ে উঠলেন ঈশ্বর। হুড়মুড় করে ল্যাবরেটরির দিকে ছুটে গেলেন তিনি; মুণ্ডুওলা মানুষ তৈরির ফর্মুলা ঠাহর করতে।

প্যারাসুট

প্যারাসুটে ঝুলে উপরের দিকে ভেসে যাচ্ছিলেন রজনীকান্তবাবু।
খাবলা খাবলা তুলোর মত মেঘ পাশ কাটিয়ে উঠছিলেন তিনি, উঠেই যাচ্ছিলেন। এত উপরে উঠে এলে আকাশের নীলটা যেন আরও মনোরম  ভাবে গায়ে চেপে বসে। আহা!

দিব্যি উড়ে ওপরের দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় রজনীবাবুর চোখে পড়ল সে ভদ্রলোকের ওপর। এক ফালি মেঘের ওপর বসে নিশ্চিন্তে নিজের পৈতে চিবচ্ছিলেন।  খালি গা, কোমরে জড়ানো গামছা।

- এক্সকিউজ মি!
- আমায় বলছেন কিছু?
- এদিকে আর ক'জন আছে বলুন। ইন ফ্যাক্ট এই প্রথম দেখতে পেলাম কাউকে। এত উপরে।
- অ।
- আমি রজনী। রজনীকান্ত। আপনার নামটা?
- মলয়। মলয় মুখুজ্জে। বেলঘড়িয়ার।
- আমি এখানে প্যারাসুটে নিয়ে উড়ে এসেছি।
- আপনিও?
- আমিও মানে? ইয়ে। আমি তো জানতাম আমি ছাড়া প্যারাসুটে ঝুলে ওপরের দিকে কেউ উড়তে পারে না।
- আরে আমারও তো সেই সমস্যা হল।
- আজ্ঞে?
- গতকাল অফিস থেকে ফিরে মনে হল মাথাটা বেশ ভার হয়েছে। কলকাতায় বেয়াল্লিশ চলছে, বুঝলেন কিনা রজনীবাবু। দেখলাম তালুটা আগুন হয়ে রয়েছে। ভাবলাম যাই, কষে মাথায় তেল ঘষে  দু'মগ ঢেলে আসি।
- তো ?
- কোথায় দু'মগ জল! কোথায় কী! সবে মাথায় প্যারাসুটের নারকোল তেল রগড়েছি, অমনি মাথা ভার গায়েব।
- গায়েব?
- গায়েব। শুধু তাই নয়। মনে হল ভার কমতে শুরু করেছে।
- সে কী!
- প্যারাসুটের এফেক্ট ভাবুন। সেই ভাসতে শুরু করেছি, শেষে এসে ঠেকেছি এই মগডালে।
- বোঝো!
- ক্যালামিটি!