Tuesday, April 12, 2016

৫৩২

- পাঁচশো বত্রিশ খানা হাইড্রোজেন বোমা!
- পাঁচশো তেত্রিশ নম্বরটা?
- আরশোলা ঢুকে সার্কিট নষ্ট করে দিয়েছে। তবে এ ক'টাই যথেষ্ট।
- ইকুয়েডোর বা চুঁচুড়া বেঁচে যাবে না তো?
- নাহ্‌! হিসবের ব্যাপার। সব কচুকাটা হবে। ওয়াশিংটন টু টোকিও। খতম। এভ্রিথিং। ফিনিশ।
- বেশ। সলতেয় আগুন দেব কখন?
- এই সবাই সব কিছু বুঝে গেল বলে। আর খান কুড়ি সেকেন্ড। এই। এই। এই। দুনিয়ায় সবাই সব বুঝে গেছে।  কম্পিউটার কনফার্ম করেছে।
- হুর্‌রে।
- হুর্‌রে! বোমা টাইম। আর দশ সেকেন্ড।
- নয়।
- আট।
- সাত।
- ছয়।
- পাঁচ।
- চার।
- তিন।
- দুই।
- এক।
- গো।
- যাচ্চলে।
- কী হল?
- দেশলাই কোথায় আছে?
- জানি না। তুমি জানো? দেশলাই কোথায়?
- নাহ্‌! গেল। সব গেল। কম্পিউটার এবারেও গুল ঝেড়ে বেরিয়ে গেল।

ঘুমের ব্যারাম

- ঘুম পাচ্ছে?
- আজ্ঞে।
- সে'টা অসুবিধে?
- সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা ডাক্তারবাবু।
- মানে, অসময়ে ঘুম পাচ্ছে কি?
- আলবাত। এই ধরুন দিব্বি রাত্রে চাট্টি ডাল ভাত খেয়ে বিছানায় গা এলিয়েছি, অমনি ঘুম পেতে শুরু করল। আগে মাঝেসাঝে হত। ইদানীং বেশি হচ্ছে। চিন্তায় চিন্তায় প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে।
- এই...ইয়ে মানে...এই ঘুম আসার ব্যরামটা কদ্দিন ধরে ফিল করছেন?
- নয় নয় করে আড়াই মাস হল। তার আগে কখনও যে চোখ ঢুলুঢুলু হয়নি তা নয়। হুড্রু ফল্‌সের পাশে বসে ট্যুয়েন্টি নাইন খেলতে খেলতে একবার সামান্য ঝিমুনি এসেছিল। বন্ধুদের চাঁটিতে সে যাত্রা বিপদ এড়ায়। বা শ্যাওড়াফুলি যাওয়ার পথে ট্রেনে একবার প্রায় ঢলে পড়েছিলাম আর কী!
- আপনি শেষ কবে ঘুমিয়েছিলেন?
- ঘুমিয়েছিলাম মানে? মস্করা করছেন ডাক্তারবাবু? সিরিয়াস কেস নিয়ে লেগ পুল?
- আপনি কোনদিন ঘুমোননি?
- যে ঘুমিয়েছে তার আবার ডাক্তারের দরকার হবে কেন? এর পর বলবেন বইয়ের পাতায় ক্লোরোফিল নেই কেন। শচিনের স্ট্রাইকরেট নাদকার্নির এগেইন্সটে এত পুওর কেন।
- ঘুমোনো তো দরকারি।
- ডাক্তার। আপনি সুস্থ আছেন তো?
- কী সব পাগলামো। না ঘুমিয়ে এদ্দিন বেঁচে থাকা যায়?
- ঘুম বেঁচে থাকা? ডাক্তার?
- এর মানে কী! এই যে আমি দুপুরবেলা একটু গড়িয়ে নিয়ে তবে উঠলাম। পাওয়ার ন্যাপ। আধ ঘণ্টার। একদম ফ্রেশ হয়ে চলে এলাম চেম্বারে।
- ডা...ডা...ডাক্তার...।
- ও কী! তাবিজ দেখাচ্ছেন কেন? ও কী!

রজনীর শনির দশা - ৪

উইউটিউবে শেওয়াগের ইনিংসের একটা হাইলাইট চালিয়ে ঠোঁটের সিগারেট জ্বালিয়ে নিলেন রজনী।

**

সিধুর ফোনটায় রীতিমত বিব্রত হয়ে পড়লেন রজনী। ফেলু লেভেল হাঁটুর কাছে লোপ্পা ফুলটস নয়। মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়েছে ছোরা এইবারে।

বাধ্য হয়ে ঘনশ্যামদার নম্বর ডায়াল করতে হল তাকে।

**

আগামী পরশুর আনন্দবাজারের প্রুফরিডিং সেরে স্টোভে চায়ের সসপ্যান বসালেন রজনী। চা খেয়ে আবার ওবামা টু ধোনি; সক্কলের টু ডু লিস্টটাটা চট করে বানিয়ে ফেলতে হবে।

**

Fifty Shades of Graceয়ের পাণ্ডুলিপিটা উলটে পালটে দেখে ফের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলেন রজনী।
ফেসবুক ঝগড়ুটেদের ইরোটিকার বাজার এখনও তৈরি বলেই তার মনে হয়।

**

হরর্ গল্প লিখতে হরেন দাস ছদ্মনামটাই রজনীবাবুর বেশি পছন্দ।

**

টাইম ফ্যাক্সের খটর খটরে আজকাল টেকা দায়। দু'একটা লেখা শুধরে দিয়ে কী মুশকিলটাই না হল, ছোকরা এখন দিনরাত লিখে চলেছে আগডুম বাগডুম। লেখা ঠিক না করে দিলে আবার অভিমান হয় বাবুর।

কিন্তু তাই বলে রাতবিরেতে ফ্যাক্সে কহাতক কবিতা রিসিভ করা যায়? অগত্যা আজ উত্তরে লিখেই দিলেন রজনীবাবু;
"একচল্লিশের অগস্ট পর্যন্ত সহ্য করব। তারপর থেকে নিজের পোঁ নিজেইই সামাল দিও চাঁদু"।

**

লাইফবয় দিয়ে মগজ সাফ করার টেকনোলজি আবিষ্কার করার পর থেকেই সেল্‌ফ হেল্‌প বইগুলো বাড়ি থেকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করেছিলেন রজনীবাবু।

**

হোলসেলার হতে চেয়ে কিছুদিন আগে ঝাঁঝরির দোকান দিয়েছিলেন রজনীবাবু।

**

"এক বুলেটে আমি ছ'জনকে ঘায়েল করতে পারি", ব্লেডে সুড়ুত করে জিভ বুলিয়ে জানালেন রজনীকান্ত।

কলমের ঢাকনা দিয়ে থুঁতনি চুলকোতে চুলকোতে মিচকি হাসলেন সঞ্জীববাবু।

Saturday, April 9, 2016

পেয়ারেলালের নিলাম

- নাম?
- পেয়ারেলাল।
- পেয়ারেলাল কী?
- পেয়ারেলাল। ব্যাস। 
- পদবী?
- ভূতের আবার পদবী!
- আচ্ছা বেশ। বয়স? 
- জন্ম থেকে না মৃত্যু থেকে?
- অকশনের কোয়ালিফিকেশন রুল্‌স দেখা আছে কি নেই?
- গরীব ভূত। চাষা  ভূত। নিয়ম কানুন দেখালে হবে স্যার?
- দশ বছরের বেশি পুরনো মড়া হলে চলবে না।
- আমার ওই বছর সাতেক হয়েছে। 
- আঁধার কার্ড দেখি?
- এই যে।
- হুঁ। ঠিক হ্যায়। 
- আজ্ঞে, নিলাম ডাকা ক'টা থেকে শুরু? 
- এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শুরু হবে। ক্রেডেনশিয়ালস্‌ কই?
- আজ্ঞে?
- চাষাদের নিয়ে এই অসুবিধে। নিয়মকানুন পড়ার ক্ষমতা নেই অথচ এদের ভূতদের নিয়েই অকশন। শুনুন, আমি যে'টা বলছি; মানে, আপনার ক্ষমতার লিস্ট চাই! তুকতাকের দম কতটা! ভেল্কি দেখানোর ক্ষমতা কতটা! সে ফর্ম ফিল আপ করা আছে?
- মরার আগে টিপ সই দিতাম। 
- আচ্ছা বেশ। আপনি বলে যান। আমি টুকে নিচ্ছি। 
- বঢিয়া।
- তার আগে বলে দিই এ নিলামে আপনাকে কে কিনবে সে খবর  রাখেন তো?
- সে'সব জানি। আইপিএলের আটটা টিম ভূত কিনবে। চাষাদের ভূত। টিমকে জিততে সাহায্য করতে হবে। আর অপনেন্ট কে গুলিয়ে দিতে হবে। 
- কারেক্ট। এবারে বলুন। ব্যাটসম্যানদের সাহায্য করতে কী কী পারবেন আপনি? ব্যাটে ঢোকার ক্ষমতা আছে? ব্যাটে ঢুকে ভেল্কি দেখানোর?
- বিলকুল আছে। 
- ভেরি গুড।
- বলে ঢুকে বোলারদের হেল্প করতে পারবেন?
- বিলকুল। 
- ভেরি ভেরি গুড। আপনার বেস্‌ প্রাইস ওপরের দিকেই থাকবে।
- অপোনেন্ট ব্যাটসম্যান বা বোলারদের ব্যাটে বলে ঢুকে থাকা ভূতদের সঙ্গে কুস্তি করতে পারবেন?
- জরুর। 
- চমৎকার। আর ইয়ে। হাওয়ায় ভেসে গিয়ে মাঠ জুড়ে ছোট ইয়ে করে আসতে পারবেন? অপোনেন্ট বোলিংকে ডিউ প্রবলেমে কিস্তি মাত করার জন্য?
- ছোট ইয়ে? সে'টা কী সাহেব?
- ছোট বাথরুম।
- পেচ্ছাপ?
- আহ্‌! রাস্টিক ভাবে বলবেন না প্লীজ। প্লীজ। ইয়ে, পারবেন?
- ভূত হয়ে সে ক্ষমতা বহুত বেড়ে গেছে।
- যাক গে। ব্রিলিয়ান্ট। 
- পিচে থুতু ফেলে স্যুইংয়ে অ্যাসিস্ট করতে পারবেন?
- যেখানে বলবেন সেখানেই। থুতুই তো। ভূতদের বাছবিচার নেই ও'সবে। 
- বাহ্‌! সবেতেই তো টিক পড়ল। আপনাকে নিয়ে বেশ টানাটানি হবে। বুঝতেই পারছি। তাহলে বেস প্রাইস কত রাখা যাবে আপনার?
- বেস কী? 
- বেস প্রাইস! যার জন্যে আপনি নিলামে হতে এসেছেন।
- শুনলাম জল পাওয়া যাবে। 
- অফ কোর্স যাবে। ধরুন আপনার বেস প্রাইস যদি কুড়ি হাজার লিটার জল হল! আর তার মাথায় ডাকাডাকি করে ধরুন গিয়ে সে প্রাইস গিয়ে ঠেকলো তিরিশ হাজার লিটার জলে; তো সেই পরিমাণের জল আপনার ফ্যামিলির কাছে পৌঁছে দেবে সেই টিম যে আপনাকে কিনবে।
- যাক। মরে একটা কাজের কাজ হল। প্রতি বছরই এ নিলাম হবে তো?
- অফ কোর্স। চাষা ভূতদের অকশনটা প্রতি বছরই হতে চলেছে।
- তিরিশ হাজার লিটার জল। অনেক না?
- অনেক মানে? ভাবতেও পারবেন না। 
- গম ফলবে তাহলে? 
- বিলকুল। 
- ছেলেটাকে সামনের নিলামে তাহলে আর এখানে দেখতে হবে না হয়তো। এটা ভালোই হল। 
- ওহ। ইয়ে। যাক গে। এইখানে একটা টিপসই প্লিজ।  

Thursday, April 7, 2016

ভরত মিশ্রর রাত

ভরত আর তার পুত্র বচ্চা। বয়েসে বাচ্চার আদত নামও বচ্চা, বচ্চা মিশ্রা।

কবে, কীভাবে মোতিহারি ছেড়ে কলকাতা এসেছিল ভরতের বাবা, তা ভরত জানেন না। তিনি ধর্মতলার ভালো নাম জানেন না। বৌটা মারা গেছে না গেছে; সে'টাও গুলিয়ে ফেলেছেন বহু আগেই। তিনি শুধু জানেন তিনি বচ্চা মিশ্রার পিতা। তিনি শুধু জানেন রাতে রুটির খিদে পায়। রাত বড় বেআব্রু করে দেয়, তার বড় দেমাক; দুপুরের মত শুখা পাউরুটিতে বশ মানতে চায় না।

রাত ও ছ'বছরের বচ্চা মিশ্রা এক সাথে রুটি চায়। চেল্লায়। সে চেল্লানি শোনে দু'জন। ভরত ও তাজিন মিয়াঁ। তাজিন মিয়াঁর রুটি সবজি তড়কার দোকান, দোকানের মুখেই উনুন। গনগনে।
রাতের পেটের মত, বচ্চা মিশ্রার আকুতির মত; "বাবা, রোটি"।

তাজিন মিয়াঁর উনুনের তাপ মিইয়ে এলে দিন কাবার হয়, রাত ঘন হয়। ভরত সূর্যের ওপর নিচ বোঝে না, স্ট্রিট ল্যাম্পের জ্বলা নেভা টের পায় না। তার ভোর  তাজিন মিয়াঁর উনুনের নরম আগুনে ঢিপঢিপে শুরু। ভরতের দিন সে উনুনের আঁচের শেষ বিন্দুর সাথে মিলিয়ে যায়।

দোকানের লাগোয়া ফুটপাথে বচ্চাকে বুকে ঠেসে শুয়ে থাকে ভরত। বুকে। ঠেসে। ঠেসে রাখলে যদি খিদে কম বাড়ে। যদি।
"বাবা, রোটি। রোটি"।

উনুনের গরম অদৃশ্য কম্বল হয়ে বাপ ছেলের গায়ে ছড়িয়ে থাকে। শীতে, গরমেও। রাত বাড়ার সঙ্গে পথ নিরিবিলি হয়ে আসে।

উনুন উষ্ণতার কম্বল গা থেকে নামতে আরম্ভ করলেই ভরত টের পায়। টের পায় এবার তাজিন মিয়াঁর দোকান বন্ধ হবে। বাড়তি রুটি দু'চারখানা বাপ ছেলের মাথার কাছে রেখে যাবেন তাজিন। তার সঙ্গে কখনও বাড়তি আলু চোখা। কখনও বা বচ্চা মিশ্রার মাথায় হাতবুলুনি। অথবা কখনও পাতে সামান্য আচারের মত গজগজ "রোজ রোজ ইধর কাহে শোতা রে!"।

ভরত কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়তে জানে না, ভরত প্রত্যুত্তর জানে না। ভরত শুধু জানে বচ্চা মিশ্রার উচিত বাপের চেয়ে অন্তত দু'গ্রাস রুটি বেশ খাওয়া। এ'টুকুই ভরতের কলকাতা চেনা।