বিশ্ব কবিতা দিবস। মিনুর মাস্টার কত কিছু যে উদ্ভট খবর দেয়।
বিশ্ব কবিতা দিবস। কবি জাতটাই আধ পাগলা। তাদের লেখাজোখার জন্য আবার আলদা দিন রেখে দেওয়া।
আজ আর বারান্দায় বসে ধোঁয়ায় টান দিতে ইচ্ছে হল না নিমাইবাবুর। চট করে সিঁড়িতে এসে বিড়ি ধরালেন তিনি। বিশ্ব কবিতা দিবস বলে কথা।
২।
- কী ব্যাপার? এখনও তৈরি হওনি?
- তৈরি? কেন? কোথাও যাওয়ার আছে?
- ওহ। তুমি তো আবার এদিকে নতুন।
- ব্যাপারটা কী বলবে?
- আজ ফ্রেম ডিঙনোর দিন।
- কী?
- ফ্রেম ডিঙিয়ে ওপারে যাওয়ার দিন।
- ও'দিকে?
- ও'দিকে।
- আমরা যেতে পারব ওদিকে? আমরা? ফিরতে পারা যায়?
- শুধু আজকের রাতের জন্য। কাল ভোর হওয়ার আগেই আবার ফ্রেমে ফেরত।
- শুধু আজ রাতের জন্য?
- আরে আজ কবিতা দিবস যে।
- তাতে কী?
- সে কী! আমরা ফ্রেম না পেরোলে চাঁদিম হিম আর ঘোড়ার ডিম আর কারা গিয়ে রেখে আসবে না-কবিতার দুনিয়ায়? চলো চলো। আর বিলম্ব নয়।
৩।
"এসো, এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে"।
সুরেলা। মিহি। আলো আলো।
কানের মেঝে বেয়ে বুক ঘষটে ঘষটে তারা এগিয়ে আসে। কানের গলিয়ে বেয়ে ঝুপ করে নেমে আসে গলার কাছটায়। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে 'জয় মা' বলে ঝাঁপ। শোঁ শোঁ শোঁ শোঁ শুধু নেমে যাওয়া বুক বেয়ে।
- শেঠ ভগওয়ান দাসের এক মাত্র কন্যা। এ দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষের একমাত্র উত্তরাধিকারিণী।
- নেশা ছুটিয়ে দিলেন। এ কথা গোপনে রেখে ঘুরতে চাই বটে, তবে কেউ জানলে ক্ষতি নেই। বাবা ভয় পায়, আমি পাই না।
- ভয় পান না?
- না মিহির।
- ভয় পাওয়া উচিৎ।
- জানি।
- কী জানেন?
- জানি আমার প্রাণের ঝুঁকি আছে। অ্যাই, মিহিরবাবু, আপনি আমায় খুন করতে এসেছেন?
- আমি গোয়েন্দা। মার্ডারার নই।
- ওহ।
- তবে। মার্ডারারের টোপ আমি হান্সা। তিরিশ পেয়েছি। আপনাকে খুঁজে বের করার জন্য। গত ছয় মাস ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। আজ পেয়েছি। এবার আমার কাজ শুধু একটি সৌজন্য চুমু আপনার গালে বসিয়ে দেওয়া। পাঁচটা স্নাইপার এই ওপেন এয়ার পার্টি তাক করে বসে আছে এ বাগানের চারিপাশে। আমি চুমু স্থাপন করলেই খুনি বুঝে যাবে তাদের টার্গেট কে। মিনিট কয়েকের মধ্যে আপনি ঝাঁঝাঁরা।
- স্মুদ।
- ভয় করছে?
- আমার ভয় করে না। কতবার বলব?
- ওহ, তাই তো।
- কিন্তু কী মুশকিল। আপনি আমায় বলে দিলেন কেন প্ল্যান? আমি যদি গালে চুমু খেতে না দিই? যদি আপনাকে ধরিয়ে দিই?
- আমিও ভয় পাচ্ছি না আপাতত।
- রিয়েলি? হোয়াই?
- হান্সা। 'মঙ্গালস ও আঁখি তব, সাকি, দিল দোলা প্রাণে'।
- এহ! এ গানের সবচেয়ে পাতি লাইন তুলে শেষ পর্যন্ত ফ্লার্ট করছেন মিহির?
- হেহ্।
- যদি চুমু খেতে না দিই মিহির? অন্য সিগন্যাল দেবেন?
- চুমু বাদ দিয়ে চললেন নাকি? ও মা! যাদের কাজ হাতে নিয়েছেন, তাদের গোঁসা হবে না?
- আসি।
- যাবেন না।
- সে কী! কেন!
- সবাই বঢিয়া বলে। বহুত খুব বলে। প্লেব্যাকের অফার পাওয়া উচিৎ বলে ঢলে পড়ে। পিলু মিশ্র, কাহারাবা, পাতিয়ালা বলে পাশে আসে না। যাবেন না মিহির।
- যাহ! আচ্ছা মুশকিল। বললাম তো, আমি স্নাইপারদের টোপ। আপনার কাকার লাগানো গোয়েন্দা আর স্নাইপার। আমি চলি। আপনিও চটপট বেড়িয়ে পড়ুন। বেশি কাছে আসবেন না বরং।
- মিহির, 'জানি আমি তোমার কাছে, ব্যথা ভোলার চুমু আছে- হিয়া কোন আমিয়া যাচে, জান তুমি, খোদা জানে'। রুকো। যেও না।
- ব্যথা ভোলার দারুর বদলে চুমু? বাজে হান্সা। বেশ বাজে।
- তোমায় গালে চুমু দিতে দিই কী করে বলো? গালে নয়। গালে নয়।
- হান্সা। আপনি নেশাগ্রস্ত। ছাড়ুন।
- যেও না মিহির। গালে না। ঠোঁটে। তারপর স্নাইপ করুক ওরা। আর পারা যাচ্ছে না। আমি মিত্রা নই, হান্সা। এতবার হান্সা বলে কদ্দিন কেউ ডাকে না। আমি মিত্রা নই। মিত্রা হাসে বোকার মত। হান্সা গায়। সবুজ সুর। ভোর মাখানো কথা। গানে ভিজে মাটির গন্ধ। হান্সা মিহির। হান্সা।
- পাগলামি সে'টা।
- আমায় মুক্তি দাও জুডাস। মুক্তি দাও। চুমু দাও। আজ শুক্রবার। মেক দিস আ গুড ফ্রাইডে ফর মি মিহির। বি মাই জুডাস। মুক্তি দাও। মুক্তি দাও। মুক্তি দাও। কিস্ মি।
- ওই মানে। অবনীবাবুর সংবর্ধনায় আপনাকে প্রণাম করে আমার লেখার কথা বলেছিলাম। গত অগস্টে। আপনি বলেছিলেন অফিসে এসে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে। বলেছিলেন পছন্দ হলে ছাপা হবে।
- ছাপা?
- আজ্ঞে।
- আপনার কবিতা?
- আজ্ঞে। যদি আপনার পছন্দ হয়।
- পছন্দ হয়নি।
- হয়নি?
- পড়িনি। তবে পছন্দ হবে না। সে'টা বলেই দিতে পারি।
- না মানে...দু'টো লেখা যদি...যদি পড়ে দেখতেন।
- মাসে অন্তত সত্তরটা নতুন পাণ্ডুলিপি জমা পড়ে। ওই দিকে দেখুন। তাকে বোঝাই করে রাখা আছে। অন্তত সাড়ে পাঁচশো না পড়া পাণ্ডুলিপি রয়েছে।
- আপনার ভালো লাগত মনে হয়...।
- কত কাটবে?
- আজ্ঞে?
- কত বিক্রি হবে?
- না মানে সে'টা তো ঠিক...।
- এগজ্যাক্টলি। সে'টা যেহেতু হলফ করে বলা যাচ্ছে না, সেহেতু আপনি আসুন।
- স্যার প্লিজ...।
- আর ও আই। বোঝেন?
- আর ও আই?
- রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট। পাঁচটাকা ট্যাঁক থেকে বেরোলে মিনিমাম সাড়ে সাত টাকা ট্যাঁকে ফেরত আসা দরকার। নয়া মালকে দমাদম ছেপে দিল আমার পকেটে যে মিসাইল পড়বে ভাইটি।
- মাল? ওহ!
- এবারে আপনি আসুন।
- আমার পাণ্ডুলিপিটা...।
- আবার কী?
- না মানে...যদি ফেরত পাওয়া যেত!
- ওই তাক ঘেঁটে খুঁজে পেলে ভালো। না পেলে আমার দায়িত্ব নয়।
***
ঈশ্বর যখন জীর্ণ পাণ্ডুলিপি হাতে মন্দাকিনী পাবলিশার্সের আপিস থেকে বেরোলেন তখন চোখে মুখে শার্টে ধুলো। যে ময়লা ঘেঁটে পাণ্ডুলিপিটা উদ্ধার করতে হয়েছে তা আর বলার নয়।
বাসস্ট্যান্ডের দিকে খানিক এগোতেই বাঁ পায়ের চটিটা গেল ছিঁড়ে। ধুস। রাগ জমাট হল। কালচে নীল রঙের বিরক্তি টিপ টিপ করে জমতে জমতে নাভির ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল।
ধুস। ধুস।
কবিতাগুলো পড়লোও না কোন প্রকাশক। ধুস্! অখাদ্য যত লোকজন।
ময়দান কবিতাটার মধ্যে যে প্যাথোস, বাগবাজার লেখাটা যে ছন্দে বাঁধা, চৌরঙ্গীর লাইনে লাইনে যে এক্সপিরেমেন্ট লুকিয়ে, বা পার্ক স্ট্রিটের মধ্যে যে আবেদন ছড়ানো আছে;
কেউ কোনদিন জানবে না। বুঝবে না। পড়ে "আহ্, বড় আদুরে" বলে চুক্ চুক্ করে উঠবে না কেউ। বইটা বুকে চেপে বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল মেঝেয় বুলোবে না কেউ।
সবচেয়ে বড় কথা, বইপাড়া কবিতাটার মধ্যে যে ভালোবাসা মেশানো ছিল, সে'টা কাউকে টেনে ধরার সুযোগটুকুও পেল না।
অখাদ্য যত সব। আবার আহ্লাদ করে ডাগর হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতায় নাম দেওয়া ; বাবু ঈশ্বরের 'কলকাতা'।
দড়াম স্বপ্নের ধাক্কায় ঝটকা দিয়ে তন্দ্রা ভাঙল জোব সাহেবের। চোখ ডলে দেখলেন জাহাজ ডাঙ্গার আশেপাশে এসে ঠেকেছে। তবে সবই জলাজমি আর জঙ্গল। নামা উচিৎ হবে বলে মনে হয় না।
তবে স্বপ্নটার জন্য মনের ভিতরটা কেমন হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠলো, কেউ যেন তাকে বলে দিলে এখানেই জাহাজ ভেড়াতে। তবে জাহাজ ভেড়ানোর কথা বলতে গিয়ে এক দিস্তে হিজিবিজি লেখা কাগজ যে কেন সে ছুঁড়ে মারতে গেল! প্রবল অসোয়াস্তি।
কাগজের দিস্তেটা জোব সাহেবের কপালে লেগেছিল; স্বপ্নে। সাহেবের বুক ছ্যাঁত করে উঠলো যখন তিনি টের পেলেন যে কপালের একটা কোণ সামান্য ফুলে রয়েছে।