Thursday, February 11, 2016

অল্প যতকিছু

মোহর চোখে অল্প কাজল দিলে।

আকাশ অল্প ভার। অল্প শীত মাখা বিছানা বালিশ। অল্প পড়া নভেলটা অযত্নে উপুড়। কাল পরীক্ষা, অথচ সিলবাস এখনও অল্প চেনা। পড়ার ইচ্ছেও অল্পই। ছেলেটা অমন চিঠি লিখতে সাহস পায় কী করে? অল্প রাগ মোহরের গালে গোলাপি ঢেলে গেল।

ওদিকে দুপুরের অল্প মেঘ জমা হওয়াটা তৌসিফের নজর এড়ায়নি কিছুতেই। অপরাধী ধুকপুকটার অল্প রেশ এখনও রয়ে গেছে। 
"দুপুর মেঘলা হলে তোমায় অল্প কাজলে মানাবে"; এমন গদগদে সস্তা ম্যাগাজিন মার্কা চিঠি সে লিখলে কোন সাহসে?


ট্রামের অন্যমনস্কতা পেরিয়ে মোহর মিত্রর কলটা অল্পের জন্য মিস হতে দিলনা তৌসিফ।

অবনীবাবুর লাইক্‌স

(ছবি সূত্র ঃ www.nationalnewswatch.com

লাইক গুনছিলেন অবনীবাবু। ঘড়া ঘড়া লাইক। গোপন সুড়ঙ্গ থেকে রোজ রাত্রে বের করে আনেন। গোনেন। গুনে তৃপ্ত হন। ঢেঁকুর তোলেন। আয়নার সামনে এসে তম্বি করেন।
আজ সবে বাহাত্তর হাজার একশো বাহাত্তর পর্যন্ত পৌঁছেছেন। মনে মনে আঁচ করতে শুরু করেছেন আজ অন্তত শতখানেক বাড়বে।
ঠিক তক্ষুনি কড়া নাড়ার শব্দ। 
"অবনী, বাড়ি আছ?"

ছড়াত করে একটা ভয় কুলকুল করে অবনীবাবুর বুক বেয়ে পেটের দিকে নামতে আরম্ভ করল।
বৃষ্টির ঝিমঝিম নতুন করে কানে ভেসে এলো।
আলোবালক মেঘের পিঠে ঝিলমিলিয়েই ছিলে; নজরে আসেনি। 
কড়া নাড়ার খঞ্জনি সুলভ শব্দে সমস্ত ফিরে এলো। পুকুরের মত নিষ্পাপে।

"অবনী, বাড়ি আছ?"
মেঝেময় লাইক ছড়ানো। আশি বিরাশি হাজার। এত লাইক কেন? বিন্তি চলে গেসল, তাই লেখার ভিড় জমিয়ে ভেজা গামছায় গা মুছেছিলেন অবনীবাবু।
তার ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ার কথা।

এত লাইক কেন? 
এত লাইক কেন?


****

বিন্তির হাজার কড়া নাড়াতেও সাড়া দিলেন না তিনি। বরং সমস্ত লাইকের অখাদ্যপনা সরিয়ে রেখে পিছনের জানালা দিয়ে লগ আউট করে পালিয়ে গেলেন অবনীবাবু।

বাপন আর অটো-করেক্ট

বাপন বানান ভুলে জর্জরিত। জ্যেঠুর ধমক, ছোটকার মারে তটস্থ। ণত্ববিবিধান ষত্বববিধানের টিপ খেয়ে খেয়ে তার পেট ফুলে থাকে; এই দশ বছর বয়েসেই খিদে গেছে মরে।

"বাঙালি হয়ে বাঙলা বানান ভুল করবি কেন?", বাবার গমগমে গলায় কেঁপে ওঠে সে মাঝেমাঝেই।

সেদিন দুপুরেও বাপন ছটফট করছিল, একটা পেল্লায় মূর্ধন্য ণ তাকে ক্রমাগত ঠেলে চলেছিল আর একটা বিশ্রী দেখতে দীর্ঘ ঈ তার মাথায় গাঁট্টা কষিয়ে যাচ্ছিল। শশব্যস্ত হয়ে বাপন খাট থেকে গড়িয়ে পড়লে।

পড়লে তো পড়লে সপাট বালির ওপর গড়াগড়ি।

আচ্ছা মুশকিল। চারিদিকে শুধু বালি আর বালি। আকাশ ঝকঝকে নীল আর গনগনে সূর্য। মরুভূমি।  কী কাণ্ড। মরুভূমিতে সে এলো কী ভাবে?

- আমি নিয়ে এলাম।
- তুমি কে?
- সরস্বতী।
- ঠাকুর?
- ওই আর কী।
- হাঁস কই?
- এখানে সে আসবে কী করে? জল কই?
- তাই তো। তা তাহলে তুমি এলে কেন? আমায়ই বা আনলে কেন?
- আমি কি সাধ করে এসেছি? তুমিই তো টেনে এনে ফেললে!
- আমি? যা! আমি তো ক্লাস ফাইভে পড়ি।
- এনেছই তো।
- কী করে? যাহ!
- সত্যি কথা।
- যাহ!
- সরস্বতী মিথ্যে বলে?
- ওহ তাই তো। কিন্তু আমি তোমায় মরুভূমিতে আনলাম কী করে?
- বাহ রে। ছোটকা তোমায় সরস্বতীপূজা নিয়ে রচনা লিখতে বললে। আর তুমি বাহাদুরি করে লিখলে বিনাপানি। দীর্ঘ ঈ নেই, মূর্ধন্য ণ নেই। জল নেই বিলকুল। স্ট্রেট এনে ফেললে মরুভূমিতে।

ছোটকা অফিস থেকে ফেরার আগে বানানগুলো ঠিক করে নিল বাপন, ডিকশনারি... থুড়ি...অভিধান হাতে মিলিয়ে।
"ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেই বাংলায় কাঁচা হতে হবে ; তার দিব্যি কেউ দেয়নি"; ছোটকার সেই লেকচার অন্তত শুনতে হবে না।

Wednesday, February 10, 2016

দীপকবাবুর নেশা

- অন্দর আইয়ে।
- দীপকবাবু পাঠালেন। দীপক চ্যাটার্জী।  পিরামিড ইঞ্জিনিয়ার্স থেকে।
- বইঠিয়ে।
- ধন্যবাদ। আমি অনির্বাণ দাস।
- ম্যায়নে পুছা আপকা নাম?
- ও। না।
- টু দি পয়েন্ট বোলিয়ে।
- আজ্ঞে।
- ইহা পে চায় কফি অফার নহি কিয়া যাতা হ্যায়। পানি পিয়েঙ্গে?
- না ঠিক আছে।
- বোলিয়ে।
- কী বলব?
- পারপাস অফ ইওর ভিসিট। বি স্পেসিফি।
- একটা মালের ব্যাপারে...।
- ইধর এক হি মাল মিলতা হ্যায়। বি স্পেসিফিক। হাউ মাচ?
- আজ্ঞে?
- কিতনা চাহিয়ে?
- ওহ। আড়াইশো  গ্রাম।
- সেভেন্টি থাউজ্যান্ড।
- মিস্টার চ্যাটার্জি বলছিলেন যদি একটু ডিসকাউন্ট..।
- টেল হিম নট টু ওয়েস্ট লালওয়ানিজ টাইম।
- আমি কিন্তু ক্যাশ এনেছি।
- ফির ইতনা ফালতু বাত কিউ করতে হ্যায়?

****

পকেটে প্যাকেটটা পুরে অনির্বাণ যখন বেরিয়ে এলে তখন রীতিমত ঘামছে। মেট্রোর কাছে রীতা দাঁড়িয়েছিল।  ওকে দেখে অনেকটা স্বস্তি নেমে এলো যেন বুকে।

***

- সত্তর পড়ল।
- চশমখোর শালা। যাকগে। কত বাঁচল?
- পাঁচ। পঁচাত্তর দিয়েছিলেন।
- আড়াই নিজের কাছে রেখে বাকিটা ক্যাশে ফেরত দিয়ে দিন।
- বলছিলাম যে, যদি কিছু মাইন্ড না করেন স্যার।
- কী!
- মানে। এ কাজটা আমায় দিয়ে না করালেই ভালো হয়।
- আচ্ছা? হঠাৎ?
- জিনিসটা তো ইলিগ্যাল।
- সো?
- আমি ঠিক...।
- আপনি ঠিক?
- অস্বস্তি হয়।
- অনেস্টি?
- ভয়ও। তাছাড়া আমি এখানে অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করেছি। আপনার নেশার বস্তু যোগার দেওয়া আমার কাজ নয় মিস্টার চ্যাটার্জী।
- রাইট। ইউ হ্যাভ আ পয়েন্ট। শুনুন। আমি ক্যাশে আদকবাবুকে বলে দিচ্ছি। আপনার ফাইনাল সেটলমেন্ট করে দেবে। কাল থেকে আপনি বরং কোন গ্রামের স্কুলে ছাত্র পড়ানোর চাকরী খুঁজে নেবেন!
- মিস্টার চ্যাটার্জী। আমার সামনের মাসে বিয়ে।
- আপনার সামনে বিয়ে। আর আমার সামনে স্পাইনলেস অথচ আইডিয়ালিস্ট ঢ্যামনা। আমার হালত আপনার চেয়ে বেশি খারাপ।
- মিস্টার চ্যাটার্জি!
- মেয়েটার নাম রীতা, তাই না? বেশ। চকমকে।
- শাট আপ।
- ওহ আই অ্যাম সরি। আই মেন্ট শি ইজ রিয়েলি বিউটিফুল। এবার আপনি আসুন।

****

শুভদৃষ্টির ধুকপুকটা চারগুণ বেড়ে গেছিল রীতার। অনির্বাণের চোখ কি ছলছলে? ওর দিক থেকে অবশ্য তক্ষুনি চোখ সরিয়ে নিয়েছিল রীতা। দীপকের চোখে মন দিল সে, আজ ওর চোখটা একটু বেশি লাল।

****

- স্যার। এই যে। মালটা।
- অনির্বাণ,  ফুলশয্যার রাত্রে লালওয়ানির মাল নিয়ে নেশা করব? নট নিডেড। প্যাকেটটা তোমার কাছেই থাক। হনিমুন থেকে ফিরে এসে বরং...হে হে।

****

স্বপ্নটা ভেঙে যাওয়ায় বড় দু:খ পেলেন লালওয়ানি। বড় ভালো লাগছিল ভাবতে যে ক্লায়েন্টরা তার অফিসে এসে মাল কেনার জন্যে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। ভেবে ভালো লাগছিল যে তার গলাতেও রোয়াব আসে।

****

ঘড়ঘড়ে শেষ ট্রামের শব্দে নড়েচড়ে ওঠেন কলকাতা। মেট্রোর সামনে ভেজা হাফ শার্টের ছেলেটির আর হলুদ শাড়ির মেয়েটির হাসিহাসি দেখা হওয়াটা তার স্বপ্নে রিপ্লে হয়। চুকচুকটা অস্ফুটে বেরিয়ে আসে হাওড়া ব্রীজ শনশনানো হাওয়ায়।

*****

রীতার উড়ে আসা চুল মুখে ঝাপাটা দিতে ঘুম ভাঙল অনির্বাণের। স্বপ্নটাও গেল মাঝপথে। স্বপ্নে চ্যাটার্জির মুখের ওপর রেসিগনেশনটা ছুঁড়ে মারার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সে। বেশ হত। দামী ফ্ল্যাটটা থাকত না। কিন্তু রীতা হয়তো আরও ভালো থাকত। আরও। বড্ড নিরিবিলির অভাব বোধ করে অনির্বাণ। বড্ড।

*****

স্বপ্নটা ভেঙে যাওয়ার বেশ পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল রীতা। অনির্বাণ তখনও ঘুমিয়ে কাদা। অনির্বাণের ওপর এত বছরের চাপা রাগটা ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল স্বপ্নে। ওর মেরুদণ্ডের লতানে ভাবটার প্রতি ঘৃণা। নরম পিঠের মানুষের থেকে শয়তান ভালো, বাবা বলতেন। সেই চ্যাটার্জী শয়তানটাও তো তার পিছনে কম ঘুরঘুর করেনি। বেশ হত তার সাথেই গেলে, অনির্বাণের একটা উচিত শিক্ষা হত। ছাইপাঁশ চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে রোববার বিকেলের চা বানাতে গেল রীতা।

*****

সিলিংটা ভেসে ভেসে নিচে নেমে আসছিল। হলুদ রঙের সিলিং। বাতাসে বমির গন্ধটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। দীপক বুঝতে পারলেন স্বপ্নটা ভেঙেছে। রীতাকে বিয়ে করার স্বপ্ন। রীতাকে বিয়ে করলে বোধ হয় এই আপদ নেশার থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যেত। হনিমুন থেকে ফিরে এসে বোধ হয় আর এ মারণ নেশায় গা ডোবাতে ইচ্ছে হত না তার। বোধ হয়। বোধ হয়। বোধ হয়। সিলিঙটা জড়িয়ে ধরে দীপক চ্যাটার্জিকে।

Tuesday, February 9, 2016

মিতা ও ঘনাদা

- হ্যাঁ রে... ।

- হুঁ।
- বল্টে।
- হুঁ।
- ঘুমোলি?
- হুঁ।
- এমন চট করে ঘুমোলি রে?
- হুঁ।
- অ্যাই বল্টে। 
- কী রে দাদা! ঘুমো না। 
- এ বয়েসে কোথায় রাত জেগে বই পড়বি তা না ঘ্যাসঘ্যাস করে ঘুমোনো শুধু। 
- হুঁ। 
- ওই দ্যাখো। ফের ঘুমোয়! ওরে ঘনাদা তোকে তাক থেকে ডাকছে। তৃতীয় সমগ্রটা তো শেষ করিসনি এখনও। 
- দাদা, উফ! ঘুমো। 
- ঘুম আসছে না তো।
- সে জন্য আমায় ঘনাদা পড়াবি?
- আমার ঘনাদা সমস্ত পড়া। নতুন করে পড়ার নেই। সে দুঃখে জেগে। আর তুই সেখানে ঘনাদা কমপ্লিট না করে ভোঁসভোঁস করে ঘুমচ্ছিস। দাদা হয়ে বরদাস্ত করব? আমি কি মুকেশ আম্বানি রে?
- উফ। কেসটা কী বলবি?
- কী কেস?
- হাঁসের ডিমের ঝোল দিয়ে দেড় কিলো ভাত খেয়েও ঘুম আসছে না বলছিস। কেস না?
- মিতা। পরের মাসে যাচ্ছে রে।
- মিতাদি? 
- ওর বাবা দুবাই যাচ্ছে। উইথ ফ্যামিলি। আজই কনফার্ম হয়েছে। 
- চাপ কীসের। হোয়াটসঅ্যাপ আছে। ফেসবুক আছে। স্কাইপ আছে। 
- মিতা থাকবে না রে। ওসব ডিজিটাল প্রেম-ফ্রেম ল্যাদের কনসেপ্ট। পার্কের বেঞ্চি নেই, এগরোল ভাগাভাগি নেই, মিতাদের ছাতের কোণ নেই...। 
- মিতাদিদের পাইপ বেয়ে ছেলে ওঠার কথাটা তাহলে সত্যি রে দাদা?
- চোপ। খালি মেয়েদের মত গসিপ গল্প খুঁজবে। ডেঁপো হয়ে যাচ্ছিস দিন দিন। 
- যাব্বাবা!
- মুশকিল রে। মিডল ইস্ট শেষে আমায় পিষে মারলে। 
- এখন উপায়?
- গ্র্যাজুয়েশনটা বাদ দিয়ে একটা জুটমিলের চাকরী। সাড়ে ছয় হাজার মাইনে। বাবা অবভিয়াসলি তাড়িয়ে দেবে বাড়ি থেকে। 
- সার্টেনলি। 
- স্টেশনের পাশের বস্তিতে একটা ছোট কিছু নিয়ে নেব। অ্যাসবেস্টসের ছাত, আধ মাইল দূরে কমন বাথরুম। 
- তার চেয়ে টিউশানি ভালো। 
- রোম্যান্স কম রে। জুটমিল। টিফিন বাক্স গুছিয়ে দেবে মিতা। স্টিলের। রুটি সবজি। হুইস্‌ল বাজবে ছুটির। মিতা চোখে কাজল দেবে সবুজ প্লাস্টিক ফ্রেমের দাড়ি কামানোর আয়নায় মুখ দেখে। 
- এটা বোধ হয় প্ল্যান বি, তাই না রে দাদা?
- রাইট। 
- প্ল্যান এ?
- প্ল্যান এ? মান্না দের ঘ্যানঘ্যানে কস্টিউম পরে ঘনাদার বাতেলার স্যুইমিং পুলে সাতদিন। এক টানা। 
- এনে দেব ঘনাদার তৃতীয় খণ্ড?
- আর দু'টো প্যাঁড়া টু গো উইথ দ্যাট প্লীজ। বাবা দেওঘর থেকে এনেছে।ফ্রিজের একদম ওপরের তাকে আছে।