Tuesday, February 9, 2016

অমিতাভবাবু ও গলি

নদীর মত তিরতিরিয়ে বয়ে চলা একটা গলিচ হাফ কিলোমিটারের মত লম্বা। তারপরেই বড় রাস্তার সমুদ্দুরে গিয়ে ঝপাৎ।
গলি জুড়ে একটাই ল্যাম্পপোস্ট লাইটহাউসের দম্ভে দাঁড়িয়ে। তার আলো ঘোলাটে। ফলত গলিটার বেশিরভাগটা জুড়েই আবছায়া। 

আবছায়াটা নিয়মিত উপভোগ করেন অমিতাভ। রাত্রে খাওয়ার শেষে তার হাঁটতে বেরোনো, তার দু'টো সিগারেট। গলি বরাবর কয়েক পাক। 
সান্যালবাবুর রেডিও এ সময়টা রোজ খেয়াল খুঁজে নেয়। 
তিন্নির এ সময়টা কাটে ভূগোল বা ইতিহাস বই দুলেদুলে রিডিং পড়ে। 
মজুমদারের অল্প বয়েস, নতুন বিয়ে। ওদের বন্ধ জানালাটা ফিসফিসে ভরে থাকে, অমিতাভ তা দ্রুত পেরিয়ে আসেন। 
মোহন সমাদ্দারের বাড়ি চিড়বিড় করে টিভি সিরিয়ালের কচকচে শব্দে। 
নিমাই মল্লিকের প্রেসের মেশিন পুরনো, লিফলেট ছাপা ছাড়া কোন কাজ হয় না- তার ঘট ঘটাং চলে অনেক রাত পর্যন্ত। 
শ্যামলী বৌদি ঠিক এই সময়টাই রোজ মিতুলকে ঘুম পাড়ান; অতুলপ্রসাদী তার কণ্ঠে হতে বড় মায়া মেখে নিঃসৃত হয়। অমিতাভ দুই সিগারেটের মাঝে সে অতুলপ্রসাদে আটকে থাকেন মিনিট পাঁচেক। 
মোড়ের দিকে এগিয়ে গেলে বিশু বুড়োর বিড়বিড় ভেসে আসে;   আনন্দবাজারকে কবিতার মত সুর করে পড়ে চলেন তিনি, অনবরত। ইনসমনিয়া আর ছিট; দুয়ে মিলে অতি ভয়ানক কম্বিনেশন। 
মোড়ের মাথার রকটা এ সময় ছোকরাদের আড্ডা থেকে মুক্তি পেয়ে শ্বাস নিয়ে বাঁচে। সেখানে ঘুমিয়ে থাকে রামনরেশ; পাশে তার রিক্সা লাগানো থাকে।  কোনদিন যদি রামনরেশ জেগে থাকে; তার সাথে চাট্টি গপ্প সেরে নেন অমিতাভ; ছপরার আর কলকাতার মাঝে যে মেঘলা অবকাশটুকু আছে- সেটুকু তাদের দু'মিনিটের গল্পে সরব হয়ে ওঠে। 

এমন ভাবেই কেটে যায় আধ ঘণ্টা। অমিতাভবাবু মোড়ের মাথা থেকে ইউটার্ন নিয়ে ফিরে যান গলির অন্তরে। বড় রাস্তার রাতটুকুও কর্কশ, অতিআলোয় আক্রান্ত। 

গলির নিঝুম শেষে পরিচিত সবুজ দরজায় এসে পকেট থেকে চাবি বের করেন অমিতাভ। গদরেজ তালাটা খোলার সময় কানে  স্পষ্ট ভেসে আসে মিঠুর হুকুম - "কাল ছেলের স্কুলে ডেকেছে, প্যারেন্ট টিচার মিটিং না কী যেন। আমি ইংরেজি-টেজি বলতে পারব না। তোমায় কিন্তু হাফ ছুটি নিতেই হবে"। বাপনের হইহই করে পেশ করা "স্কুল ফেরত আইসক্রিম"য়ের দাবীর সরবতাও কানে আসে অমিতাভর। 

গলির চেনা আবছায়ার আশ্রয় ছেড়ে ঘরের টিউবলাইটের অপরিচিত আলোর ব্যথায় ঝলসে ওঠেন তিনি। কিছুতেই ঘরের রেডিওর চ্যানেল ঘুরিয়ে অতুলপ্রসাদ বা খেয়ালের নিশ্চিন্দি খুঁজে পান না অমিতাভ।  

Sunday, February 7, 2016

সমুর দাদু

দামোদর পাড়ে ছপাত ছপাত করে ভাঙছিলে।
পাড়ের নরমে নরমে ক্ষয়ে যাওয়া টের পাওয়া যায় না।


ওদিকে রাত সবে জমাট বাঁধতে শুরু করেছিল। বাতাসে শেষ শীতের কুঁইকুঁই।
পাড়ের ঘাস বালি পাথরের নরম ভিজেভাব খালি পায়ে মন্দ লাগছিল না সুমনের। সিগারেটের প্যাকেট প্যান্টের পকেটে রয়ে গেছে বলে সামান্য উশখুশ। ধরাবস্ত্র পরার সময় খেয়াল ছিল না। খানিক আগেই ডুব দিয়ে উঠে এসেছে সে। গা ভালো করে মোছা হয়নি, শিরশিরানি গা জুড়ে। ভিড় বাঁচিয়ে একটু সরে আসতেই হত।

সমু খেয়াল করেছে তার সরে আসা। পিছুপিছু চলে এসেছে।

- বাবা!
- কী রে সমু! অন্ধকারে একা এলি?
- তুমিও তো এলে।
- আমি বড়।
- দাদু বলেছিল দাদু মারা গেলে আমি বড় হয়ে যাব।
- বটে? তাহলে আজ থেকে তুই অ্যাডাল্ট।
- তোমার কষ্ট হচ্ছে বাবা?
- হচ্ছে। তোর আম্মারও আজ বড় কষ্ট রে।
- আমারও কষ্ট হচ্ছে। দাদু আর মর্নিং ওয়াকে বেরোবে না।
- আমার সাথে বেরোস মর্নিং ওয়াকে।
- দাদু গল্প বলত। গ্রীসের। রোমের। পারস্যের। মাচ্চুপিচুর।
- বলিস কী!
- হুঁ।
- আমি পড়াশোনা করে নেব। তোর সাথে মর্নিং ওয়াকের আগে।
- বাবা, চলো। সবাই ওদিকে।
- তুই তো বড় হয়ে গেছিস আজ থেকে। তুই একা ফিরে যা।
- তুমি অন্ধকারে একা যেতে পারবে বাবা?
- আমিও বড় তো। একা যেতে অসুবিধে হবে না।
- তুমি এখনও বড়?
- মানে? বড় হলে রিভার্স গিয়ার নেই।
- না মানে, দাদু বলত...।
- কী বলত?
- দাদু বলত দাদু মারা গেলে আমি বড় হয়ে যাব আর তুমি বুড়ো হয়ে যাবে। বাচ্চা আর বুড়োদের তো একা থাকতে নেই। তুমি আমার সাথে চলো।
- এরপর আর কথা হয় না। চলো সমু সর্দার।

বাপ-ছেলে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দামোদরের স্রোত ঘন হয়ে রাতকে গভীরে টেনে নিয়ে গেল।

মাইকেলের বিরক্তি

রাত আড়াইটে বাজলেই ফ্যাসফ্যাসে গলায় কথা বলার শব্দটা মাইকেলের কানে আসে। রোজ।
"আমি মরিনি, হাহাহা, আমি মরিনি", এক ঘেয়ে খ্যানখ্যানে গলা, তাতে চাপা উত্তেজনা। আনন্দ মাখা উত্তেজনা।
মাইকেল আজ আর থাকতে না পেরে কফিনের ডালা খুলে কবর থেকে বেরিয়ে এসে বলেই ফেললেন "আমি জানি জন, প্লেনক্র‍্যাশটা তুমি অবিশ্বাস্য ভাগ্যের জোরে সার্ভাইভ করেছিলে। তাই বলে এই বিশ্রী শো অফ?"।
জন "এক্সকিউজ মি" বলে সিচুয়েশন হালকা করে চটপট বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। কবরে ঢোকার আগে মাইকেল দেখতে পেলে তার এপিট্যাফের ওপর কাঁচা ভাবে কালো পেন্ট দিয়ে লেখা "প্লেনে ভেঙে কেস খেয়েছে জব্বর"। নিচে জনের সই। উফফ। বদের বাসা একটা।

***

হুড়মুড় করে বেরোবার সময় মিশেলের সাথে দেখা হল জনের।
- ফের তুমি মাইকেলের সমাধির কাছে গেছিলে?
- হুঁ। রোজই যাই।
- অথচ ওর বিশ্বাস তুমি মানুষ। উফ! ভূত হয়ে আজ পর্যন্ত ভূত চিনতে শিখল না সে!
- বিশ্বাসটুকুই থাক না।আমার এ'সব ছেলেমানুষি ও সহ্য করে সহজেই, বেঁচে থাকতেও করত। দাম্পত্যে এটুকু খুনসুটি না থাকলে চলে বলো? কিন্তু নিজে মারা যাওয়ার পরেও, আমার মৃত্যুসংবাদ সহ্য করার ক্ষমতা মাইকেল অর্জন করতে পারেনি। ও পারেনি। আর ওর এ বিশ্বাসটুকু টিকিয়ে রাখতেই তো এই পাগলের চেষ্টা। বেচারার কবরের ঘুমটা অন্তত শান্তিতে হোক। এ ভালোবাসায় জ্যান্ত থাকতে তো শান্তি পেলে না সে। কবরে ভালো থাক অন্তত।

গোপন কোড

ছোকরা তখন থেকে ঘুরঘুর করছিল আমাদের পার্টি আপিসের আশেপাশে। হলুদ হাফ শার্ট আর জিন্স, হিরো সাইকেল। নিষ্পাপ অল্প গোঁফ চেহারা। আগ্রহী বলে মালুম হচ্ছিল।
- অ্যাই যে, ওই তোমাকেই বলছি। আরে এইয়ো, হলুদ টিশার্ট ভায়া। এদিকে এসো দেখি।
- আমি?
- হলুদ টিশার্ট তো আর ক্ষেন্তি পিসি পরে নেই।
- আজ্ঞে, ভিতরে আসব?
- আমিই ডাকছি তো, এসো।
- আজ্ঞে।
- বসো।
- আজ্ঞে।
- তা, কী মনে করে ঘুরঘুর করা হচ্ছিল?
- না ঠিক ঘুরঘুর নয়, ভিতরে আসতেই চাইছিলাম; শুধু সাহসে কুলোচ্ছিল না।
- নাম কী?
- আমার?
- ক্ষেন্তিপিসির নাম আমি জানি। এমনকি নিজের নামটাও।
- ওহ। আমি মদন। মদন সেন।
- তা মদনা, এদিকে কী চাই?
- আজ্ঞে আমি শুনেছি চোদ্দই ফেব্রুয়ারির আগেআগেই আপনারা রিক্রুট করেন। আমি এনরোল করাতে এসেছি।
- রেকমেন্ডেশন ছাড়া তো আমরা...।
- আজ্ঞে রেকমেন্ডেশন আছে। বামুনপাড়ার...।
- উঁহু। উঁহু। তার নাম চাই না। নাম চাই না। কোড নিশ্চই বলে দিয়েছে সে। সে'টা জানালেই তোমায় এনরোল করে নেওয়া হবে।
- কোড?
- গোপন কোড। জানো?
- আজ্ঞে।

মদন কাঁপা হাতে বুকপকেট থেকে এক পিস টসটসে সবুজ আঙুর টেবিলের ওপর রাখলে। সে আঙুর তুলে আমি মুখে পুরে দিলাম।
বিশ্রী টক আঙুর, মাথা ঝনঝন করে উঠল। বুঝলাম, ছেলেটা জেনুইন।
এক গাল হেসে বললাম "অখিল ভারত হনুমান সেনা পার্টির সদস্যপদলাভের যোগ্য তুমি। ভারতের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য বাঁচানোর জন্য ডাণ্ডা হাতে আগামী চোদ্দই থেকে তোমায় পথে নামতে হবে মদন"।


অমৃতেন্দু

অমৃতেন্দুর কপালটা মুখে রাখলেন বন্দুককুমার। 

স্নেহ। স্নেহ। 

কেউ স্নেহের চাঙড়টা দেখতে পেলেনা যখন বুক থেকে এক টুকরো পাঁজর খুলে অমৃতেন্দুর মনে গুঁজে দিলেন বন্দুককুমার।


**
সিঁড়িটা রোজ অমৃতেন্দুকে বেয়ে নেমে আসে অন্ধকারে। অমৃতেন্দু ছাদের রোদে সিঁড়ির হারিয়ে যাওয়া টের পায় না।

**
চাকরীটা অমৃতেন্দুকে জড়িয়ে ধরলে। চাকরীর বুক থেকে আঁচল খসে গেছিল। অমৃতেন্দু না বলতে পারেনি।

**
ট্রাম রোজ অমৃতেন্দুকে নামিয়ে উত্তরণ অনুভব করে। অমৃতেন্দু ভাবে সে কলেজমুখো হচ্ছে। অমৃতেন্দু ভাবলে এগজামিনে নম্বর, অথচ বুঝলে না যে এগজামিন তার কলার টেনে ধরেছে।

**
অমৃতেন্দুর ছাত্র ইতিহাস। মহেঞ্জোদারোরর স্বপ্ন কেসি নাগের অঙ্কের বইতে বুনেছে সে। অথচ জয়েন্ট অমৃতেন্দুতে সেঁধিয়ে একাকার ঘটালে।