Friday, January 29, 2016

দীপক চ্যাটার্জীর বিকেল


বিকেলটা বড় হতে হতে কমলা হলুদে আকাশ ঢেকে ফেলেছিল। হাওয়ায় অল্প ধুলো,  ভিড়ের গন্ধ, মরা শীত আর মিঠে হইহইয়ের ঘুঙুর।

দীপক চ্যাটার্জীর একটা হাফ লিটারের জলের বোতলে চুমুক দিলেন। শীতটা চলেই গেল। বিকেল দানা বাঁধার সাথে সাথে মেলায় লোক বাড়ছে। বইয়ের বড় স্টলগুলোর ধারে কাছে ঘেঁষা মুশকিল হয়ে উঠছে। ঘড়ি দেখলেন দীপক, এই নিয়ে গত তিন মিনিটে অন্তত সতেরোবার। লিটল ম্যাগাজিনের ওদিকে একবার যাওয়া দরকার; কোন ছোট প্রকাশক অমূল্যদার একটা কবিতার বই ছেপেছে। কোন এক টেবিলের কোন এক কোণে সে বই রাখা; কেনা দরকার। কবিতার জন্য নয়, অমূল্য বসুর জন্য। বেনফিশে একবার যাওয়া কর্তব্য। সাতটা নাগাদ সুমনরা আসবে। তার আগে যেটুকু সময়। দীপকের অবশ্য মেলাটেলা ভালো লাগে না, উনি কলেজ স্ট্রিটের ভক্ত। কিন্তু যার ভালো লাগে সে এখনও এলো না। কুন্তলিকা বিরক্ত হয় দীপকের বইমেলার প্রতি অবজ্ঞায়। কুন্তলিকা সেন জোর দিয়ে বলে থাকেন বইমেলার স্নেহ যে আবিষ্কার করেনি সে হয় অলস বা নয়তো সে বইয়ের চরিত্র সম্যক বোঝে না। সে বলে; গাদাগাদা বই পড়লেই বইকে বেশি ভালোবাসা যায় না; যুক্তি দিয়ে সে বলে গান্ধারীর গায়ে কি যশোদার চেয়ে বেশি মা-মা গন্ধ? 

দীপক এ'সব শুনে হাসেন। কিছু বলেন না। কুন্তলিকার জন্যই তার আলস্য ভেঙে বইমেলায় আসা। প্রতি বছর। হলুদ শাড়ির  কুন্তলিকার মধ্যে অবিকল সঞ্জীবের "দশটি কিশোর উপন্যাস সমগ্র" উঁকি মারে - গায়ে ফুল ফুল ছোপ, নরম সঞ্জীবে আবদার জুড়ে থাকা সমস্তটা। মন ভার করা ভালোবাসা নামে ওর গা দিয়ে, ওর গায়ে মিশে যেতে ইচ্ছে করে প্রচ্ছেদে কিশোর মুখের স্কেচটির মত। বইটার শুরুতে সঞ্জীব লিখেছেন "আমার মা-কে"। দীপক জানেন হলুদ শাড়ি সবুজ ব্লাউজের কুন্তলিকাকে নিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে বসে বসে কুইকুই করা যায়। 

কুন্তলিকা সেন বড় হতে হতে দীপক চ্যাটার্জীর আকাশ ঢেকে ফেলেছিল। হাওয়ায় কুন্তলিকার হাসি, ওর ধমকের গন্ধ, মরা ছোটবেলা আর মিঠে ক্রীমের ঝিমঝিমে গন্ধ। 

দীপক চ্যাটার্জীর হাফ লিটারের জলের বোতলে আরেকটা চুমুক দিলেন। এবার ফোন করার সময়।

- এলি না?
- আসার কথা ছিল?
- ছিল না?
- তোর সামনে থাকলে কান মলতাম।
- আচ্ছা।
- তোর কান মলতাম।
- কেন?
- তুই বইমেলায় বই ছেড়ে হাভাতের মত আমার দিকে তাকাতিস বলে।
- ভারি যেন তোর দেখা পাই।
- আমার যেতে ইচ্ছে করছে।
- বাজে কথা।
- সবটাই তো বাজে কথা, না বাবু?
- একা এ মেলা আমার বাজে লাগে রে।
- ছোটবেলা থেকেই লাগত। 
- তোর তো ভালো লাগত!
- তা লাগত।
- তাহলে আয় না।
- কাল আসব।
- আসবি?
- মা কালী। বেগুনী খাওয়াবি?
- আর ফিশ ফ্রাই।
- আমি বইমেলায় ফিশ ফ্রাই খাই না। 
- বড় স্টলে ঢুকব না।
- বেশ। আর তুই হাভাতের মত তাকাবি না?
- তাকাবো না। মা কালী।
- বাবু। আমায় নিয়ে যা। এখুনি।
- সাতটায় সুমনরা আসবে। নয়তো যেতাম।
- যত বাজে কথা।
- আমার ভালো লাগে না কিচ্ছু। এ মেলা কেমন গুমোট।
- আমায় বইমেলায় চুমু খাবি বাবু?
- এবার কে হাভাতে?
- গালে। হালকা চুমু। হাওয়াও টের পাবে না এমন নরম।
- তুই আজকাল বড় অল্পে কেঁদে ফেলিস কিচি।
- তুই বড় মাতব্বর হয়েছিস দীপু। যা ভাগ।

বাজে কথা বড় হতে হতে ঝাপসা চোখ আর কাঁপা গলায় আকাশ ঢেকে ফেলে। বিকেল ছাপিয়ে সন্ধ্যা আসে। আসে কত বছরের ধুলোয় আবছা হয়ে আসা ছেলেবেলা, আসে কত হাজার কিলোমিটারের তফাৎ আর দু'টো গাম্বাট সংসারের ফারাক।

স্নেহ বড় হতে হতে আকাশ সঞ্জীবে ঢেকে ফেলে। একলা-থাকার দল আদরের সুরে আর বইমেলার ঢেউয়ে নরম হয়ে আসে। 

কুন্তলিকা সেন কোনদিন বইমেলায় আসবেন না। বইমেলা ছাড়বেন না দীপক চ্যাটার্জি। একা সঞ্জীব নিরিবিলিতে সমস্ত ব্যথার গল্প হাসির কালিতে নোটবইতে লিখে রাখবেন। সেটুকুই ভরসা।

Thursday, January 28, 2016

অনুভব দাসগুপ্তর স্বপ্ন

- ডাক্তারবাবু, একটা ছোট ব্যাপার। 
- হ্যাঁ বলুন। 
- না বলছিলাম। আপনার সেক্রেটারি স্লিপে আমার নাম লিখেছে অনুভব দাসগুপ্ত। 
- আপনি তো অনুভব দাসগুপ্তই অনুভববাবু। 
- না মানে, একটা স্পেস আছে। দাস আর গুপ্তের মাঝে। দাস স্পেস গুপ্ত আর দাসগুপ্ত টেকনিক্যালি ঠিক এক বলা যায় না...। 
- আচ্ছা পিয়াকে বলে দেব পরের বার ঠিক করে লিখতে। 
- না মানে। এবারে ঠিক করা যায় না?
- এটা তো মিনিংলেস্‌ একটা স্লিপ...। এইত্তো। আপনি চলে গেলে এটা ফেলে দেওয়া হবে। 
- তবু। ডাস্টবিনে সামান্য ভুল পড়ে থাকার চেয়ে না হয় ঠিক কিছু পড়ে থাকবে। 
- অ। এই যে। এই নিন স্লিপ। ঠিক করে নিন। 
-  কেটে ঠিক করব?
- অবভিয়াসলি। 
- বলছিলাম ডাক্তারবাবু, আপনার পেনটা কি কালো কালির? 
- কেন?
- না মানে, আমার পেনটা নীল। আর আপনার সেক্রেটারি কালো কালিতে এই স্লিপে লিখেছিলেন। 
- এই যে কালো পেন। 
- থ্যাংকস। এই নিন। স্লিপটা ঠিক করে দিয়েছি। 
- আর ইউ অ্যাট ইজ্‌ নাউ মিস্টার দাস স্পেস গুপ্তা?
- ইজ্‌? ইজেই তো নেই। সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা। 
- রাইট। ঠিক। বেশ। বলুন তাহলে। শুরু থেকে বলুন। অসুবিধেটা কী, কেন আপনি ট্রাব্‌লড হচ্ছেন। মন খুলে বলুন। উই হ্যাভ অল দ্য টাইম দাসগুপ্তবাবু। 
- আসলে ব্যাপারটা একটু জটিল। 
- সেটা আমায় ঠিক করতে দিন। 
- আচ্ছা বেশ। 
- বলুন। 
- শুরু থেকে বলব?
- শুরু থেকে। 
- শুরুটা গত পরশু সকাল থেকে। 
- পরশু সকাল?
- হ্যাঁ। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই। 
- কীরকম প্রবলেম ফিল করতে পারলেন ?
- ফিল করতে পারলাম মানে। ঘুম ভাঙল বটে। কিন্তু আড়মোড়া ভাঙার সময় স্পষ্ট মনে হল ঘুমটা ভাঙেনি। 
- ঘুম ভাঙার পর মনে হল ঘুম ভাঙেনি?
- এগজ্যাক্টলি। 
- কেন এটা মনে হল? 
- বেড শিটটা দেখে প্রথম সন্দেহ হল। 
- কীরকম?
- লখনৌ থেকে চিকন কাজের বেডশিট কিনেছিলাম এইট নাইনে। শৌখিন চাদর কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের লোভ সামলাতে পারিনি। নষ্ট হয়ে গেছিল। কিন্তু পরশু উঠে দেখলাম সেই চাদর পাতা, যেন দু'দিন আগে কেনা। চেকনাইটাই আলাদা। 
- ইন্টারেস্টিং। 
- তারপর ধরুন খানিক পরেই সুতপা চা নিয়ে এলো। 
- সুতপা?
- আমার মিসেস্‌। ইয়ে, এক্স মিসেস্‌। নাইনটি ওয়ানে ডিভোর্স হয়। ডিভোর্স দেয়। 
- ডিভোর্স দেওয়া বৌ আপনার ঘুম ভাঙার পর চা নিয়ে ঘরে ঢুকলে?
- এগজ্যাক্টলি। এমন ভাবে যেন কিস্যুটি হয়নি। 
- এক্সট্রিমলি ইন্টারেস্টিং। উনি চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন এমন ভাবে যেন আপনাদের সেপারেশন হয়নি। যেন আপনারা এক সাথেই আছেন, তাই তো?
- কারেক্ট।  
- তারপর?
- বাপ্পা। 
- বাপ্পা? সে'টা কে?
- একটা বারো বছরের ছেলে। 
- আপনার ছেলে?
- সে তো সে ক্লেমই করছে। সুতপাও অবভিয়াসলি তাল দিচ্ছে। 
- কিন্তু আপনার ধারণা সে আপনার ছেলে নয়। তাই তো?
- সুতপার সাথে সেপারেশনের আগে আমাদের কোন ইস্যুই হয়নি। তো পরশু থেকে সেই উড়ে এসে জুড়ে বসা চিজ আমায় কন্সট্যান্ট বলে চলেছে 'বাবা বইমেলা নিয়ে চলো, বইমেলা নিয়ে চলো'। বুঝুন ঠ্যালা। 
- সাঙ্ঘাতিক। তা, স্বপ্নের সিম্পটম আর কী কী দেখছেন?  
- মা। 
- আপনার?
- অবভিয়াসলি। 
- তা উনি কী...। 
- দিব্যি আমার সামনে ঘুরঘুর করছে। পাটিসাপটা অফার করছে। অথচ নাইনটি ফোরে নিজের হাতে নিমতলায় পুড়িয়ে এসেছি মাকে। 
- ওহ্‌। টেরিব্‌ল ব্যাপার। 
- টেরিব্‌ল বলে টেরিব্‌ল ডাক্তারবাবু? মায়ের স্নেহটেহ এক জিনিষ। কিন্তু ভূত ইজ ভূত। ডিফারেন্ট লেভেলের ব্যাপার তো। 
- ঘটনা। তা, আর কোন সিম্পটম?
- আছে। 
- যেমন?
- কলকাতা। 
- কলকাতা?
- মা মারা যাওয়ার পরের বছরই তো আমি কটিহারে চলে গেলাম। তখন থেকে তো সেখানেই। এক কামরার ভাড়া বাড়ি আর এক দেহাতি চাকর। দ্যাট ইজ অল। অথচ দেখুন। ঘুম ভেঙ্গে উঠলাম কলকাতায়। আপনার চেম্বারে এলাম, সেটা আমহার্স্ট স্ট্রিটে। 
- সাঙ্ঘাতিক। আর কোনও সিম্পটম আছে?
- পিয়া। আপনি। 
- সে কী। কী রকম?
- পিয়া, মানে আপনার সেক্রেটারির চেহারা অবিকল মিতার মত। 
- মিতাটা আবার কে?
- আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আমার একটু ব্যথা ছিল। ম্যাটেরিয়ালাইজ করেনি। 
- আচ্ছা। তাহলে আপনি বলছেন নতুন আলাপের চেহারাগুলোও আপনার চেনা চেহারা ধার করে তৈরি হচ্ছে। 
- ক্লিয়ারলি। 
- আর আমায় কার মত দেখতে লাগছে?
- আপনার মুখটাও স্বাভাবিক ভাবেই বেশ চেনা লাগছে। তবে ঠিক ধরতে পারছি না বুঝলেন। পাড়াতেই কোথাও দেখেছি। সে মনে পড়ে যাবে। তবে অত্যন্ত চেনা চেহারা।  
- হুম। তাহলে গোটাটাই যখন স্বপ্ন, তখন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এলেন কেন দাসগুপ্তবাবু?
- দু'দিন অপেক্ষা করলাম স্বপ্ন ভাঙার। কিস্যুতে কিস্যু হল না। মায়ের শুচিবাইয়ের বাতিকে জান কয়লা করে দিচ্ছে। সুতপার হাজার বাই। আর বাপ্পা নামের ইম্পস্টারটাকে গতকাল বইমেলা নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি। 
- কিন্তু আমিও যদি আপনার স্বপ্নে থাকি, তাহলে আপনার কী উপকার আমি করতে পারব মিস্টার দাসগুপ্ত?
- না মানে। সব কিছু সত্ত্বেও যদি ব্যামো আমারই হয়ে থাকে? ওয়ান পার্সেন্ট চান্স। তবু। তাই ভাবলাম...আর কী।  

***ছ'মাস পরে***

- নমস্কার মিস্টার দাসগুপ্ত।
- নমস্কার প্রেসিডেন্ট স্যার। বড় বিড়ম্বনা হয়ে যাচ্ছে। আমায় এমন আটকে রাখার মানে কী?
- মানেটা সহজ। ভীষণ সহজ। একটা গোটা দুনিয়া আপনার স্বপ্নে গড়ে উঠেছে। সে দুনিয়ায় অর্থনীতি, বিজ্ঞান সমস্তই আছে। আমার মত রাষ্ট্রনেতারা আছে। কিন্তু আপনার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে দুনিয়াটা ভেসে যাবে। আমরা কেউই থাকব না। শহর, গ্রাম, জিডিপি সমস্ত মিথ্যে হয়ে যাবে। 
- তাই বলে আমায় বেঁধে রাখা?
- আপনার স্বপ্নকে ভাঙতে না দেওয়ার আর কোন উপায় ছিল না। চলি...।
- প্রেসিডেন্ট সাহেব...! 

***

- কী গো! অমন ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভেঙ্গে উঠলে কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছ?
- হ্যাঁ মানে...। 
- এত ঘামছ কেন! উরিব্বাবা! কী অবস্থা। কী স্বপ্ন দেখলে গো?
- স্বপ্নে দেখলাম...স্বপ্নে দেখলাম...। 
- কী দেখলে গো?
- স্বপ্নে দেখলাম আমি ডাক্তারের কাছে গেছি। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। 
- নিজে সাইকিয়াট্রিস্ট হয়ে তুমি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেছ?
- অন্য নয়। অন্য নয়। আমি নিজে নিজেরই কাছে পেশেন্ট হয়ে গেছি। 
- কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড। কেন গেছিলে...?
- এ কী! এ কী সুতপা!
- কী হল? কী হয়েছে?
- সুতপা! এই চিকনের বেডশিটটা আবার কোত্থেকে এলো? এটা তো নষ্ট হয়ে গেছিল অনেক বছর আগেই! এটা এখানে এলো কী করে?
- তোমার হয়েছেটা কী বল তো? গত হপ্তাতেই তুমি লখনৌ থেকে এই চাদর কিনে নিয়ে এলে! কী যে বলছ। যাক ভোর হয়েছে। আমি বরং তোমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসি। আর শোন, আগামীকাল কিন্তু তোমায় বাপ্পাকে একবার বইমেলা থেকে ঘুরিয়ে আনতেই হবে। ছেলেটা বড্ড আবদার করছে। কেমন?  

...ভূত তো নয়

এত ওপর থেকে বাইনোকুলারে চোখ রেখেও কেঁপে উঠতে হয়।

ওই যে। এক্কেবারে নিচে। দৈত্যটা একটা মাদুর পেতে শুয়ে। এতটা নিচে যে তাকাতেই পেটের ভিতরটা কেমন গুলিয়ে আসে। কিন্তু উপায় নেই। দৈত্যটার কাছে পৌঁছতেই হবে।

এক বুক নিঃশ্বাস নিয়ে মনটাকে গুছিয়ে নিলাম। ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া গতি নেই। সাবধানে নামতে হবে দৈত্যটার পাশে। এমন ভাবে নামতে হবে যাতে খুব একটা চোট না লাগে। এত উপর থেকে ঝাঁপানো, চাট্টিখানি কথা?

এমনটা তো নয় যে আমার পিঠে প্যারাশুট বাঁধা, ঝাঁপ দেবো আর টপাৎ করে তা খুলে যাবে আমি পালকের মত ভাসতে ভাসতে নেমে আসব। এ এক্কেবারে ডাইরেক্ট ঝাঁপ, শোঁশোঁ করে নেমে আসা আর তারপর দুম ধপাৎ।
কিন্তু উপায় নেই। নেই উপায়।

জয় মা বলে দিলাম ঝাঁপ।

আহহ। ছড়েছে অল্পবিস্তর। পিঠে কিছুটা মোচড়। তবে আহামরি নয়। টিকে যাব। সোজা গিয়ে ঠেলা দিলাম দৈত্যটাকে।

- "ভায়া শুনছেন?", নরম করে ডাকলাম।
- "আ...আ...", অমন দশাসই চেহারা নিয়ে কেউ অমন করে ঘাবড়ে যাবে ভাবিনি।
- "আ আ কী করছেন"।
- "বই...বই..."।
- "আহ! বইই তো। ভূত তো নয়", অভয় দিতেই হল।
- "বই কথা..কথা বলছে..."।
- "বই বই আবার কী? আমার একটা নাম আছে তো। শিব্রাম সমগ্র। শিবসম বলেও ডাকতে পারেন। যে জন্য
এত ঝামেলা করে আসা। বলি গত বই মেলায় দিব্যি আমায় নিয়ে বাড়ি এসে সেই যে ওপরের তাকে চালান করলেন, তারপর তো একবারের জন্যও উলটে দেখলেন না। আমার আত্মায় যে জং ধরছে। ভিতরটা শুকিয়ে আসছে। আবার আর এক পিস বই মেলা এসে গেছে। আরও দেখনাই কেতা মেরে বেওয়ারিশ কেতাব খরিদ করে তাক বোঝাই করবেন আর পড়বেন না, সে'টি হচ্ছে না। হয় আমায় পড়ুন, নয়তো ছাড়ছি না। ও মশাই, অজ্ঞান হলেন নাকি? ও মশাই?

চশমার খোঁজ

চশমাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড় মুশকিল হল। পড়ার টেবিল থেকে বাথরুমের তাক থেকে মাথার উপর, খুঁজতে কসুর করিনি। কিন্তু কোথাও নেই। ভুলুকে জিজ্ঞেস করলাম যদি সে চশমা কমোডের ভিতরে রেখে এসে থাকে, সে বোধ হয় ল্যাজ নেড়ে জানালে তেমন কিছু ঘটেনি।

শ্রীতমার মোবাইলে ফোন করলাম। খেইমেই করে উঠলে। বারো বছর আগে দূরে গেছে বলে এখনকার চশমার খবর রাখবে না? এ কি মনুপ্রণীত বিধান? মহামুশকিল।

সিগারেট জ্বালবার চেষ্টা করলাম। বুঝলাম চশমা চোখে না থাকলে সিগারেটের স্বাদ পালটে যায় আর ফিল্টারের মাথায় দেশলাই লাগানোর কোনও মানে হয় না।

চশমা আর কোথায় থাকতে পারে? কী মনে হওয়ায় চট করে একটু ফ্রীজের ভিতর হাতড়ে দেখে এলাম। নেই। আর ফ্রীজে মেয়োনিজের বদলে ময়শ্চারাইজিং ক্রীম রয়েছে। সেটা এক প্রকার অনভিপ্রেত ভাবে জানলাম। জিভের তো চশমা লাগে না।ফিরে এসে ড্রেসিংটেবিল থেকে ময়শ্চারাইজিং ক্রীমের ডিবেটা তুলে আবর্জনার বাক্সে ফেলে দিলাম। চিন্তা বাড়ছে। 

এখনও বিকেলের মরা আলো রয়েছে। অবশ্য ভেবে দেখলে টিউবলাইটও রয়েছে। কীসের ভাবনা? আলো কম বলেই হয়তো নজরে পড়ছে না। লাফ দিয়ে উঠে টিউবলাইটের স্যুইচ দিলাম। বনবনে ফ্যানে ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করল। ফিরে গিয়ে স্যুইচ বন্ধ করলাম। টিভিটা বন্ধ হয়ে গিয়ে একপ্রকার নিশ্চিন্দি। শুধু খুন রাহাজানি আর স্ক্যান্ড্যাল।

মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে হবে। দিনটা রিওয়াইন্ড করতে হবে। চশমাটা গেল কোথায়? দয়াল চলে আসায় সুবিধে হল। দয়ালকে বললাম চট করে এক কাপ লিকার চশমা বানিয়ে আনতে আর চা খুঁজে দেখতে। দয়ালটা আবার দিনদিন বখে যাচ্ছে বা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে বা দু'টোই। সে ইশারায় যা জানালে তার মানে হয় যে আমার চশমার নেশা বা চোখে চা কোনটাই নেই। এসবই নাকী আমার মনগড়া। বোঝ। লে হালুয়া। দয়াল "ঘরের যা অবস্থা করে রেখেছ, সাফ না করলেই নয়" বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলে কিন্তু খপাৎ করে তার আঁচল কামড়ে হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে ডাকলাম।

তক্ষুনি মাথায় এলো; দয়াল তো পাজামা আর ফতুয়া পরা মানুষ। তাঁতের আঁচল এলো কোথা থেকে?
শ্রীতমার কোঁচকানো ভুরু সহসা নরম হয়ে এলো।
"এমন ছটফট কর কেন বুড়ো? কত চিন্তা আমার তোমায় নিয়ে", শ্রীতমার গলায় শিউলির কারখানা আছে। আমার পার্সোনাল থিওরি।

আর একটা বিশেষ ব্যাপার আছে শ্রীতমার কণ্ঠস্বর আর ওর গায়ের গন্ধে। চোখের ঘোলাটে ভাবটা কেটে গেল বিলকুল। রোজ যেমন যায়। মনের শ্যাওলাও ডেটলে ফিনাইলে সাফ হয়ে যায়। দয়ালের বারো বছর আগের চলে যাওয়া স্পষ্ট মনে পড়ে। বড় ভালোবাসার মানুষ ছিল, কোলেপিঠে বড় তো ওই করেছে। শ্রীতমাকেও বড় আদরের সাথে সামাল দিয়ে রাখত। বারো বছর আগে ওর বেমক্কা চলে যাওয়া; উফ। ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, চোখ চিকচিক করে, বুক চিনচিন করে।

চট করে একবার দয়ালের ছবির সামনে গিয়ে কুঁইকুঁই করে স্বীকার করে এলাম যে চশমা হারানোর অভ্যাস আদতে তার, আমার নয়। আর লেজ নাড়ার ডিপার্টমেন্টটা আমার। এবং আমি থাকতে তার ছবির ফ্রেমের নাম ভুলু হবে কেন? সে ছবির ফ্রেমকে ভুলু বলে ডেকেছি বলে লেজ নেড়ে, ঘেউ সুরে একটা অথেনটিক "সরি"ও বলে ফেললাম।

মই বেলা



- বইমেলা ইজ দ্য ফাইনেস্ট টাইম অফ দ্য ইয়ার।
- অবশ্যই। অবশ্যই। বইমেলার মেজাজটাই আলাদা। পড়ন্ত বিকেলে নাক-মন জুড়ে নতুন বই মেশানো গন্ধ। জমজমাট আড্ডা আর ফিশফ্রাই। স্বর্গ এখানেই। এখানেই। এখানেই।
- না না। সে'জন্য বলছি না।
- তবে? বইমেলায় প্রেম? হ্যাঁ সেটাও একটা...।
- না বস। সে'সবের জন্য না।
- ওহ। লিট্‌ল ম্যাগাজিন। কবিতা নিয়ে আড্ডা।
- না না। সেস'ব ব্যাপার নয়।
- দেন হাউ ইজ বইমেলা দ্য ফাইনেস্ট টাইম অফ দ্য ইয়ার?
- কারণ এই সময়টা কলেজ স্ট্রিটের বেফালতু ভিড়টা একটু কমে। রিয়েল প্লেজ্যান্ট অ্যাফেয়ার।