Monday, January 11, 2016

উঠোনচরিত

সমস্ত শেষে। 
সমস্তটার শেষে। 

একটা উঠোন পড়ে থাকবে। নতুন ইমারতের অবজ্ঞার ছায়ায়, খিড়কীর অন্ধকারে পড়ে থাকা শ্যাওলা-ঘাস মেশানো মাটির উঠোন। নোনা ইটের ভাঙা পাঁচিলে তিন দিক ঘেরা।  শুধু পশ্চিম কোণে একটা পুরনো ভাঙা টালির ঘর। বাড়ির পুরনো রান্নাঘর। ফেলে আসা রান্না ঘর; এখন ভেঙ্গেচুরে টুটি-ফাটা। তার আধভাঙা দরজায় পুরনো সবুজ, লোহার শিকলে মরচের তালা। সে ঝুরঝুরে রান্নাঘরের গায়ে ভাঙা ফিক হাসির একটা জানলা। 

উঠোনময় আগাছা আর ভাঙা ইট। উত্তরের দেওয়াল ঘেঁষে দু'টো নারকোল গাছ আর একটা সুপুরি গাছ। পূব দিকে জাম গাছ। ঝাঁকড়া। ছায়া মাখানো। আর মধ্যেখানে পাশাপাশি দু'টো গাছ। একটা জামরুল। অন্যটা গন্ধরাজ।

গন্ধরাজ গাছটা পাকিয়ে উঠে গেছে। সে ফুলের গন্ধে, ঘাস শ্যাওলার মেজাজ মিশে যায়। তাতে চোখ ছলছলেও মিঠে স্বাদ মিশে যায়;  এমনি সে সুবাস।  সে গাছে আধো-হেলান দিয়ে দু'জনে দাঁড়ানো যায়।  পাশাপাশি। আলতো গা ঘেঁষে। 

- বাবু! বড় কষ্ট! বমি থামছে না। 
- জল মুড়ি। 
- হোয়াট?
- জল মুড়ি। খা। পেট ঠাণ্ডা করবে। মনও।
- বাঙাল শালা। 
- তোর পায়ে আলতা এমন মানায়। তোর  মুখে শালা কেন?
- ন্যাকাচন্দ্র খাসনবীশ। এদিকে আমি মরছি নিজের জ্বালায়, আর উনি বলেন জল মুড়ি। 
- বেশ। মোহনবাগানি বমি চালিয়ে যা। 
- আবার পাচ্ছে। 
- ডেলিভার কর। ডেলিভার কর আর নুন চিনির জল ঢকঢক করে গিলে যা। অল্টারনেট সাইকেলে।  
- বাবু! আর পারছি না। শরীরটা দুমরে-মুচড়ে যাচ্ছে। 
- স্টেডি বমিকুমারী। স্টেডি। 
- পাশে বস। 
- আসছি।  
- তুই বলিস, তুই আসিস কই? 
- এই আসি। 
- আয়। আসি বলিস। আসিস না। 
- মোহনবাগানের সংসার। ইস্টবেঙ্গলের সংসার। মাঝে মিনিমাম ন'হাজার মাইলের গ্যাপ। গ্যাপ হজম করতে সময় লাগবে না? এই এসে পড়লাম বলে। 
- এসে পাশে বসিস বাবু। 
- জরুর বয়ঠেগা। 
- মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি?
- দিবে। হামি আশীর্বাদ দিবে। আমি বড়। আশীর্বাদ দিতেই পারি। 
- ধুর শালা। 

হাজার হাজার মাইল মোমের মত গলে পড়ে। থিতিয়ে যায় মোমদানির পেটে। ন্যাকাচন্দ্র আস্তে হাঁটেন কী না। 

ওদিকে।
বমিদেবী গন্ধরাজ গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। বিরানব্বুই পেরিয়ে তার বয়স পনেরোয়। 
ন্যাকাচন্দ্র ক্লান্ত। পায়ে ফোস্কা, মুখে ল্যাতপ্যাতে হাসি। তিরানব্বুইয়ের মায়া কাটিয়ে তার বয়স তখন ষোল। 

মোহনবাগানের কাঁচা হাতের হলুদ শাড়ির কুচির মত অগোছালো ইস্ট বেঙ্গলের চুল। 

- বাবু। এসেছিস? 
- বমি বমি ভাবটা আর আছে?
- তুই এলি। কেটে গেল। 
- বাষট্টি বছর বমিভাব বয়ে বেড়ালি? তোর ন্যাকামিতে আমার বমি আসছে। 
- বেশ। আমি তাহলে নেকিকুমারী। আর তুই বমিচন্দ্র পরামানিক। 
- তোর চোখে জল। 
- গাধা। আমার পায়ে আলতা। 
- তোর পায়ে আলতা মানায়। 
- আমরা এই গাছের নিচে দিব্যি মানিয়ে যাই। বল?
- এবার। মাথায় হাত রাখ। 
- চেঞ্জ অফ মাইন্ড। তোর পায়ের কাছে বসি। 
- আলতা হাভাতে। 
- শাড়ির কুচি এবড়ো খেবড়ো তোর। 
- ধরে দে। ঠিক করে নিই। 
- ধরে দে বললে শাড়ির কুচি ধরা যায় না। 
- ধরে দাও। 
- যো হুকুম। 
- তুই বড় পাকা হয়েছিস বাবু। 

Saturday, January 9, 2016

এদিক ওদিক

১। 
- মামা! তোমার মিত্তির-গাঙ্গুলি কোচিং সেন্টারের আইডিয়াটা ক্লিক করল? বিজ্ঞাপনে সাড়া কেমন?
- গম্ভীর কেস।
- গম্ভীর? আবেদনপত্র জমা পড়েনি? 
- কোচিং সেন্টারে দু'টো কোর্স...। 
- "হাউ টু বি ফেলুদা" আর "হাউ টু বি জটায়ু"। তাই তো?
- প্রিসাইসলি।
- দু'টোতেই পঞ্চাশটা করে সীট রেখেছিলে, তাই তো?
- ঠিক।
- বিজ্ঞাপন অনুযায়ী অ্যাপ্লাই করার শেষ দিন তো আজ ছিল।
- ঠিক।
- অ্যাপ্লিকেশন কেমন জমা পড়েছে?
- "হাউ টু বি ফেলুদা"র জন্য দেড় হাজার অ্যাপ্লিকেশন। 
- দারুণ তো। কাঁপিয়ে দিয়েছ তো। আর "হাউ টু বি জটায়ু"র জন্য? ক'টা?
- একটা।
- অনলি ওয়ান আবেদনপত্র? সে কী মামা! তাহলে একটা কোর্স ক্যান্সেল? 
- নো স্যার। সে সাহস পাচ্ছি না।
- হোয়াই? পঞ্চাশটা সীটের জন্য একটা অ্যাপ্লিকেশন! কোর্স চালাবে কী করে?
- চালাতে হবে।
- কেন? চালাতে হবে কেন?
- কারণ সেই একমাত্র আবেদনকারীর নাম হল শ্রী প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।


২। 
ফেলু মিত্তিরের চোখের চিকচিকে,
ওর কথার ধারে, 
ওর অনুসন্ধিৎসু কপালের ভাঁজে,
ওর যুক্তির জাল পাতার স্টাইলে,

সেই মানুষটির ছায়া স্পষ্ট দেখতে পেলেন তিনি।
ফেলুর মিত্তিরের মধ্যে নিজের লালমোহনকে খুঁজে পেলেন শ্রী শার্লক হোম্স।

কলকাতার রবিনহুড

- জানালাটা বন্ধ করুন।
- আজ্ঞে?
- পিছনে হুহু করে ঠাণ্ডা আসছে।
- কলকাতায় আবার ঠাণ্ডা। আর বাস চলেছে তো ইষ্টিকুটুমের স্পীডে।
- আমার ঠাণ্ডা লাগছে!
- আমার মাফলারটা নেবেন নাকি?
- জানলাটা বন্ধ করুন!
- ঠাণ্ডা যেমনটা ভাবছেন তেমনটা নেই কিন্তু। ভালো করে খেয়াল করে দেখুন। জ্যানুয়ারি বটে কিন্তু একটা মার্চ মার্চ বোটকা ব্যাপার কিন্তু আছেই।
- আচ্ছা মুশকিল। ঠাণ্ডা আমার লাগছে। অত কথায় কী? বাসে আর কেউ জানালা খুলে বসেছে? আপনার অত তেল কেন?
- অমন বলবেন না স্যার। সেওয়াগও তো এক্সেপশনাল ছিলেন; তাই বলে কি দ্রাবিড় তাকে জিজ্ঞেস করছে "অত তেল কেন"?
- আরে ধুর। অত কথা কীসের? জানালাটা নামান! নাউ!
- সেওয়াগ সেবার ছয় মেরে ডাবল সেঞ্চুরি করতে গিয়ে আউট হল। আপনি কি শুধু আউট হওয়াটা দেখেছিলেন? রোম্যান্সটা দেখেননি?
- মহামুশকিল।
- মুশকিল? আসান হয়ে যাক। এই নিন। জানালা বন্ধ।
- বোঝ। এতক্ষণ ভ্যানতারা করার মানেটা কী?
- রবিনহুড কি মানে মেপে কাজ করে স্যার?
- রবিনহুড?
- এই যে। শীত কাঙাল কলকাতায় মিনিট পাঁচেকের কাঁপুনি লুঠ করে এনে আপনাকে অফার করলাম। আপনার আত্মা চাট্টি ঠাণ্ডা হাওয়ার থাবড়া পেয়ে বাঁচলে।
- আদেখলাপনা।
- বেশ। রবিনহুড বলতে না চাইলে বলবেন না। জীবনবাবু, আপনি বরং আমায় বনলতা বলেই ডাকবেন।

Friday, January 8, 2016

কাঁপুনি

অনির্বাণবাবু কাঁপছিলেন।

খাট কাঁপছিল।

তাই বলে অনির্বাণবাবু খাটের ওপর ছিলেন না।

মেঝে কাঁপছিল।

অনির্বাণবাবু অবিশ্যি মেঝেতেও বসে ছিলেন না। শুয়ে ছিলেন না। এমনকি দাঁড়িয়েও ছিলেন না।

ছাত কাঁপছিল। দুমুর দুমুর দুমুর। সে'সময় অনির্বাণবাবু ছাতেও ছিলেন না।

অনির্বাণবাববাবু কাঁপছিলেন। ছাদে রাখা ফুলের টবগুলো কাঁপছিল। কিন্তু না। অনির্বাণবাবু যেহেতু ছাদে ছিলেন না, ফুলের টবগুলোর পাশেও তিনি ছিলেন না।

এবার আসি দেওয়ালের কথায়। হ্যাঁ। ছাদ মেঝে কাঁপলে দেওয়ালের না কাঁপাটা বোকামি। দেওয়ালে মা বগলা হার্ডওয়্যার স্টোরের ক্যালেন্ডারটাও খচর খচর করে কাঁপছিল। তাকের বইগুলো ঝুপুরঝুপুর করে ডাইভ দিচ্ছিলে মেঝের দিকে।

মনে রাখবেন, মেঝেও কাঁপছিল।

অনির্বাণবাবুও কাঁপছিলেন। কিন্তু তিনি ছাদে ছিলেন না, খাটে বা মেঝেতে ছিলেন না এমন কী দেওয়ালেও ঝুলছিলেন না।


অনির্বাণবাবু হাওয়ায় ভাসছিলেন। লজিক তাই বলে। লজিক ছাড়া রিয়ালিটি হয় না। অনির্বাণবাবু উত্তেজনায় কাঁপছিলেন।

বিশাখাদেবী অনির্বাণবাবুকে খেপচুরিয়াস হয়ে মাটিতে নামতে আদেশ করছিলেন। বার বার। যদিদং ভূমিকম্প মম, তদিদং ভূমিকম্প তব নয় কেন?

অনির্বাণবাবু অনেক চেষ্টা করেও বিশাখাদেবীকে বোঝাতে পারছিলেন না যে এরকম উড়ুক্কু মনোভাব দেখিয়ে আসলে তিনি মেরুদণ্ডের জোর দেখাতে চাইছেন না। স্ত্রৈণ সত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জা তার নেই। ভূমিকম্পের মুখে দাঁড়িয়েও নেই।

এটা একটা অনাবিল ঘটনা। ভূমিকম্প এলে অটোমেটিক ভেসে বেড়ানোর ক্ষমতাটা আগে জানতেন না বলে নিজেকে অপরাধি মনে হল তার। বিশাখা না জানি কী মনে করছে। বৌ জানেনা এমন কাজ করতে বা তেমন কোন ক্ষমতা বহন করতে অনির্বাণবাবুর লজ্জা লাগে। সরি। লজ্জা নয়। ভয় হয়।

ঝ্যামেলা মিটে গেলো যখন একদিকের দেওয়াল ভেঙে খান পাঁচেক ইট বিশাখার মাথায় এসে পড়ল। মেঝে কাঁপছিল তখনও, চাপ চাপ রক্তের ছোপও কাঁপছিল। রক্তের ছোপ মেঝেতে পড়েছিল কী না।

দু'সেকেণ্ডের দুঃখটা ফার্মেন্ট হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এলো অনির্বাণবাবুর বুক বেয়ে। বিশাখার দেমাক ছিল বটে, কিন্তু এদ্দিনে একটা মায়ার বলয় তৈরি হয়েছিল ওর চারদিকে। হাউ হাউ করে বুকের ভিতর থেকে কান্না বেরিয়ে এলো অনির্বাণবাবুর।

ঠিক তক্ষুনি।  বিশাখা একটু নড়ে উঠলেন। কাঁপুনি নয়। সে তো আছেই। মেঝে কাঁপছে তো। নড়ে ওঠা। সামান্য। ঠিক সেই মূহুর্তে অনির্বাণবাবু টের পেলেন তিনি কাঁদতে চাইছিলেন না;  আচমকা এ নড়ে ওঠাও তিনি দেখতে চাইছিলেন না। আচমকা অনির্বাণবাবু পিঠের মধ্যে শক্ত কিছু একটা টের পেলেন। ভাসতে ভাসতে কোনও ক্রমে দেওয়ালের কাছে গিয়ে খান চারেক ইট তুলে সপাটে ছুঁড়লেন বিশাখাদেবীর দিকে।

ব্যাস। নো মোর নড়নচড়ন।  ওনলি কাঁপুনি, মেঝের কাঁপুনির সাথে এক সুরে। আর কিছু বাড়তি কাঁপা কাঁপা রক্তের চাপ। মেঝেতেই।

এতক্ষণে হাসি ভাসলো ভাসমান অনির্বাণবাবুর মুখে। আর তার দু'সেকেন্ডের মাথায় নিজের শক্ত পিঠে দু'টো টোকা অনুভব করে পিছন দিকে ঘুরলেন অনির্বাণ রায়।

ভাসমান বিশাখাদেবী গনগনে চোখে জানতে চাইলেন "তোমার পেটে পেটে এই ছিল?"।

বাপ্পার স্বপ্ন

স্বপ্নের এই একটা অ্যাডভান্টেজ। নিজের ঘুমন্ত শরীরে কম্বল টেনে দেওয়া যায়। পিঠের যে অঞ্চলে যে জেগে থাকতে হাত পৌঁছোয় না, সেখানে চুলকে দেওয়া যায়।

নিজের নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বড় ভালো লাগল বাপ্পার। ঘুমন্ত বাপ্পার চুলে বিলি কেটে দিয়ে ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারটায় এসে বসল বাপ্পা।

সিগারেটটা ধরাতে যাবে এমন সময় চোখ গেল রাস্তায়। স্ট্রিট ল্যাম্পের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে বাপ্পা। ব্যালকনি থেকে হাঁক দিতেই হল...

- কী ব্যাপার? তুমি ওখানে কী করে? স্বপ্নে তো আমি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম।
- স্বপ্নবাপ্পা মানেই কি বাপ্পার স্বপ্নের বাপ্পা হতে হবে? তোমার দেশলাইটা ছোঁড় দেখি। সিগারেটটা ধরাই।

**
এমন সুন্দর স্বপ্ন দেখছিল মান্তাই। দারুণ স্বপ্ন। বাপ্পাদা তার বাড়ির পাশের ল্যাম্পপোস্টটার নিচে অপেক্ষা করছে। তাও মাঝরাতে। নাইটড্রেসের ওপরেই একটা নীল শাল জড়িয়ে বাপ্পাদার সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে চলে গেছিল মান্তাই। কোথা থেকে একটা দেশলাই মুখের ওপর এসে পড়ল আর স্বপ্নটা গেল ভেঙ্গে। কী মুশকিল। দেশলাই আবার এলো কোথা থেকে?

**
সকাল সকাল এমন কাঁচা মিঠে স্বপ্নের আমেজ নিয়ে ঘুম থেকে উঠতে বাপ্পার যে কী ভালো লাগছিল। তবে স্বপ্নটা একটু গুলিয়ে যাচ্ছিল। কাকে যে দেখেছে ঠিক মনে করতে পারছিল না। শুধু একটা হলুদ ঘোলাটে আলো আর নীল শাল মেশানো একটা আবছায়া রয়ে গেছে মনের ভিতর। স্বপ্নের আমেজেই একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে হল বাপ্পার; খাটে বসেই।

পকেট, বিছানা বা বিছানার পাশের টেবিল হাতড়েও দেশলাইটা খুঁজে পেল না বাপ্পা।