Tuesday, January 5, 2016

ডেমো

- ইধর সে আইয়ে।
- এ দিক দিয়ে?
- হাঁ। উধর থিকে।
- আইব্বাস। কোনদিন দোকানদারের দিকে আসা হয়নি আগে।
- কেয়া?
- মানে। আমাদের বংশে কেউ কোনদিন ব্যবসা করেননি, দোকান সামলাননি। সবাই চাকরী। ক্লার্ক টু বড়বাবু। ওই রেডিয়াসে। এই প্রথম এই কাঠের পার্টিশন পেরিয়ে দোকানির দিকে এলাম। অদ্ভুত একটা ফিলিং।
- প্যাকেট দিজিয়ে।
- এই যে। গতকালই নিয়ে গেলাম। আপনারই ফার্মেসি থেকে। ঠাহর করতে পারছি না ইউসেজটা। তাই ভাবলাম...।
- হাঁ। কাল এসেছিলেন। ইয়াদ হ্যায়। স্লিভ উপর কিজিয়ে।
- গোটাবো? অ্যাই যে।
- ইয়ে হাত মে রোল কর লিজিয়ে। ফার্স্ট স্টেপ।
- এই ভাবে তো?
- হাঁ।
- এইখানটায়, হাতের ভাঁজে। তাই তো?
- হাঁ।
- টাইট করিয়ে লিন।
- খুব টাইট করব? নাকি...।
- বস্‌ ইতনা হি। ইনাফ্‌।
- বেশ। দেন?
- দেন ইয়ে বাটন অন কর দিজিয়ে।
- তারপর?
- বস। ইলেক্ট্রনিক স্ক্রিন পে আপকা প্রেশার দিখ যায়েগা। ইন থার্টি সেকেণ্ডস।
- বলেন কী মশাই। ব্যাস? ওই হাতে করে প্যাঁপো দাবানোর ঝামেলা নেই?
- ইয়ে ইলেক্ট্রনিক হ্যায়। নো ঝঞ্ঝট।
- কত প্রেশার দাঁড়ালো মশাই।
- ওয়ান ট্যুয়েন্টি বাই সেভেন্টি নাইন। পারফেক্ট। বঢিয়া হ্যায় জি আপকা ব্লাড প্রেশার লেভেল।
- ছেলে বৌ দু'জনেই রয়েছে কী না।
- হ্যাপি ফ্যামিলি?
- হ্যাপি কি না জানি না। তবে। ইয়ে, ব্যালেন্স্‌ড ফ্যামিলি তো বটেই। গিন্নী সর্বক্ষণ ছড়ি ঘুরিয়ে প্রেশারকে উপরের দিকে টানছে, ছেলে গ্রাজুয়েশন করে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে গলায় গিটার ঝুলিয়ে রামপাম্‌পম্‌ মেজাজে ঘুরে প্রেশার কে নিচের দিকে টানছে। ছেলে বাইরে গেলে বৌয়ের "হ্যান করো না, ত্যান করো না"র ধাতানিতে প্রেশার বেড়ে যায়, ওপরেরটা দেড়শ নিচেরটা নব্বুই। মিনিমাম। বৌ বাপেরবাড়ি গেলে ছেলের সেবন করা গঞ্জিকার গন্ধে প্রেশার হু হু করে নেমে আসে মশাই। ওপরেরটা একশো পাঁচের নিচে ঘুরঘুর করে। দু'জনে একসাথে থাকলে আবার নো চিন্তা, এ ওদিক থেকে দড়ি টানে, ও ওদিক থেকে। আমায় মন্থন করে প্রেশার স্টেডি করে অমৃত জেনারেট করে।
- বেওসার উসুল আছে। দুকানদারির সময় বাজে গল্প না করা। ডেমো খতম। আসুন।
- এই। এই মার্ভেলাস অ্যাটিটিউডের জন্যেই আপনারা এগিয়ে। চলি, কেমন?

Monday, January 4, 2016

না যাওয়ার গল্প

অরিন্দমের অফিস ফেরতা বাড়ির কলিংবেল বাজানোর একটা সিগনেচার স্টাইল আছে; একটা স্পষ্ট চাপ, তার পরেই ঘনঘন দু'বার এবং শেষে স্পষ্টভাবে আরেকবার।

রীতা সে'টা জানে। চেনে। রীতা জানে যে সেই স্টাইলটা অপাইও জানে।
অপাইকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য ঠিক সেই ঢঙেই কলিং বেলটা বাজালো রীতা; একটা স্পষ্ট চাপ, তার পরেই ঘনঘন দু'বার এবং শেষে স্পষ্টভাবে আরেকবার।

- বাবা এসেছে!
- বাবা এসেছে কী রে ব্যাটা? আমি তো তোর সঙ্গে বসে।
- ওই যে বেল বাজলো তোমার মত করে। টুং টুটুং টুং।
- কিন্তু আমি যখন তোর সঙ্গে বসে ট্রাম্প কার্ড খেলছি, তাহলে সেটা নিশ্চই আমি না।
- মা এসেছে? কিন্তু মার তো কালকে আসার কথা।
- হয়ত সারপ্রাইজ দিতে এসেছে। আর ডেফিনিটলি ভাবতে পারেনি যে আমি এত তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে যাব। মা প্ল্যান করেই টুং টুটুং টুং বেল দিয়েছে। যাতে তুই ভাবিস যে আমি এসেছি। আর দরজা খুলেই...?
- সারপ্রাইজ!
- আর ক্যাডবেরি।
- আর এয়ারগান।
- হাই ফাইভ।
- হাই ফাইভ।


***

- অপাই তোমায় খুব মিস করে। কী আনন্দ দেখছ ওর?
- জানি।
- জানো যখন, তখন মাঝে মাঝেই আসনা কেন? সেই মাসে একবার তো একবার।
- অপাইকে আমার ওখানে পাঠিয়ে দাও না কেন মাঝে মাঝে।
- কোর্টের বারণ।
- খুব আইন মানতে শিখেছ, তাই না?
- না মানে। কোর্টে পইপই করে বলে দিয়েছে।
- কী বলেছে? যে ছেলে মায়ের কাছে গিয়ে মাঝেমাঝে থাকলে বখে যাবে?
- তা ঠিক নয়। তবে আইনকানুনের ব্যাপার তো।
- তুমি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছ কেন?
- কাল অপাইয়ের জ্বর ছিল। রাতের দিকে। ওই এক মত। আজকে ফাইন।
- হোয়াই ক্যান নট ইউ সেন্ড অপাই টু মি অরিন্দম?
- হোয়াই ক্যান নট ইউ কাম ব্যাক রীতা?
- এত কিছুর পরে এই প্রশ্নটা শুনলে জাস্ট গা জ্বালা করে।
- অপাই মিস করে তোমায়। আমিও।
- অসহ্য। কোর্টে দাঁড়িয়ে পজেশন ব্যাটেলের সময় খাজা মিথ্যেগুলো না বললে চলছিল না? এখন মিস করার কথা বলছ।
- তখন রেগে ছিলাম। তাছাড়া মৃণালকে সহ্য করতে পারতাম না।
- এখন পার?
- রাগ গেছে। দুঃখ এসেছে।
- গ্রো আপ।
- কাম ব্যাক। ইউ উইল গ্রো ওল্ড। আই উইল গ্রো আপ উইথ অপাই।
- আজ চলি। মৃণাল নিড্‌স দ্য কার।
- উই নিড ইউ।
- এটা কলেজ ক্যান্টিন নয় অরিন্দম।
- কলিং বেলটা এখনও পাল্টাইনি। আওয়ার লাস্ট পারচেজ টুগেদার।
- ডিভোর্সের খরচটাও ডাচ করেছিলাম। টেকনিক্যালি আওয়ার লাস্ট পারচেজ টুগেদার।
- মৃণালের মত ভালো ইয়ে হয় না।
- তোমার বয়স হয়েছে। এসব মানায় না এখন।
- লাল তোমায় এখনও মানায়। ক্যাটক্যাটে লাল।
- মদে লাল হয়ে থাকে। চোখ। প্রত্যেকদিন রাত দশটার পরে। অপাই এখানেই ভালো আছে। চলি।
- অপাই ছাড়বে না এখন তোমায়।
- ছাড়ার এক্সপার্ট তো তুমি।
- তখন বয়স কম ছিল। রাগ ছিল। মৃণালের ওপর। তোমার ওপর।
- মৃণালের অনেক ঋণ আমার ওপর। আমার এই কেরিয়ার, সমস্ত কিছু। প্লাস হি হ্যাস বিন সেলফলেস। কেয়ারিং।
- ও তোমায় কেরিয়ার দিয়েছে। আমি তোমায় মোড়া দেব। ইউ অন মোড়া। আমি মেঝেয়। তোমার পায়ের কাছে। আটার ডেডিকেশনে। আমি আর অপাই।
- আই হ্যাভ টু গো।

***

সন্ধ্যা নরম হয়ে এলে অপাই অফিস থেকে ফেরে। টুং টুটুং টুং রিদ্‌মে কলিং বেল বাজায়। বাবা দরজা খুলে দেন। পাজামা, গেঞ্জি মাখানো বাবা। বাবার জবাব নেই। মুড়ি মাখা টু ফুলুরি ভাজা, বাবার হাতে মাখন রয়েছে।

হাত মুখ ধুয়ে মুড়ির বাটি হাতে অপাই ব্যালকনিতে এসে বসে। ব্যালকনির মোড়ায় বাবা, বাবার পায়ের কাছে মেঝেয় অপাই। আটার ডেডিকেশন। কারুর কোত্থাও যাওয়ার থাকে না।

ঘুরতে যাওয়া

-   অমুদা।
-   হুঁ।
-   যাবে নাকি?
-   যাব? কোথায়?
-   জঙ্গু। সিক্কিমে।
-   কেন?
-   কেন মানে? পাহাড়ের বুকে ছোট্ট এক চিলতে গ্রাম। প্যান্ডিমের মায়াবী রূপ। ঝর্ণা। জিরো পলিউশন। ডিটক্সিং অফ সোউল।
-   কী হবে?
-   কী হবে মানে?
-   মানে ওই। পাহাড়, ঝর্ণা। তার চেয়ে বই পড়লে ডিটক্স আরও সহজে হবে। খাটনি কম।
-   ঘুরতে যাওয়া খাটনি?
-   নয়?
-   হাউ?
-   প্যাকিং কর রে। তারপর সেখানেই শেষ নয়। যেখানে যাব সেখানে গিয়ে ফের অ্যানপ্যাক কর রে। ইন ফ্যাক্ট সেখানেও শেষ নয়। ঘোরাঘুরি শেষ হলে ফের প্যাক করা। তারপরেও রয়েছে।
-   বাড়ি ফিরে আনপ্যাক করা। তাই তো?
-   এগজ্যাক্টলি।
-   ধুস। এ তোমার রাম-আলসেমি।
-   রাম কি অলস ছিল?
-   সেটা কি এখানে রেলেভ্যান্ট?
-   একটা কথা বললি। তার রেলেভ্যান্স ভাববি না?
-   রাম ইন মন্সট্রাস্‌ সেন্স।সাইজের কথা বলছি। রামগাধা। রামছাগল।রামগবেট। রামঠকানে। মেগা।
-   নেগেটিভ যা কিছু মেজর প্রপোরশনের সবার প্রিফিক্সেই রাম বসানো যায়। তাই বলছিস?ফর এগজ্যাম্পেল; ঘুরতে যাওয়া ইজ আ রাম-ওয়েস্ট অফ টাইম। দাঁড়াচ্ছে?
-   তুমি যাবে না?
-   ইনসেন্টিভ ডিফাইন করতে পারলি না। বললামই তো। মনকে তরতাজা রাখাটাই যদি চ্যালেঞ্জ হয় তাহলে বই পড়াই আমার জন্য যথেষ্ট।
-   সে তো ঘুরতে গিয়েও বই পড়তে পারবে।
-   তাহলে আর ঘুরতে গিয়ে কী লাভ?
-   বাহ! পাহাড় দেখবে। তার মূল্য নেই?
-   মূল্য? নতুন জিনিষ দেখার মূল্য নেই সেটা কী করে বলি। তবে গুগ্‌ল ইমেজেস্‌ আছে তো। সেখানে দেখে নিলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
-   কিন্তু ওই টাচ ফিল অনুভূতি? সেই অপার্থিবকে ছুঁয়ে দেখার থ্রিল? সেটা কোথায় পাবে বাড়ি বসে?
-   গুগ্‌লের ছবিগুলোর হার্ডকপি প্রিন্ট নিলেই মিটে যায়। ছুঁয়েও দেখলি। প্যাকিঙের ঝামেলাও পোহাতে হল না। 

Sunday, January 3, 2016

ইনসমনিয়ার ঘটনা

শাল জড়িয়ে উঠতে হল। বেশ ঠাণ্ডা। মোবাইলে সময় দেখলেন সমীরণ; রাত পৌনে দু'টো।

ইনসমনিয়ায় চানাচুরের খরচ বাড়ে। রান্নাঘরে গিয়ে বয়াম খুলে বাটি ভরে সোফায় এসে বসা। রোজকার মত। রোজকার মত আনন্দবাজার খুলে বসা। এক ঘেয়ে খুনখারাপির খবরে যদি চোখ লেগে আসে।

- ঘুম আসছে না রে?
- এটাই তো রোগ বাবা। তুমি আবার এত রাত্রে এদিকে কেন?
- তোর রোগ। আমার বয়স।
- বৌমা?
- কাদা।
- মা?
- লাইকওয়াইজ।
- বড় মুশকিল হল।
- মুশকিল কেন?
- রাতের পর রাত।  এই ভাবে ঘুম না আসা। ফ্রাস্ট্রেটিং নয়?
- সমু। হোমিওপ্যাথি ট্রাই কর।
- আনন্দবাজারে কাজ হচ্ছে না। তায় হোমিওপ্যাথি।
- ডাজ দ্য চানাচুর হেল্প?
- রিডিউসেস দ্য পেইন।
- গুড। গুড। 
- লুডো খেলবে বাবা?
- আপত্তি নেই। দাঁড়া বোর্ডটা আনি।

***

- অবিনাশ।
- বলো ডাক্তার।
- কদ্দিন চালাবে এটা? 
- যদ্দিন তদ্দিন। তোমার হোমিওপাতির ওষুধ তো..সাইড এফেক্ট যখন নেই...।
- তাই বলে সমীরণ রাতের পর রাত না ঘুমোলে...।
- ঘুমোচ্ছে। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে। তোমার বড়ির জবাব নেই হে ডাক্তার। ঠিক ভোর চারটে পর্যন্ত জাগিয়ে রাখে ওকে।
- না মানে...।
- অপরাধ বোধ প্লান্ট করতে চাইছ মনে? লাভ নেই। শোন। ছেলের তিন বছর বয়স পর্যন্ত নিয়ম করে রাত জেগেছি; ওর শ্বাসের অ্যাকিউট প্রবলেম ছিল। ওর স্কুল কলেজের কোনও ইম্পর্ট্যান্ট ফাংশন মিস করিনি। ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত অঙ্ক ইংরেজি পড়িয়েছি। অথচ গত বছর পাঁচেক ধরে...মানে যবে থেকে ওই চাকরীতে ঢুকেছে সমু, যবে থেকে বিয়ে করেছে; উই হার্ডলি স্পীক। হার্ডলি। আই মিস হিম। ডু নট ব্লেম মি ফর মিসিং মাই সন।
- অবিনাশ। 
- ডাক্তার।
- মনে রেখ।  এক বয়াম চানাচুরে মাত্র দু'টো বড়ি গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া। ওভারডোজ হলে কী হয় বলা যায় না।
- আরে এতদিনে মাপ বুঝে গেছি ডাক্তার। চিন্তা নেই। থ্যাঙ্ক ইউ। আজ আসি।

Friday, January 1, 2016

আগ্রা আগ্রহ

"একটা আট", কণ্ডাক্টরের দিকে দশটাকার নোটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন অনিল মুন্সী।  
অফিস ফেরতা বাসে জানালার সিট বড় একটা পাওয়া যায় না। আজ পয়লা জানুয়ারী বলে হয়ত এতটা ফাঁকা। পার্ক স্ট্রিটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেশ ঝলমল নজরে পড়ল। 

আজ বোধ হয় শীত একটু কম। হাফ সোয়েটারে দিব্যি চলে যাচ্ছে। এমনকি বাসের জানলার কাঁচের ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য ফুরফুরে সন্ধ্যের হাওয়াটাও মন্দ লাগছিল না অনিলবাবুর। বাসে না থাকলে একটা সিগারেট ধরান যেত। 

কাঁধের ব্যাগ থেকে মা তারা ট্রেডার্সের দেওয়া ক্যালেণ্ডারটা বার করলেন। বাসে ভীড় কম, খুলে দেখাই যায়। গার্ডার খুলে মেলে ধরলেন। এর বরাবর ভালো আর বড় ক্যালেণ্ডার বানায়; প্রায় আধ মানুষ লম্বা। দেওয়াল ঝলমল করে। দত্ত অ্যান্ড বসু ফার্মের বড় ক্লায়েন্ট এই মা তারা ট্রেডার্স। প্রত্যেক বছর হেডক্লার্ক হিসেবে এদের থেকে একটা এক্সেকিউটিভ ডায়েরী আর ক্যালেণ্ডার প্রাপ্তি ঘটে অনিলবাবুর। 

ক্যালেণ্ডারটা খুলে মন জুড়িয়ে গেল। পিছনের সিটের দুই ভদ্রলোকও যে মন দিয়ে ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকিয়েছিল সেটা বেশ টের পাচ্ছিলেন তিনি। 

তাজমহল। যাওয়া হয়নি। কিন্তু ছবিতে পরিচয় কম না। ক্যালেণ্ডারটায় প্রাণ ছিল। ঝকঝকে নীল আকাশ, তার নিচে মন কেমন করা সাদায় সাদা ইমারৎ। অপরূপ।

- মিতুল? 
- কোথায় আছ?
- বাসে। আর আধ ঘণ্টা মত। 
- ঘরে ঢোকার পথে একটু আলু...। 
- আগ্রা যাবে?
- আগ্রা?
- আজই। রাত এগারোটায় আজমের এক্সপ্রেস ছাড়ে। সেবার পিন্টুরা গেল না? 
- পাগল নাকি? বলা নেই, কওয়া নেই...। 
- আমি তুমি আর বাবু তো। ম্যানেজ হয়ে যাবে। কাল শনি, রবি ছুটি। সোম মঙ্গল সি-এল মেরে দেব। প্লীজ। চট করে স্যুটকেস গুছিয়ে নাও। বাবুটার জন্যও সারপ্রাইজ হবে। পুরী ছাড়া তো আর...।
- টাকা পয়সারও তো ব্যাপার আছে না কী? এ মাসের শেষে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হবে তো?

ফুস মন্তরের মত কাজ হল। 

অনিল মুন্সীর বড় রাগ হল। অভিমান হল। দুঃখ হল। এভাবেই টাকার চিন্তায় প্রেমিকরা খুন হয়। ভালবাসার লেজ কাটা যায়। এভাবেই। 

টাকা? টাকার চিন্তায় এমন ভালোবাসার হুজুগ ফিরিয়ে দেবে? ইন্স্যুরেন্সই সব? যাবই না শালা।  কাড়িকাড়ি আলু নিয়ে বাড়ি ঢুকব আর মোচ্ছব করব। আলু ভাতে, আলুর দম, আলু পোস্ত আর আলু ভাজা। আলু খেয়েই তাজমহলের দুঃখ ভোলাতে হবে। 

পিছনের ভদ্রলোকের দিকে ফিরে ক্যালেন্ডারটা অফার করলেন অনিলবাবু; "পছন্দ? নেবেন নাকী?"। 

***

- পাঁচ কিলো আলু? এটা কোন আনার ধরণ হল?
- ইচ্ছে হল তাই। 
- এখন এত আলু বাড়িতে রেখে গেলে পচবে না?
- পচবে? যাচ্ছটা কোথায় ? রাণাঘাট?
- এই যে বললে আগ্রা। তাজমহল। এই যে স্যুটকেস। চারদিনের তো ব্যাপার। বেশি কিছু নিতে হয়নি। 
- গেলেই হল? টাকা? ইন্স্যুরেন্স?
- সোনার চেয়ে বড় ইন্স্যুরেন্স কী? বালাটা দেখছ? তিনবার আগ্রা যাওয়া হয়ে যাবে।  আর দু'টো প্রিমিয়াম দেওয়া হয়ে যাব। আমরা তো মাত্র একবার আগ্রা যাব আর একবার প্রিমিয়ামের টাকা দেব।
- হক কথা। 
- বাবুর জন্য দারুণ সারপ্রাইজ হবে।
- বাবুর বাবাও ওভারহোয়েল্ম্‌ড। বাবু কোথায়?
- টিউশনে। এই এল বলে। তুমি ফ্রেশ  হয়ে নাও। বাবুর সময় লাগবে। সাড়ে ন'টার মধ্যে বেরোতে হবে। টিকিটও তো কাটতে হবে।
- জেনারেলে বসে বসে যেতে হবে কিন্তু।
- তাজমহলের জন্য তো। খুব পারব।
- হোটেল খুঁজে পাওয়ার ঝক্কিও কম না। পিক্‌ সিজন। 
- কোই পরওয়া নহি।
- বেশ। বাড়তি সোয়েটার মাফলার রেখ। আগ্রা তো আর কলকাতা নয়। শীতের কামড় থাকবে বলেই বিশ্বাস। 

***

- কী সারপ্রাইজ বলছিলে বাবা?
- বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম অ্যান্ড ভিক্টোরিয়া। কাল গোটা দিন। ঝকঝকে নীল আকাশ, তার নিচে সাদা ইমারৎ। যাদুই ব্যাপার। 
- সে তো কতবার গেছি। 
- এবারে স্পেশ্যাল। টিফিন কেরিয়ারে লুচির সাথে কী থাকবে জানিস?
- আলুর দম?
- সে তো বটেই। আর কী?
- আরও কিছু থাকবে?
- অফ কোউর্স। লুচি উইথ আলুর দম ,আলু ভাজা অ্যান্ড আলু পোস্ত। 
- থ্রি ইন ওয়ান?
- থ্রি ইন ওয়ান।
- এটা কোন সারপ্রাইজ হল?

***

অনিলবাবুর একটা অদ্ভুত শখ আছে। ডিমের খোসায় ওয়ার্ল্ড ম্যাপ আঁকা, চালের দানার সই করা; এইসব। জাস্ট শখ। ভালো লাগা। ভালো লাগাটুকুই তো ভালোবাসা।

মিতুলের কালো ব্লাউজের পিঠের দিকে অল্প একটু ছেঁড়া। সেদিনে রাত্রে, সেই ব্লাউজের ছেঁড়া অংশের ফাঁকে রেনল্ডস ডটপেন দিয়ে তাজমহল আঁকলেন অনিল মুন্সী।

কলমের ডগার অল্প সুড়সুড়িতে শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়ছিল মিতুলের পিঠে। মিতুলের উপুড় থুতনি বেয়ে জল গড়িয়ে নেমে আসছিল বালিশের সাদা নীল ওয়াড়ে।