Wednesday, November 11, 2015

মশা

- মশা। এক পিস।

- হতেই পারে না। আজ মশারি আমার নিজের হাতে গোঁজা।

- সামান্য ওমলেটে দু'বার নুন দিয়ে হন্যে হলে আর মশারি।

- থাম। বাথরুমে যাওয়ার জন্য এমন রাক্ষুসে ভাবে উঠলে মশারি মাথায় তুলে, তখনই ঢুকেছে বোধ হয়।


- ডেলিকেটলি হাফ ফুট মশারি তুলে সাপের মত লেতকে লেতকে গলে বেরিয়েছি। বেরিয়েই গুঁজেছি। রিটার্নও সিমিলার টেকনিকে। যাক গে, মনে হচ্ছে মশারির সাউথ ওয়েস্ট ওয়ালে আছে। বেড স্যুইচটা সাবধানে গ্রিপ কর দেখি।
- ভাক। ভীমরতি যত। ঘুমোও। তিনটে বাজে।
- অ্যাটেনশন। হেইয়ো। শুনতে হো।
- কী রে বাবা!
- বাবাজীবন ডান গালে ল্যান্ড করেছেন। তোমার ফেভারেবল ডাইরেকশনে; চালাও বিরাশি সিক্কা। গন্ধমাদন শুইয়ে দাও।
- ছিঃ, এক গালে চড় মারতে নেই।
- দু'গালে মেরো।
- অকারণে বর পেটাবো?
- তোমায় রাম চিমটি কেটে কারণ দেব?
- থাম। ঘুমোও।
- আরে উড়ে যাবে। রক্ত খেয়ে ঢ্যাপস হয়ে বসে। এই মউকা। চালাও থাবড়া।

- বললাম না এক গালের চড় মারতে নেই?

- মারলে কী হয়?
- বিয়ে হয় না।
- এক চড়েই খুনের বদলা খুন প্লাস টাইম ট্র‍্যাভেলে ব্যাক টু গ্লোরি? শালি চড় মারবি কী না বল!

ডিস্টার্বেন্স

- ইউ সি।গণতন্ত্র গরম ফুলকো লুচি য্যায়সা অমূল্য হ্যায়। তবে উয়ো লুচি আধুনিক ভারতবর্ষ কা প্লেট মে সিরিফ দুর্নীতি কা আলকাতরা ইয়া ধর্ম-জাতপাত কা কাদা মে চুবিয়ে খা সকতা হ্যায়। এখন চয়েজ ইজ ইওর্স। আলকাতরা খানে কা না কাদা চাটনে কা।

- বঙ্গালি বাবু, ইতনা পেসিমিস্ট কিউ?

- রোববার রাত হ্যায় ভাইটি। বাটি চচ্চড়ি অ্যান্ড পেসিমিজম ইজ দ্য নর্ম।

- হা হা, বঢিয়া বোলা ইয়ে আপ।

- বঙ্গালি হ্যায় স্যার। বঢিয়া না বোলনে সে বঢিয়া করনা পঢেগা। উয়ো জিয়াদা ডিফিকাল্ট।

- কিউ? বঙ্গালি ভি শের আছে। ট্যাগোর কোরলেন। স্যাটয়াজিট কোরলেন। বঙ্গালি ভি কোরে।

- স্যাটিয়াজিট? ট্যাগোর? আরে ওরা বাঙালি নহি হ্যায় রে বাবা। ওসব লোগ মানুষ হ্যায়।

- মানুষ আছে? ফির আপ কেয়া?

- হম? হম বংগালি হায়। বোলা তো। মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ সেট হ্যায় স্যার। ট্যাগোর ফর্মুলা দেকে গয়া থা।

- বহোত কনফিউজ করতে হ্যায় আপ জী।

- এগজ্যাক্টলি।

- এগজ্যাক্টলি কেয়া?

- কনফিউজ করকে অন্যের দিমাগের ফিউজ উড়িয়ে দেনা। দ্যাট ইজ দ্য ইউএসপি। উই আর মেন অফ কবিতাজ ইউ সি। ব্যালান্স শিট ইজ ইমোশনাল কুলিগিরি ফর আস।

- কভিতা কনফিউশন হ্যায়?

- মডার্নিজম কা ডেফিনিশন পতা হ্যায় স্যার?

- বতাইয়ে।

- কবিতাকে সলিউশন মে, ড্রপার লেকে ফোঁটা ফোঁটা কনফিউশন কবিতা মে ডালনে কা। দ্যাট মাই ফ্রেন্ড ইজ মডার্নিজম। সমঝলেন?

- আপ লুচি খাইয়ে জী। ডিস্টার্ব করকে গলতি কিয়া ম্যায়নে।

অঙ্কের খাতা

অঙ্কের ক্লাস টেস্ট। কুড়িতে আড়াই। অমিয়বাবু কানটা টেনে মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছিলেন। অমিয়বাবুর রাগের কারণ চারটে স্তরে। 

এক, দীপুর নম্বর।


দুই, এই খাতা দীপুর গার্জেনের সই করিয়ে আনার কথা ছিল। আনেনি। 


তিন, খাতার অবস্থা খুব খারাপ। দীপু গতকাল বৃষ্টি ভিজেছিল, কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে। খাতা ভিজে নেতিয়ে একাকার। খাতায় স্বাভাবিক ভাবেই নীল কালির চেয়ে লাল কালি বেশি; সেই লাল কালি ছোপ ছোপ হয়ে সাদা পাতা জুড়ে। 


চার, সব চেয়ে বড় কারণ। দীপুর হাসছে না কিন্তু ওর মুখ জুড়ে হাসি। ওর চোখে ঝিলিক। হেডমাস্টার মনোময় মিত্তিরের ছেলে এমন বেহায়া বেয়াদপ ভাবাই যায় না।


বেআক্কেলে। গাধা। আরও কত ভার্বাল মিসাইল দীপুর দিকে ফায়ার হচ্ছিল। ওদিকে কান হ্যাঁচড়ানো শেষ হলে শুরু হল থাপ্পড়। হাই ভেলোসিটি থাপ্পড় সব।
তবু দীপুর চোখ থেকে হাসির ছলছল যাচ্ছিল না। অমিয়বাবু যতবার দীপুর চোখের সামনে লাল কালি ছোপানো অঙ্ক টেস্টের খাতা মেলে ধরছিলেন; ততবার দীপুর মুখ ঝলসে উঠছিল। দীপুর গাল লাল, কতকটা থাপ্পড়ে কতটা ভালো লাগায়। লাল ছোপ ছোপ সাদা খাতার পাতায় যে কী ভালো লাগছিল দেখতে।
অবিকল, অবিকল সে'রকম।

গত পরশু কিচির নাচ ছিল, পাড়ার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায়। কিচি পায়ে আলতা পরেছিল। গতকাল বিকেলে কিচি এসেছিল স্কুলের পর; অমুদের পুরনো বাড়ির ছাদে। জলের ট্যাঙ্কির ওপর উঠে বসেছিল; কেড্‌স খুলে - পা দুলিয়ে দুলিয়ে দীপুকে বলছিল ক্যালকুলাসকে ও কতটা ভালোবাসে। দীপু জানে কিচি প্রফেসর ক্যালকুলাসের কথা বলছিল না; তবু দীপু প্রতিবাদ করেনি। সে শুধু কিচির পায়ের মোজার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল; নীল বর্ডারের সাদা মোজা আলতা কাঁচা লালে ছোপানো; অবিকল বৃষ্টি ভেজা অঙ্ক খাতার লাল লাল ছোপের মত। অবিকল। অবিকল।

কিচিকে ছাদে বড় মানায়। কিচিকে বিকেলের ছাদে বড় মানায়। আর অমিয়বাবুকে মানায় ক্লাসে; ডাস্টার হাতে।

স্টেরয়েড

প্রতি শনিবার সকালে হৃদয় কে জিমে পাঠানোর বিশেষ দরকার। গোটা হপ্তার যা কড়কানি, হপ্তায় একবার অন্তত মনকে গড়ে পিটে নেওয়া দরকার।

সকাল দশটার আধো ঘুমের টি শার্ট আর সোফার শর্টস পরিয়ে হৃদয়কে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া জলখাবারের প্লেটের জিমে। সেখানে হৃদয় ছুটবে; ক্লান্তির মেদ ঝড়াবে, ছিপছিপে লিন-মিন প্রেম মেশিন হয়ে উঠবে অন্তর। হেমন্তর "পথ হারাবোর" তালে গতি সঞ্চয় করে হৃদয় লুচির ট্রেড মিলে দৌড়বে, সাথে আলুর দমের ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ আর মিহিদানার এরোবিক্‌স। হৃদয়ের তৃপ্ত ঘাম ঝড়বে নোলার দাবীময় সকসকে! দানা দানা ভালোবাসা অন্তরের আনাচে কানাচে ব্যাগাটেলির বলগুলোর মত ছড়িয়ে পড়বে।

"কাল ব্রেকফাস্টে লুচি" - বাঙালি হৃদয়ের জন্য এই আশ্বাসের চেয়ে বড় স্টেরয়েড আর হয় না।

ডাকবাক্স

ডাকবাক্সে পোস্টকার্ডটা গলিয়ে দিলেন মিহির। সেখান থেকে অল্প এগিয়েই দুলালের চায়ের স্টল। এক কাপ লিকার চা ডাব্‌ল চিনি, দু'টো বাসন্তী বিস্কুট আর একটা বিড়ি; দৈনিক। নিয়মের নড়নচড়ন হওয়ার উপায় নেই।

বিড়ির শেষটানটা দিয়ে হুড়ুমুড় করে উঠে পড়েন তিনি। রোজ। কনসাইনমেন্ট নিয়ে অফিস যেতে হবে যে। চটপট সেই ডাকবাক্সের কাছে ফেরত গিয়ে বাক্সের তালা খুলে একমাত্র চিঠিটা বের করে আনেন মিহির। ঝোলায় একমাত্র চিঠিটা ফেলে সাইকেলে রওনা দেন পোস্টঅফিসে। স্টাম্প করে, পোস্টমাস্টারের খাতায় এন্ট্রি করে তারপর সে চিঠি নিয়ে বেরোনো ডেলিভারি করতে। ফাঁকি ব্যাপারটা মিহিরের সহজাত নয়, হাতের কাজ সে ফেলে রাখতে পারে না।

মিহির পোস্টম্যানকে নিয়ে তবু মুকুন্দপাড়ার সক্কলের ভারী দুঃখ। বড় কারখানার বিষ গ্যাস লিক করে গাঁয়ের সক্কলে নিকেশ হল শুধু মিহির ভূতের মত একা একা বেঁচে রইল। গ্রামটা আগাছার জঙ্গলে আর ভূতের দঙ্গলে হারিয়ে গেল, শুধু মিহির চিঠি আর পোস্টঅফিস ভুলতে পারল না। তাই পোস্টমাস্টার সেদিন দুলালকে আক্ষেপ করে বলছিলেন, "মাথার ব্যামো কী বিপজ্জনক ভাবো, খালি ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে সে ব্যাটা ভাবে যে চা খাচ্ছে, কাঠি ফুঁকে বিড়ি খায়। আপদটা আবার পোস্টঅফিসে এসেও কাজ করার তম্বী করে। আর পাগলকে আমরা তোল্লায় দিয়ে চলেছি। এই তোমায় বলে রাখলাম দুলাল, একদিন সে মিহিরের ব্যাটা বুঝবে, পাগলের মত আত্মহারা হয়ে বেঁচে থাকার থেকে ভূতের নিরিবিলি জিন্দেগী অনেক বেশি সুখের। মাঝে মাঝেই ইচ্ছে হয় দি মটকে। তবে এমন ভাবে গুড মর্নিং বলে পেন্নাম করে রোজ! বল পাই না! থাক যে কটা দিন আছে! দু'দিন বই তো নয়।"