Thursday, November 5, 2015

বাদশা

সিগারেটের ধোঁয়ার রিংটা ভাসতে ভাসতে ট্রেনের ছাতে মিলিয়ে গেল। সত্যজিৎ বুঝলেন; ফর আ চেঞ্জ কাট শব্দটা তাকে দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হল।

***


কেক কাটতেই বাদশাকে জড়িয়ে ধরলেন রোহিত। 


"মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স কিং", রোহিতের গলায় হাওয়ায় গাড়ি ভাসানো উচ্ছাস।


"সমস্তই হাতের মুঠোয়", কেক মুখে সিগারেট ধরালেন বাদশা, "এ পঞ্চাশে প্রায় করার কিছুই বাকি নেই। প্রায়"।

"প্রায়?", রোহিতের কণ্ঠে অবিশ্বাসের মাখন, "প্রায় কেন বলছ বস?"

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বাদশা; "সিগারেটের ধোঁয়ার পারফেক্ট রিংটা এখনও তৈরি করতে পারলাম না, ড্যাম"।

ঠিক তক্ষুনি। সবাইকে চমকে দিয়ে;

ছাদ ফুঁড়ে একটা নিঁখুত ধোঁয়ার মালা নেমে এসে বাদশার হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের ভিতর সেঁধিয়ে গেল।


ব্যালকনির রাজ্যে

ব্যালকনির রাজ্যে তখন বিকেলের মরসুম।
মহারাজের পরনে পাজামা, গায়ে নামাবলির মত জড়ানো গামছা, মাথায় ব্যাথা। কাঠের ছোট্ট টুলের সিংহাসনে সেঁটকে বসে।
মহারানী ডেস্পোটিক মেজাজে মহারাজের মাথায় জবাকুসুম তেল মালিশ করে চলেছেন। আঙুল চটাপট চাপড়ে যাচ্ছে মহারাজের চওড়া বাঁটুল ভক্তিতে লটপট কপাল।
মহারাজ বার্তা পাঠালেন "রানী, তোমার আঙুলে ফ্রেঞ্চ আঙুরের গন্ধ। জানো?"
মহারানী ধাঁচিয়ে উঠলেন "পাঁচ মিনিট আগে মাছ কেটেছি। আঙুরের গন্ধ? ন্যাকার ডিম"।

মহারাজের মুখে হাসির হিরের ঝিলিক; "পাবদার দাম জানলে এ গন্ধকে ছোট করতে না গো, তোমার আঙুলে পাবদার সুবাস মিশে ওয়াইন আলবাত তৈরি হয়। বিকেলে ওয়াইন আর তার সাথে রাতের হেঁসেলের তেল হলুদ মিশে তোমার আঙুলগুলোর মুণ্ডুতে তৈরি হয় চাঁদনি রাতের জাদু চোলাই। তবে খেয়াল করে দেখো, আমার মধ্যে লোভ নেই। আমি তোমার আঙুলেই কনটেন্ট। আমি এসেনশিয়ালি বাউল"।
রানী ভেবে বলেন "তুমি একটা গবেট"।
এমন সময় কী হওয়ায় রানী গবেট ছেড়ে উঠতে যান। অমনি শাড়ির কোণ ধরে টান। অমনি রাস্তায় ঘুগনিওলার ঠেলা বেয়ে চলে যাওয়ার ডাক। অমনি মহারাজ গানের ল্যাসোতে রানীকে বাঁধেন;
"চিরসখা হে.....ছেড়ো না"!

রানী আঁতকে ওঠেন "এটা সুর? "
থমকে রাজা সারেণ্ডার করেন "আসলে ঘুগনিওলা স্কেলটা এমন চড়ায় বেঁধে দিয়ে গেল"।
রানীর পাশে গুটিসুটি এগিয়ে এলেন রাজাধিরাজ ; "বুঝলে। এবার থেকে এই গানটাই ব্যালকনির অ্যান্থেম, তোমার আঁচল আমাদের পতাকা, সেটা বহিবারে আমায় দাও শকতি"।
রানী বার দুই গবেট বলে ফের হাতের তালুতে জবাকুসুমের দু'ফোঁটা নিলেন।

কই হে

ঝপাৎ শব্দে নেমে এলেন সুপারম্যান। কপালে ঘাম, বাইসেপে দপদপ।

আর ঠিক তক্ষুনি নিঃশব্দে অন্ধকার চিরে উদয় হলেন ব্যাটম্যান। শক্ত চোয়াল, আগুনে চোখ।


"কই হে?"।

হাঁক শুনেই দুদ্দাড় করে রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের জল গরম বসালেন সুপারম্যান। মিডনাইট ওমলেটের জন্য পেঁয়াজ কুচোতে বসে গেলেন ব্যাটম্যান।

একরাশ বিরক্তি ঝেড়ে; নতুন প্লট মাথায় লেখার টেবিলে বসলেন প্রেমেন মিত্তির।

মেগাপিক্সেল


"গাদা গাদা মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় পুষছিস কেন যদি দুমাদুম গুপাগুপ আপলোড নাই করিস? এই অ্যাঙ্গেলটা দ্যাখ। দ্যাখ দ্যাখ। এদিকে, নিচে। ক্লিক কর। ফিল্টার লাগা। পোস্ট কর। ক্যাপশন দে। হট হুইলস"।

বলে বেশ রোয়াব নিয়ে সিগারেট ধরালেন অরিন্দম রায়। নীলা ছাতের পাঁচিলের ওপাশে ক্যামেরা তাক করে ঝুঁকে দেখতেই মাথা ঘুরে গেল অল্প।

নীলার অবশ্য অ্যাক্রোফোবিয়া নেই। শুধু ওই ভয়ঙ্কর সেন্সটা আছে। ক্যামেরা নিচের দিকে তাক করলেও রিয়ার ক্যামেরার বদলে ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করলে নীলা। অরিন্দমের হাত বাড়িয়েছে নীলার পিঠের দিকে। ভয়ানক ওই সেল্ফিটা মূহুর্তের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে গেল দশজনের কাছে, লালবাজারে সুরিন্দরের কাছেও।

অরিন্দমের আঙুল নীলার পিঠ ছুঁতেই ক্যামেরাকে সেল্ফি মোড থেকে রিয়ারে চলে গেল। অরিন্দমের চোখ আছে; সত্যিই কী চমৎকার লাগছে এই এগারোতলার ছাদ থেকে হলুদ ট্যাক্সিগুলো।

-"নতুন ট্যাটু?" অরিন্দমের দু'টো আঙুল নীলার ঘাড়ে পৌঁছেছিল।
-"কেন আমায় রিফিউজ করলি অরিন্দম? আমি রিমির মত ঘরোয়া নই বলে?"
-"আবার সেই পুরোনো কথা কেন নীলা?"
-"তোর সাজানো সংসার। আমার এই একার পাগলামি। তোর সাথে লুকিয়ে দেখা। নট ফেয়ার নো অরিন্দম?"
-"কেন এখন এসব? কাছে আয়"।
-"নাহ, আমায় যেতে হবে। দিস এন্ডস নাউ"।
-"যাবি, আমি ড্রপ করে দেব। কিন্তু এন্ডের কথা কী বলছিস?"
-"এভ্রিথিনং এন্ডস। এভ্রিথিং। তোরও সব শেষ। সব। চলি। নিচে অনেক ট্যাক্সি, আমি চলি রে"।
-"নীলা, ডোন্ট!!!! ওদিকে কোথায়.....হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং.....স্টপ....ওহ.....নীলাআআআ...."।"গাদা গাদা মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় পুষছিস কেন যদি দুমাদুম গুপাগুপ আপলোড নাই করিস? এই অ্যাঙ্গেলটা দ্যাখ। দ্যাখ দ্যাখ। এদিকে, নিচে। ক্লিক কর। ফিল্টার লাগা। পোস্ট কর। ক্যাপশন দে। হট হুইলস"।
বলে বেশ রোয়াব নিয়ে সিগারেট ধরালেন অরিন্দম রায়। নীলা ছাতের পাঁচিলের ওপাশে ক্যামেরা তাক করে ঝুঁকে দেখতেই মাথা ঘুরে গেল অল্প।
নীলার অবশ্য অ্যাক্রোফোবিয়া নেই। শুধু ওই ভয়ঙ্কর সেন্সটা আছে। ক্যামেরা নিচের দিকে তাক করলেও রিয়ার ক্যামেরার বদলে ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করলে নীলা। অরিন্দমের হাত বাড়িয়েছে নীলার পিঠের দিকে। ভয়ানক ওই সেল্ফিটা মূহুর্তের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে গেল দশজনের কাছে, লালবাজারে সুরিন্দরের কাছেও।
অরিন্দমের আঙুল নীলার পিঠ ছুঁতেই ক্যামেরাকে সেল্ফি মোড থেকে রিয়ারে চলে গেল। অরিন্দমের চোখ আছে; সত্যিই কী চমৎকার লাগছে এই এগারোতলার ছাদ থেকে হলুদ ট্যাক্সিগুলো।
-"নতুন ট্যাটু?" অরিন্দমের দু'টো আঙুল নীলার ঘাড়ে পৌঁছেছিল।
-"কেন আমায় রিফিউজ করলি অরিন্দম? আমি রিমির মত ঘরোয়া নই বলে?"
-"আবার সেই পুরোনো কথা কেন নীলা?"
-"তোর সাজানো সংসার। আমার এই একার পাগলামি। তোর সাথে লুকিয়ে দেখা। নট ফেয়ার নো অরিন্দম?"
-"কেন এখন এসব? কাছে আয়"।
-"নাহ, আমায় যেতে হবে। দিস এন্ডস নাউ"।
-"যাবি, আমি ড্রপ করে দেব। কিন্তু এন্ডের কথা কী বলছিস?"
-"এভ্রিথিনং এন্ডস। এভ্রিথিং। তোরও সব শেষ। সব। চলি। নিচে অনেক ট্যাক্সি, আমি চলি রে"।
-"নীলা, ডোন্ট!!!! ওদিকে কোথায়.....হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং.....স্টপ....ওহ.....নীলাআআআ...."।

ভাতের দলা

নিয়মমত যত্ন করে ভাতের প্রথম দলাটা মাখলেন নিমাই। ডাল, অল্প নুন, দু'টুকরো উচ্ছে ভাজা আর অল্প কাসুন্দি। সামান্য মাখিয়ে নিয়ে তারপর কষে দু'রাউন্ড চটকানি। তারপর খেলিয়ে খেলিয়ে গোল্লা পাকানো। পাঁচ সেকেণ্ডের খেল। 

নিয়মমত এঁটো হাতে ভাতের দলা নিয়ে নিমাই চলে গেলেন ছাতে। ছাতের পশ্চিম কোণে দলাটা রেখে দিলেন নিমাই। 

নিয়মমত কাকটা নেমে এসে দলাটা খেয়ে হাওয়া হয়ে গেল।

এমন নিয়মিত। দৈনিক। 

গত ডিসেম্বরের অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে। নিয়মত এমনটাই হয়ে আসছে। বুক থেকে প্রাণের এক কুচি যে তখন সট করে বেরিয়ে গেছিল; সে সন্দেহ তক্ষুনি হয়েছিল নিমাইয়ের। কাক নিমাইকে দেখে এক মূহুর্তেই আঁচ করে নিয়েছিল সে। আনন্দবাজারের খেলার পাতা নিয়ে কাক নিমাই আর মানুষ নিমাইয়ে সে কী টানাটানি প্রথমদিন। সে থেকেই নিমাই নিশ্চিত। এমনকি রমার দিকেও কেমন নরম বর বর দৃষ্টি হেনে দেখে কাকনিমাই। সেই থেকেই। 

ওদিকে উচ্ছের শেষ টুকরোটা চিবুতে চিবুতে কাকনিমাই ভাবছিল কাসুন্দির লোভে রোজ রোজ ভূতের বাড়ি বয়ে আসা কি ঠিক হচ্ছে? আর ভাতমাখা নিমাইয়েরও বলিহারি। অ্যাক্সিডেন্টে নিজের এককুচি প্রাণ বেরিয়ে কাক হল; সেটা চট করে টের পেয়ে গেল অথচ সেই দূর্ঘটনাতেই রমা ফৌত হয়ে গেল সেটা এদ্দিনেও বুঝে উঠতে পারল না? রমার দিকে তাকালেই কেঁপে ওঠে কাকনিমাই। 
শুধু কাসুন্দি উচ্ছে মাখা ভাতের দলার যে কী বিশ্রী লোভ!