Thursday, November 5, 2015

মেগাপিক্সেল


"গাদা গাদা মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় পুষছিস কেন যদি দুমাদুম গুপাগুপ আপলোড নাই করিস? এই অ্যাঙ্গেলটা দ্যাখ। দ্যাখ দ্যাখ। এদিকে, নিচে। ক্লিক কর। ফিল্টার লাগা। পোস্ট কর। ক্যাপশন দে। হট হুইলস"।

বলে বেশ রোয়াব নিয়ে সিগারেট ধরালেন অরিন্দম রায়। নীলা ছাতের পাঁচিলের ওপাশে ক্যামেরা তাক করে ঝুঁকে দেখতেই মাথা ঘুরে গেল অল্প।

নীলার অবশ্য অ্যাক্রোফোবিয়া নেই। শুধু ওই ভয়ঙ্কর সেন্সটা আছে। ক্যামেরা নিচের দিকে তাক করলেও রিয়ার ক্যামেরার বদলে ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করলে নীলা। অরিন্দমের হাত বাড়িয়েছে নীলার পিঠের দিকে। ভয়ানক ওই সেল্ফিটা মূহুর্তের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে গেল দশজনের কাছে, লালবাজারে সুরিন্দরের কাছেও।

অরিন্দমের আঙুল নীলার পিঠ ছুঁতেই ক্যামেরাকে সেল্ফি মোড থেকে রিয়ারে চলে গেল। অরিন্দমের চোখ আছে; সত্যিই কী চমৎকার লাগছে এই এগারোতলার ছাদ থেকে হলুদ ট্যাক্সিগুলো।

-"নতুন ট্যাটু?" অরিন্দমের দু'টো আঙুল নীলার ঘাড়ে পৌঁছেছিল।
-"কেন আমায় রিফিউজ করলি অরিন্দম? আমি রিমির মত ঘরোয়া নই বলে?"
-"আবার সেই পুরোনো কথা কেন নীলা?"
-"তোর সাজানো সংসার। আমার এই একার পাগলামি। তোর সাথে লুকিয়ে দেখা। নট ফেয়ার নো অরিন্দম?"
-"কেন এখন এসব? কাছে আয়"।
-"নাহ, আমায় যেতে হবে। দিস এন্ডস নাউ"।
-"যাবি, আমি ড্রপ করে দেব। কিন্তু এন্ডের কথা কী বলছিস?"
-"এভ্রিথিনং এন্ডস। এভ্রিথিং। তোরও সব শেষ। সব। চলি। নিচে অনেক ট্যাক্সি, আমি চলি রে"।
-"নীলা, ডোন্ট!!!! ওদিকে কোথায়.....হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং.....স্টপ....ওহ.....নীলাআআআ...."।"গাদা গাদা মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় পুষছিস কেন যদি দুমাদুম গুপাগুপ আপলোড নাই করিস? এই অ্যাঙ্গেলটা দ্যাখ। দ্যাখ দ্যাখ। এদিকে, নিচে। ক্লিক কর। ফিল্টার লাগা। পোস্ট কর। ক্যাপশন দে। হট হুইলস"।
বলে বেশ রোয়াব নিয়ে সিগারেট ধরালেন অরিন্দম রায়। নীলা ছাতের পাঁচিলের ওপাশে ক্যামেরা তাক করে ঝুঁকে দেখতেই মাথা ঘুরে গেল অল্প।
নীলার অবশ্য অ্যাক্রোফোবিয়া নেই। শুধু ওই ভয়ঙ্কর সেন্সটা আছে। ক্যামেরা নিচের দিকে তাক করলেও রিয়ার ক্যামেরার বদলে ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করলে নীলা। অরিন্দমের হাত বাড়িয়েছে নীলার পিঠের দিকে। ভয়ানক ওই সেল্ফিটা মূহুর্তের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে গেল দশজনের কাছে, লালবাজারে সুরিন্দরের কাছেও।
অরিন্দমের আঙুল নীলার পিঠ ছুঁতেই ক্যামেরাকে সেল্ফি মোড থেকে রিয়ারে চলে গেল। অরিন্দমের চোখ আছে; সত্যিই কী চমৎকার লাগছে এই এগারোতলার ছাদ থেকে হলুদ ট্যাক্সিগুলো।
-"নতুন ট্যাটু?" অরিন্দমের দু'টো আঙুল নীলার ঘাড়ে পৌঁছেছিল।
-"কেন আমায় রিফিউজ করলি অরিন্দম? আমি রিমির মত ঘরোয়া নই বলে?"
-"আবার সেই পুরোনো কথা কেন নীলা?"
-"তোর সাজানো সংসার। আমার এই একার পাগলামি। তোর সাথে লুকিয়ে দেখা। নট ফেয়ার নো অরিন্দম?"
-"কেন এখন এসব? কাছে আয়"।
-"নাহ, আমায় যেতে হবে। দিস এন্ডস নাউ"।
-"যাবি, আমি ড্রপ করে দেব। কিন্তু এন্ডের কথা কী বলছিস?"
-"এভ্রিথিনং এন্ডস। এভ্রিথিং। তোরও সব শেষ। সব। চলি। নিচে অনেক ট্যাক্সি, আমি চলি রে"।
-"নীলা, ডোন্ট!!!! ওদিকে কোথায়.....হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং.....স্টপ....ওহ.....নীলাআআআ...."।

ভাতের দলা

নিয়মমত যত্ন করে ভাতের প্রথম দলাটা মাখলেন নিমাই। ডাল, অল্প নুন, দু'টুকরো উচ্ছে ভাজা আর অল্প কাসুন্দি। সামান্য মাখিয়ে নিয়ে তারপর কষে দু'রাউন্ড চটকানি। তারপর খেলিয়ে খেলিয়ে গোল্লা পাকানো। পাঁচ সেকেণ্ডের খেল। 

নিয়মমত এঁটো হাতে ভাতের দলা নিয়ে নিমাই চলে গেলেন ছাতে। ছাতের পশ্চিম কোণে দলাটা রেখে দিলেন নিমাই। 

নিয়মমত কাকটা নেমে এসে দলাটা খেয়ে হাওয়া হয়ে গেল।

এমন নিয়মিত। দৈনিক। 

গত ডিসেম্বরের অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে। নিয়মত এমনটাই হয়ে আসছে। বুক থেকে প্রাণের এক কুচি যে তখন সট করে বেরিয়ে গেছিল; সে সন্দেহ তক্ষুনি হয়েছিল নিমাইয়ের। কাক নিমাইকে দেখে এক মূহুর্তেই আঁচ করে নিয়েছিল সে। আনন্দবাজারের খেলার পাতা নিয়ে কাক নিমাই আর মানুষ নিমাইয়ে সে কী টানাটানি প্রথমদিন। সে থেকেই নিমাই নিশ্চিত। এমনকি রমার দিকেও কেমন নরম বর বর দৃষ্টি হেনে দেখে কাকনিমাই। সেই থেকেই। 

ওদিকে উচ্ছের শেষ টুকরোটা চিবুতে চিবুতে কাকনিমাই ভাবছিল কাসুন্দির লোভে রোজ রোজ ভূতের বাড়ি বয়ে আসা কি ঠিক হচ্ছে? আর ভাতমাখা নিমাইয়েরও বলিহারি। অ্যাক্সিডেন্টে নিজের এককুচি প্রাণ বেরিয়ে কাক হল; সেটা চট করে টের পেয়ে গেল অথচ সেই দূর্ঘটনাতেই রমা ফৌত হয়ে গেল সেটা এদ্দিনেও বুঝে উঠতে পারল না? রমার দিকে তাকালেই কেঁপে ওঠে কাকনিমাই। 
শুধু কাসুন্দি উচ্ছে মাখা ভাতের দলার যে কী বিশ্রী লোভ!

Tuesday, November 3, 2015

ইন্টারনাল পরীক্ষা

- কাকীমা, অজয়দা আছে? 

- অজয় তো শ্যামনগর গেছে রে। ওর পিসির বাড়ি। পরশু আসবে।

- ও। 

- কোন কাজ ছিল?

- না মানে। ওই। 

- আমায় বলবি?

- অজয়দা একটা বই দেবে বলেছিল।

- বই?

- ওই। ফিজিক্সের। একটা ভালো গাইড বই। 

- খুব দরকারি? 

- হ্যাঁ। মানে কাল একটা পরীক্ষা ছিল। 

- পরীক্ষা? এই সময়ে?

- ইন্টারনাল। অজয়দা বলেছিল। বইটার কথা। আমায় গাইড করে। মাঝে মাঝেই। 

- অজয় তোকে গাইড করে? ও উচ্চমাধ্যমিকে ফিজিক্সে ব্যাক পেয়েছিল রে!

- অজয়দা বলে পরীক্ষাই সব নয়। 

- বাহ, তোর মাথা ভালোই খেয়েছে। যা, দোতলায় ওর পড়ার টেবিলে আর বইয়ের তাকে দেখ খুঁজে। যদি পাস বইটা।

- যাব?

- যা। যা না। 

**

- কী খুঁজছিস?

- ফিজিক্সের গাইড বই। অজয়দা বলেছিল। 

- দাদা তো নেই।

- কাকীমাই বললে। বইটা আসলে...আর্জেন্ট...কাল পরীক্ষা ছিল। 

- পেলি? 

- না। মানে। এখানে নেই বোধ হয়...।

-  তুই কী এই বইটা খুঁজছিলিস?

- ওহ। হ্যাঁ মানে...।

- কাল কখন পরীক্ষা তোর?

- চা...চারটে। বিকেল। 

- যা ভাগ। 

- আসি। হেহ!

- আর শোন! 

- হুঁ?

- যাওয়ার আগে একটা যে কোন ফিজিক্সের বই তুলে নিয়ে যা। গবেট কোথাকার। 

**

মেজজেঠিমা নতুন হাতঘড়িটা পকেটে রাখে দীপু। কিচি বলে গোল্ডেন ব্যান্ডের ঘড়ির বয়স নাকি দীপুর হয়নি। কিচি কি ডেঁপো? দীপুর মনে হয়। 
  
ঘড়ি বের করে দেখলে তিনটে চুয়ান্ন। সাইকেলটা গাছতলায় রেখে ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে বসে কিচির দেওয়া বইটা খুললে দীপু। শৈলেনের "ভালোবাসার ছোট্ট হরিণ"। পাঁচ মিনিট রয়েছে, শেষ রিভিসন দেওয়াই যায়।  

Sunday, November 1, 2015

পরিচিতি

খাট থেকে নেমে পায়ে হাওয়াই চটি গলিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন নিশিকান্তবাবু। অন্তত বার তিনেক না উঠলে তার রাত কাটে না। যে বয়েসের যে দোষ। অন্ধকার হাতড়ে সুইচ বোর্ড খুঁজে পেয়ে আলো জ্বালাতেই টের পেলেন তিনি তার বাড়িতে নেই। 

কারণ অ্যাকিউট অ্যাম্নেসিয়ার দোষ এটাই যে তার কিছুই মনে থাকার কথা নয়; দেওয়ালে স্যুইচ বোর্ড কোথায় সেটাও নয়। খুঁজে পেয়েছেন মানে এ ঘর তার নয়।


তখনই শোনা গেল কণ্ঠস্বরটা। এমন মিষ্টি পুরুষ কণ্ঠ সচরাচর শোনা যায় না।

- "ব্রিলিয়ান্ট নিশিকান্তবাবু। আপনি সবিশেষ ভুলো কিন্তু আপনার ডিডাকশন পাওয়ার এ জরাগ্রস্ত সময়েও তন্দরুস্ত রয়েছে, ব্রিলিয়ান্ট। সত্যিই এটা আপনার ঘর নয়"।

-" আই সি, এক আমি এখানে এলাম কী করে। দুই এখানের স্যুইচ বোর্ড কোথায় বা আমার হাওয়াই চটি কোথায়; সেটাই বা আমি বুঝলাম কী করে"।

- " বুঝতে পারছেন না কী?"

- " না, বৃদ্ধ মানুষ আমি। হেঁয়ালি অপছন্দ করি"।

-" সুইচ বোর্ড এই নতুন ঘরে ঠিক কোথায় সেটা আপনি জানতেন কারণ জানার দরকার নেই বলে। এ ঘরের ডিজাইন আপনার। আপনার মগজের মধ্যে। আপনার দৈনিক অসুবিধেগুলোর ছেনি হাতুড়িতে কন্সট্রাক্ট করা এই ঘর। আপনি যে দেওয়ালেই যখনই সুইচ বোর্ড খুঁজতে হাত বাড়াবেন অমনি স্যুইচ বোর্ড হাতে পেয়ে যাবেন"।

- " সিলি"।

- "অন দ্য আদার হ্যান্ড। এক্সট্রিমলি রিয়েল"।

- "রিয়েল?"

- "আলো জ্বলল তো?"

-" ইজ ইট আ ড্রিম না আপনি আমায় কিডন্যাপ করেছেন?"

-"স্বপ্ন? না না। কিডন্যাপ? ওয়েল।"।

-" কিডন্যাপ করেছেন? করে এসব আজগুবি আজেবাজে কথা বলছেন ? আপনি কী এক্সপেক্ট করছেন? আমার ছেলেপুলে আপনাকে র্যােনসম দেবে?"

-"নিশিকান্তবাবু, সেই এক্সপেকটেশন আমার নেই।"

-"ওহ, আই সি। চিনতে পেরেছি আপনাকে"।

-"বললাম তো, আপনার ডিডাকশন পাওয়ার ইজ আনপ্যারালাল"।

-"যে যে অসুবিধেগুলো ছিল সবই কেটে গেছে দেখছি। পকেটে চশমা। হাতঘড়ি হাতে। ব্রিলিয়ান্ট। অফ কোর্স এ ডিজাইন আমার। আপনার ভয়েস শুনে অবিশ্যি তখনই সন্দেহ হয়েছিল"।

-"আমি পেরেছি তাহলে বলুন নিশিকান্তবাবু"।

-"হুঁ? ইয়েস। ইয়েস। পেরেছেন। সহজ ছিল না। এইভাবে টেনে আনা। বাহ, জলের গেলাসটাও দেখছি হাতের কাছেই। থ্যাঙ্ক ইউ ফর কিডন্যাপিং মি বাই দি ওয়ে"।

- " ওয়েলকাম টু কোমা নিশিকান্তবাবু। আর আমায় কী আপনিতেই বেঁধে রাখবেন?"

-"আমি নিজেকে ভীষণ রেস্পেক্ট করি, ভীষণ। আপনিই থাক"।

হ্যালোউইন

- ভয় করে না অনিলবাবু? ভয় করে না?

- করে না আবার? ইনফ্লেশনের ভয়। বসের ভয়। বৌয়ের ভয়। চৈত্র সেলের ভয়। ছেলেমেয়ে আমায় যথেষ্ট ভয় পাচ্ছে না ভেবে ভয়। লোডশেডিং হলে ফিউজ উড়েছে কী না ভয়। ক্যানসারে মরার ভয়...। 

- এ বয়েসে প্রেমে পড়ার ভয়? করে না?

- কী যে বলে পাঁজাবাবু। আমি রেলের ক্লার্ক। আমার শ্বশুরবাড়ি মালদা। এক বৌ দুই ছেলে তিন মেয়ে। মেয়েটা সেকেন্ড ইয়ার, বড় ছেলে এগারো ক্লাস, ছোট ছেলে নাইনে। দেড় বছর পর রিটায়ারমেন্ট। ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম দিতে গিয়ে হিমশিম। প্রেমে পড়ব?

- কলেজে প্রেমে পড়ছিলেন? 

- মুখচোরা ছিলাম তো। 

- প্রেম করেছিলেন কী না জিজ্ঞেস করিনি। প্রেমে পড়েছিলেন?

- ঈশানী। চ্যাটার্জী বোধ হয়। আমার আওতার বাইরে ছিলে সে মশাই। অবভিয়াসলি। সে গেল মাস্টার্সে। আমি ঢুকলাম ফেয়ার্লি তে ক্লার্ক হয়ে। 

- ঈশানীরা আর নেই? না আপনার সে চোখ নেই? 

- এ বয়েসে...ছিঃ...ছিঃ...। 

- ঈশানীরা আর নেই? সেই চোখ আপনার, নেই?

- সে সময়ের সাহস...। 

- এ সময়ের ভয়?

- জলের গেলাসটা এগিয়ে দিন না এদিকে। 

- হ্যাপি হ্যালোউইন অনিলবাবু।

- হ্যালো...কী?

- নীলা শার্প মেয়ে অনিলবাবু। ইংলিশে তুখোড়। ওর হোম টিউশানির দরকার নেই। 

- দরকার...নেই...মানে?

- মানে মনে হয় ওকে আর পড়ানো আমার হবে না।

- সে কী? আপনি পড়াতে শুরু করার পর থেকে এত ইম্প্রুভ করেছে ওর মার্কস...। 

- নতুন চাকরী জুটেছে একটা কটিহারে। কলকাতা ছাড়তেই হচ্ছে। আর এ মাসের মাইনেটা বরং থাক। চলি।