Tuesday, November 3, 2015

ইন্টারনাল পরীক্ষা

- কাকীমা, অজয়দা আছে? 

- অজয় তো শ্যামনগর গেছে রে। ওর পিসির বাড়ি। পরশু আসবে।

- ও। 

- কোন কাজ ছিল?

- না মানে। ওই। 

- আমায় বলবি?

- অজয়দা একটা বই দেবে বলেছিল।

- বই?

- ওই। ফিজিক্সের। একটা ভালো গাইড বই। 

- খুব দরকারি? 

- হ্যাঁ। মানে কাল একটা পরীক্ষা ছিল। 

- পরীক্ষা? এই সময়ে?

- ইন্টারনাল। অজয়দা বলেছিল। বইটার কথা। আমায় গাইড করে। মাঝে মাঝেই। 

- অজয় তোকে গাইড করে? ও উচ্চমাধ্যমিকে ফিজিক্সে ব্যাক পেয়েছিল রে!

- অজয়দা বলে পরীক্ষাই সব নয়। 

- বাহ, তোর মাথা ভালোই খেয়েছে। যা, দোতলায় ওর পড়ার টেবিলে আর বইয়ের তাকে দেখ খুঁজে। যদি পাস বইটা।

- যাব?

- যা। যা না। 

**

- কী খুঁজছিস?

- ফিজিক্সের গাইড বই। অজয়দা বলেছিল। 

- দাদা তো নেই।

- কাকীমাই বললে। বইটা আসলে...আর্জেন্ট...কাল পরীক্ষা ছিল। 

- পেলি? 

- না। মানে। এখানে নেই বোধ হয়...।

-  তুই কী এই বইটা খুঁজছিলিস?

- ওহ। হ্যাঁ মানে...।

- কাল কখন পরীক্ষা তোর?

- চা...চারটে। বিকেল। 

- যা ভাগ। 

- আসি। হেহ!

- আর শোন! 

- হুঁ?

- যাওয়ার আগে একটা যে কোন ফিজিক্সের বই তুলে নিয়ে যা। গবেট কোথাকার। 

**

মেজজেঠিমা নতুন হাতঘড়িটা পকেটে রাখে দীপু। কিচি বলে গোল্ডেন ব্যান্ডের ঘড়ির বয়স নাকি দীপুর হয়নি। কিচি কি ডেঁপো? দীপুর মনে হয়। 
  
ঘড়ি বের করে দেখলে তিনটে চুয়ান্ন। সাইকেলটা গাছতলায় রেখে ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে বসে কিচির দেওয়া বইটা খুললে দীপু। শৈলেনের "ভালোবাসার ছোট্ট হরিণ"। পাঁচ মিনিট রয়েছে, শেষ রিভিসন দেওয়াই যায়।  

Sunday, November 1, 2015

পরিচিতি

খাট থেকে নেমে পায়ে হাওয়াই চটি গলিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন নিশিকান্তবাবু। অন্তত বার তিনেক না উঠলে তার রাত কাটে না। যে বয়েসের যে দোষ। অন্ধকার হাতড়ে সুইচ বোর্ড খুঁজে পেয়ে আলো জ্বালাতেই টের পেলেন তিনি তার বাড়িতে নেই। 

কারণ অ্যাকিউট অ্যাম্নেসিয়ার দোষ এটাই যে তার কিছুই মনে থাকার কথা নয়; দেওয়ালে স্যুইচ বোর্ড কোথায় সেটাও নয়। খুঁজে পেয়েছেন মানে এ ঘর তার নয়।


তখনই শোনা গেল কণ্ঠস্বরটা। এমন মিষ্টি পুরুষ কণ্ঠ সচরাচর শোনা যায় না।

- "ব্রিলিয়ান্ট নিশিকান্তবাবু। আপনি সবিশেষ ভুলো কিন্তু আপনার ডিডাকশন পাওয়ার এ জরাগ্রস্ত সময়েও তন্দরুস্ত রয়েছে, ব্রিলিয়ান্ট। সত্যিই এটা আপনার ঘর নয়"।

-" আই সি, এক আমি এখানে এলাম কী করে। দুই এখানের স্যুইচ বোর্ড কোথায় বা আমার হাওয়াই চটি কোথায়; সেটাই বা আমি বুঝলাম কী করে"।

- " বুঝতে পারছেন না কী?"

- " না, বৃদ্ধ মানুষ আমি। হেঁয়ালি অপছন্দ করি"।

-" সুইচ বোর্ড এই নতুন ঘরে ঠিক কোথায় সেটা আপনি জানতেন কারণ জানার দরকার নেই বলে। এ ঘরের ডিজাইন আপনার। আপনার মগজের মধ্যে। আপনার দৈনিক অসুবিধেগুলোর ছেনি হাতুড়িতে কন্সট্রাক্ট করা এই ঘর। আপনি যে দেওয়ালেই যখনই সুইচ বোর্ড খুঁজতে হাত বাড়াবেন অমনি স্যুইচ বোর্ড হাতে পেয়ে যাবেন"।

- " সিলি"।

- "অন দ্য আদার হ্যান্ড। এক্সট্রিমলি রিয়েল"।

- "রিয়েল?"

- "আলো জ্বলল তো?"

-" ইজ ইট আ ড্রিম না আপনি আমায় কিডন্যাপ করেছেন?"

-"স্বপ্ন? না না। কিডন্যাপ? ওয়েল।"।

-" কিডন্যাপ করেছেন? করে এসব আজগুবি আজেবাজে কথা বলছেন ? আপনি কী এক্সপেক্ট করছেন? আমার ছেলেপুলে আপনাকে র্যােনসম দেবে?"

-"নিশিকান্তবাবু, সেই এক্সপেকটেশন আমার নেই।"

-"ওহ, আই সি। চিনতে পেরেছি আপনাকে"।

-"বললাম তো, আপনার ডিডাকশন পাওয়ার ইজ আনপ্যারালাল"।

-"যে যে অসুবিধেগুলো ছিল সবই কেটে গেছে দেখছি। পকেটে চশমা। হাতঘড়ি হাতে। ব্রিলিয়ান্ট। অফ কোর্স এ ডিজাইন আমার। আপনার ভয়েস শুনে অবিশ্যি তখনই সন্দেহ হয়েছিল"।

-"আমি পেরেছি তাহলে বলুন নিশিকান্তবাবু"।

-"হুঁ? ইয়েস। ইয়েস। পেরেছেন। সহজ ছিল না। এইভাবে টেনে আনা। বাহ, জলের গেলাসটাও দেখছি হাতের কাছেই। থ্যাঙ্ক ইউ ফর কিডন্যাপিং মি বাই দি ওয়ে"।

- " ওয়েলকাম টু কোমা নিশিকান্তবাবু। আর আমায় কী আপনিতেই বেঁধে রাখবেন?"

-"আমি নিজেকে ভীষণ রেস্পেক্ট করি, ভীষণ। আপনিই থাক"।

হ্যালোউইন

- ভয় করে না অনিলবাবু? ভয় করে না?

- করে না আবার? ইনফ্লেশনের ভয়। বসের ভয়। বৌয়ের ভয়। চৈত্র সেলের ভয়। ছেলেমেয়ে আমায় যথেষ্ট ভয় পাচ্ছে না ভেবে ভয়। লোডশেডিং হলে ফিউজ উড়েছে কী না ভয়। ক্যানসারে মরার ভয়...। 

- এ বয়েসে প্রেমে পড়ার ভয়? করে না?

- কী যে বলে পাঁজাবাবু। আমি রেলের ক্লার্ক। আমার শ্বশুরবাড়ি মালদা। এক বৌ দুই ছেলে তিন মেয়ে। মেয়েটা সেকেন্ড ইয়ার, বড় ছেলে এগারো ক্লাস, ছোট ছেলে নাইনে। দেড় বছর পর রিটায়ারমেন্ট। ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম দিতে গিয়ে হিমশিম। প্রেমে পড়ব?

- কলেজে প্রেমে পড়ছিলেন? 

- মুখচোরা ছিলাম তো। 

- প্রেম করেছিলেন কী না জিজ্ঞেস করিনি। প্রেমে পড়েছিলেন?

- ঈশানী। চ্যাটার্জী বোধ হয়। আমার আওতার বাইরে ছিলে সে মশাই। অবভিয়াসলি। সে গেল মাস্টার্সে। আমি ঢুকলাম ফেয়ার্লি তে ক্লার্ক হয়ে। 

- ঈশানীরা আর নেই? না আপনার সে চোখ নেই? 

- এ বয়েসে...ছিঃ...ছিঃ...। 

- ঈশানীরা আর নেই? সেই চোখ আপনার, নেই?

- সে সময়ের সাহস...। 

- এ সময়ের ভয়?

- জলের গেলাসটা এগিয়ে দিন না এদিকে। 

- হ্যাপি হ্যালোউইন অনিলবাবু।

- হ্যালো...কী?

- নীলা শার্প মেয়ে অনিলবাবু। ইংলিশে তুখোড়। ওর হোম টিউশানির দরকার নেই। 

- দরকার...নেই...মানে?

- মানে মনে হয় ওকে আর পড়ানো আমার হবে না।

- সে কী? আপনি পড়াতে শুরু করার পর থেকে এত ইম্প্রুভ করেছে ওর মার্কস...। 

- নতুন চাকরী জুটেছে একটা কটিহারে। কলকাতা ছাড়তেই হচ্ছে। আর এ মাসের মাইনেটা বরং থাক। চলি।

Saturday, October 31, 2015

লাল নীল সবুজ

তেলচিটে হলুদ রান্নাঘরের দেওয়াল। এক ঘুপচি কোনে দেওয়াল ফুঁড়ে একটা লম্বা বেঁকানো পুরনো পরিচিত পেরেক। সে পেরেকের গায়ে রাবার ব্যান্ডের গোছা; সবুজ গার্ডার, নীল গার্ডার আর লাল গার্ডার। পেরেকের মুখের দিকে সবুজগুলো, মাঝে নীল আর পিছনের দিকে লালগুলো; যত্নে সাজানো। 

লাল, নীল আর সবুজ রঙেরই কেন? কারণ নিউ শ্রীকৃষ্ণ কুড়িটাকার মিষ্টির বাক্সের প্যাকেটে এই তিন রঙের গার্ডারই থাকে। সোম টু শনি ভদ্রলোকের অফিসের ঝোলার টুপি থেকে খরগোশের মত বেড়িয়ে আসে সেই মিষ্টির বাক্স; হয় ছানার জিলিপি নয়ত চন্দ্রপুলি। চার টাকার পাঁচ পিস্‌; তিন পিস ভদ্রলোকের, দুই পিস্‌ ভদ্রমহিলার। এক পিস্‌ এক পিস্‌ খাওয়ার পরে। দু'পিস্‌ এক পিস্‌ রাত দেড়টার গল্পের আসরে। ভদ্রলোক সঞ্জীব পাঁচালির ভক্তিতে পড়ে চলেন।  ভদ্রমহিলার চোখের ঘুমের ভার, ঠোঁটে ছানার মত নরম হাসি, আঁচলে ফ্যাসফ্যাসে অগোছালো আনন্দ। খোলা জানালার গোলাপি প্রিন্টের জানালা প্যাতপ্যাতিয়ে নড়াচড়া করে চলে। 

ভদ্রলোক  সঞ্জীব ছেড়ে নারায়ণ দেবনাথ ধরলে ভদ্রমহিলা তন্দ্রা ঝেড়ে ফাঁকা মিষ্টির বাক্স নিয়ে উঠে যান; কাগজের বাক্সটা নিপাত যায় - গার্ডার দু'টো যত্নে ঝুলিয়ে দেন পরিচিত পেরেকে; সবুজে সবুজ,  নীলে নীল, লালে লাল। 

ভদ্রলোকের অফিসের স্টিল-টিফিন বাক্স তিন তলার; এক তলায় ভাত, দোতলায় সবজি, তিন তলায় ঝোল। তিন ডিব্বাতেই  ঢাকনা আলগা, তাই বাড়তি বাঁধনে গার্ডার। ভাতের ডিব্বায় নীল গার্ডার, সবজির ডিব্বায় সবুজ আর ঝোলে লাল।

সেবার নতুন টিফিন এলো। সেবার রান্নাঘর রঙ হল গোলাপিতে। 
সেবার ভদ্রমহিলার চোখে জল; "আমায় দেখতে এলে মিষ্টির বাক্স নিয়ে আসতে হয় ?"।  
সেবার ভদ্রলোকের কাঁচুমাচু সারেন্ডার; "তোর বর মিষ্টি আনে? তুই গার্ডার জমিয়ে রাখিস?"।
ভদ্রমহিলা ছানার মত নরম হাসেন, "বৌয়ের কানে সঞ্জীব দিস? রেনল্ড পেনে ট্যাটু আঁকিস?"

সুকুমার

১।



২। 

- এই লেদার জ্যাকেটটা দেখেছ সোনা? সাড়ে তিন।

- শো?

- ধুর। হাজার। মাও বললে, আউটরাইট হ্যান্ডসাম লাগছে। পিসি বললে ক্লুনি।

- যতসব আবোলতাবোল।

- যা, শালা। 
- হ্যান্ডসাম বলতে আমি পাতি বাংলায় সুকুমার বুঝি। দ্যাট ইজ মাই ওপিনিওন, আমার রায়।


৩।

- মদনা! অ্যাই মদনা।
- স্যার! আসছি স্যার।
- কনসাইনমেন্ট রেডি?
- কন...কোন কনসাইনমেন্ট?
- যাব্বাবা...দেখ কাণ্ড, আজ বাজে কাল পৃথিবীর উদ্বোধন। মানুষ লঞ্চ করতে হবে। মানব মানবীকে প্রেমে চেজ্‌ করবে। আর তুই ব্যাটা বলছিস কোন কনসাইনমেন্ট? হারামজাদা! চাবকে সিধে করে দেব। বলি প্রেমের যন্ত্রপাতিগুলোর কনসাইনমেন্ট, তৈরি আছে তো? 
- ও প্রেমের টুলবক্সের কনসাইনমেন্ট? সে তো কব্বে থেকে রেডি। সে আপনি আজ্ঞা করলেই মর্তে ডেলিভার করে দেব।
- গুড। তা ইয়ে, সমস্ত জাতি উপজাতির প্রেমের টুল-বক্স কিন্তু আলাদা!
- তা আর বলতে কত্তা! তবে সবচেয়ে হিমশিম ওই বাঙালির প্রেমের টুলবক্স জড়ো করতে। যা ডিএনএ'র নমুনা দেখলাম; ঢ্যাঁটা জাত। প্রেম-ট্রেম ইনসার্ট করা মামুলি না এদের মধ্যে। সবকিছুতেই এদের ধানাইপানাই। 

- কই দেখি বাঙালির প্রেম টুলবাক্সে কী কী রেখেছিস!
- জিনিষ কী আর একটা কত্তা। পার্কের বেঞ্চি থেকে রেস্তোরাঁর কেবিন, কিছুই বাদ রাখিনি। নলবন দিয়েছি, ছাতা দিয়েছি... ।
- আরে হাইয়ার ফর্ম অফ প্রেমের জন্য কী কী দিয়েছিস।
- বসন্ত আছে। সঙ্গীত আছে। কবিতা আছে।
- তবু যেন হচ্ছে না রে মদনা। কিছু একটা কম পড়ছে।
- আজ্ঞে চিন্তা করবেন না মদনা থাকতে আপনার চিন্তা নেই। সবচেয়ে মোক্ষম দাওয়াইটাও দিয়ে রেখেছি।
- সেটা কী?
- শেষের কবিতা। যে কোন সিচুয়েশনে মাখনে ছুরি।
- হুঁ। মন্দ নয়। তবে তাও যদি ফেল করে?
- এক্সেপশনাল কেস্‌ স্যার। অত ফেউ সামলানো যাবে না। যে মানবী শেষের কবিতাতেও ঝুলে পড়বে না, মানবদের উচিৎ তাদের থেকে দূরেই থাকা। সোজা কথা।
- না না না। তা বললে কী হয়? এ জিনিষে চান্স নেওয়া যাবে না। দে আমার হোমিওপাতির বাক্সটা দে। একটা মিক্সচার বানিয়ে দিচ্ছি, টুলবক্সে সেটাও রেখে দে।
- এই নেন।

**দু'মিনিট পর**

- এই নে মদনা, এই মিক্সচার খালি বাঙালি প্রেমের টুল বক্সে রেখে দে। প্রেমিকের আর গাড্ডু খাওয়ার চান্স রইল না।
- এটা কীসের মিশেল কত্তা?
- আরে পার্বতী কে এই মিশেলেই...।
- আপনার স্টোরি শুনে কাজ নেই কত্তা, মিক্সচারে কী আছে সেটা বলেন।
- সিম্পল রে। এক দাগ বিকেল, দুই দাগ ছাদের কোণ, দেড় দাগ মন-কেমন আর চার দাগ হঠাৎ আবোলতাবোল। ম্যাজিক। নিশ্চিন্দি।