Thursday, September 10, 2015

ঘুম আর মা

- ঘুমিয়ে গেলি খোকা?

- ঘুমোব কী করে? তুমি না এলে আমার ঘুম আসে?

- নতুন মা এত সুন্দর ঘুম পাড়ানি গান গায়, তবু আমায় খুঁজিস কেন?

- ছোটমার গায়ে যত ক্রীমের বিচ্ছিরি গন্ধ । অথচ তোমার গায়ে কী সুন্দর হাড় হাড় গন্ধ! তাই তো তোমায় ছাড়া ঘুম আসে না মা।

রমেনবাবুর স্বস্তি

সিগারেটের প্যাকেটটা খালি। বাড়িতে চায়ের পাতা নেই। মানিব্যাগে দু'টো কুড়ি টাকার বাইরে আর কিস্যু নেই। বিকেলে থেকে লোডশেডিং; ফেজ গ্যাছে। ঢাকা দেওয়া রাতের খাওয়ার বলতে ভাত, এক বাটি ডাল, আলু কুমড়োরর তরকারি আর বড়ি ভাজা। গায়ে সামান্য জ্বর কিন্তু রমেনবাবুর মেজাজখানা খুশ।

মিতার আজ ছেলে হয়েছে। আহা, কী চিন্তাতেই না ছিল মিতা আর অভীক; সাত বছরেও যখন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। অবশেষে। হল। ফুটফুটে। জলে ভিজে শুভেচ্ছা জানাতে গেছিলেন রমেনবাবু। মিতার সাথে দেখা হয়নি, অভীককে জড়িয়ে কঙ্গ্র‍্যাচুলেট করে এসেছিলেন রমেনবাবু।

আহা! ওদের মুখে হাসি ফুটলো। বড় পোড়া কপাল মিতার; সেই ছেলেবেলা থেকে। ইস্কুল থেকে। বাপ মা বিনে বড় হয়ে ওঠা, মামা মামির ধ্যাতানি মাথায় করে বড় হয়ে ওঠা মেয়ে মিতা। অভীকের মত ছেলে হয় না। ওকে পেয়ে বেঁচেছিল মিতা।

কত কিছুই তো নেই, মিতাকে বিয়ে না করতে পারাটাও স্নেহের না থাকা হয়ে আগলে রেখেছে রমেনবাবুকে। সমস্ত না থাকাকে আলোয় আলোয় ভরে রেখেছে মিতার না থাকা।

মিতার ছেলে হওয়ার খবরে 'না থাকা'র ওজন বেশ লাঘব হল রমেনবাবুর জন্য। আহা রে, ওরা তিনজনে ভালো থাকুক।

মিতার সিঁদুরের ছোপ রাখা বালিশের ওয়াড়টা আলমারিরর লকার থেকে বের করে তার ঘ্রাণে বুক ভরলেন রমেনবাবূ। মেয়েটা বড় ভালো; ওর ভালো হোক।

টিচার্স ডে

- অদ্ভুত।



- জানি। 

- খেতে কেমন লাগছে?

- অপূর্ব। অভূতপূর্ব।

- জানি। আমার তো নেশা হয়ে গেছে এ জিনিষে।

- এই স্যুপ কি রোজ চলে নাকি তোমার?

- রোজ রোজ এ জিনিষের সাপ্লাই পাই কোথায় বল। 

- তা ঠিক। 

- রেসিপিটাটা অরিজিনাল তো?

- অফ কোর্স। স্যুপ লব্য।

- লব্য কেন? 

- সে লম্বা গপ্প। টু কাট দ্য লং স্টোরি শর্ট, বেশ ক'বছর আগে গুরুদক্ষিণা হিসেবে এক ছাত্রের থেকে এ জিনিষ প্রথম পাই। তখনই এই স্যুপের আইডিয়াটা ক্লিক করে। 

- গুরুদক্ষিণায় আঙুল?

- তবে আর বলছি কী? ভীলের ব্যাটার শখ হয়েছে ধনুক শিখবে আমার কাছে। গোড়াতেই সে গুড়ে বালি ঢালতে গুরুদক্ষিণা হিসেবে ওর বুড়ো আঙুল চেয়ে বসলাম। সে গবেট রাজী হলে। আর সেই বুনো দেশী নধর আঙুলের টুকরোটা হাতে আসতেই মাথায় খেলে গেল আঙুল স্যুপের কথাটা। গবেটের নাম ধার করে এ রেসিপির নাম দিলাম লব্য স্যুপ।

- বট! বাহ, এই না হলে শিক্ষক।

- হে হে হে।

- হ্যাপি টিচার্স ডে টু ইউ বস। আরেক বাটি স্যুপ দাও দেখি।

ল্যাদ যন্ত্র

১। 

অফিসে ফেরতা ঘাম আর অফিস মোছানো স্নান। 

বাথরুমে গলায় মুকেশ আর বৌ-বৌ গন্ধের লাক্স সাবান। ভেজা গামছায় মুনওয়াকি কেতায় বেরিয়ে এসে ঘাড়ে পন্ডস পাউডারের মা-মা গন্ধ আর ডাবল ঢলা পাজামার বাবা-বাবা টাইপের মেজাজ।


রেমণ্ডকে বালখিল্য করে নিজের কবিতা তৈরি করতে পারা। দ্যাট।



২। 

লাল নীল সবুজেরই মেলা বসেছে।

স্টিলের বাটিতে বিউলির ডালের বড়ার লাল।

মনের কোণে আগামীকাল অফিস রিভিউয়ের নীল।

কড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানো মায়ের ঘামে ভেজা গালে মিষ্টি চকমকি "আরও দু'টো দিই?" মার্কা হাসির সবুজ।

৩।
বিপুলবাবু বুঝেছেন জীবনে রোটির বদলে ডাল ভাত থাকলেই চলবে। পোস্তর বড়াটা ম্যান্ডেটরি নয় কিন্তু থাকলে তোফা।

কপড়া বলতে দরকার জেনুইন ভালো কোয়ালিটির এক জোড়া গামছা; প্রয়োজনে যা আলোয়ান টু লুঙ্গি টু বেডকভার টু কাঁথা সমস্ত হতে পারে।

আর মকান বলতে অল্প ভাড়ার ছাতের ঘরের জানালা ঘেঁষা জলচৌকি, তার ওপর লাল ফুল ফুল প্রিন্টের চাদর। সাথে দু'টো বালিশ, একটা পাশবালিশ আর বালিশের তলায় রাখা পোস্টকার্ড;
"খোকা, টাকাটা পেয়েছি। এবারে ভাবছি তোর মায়ের ওই টেস্টগুলো করিয়েই নেব। বড় ভুগছে বেচারি। তুই যেন আবার চিন্তা করিস না, আমি সামলে নেব। তুই ভালো থাকিস, শরীরের যত্ন নিস। বাবা"।


বিপুলবাবু নিজের ডায়েরীও ছদ্মনামে লেখেন : শ্রী ডেয়ারডেভিল।


৪। 

অমিয়বাবু। দিনে তিনটে করে খবরের কাগজ রাখেন।

গণশক্তি রাখেন তার পাশের ফ্ল্যাটের গমগমে তৃণমূল সমর্থক মৃদুলবাবুকে দূরে রাখতে।
জাগো-বাংলা রাখেন তার অন্য প্রতিবেশি নীরদবরণবাবুর সিপিএম সিপিএম বাতিকের থেকে নিজেকে ইনসুলেট করতে।


আনন্দবাজার রাখেন তা থেকে ইউজ অ্যান্ড থ্রো মাদুর করে; সন্ধ্যেবেলা ছাতে হ্যারিকেন আর হারমোনিয়াম নিয়ে বসে রজনীকান্তের গান গাইতে।

সকালে চায়ের সাথে অমিয়বাবুর নারায়ণ দেবনাথেই চলে যায়।

গল্পে বিশ্বাস

- গল্পে বিশ্বাস আছে?

- হোয়াট?

- ডু ইউ বিলিভ ইন ফিকশন?

- বিশ্বাসের স্টাম্প দরকার নেই; তাই তো সেটা গল্প।

- রিয়ালিটির ওপর স্টাম্প আছে?

- দেখতে পারি। ছুঁতে পারি। অন্তত লজিক আর বিজ্ঞানে বাঁধতে পারি। তাই সে'টা রিয়ালিটি।

- সো উড উ থিঙ্ক।

- মানে?

- মানে তোমার দেখা, ছোঁয়া, লজিক, বিজ্ঞান; সবটাই যদি অন্যের ফিকশনে প্ল্যান্টেড থাকে?

- ল্যাদ শেয়ার করছ?

- সিরিয়াসলি।

- আমার রিয়ালিটি অন্যের গল্পে প্ল্যান্টেড?

- মানে। এমনটাও তো হতে পারে যে মানুষ সত্যিই আছে।

- হুঁ? মানুষ? ওই সস্তা হরর গপ্পের মানুষ? যারা রক্ত খায় না আর যুদ্ধ করে?

- হতেও তো পারে। আই মিন। হয়তো তাঁদের কাছে ড্রাকুলা ব্যাপারটাই ফিগমেন্ট ইফ ইম্যাজিনেশন!

- হ্যাঁ, এরপর বলবে মানুষ ইউনিকর্নে চেপে ঘুরে বেড়ায়।

- হতেও পারে। আবার বিভিন্ন রিয়ালিটি বা বিভিন্ন ফিকশন ইন্টারসেক্ট নাও করতে পারে।

- তুমি ল্যাদে ল্যাদল্যাদ করছ।

- হয়ত ল্যাদ ব্যাপারটাই অনলি কমন থ্রেড অ্যাক্রস রিয়ালিটিজ।

- হেহ! হয়ত।