Tuesday, July 21, 2015

ডমিনো

লাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে একটা বেশ চনমনে মন কেমনের ভাব আসে। ব্লজ্ঞপ্রাণের মনের মধ্যেও সেইরকমই একটা শিরশিরে ভাব। খানিকক্ষণ ছটফট করেছিল বইবপনবাবু মারা যাওয়ার আগে। বইবপনের বুকে ছুরিটা বসাতে একটুও ভুল হয়নি ব্লজ্ঞপ্রাণের। দু'টো পাঁজরার মাঝখান দিয়ে সটান ঢুকিয়ে দেওয়া। সঠিক পয়েন্ট জানা থাকলে বুকে ছুরি ঢোকানো এক তাল নরম মাখনে ছুঁচ ঢোকানোর চেয়েও সহজ।
মৃতদেহর প্রতি মায়া বোধ হয় খুব সহজে আসে। ব্লজ্ঞপ্রাণের চোখে সামান্য স্নেহ চিকচিক করে উঠছিল বোধ হয় বইবপনের লাশটার দিকে তাকিয়ে। অথচ খুন করার আগে ব্যাটার দিকে তাকিয়ে এক ফোঁটাও অনুকম্পা আসেনি। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করলে ব্লজ্ঞপ্রাণ। 
**

টুঁটি টিপে মেরে ফেলাটা সহজ নয়। তবে এই কাজটাতে শ্রীমান ফেবুপেমনকে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। অভ্যাসে কী না হয়। ব্লজ্ঞপ্রাণ সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে সবে পাঞ্জাবীর পকেট হাতড়াতে শুরু করেছিল দেশলাই খুঁজতে। ঠিক তখনই পিছন থেকে এসে ডান হাতটা দিয়ে সাঁড়াশির মত ব্লজ্ঞপ্রাণের গলাটা চেপে ধরে ফেবুপেমন। পাক্কা আড়াই মিনিটের ব্যাপার। মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি বের হয়নি ব্লজ্ঞপ্রাণের; অল্প সময়ের মধ্যেই ঠোঁটের বাঁ দিক ঘেঁষে একটা রক্তের ধারা নেমে আসে।

অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে ব্লজ্ঞপ্রাণের নিথর দেহটা ফুটপাথে শুইয়ে রেখে পাশের বাস স্টপের বেঞ্চিতে একটু এলিয়ে বসে ফেবুপেমন। বড় ঝক্কির দিন গেছে। ব্লজ্ঞপ্রাণের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইটা আগেই বের করে রেখেছিল সে। সিগারেট ধরিয়ে চটপট কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ভাসিয়ে দিল ফেবুপেমন। আহ! তৃপ্তি। গুনগুন করে " ছু কর মেরে মন কো কিয়া তুনে কেয়া ইশারা"র সুর ভাজতে শুরু করলে সে।

**
ট্যুইটঙ্কার মুখার্জির ভারী মিষ্টি লাগছিল জানালার ধারে বসে থাকতে। রাত দেড়টার সময় শহরটা এত শান্ত হয়ে যায়, যে তাকে ঘুমন্ত কুকুরছানার মত আদর করতে মন চায় ট্যুইটঙ্কারের।

ট্যুইটঙ্কারের আট তলার জানালার নিচেই বড় রাস্তা। রাস্তার ওপারে বাস স্টপ। বাস স্টপের পাশে বেঞ্চি। স্ট্রীট ল্যাম্পটা বিগড়েছে আজ, তাই আবছায়াতে বেঞ্চিটাকে কালো মনে হচ্ছিল; যদিও ট্যুইটঙ্কার জানে যে বেঞ্চির রঙ আসলে সবুজ। বেঞ্চিতে যে একটা আবছা অবয়ব বসে; সে প্রায় অন্ধকারে মিশে থাকলেও ট্যুইটঙ্কার জানে যে তার নাম ফেবুপেমন। ট্যুইটঙ্কার আশা করেছিল যে ফেবুপেমন আজ এসে এই বেঞ্চিতে বসবে। যাক। স্নাইপারের নলটা জানালায় গুঁজে স্নাইপার-ফোকাসে চোখ রাখলে ট্যুইটঙ্কার। ফোকাসটা অ্যাডজাস্ট করে ফেবুপেমনের মাথাটা নিশানায় মেপে নীল সে। ট্রিগারে আঙুল রেখে মিহি সুরে গান ধরলে ট্যুইটঙ্কার; "...বদলা ইয়ে মউসম, লাগে পেয়ারা জগ সারা..."।


**
ট্যুইটঙ্কারের ভূমিকায় - 
ট্যুইটার পেজ https://twitter.com/mtanmay


ফেবুপেমনের ভূমিকায় - 
ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/bongpen.net


ব্লজ্ঞপ্রাণের ভূমিকায় - 
ব্লগ www.bongpen.net


বইবপনের ভূমিকায় -
অচেনা পুরনো বই 
http://www.amazon.in/Bong-Pen-Tanmay-Mukherjee/dp/1621543471/ref=la_B00J4T7038_1_1?s=books&ie=UTF8&qid=1437418287&sr=1-1

Sunday, July 19, 2015

বোমা ও বেহেস্ত



আদেকুম্বির মনে হচ্ছিল আহ্লাদে বুঝি সে পাগল হয়ে যাবে। ভোরের আকাশের মত মেঝে, ঘাস সবুজ ছাত। কতরকমের কত রঙের প্রজাপতি যে উড়ে বেড়াচ্ছে চারিদিকে তার ইয়ত্তা নেই। হাওয়ায় গরম ভাত আর ভ্যানিলা আইসক্রিম মেশানো মন পাগল করা গন্ধ। আদেকুম্বি আহ্লাদে লাফিয়ে নিল। দশ বছরের জীবনে এমন জায়গা সে কোনোদিন দেখেনি।

ঘরের মধ্যে বয়ে যাচ্ছে নদী; মজার ব্যাপার হল কুলুকুলু শব্দে না - নদী চলেছে টুংটাং শব্দে। সবুজ রঙের কাঠবেরালি, হলুদ ময়ূর, মিষ্টি পাউরুটির গাছ; কত আজব সুন্দর জিনিষ যে তার নজরে পড়ছে একের পর এক। আদেকুম্বি দেখে আর হাততালি দিয়ে ওঠে। আদেকুম্বি যেদিকেই ছুটতে যায় সেদিকেই রয়েছে মজার কিছু। জ্যান্ত সোনার উট তার চোখে বসানো হীরে, গোলাপি লোমের ভল্লুক- কত কী।

ছুটতে ছুটতে আদেকুম্বি হঠাৎ একটা শ্যাওলা মাখানো ঘরে ঢুকে পড়লে। এই ঘরটা বিচ্ছিরি। মেঝেয় শ্যাওলা, ছাতে শ্যাওলা, হাওয়ায় শ্যাওলা উড়ছে- ভ্যাপসা গন্ধ। আদেকুম্বি ছুট্টে সে ঘর থেকে পালাতে যাবে এমন সময় তার কানে ভেসে এলো হাউহাউ কান্নার শব্দ - একজন, দু'জন নয়- বহু লোকে একসাথে কাঁদছে। কান্নার শব্দ ধাওয়া করে আদেকুম্বির দৃষ্টি ঘরের কোণের দিকে গেল আর সে অবাক হয়ে দেখলে একদল মানুষ সেখানে কান ধরে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে। মানুষগুলো প্রত্যেকে আদেকুম্বির দিকে তাকিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদে যাচ্ছে।

বিব্রত হয়ে আদেকুম্বি জিজ্ঞেস করলে; "তোমরা কে গো?"।
প্রত্যেকে চিৎকার করে নিজের নাম বলে গেলে। শয়ে শয়ে নাম; আদেকুম্বি এত্তটুকু মেয়ে, সে কি পারে সব নাম মনে রাখতে? কয়েকটা নাম শুধু মনে রয়ে গেল; দ্য ভিঞ্চি, রবীন্দ্রনাথ, গালিব, চ্যাপলিন, ম্যান্ডেলা; আরও খটমট কত নাম।

-"তোমরা এমন ভাবে কাঁদছ কেন?", চিৎকার করে জানতে চাইলে আদেকুম্বি।



-"তোমার জন্য", সক্কলে কোরাসে জবাব দিলে।
-"এ মা, আমার জন্য কাঁদছ কেন? আর এমন ভাবে কান ধরে হাঁটু গেড়েই বা বসে কেন তোমরা?"
-"আমার নিজেদের শাস্তি দিয়েছি মা। অবশ্য কোন শাস্তিই যথেষ্ট নয়। তবুও দিলাম। তোমার এই কষ্টের জন্য তো মামনি আমরাই দায়ী", এবারও কোরাসে উত্তর।
-"আমার কষ্ট কিসের? আমি তো বেহেস্তে এসেছি গো?", আদেকুম্বি এ কথা বলতেই কান্নার রোল আরও ঘনীভূত হল।
-"এ বেহেস্ত নয় বেটি। এ তোর মনের ভুল। অবশ্য অন্যায় আমাদেরই। আমরাই তোর জন্য সঠিক পৃথিবী রেখে যেতে পারিনি মা আদেকুম্বি। তাই তো দশ বছর বয়েসে তোকে সুইসাইড বম্ব হয়ে মসজিদে ঢুকতে হয় মানুষ খুন করতে। এ ভুল তোর নয় মা। আমরাই তোর অপরাধী। আমরাই পৃথিবী থেকে বিষ শুষে নিয়ে আসতে পারিনি। আমাদের কবিতা, গান, আবিষ্কার, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান সমস্ত মিথ্যে মা। যে মানব সমাজে তোর দাম নেই, সে মানব ইতিহাসের দাম নেই মা। সেই সমাজ, সেই ইতিহাসের মলিকিউল যে আমরাই। আমাদের ক্ষমা কর"।
-" বেহেস্ত নয় কেন বলছ? ওই যে দেখলাম টুংটাং সুর তোলা নদী, সবুজ কাঠবেরালি, পাউরুটির গাছ; আরও কত কী! ঠিক যেমনটা বলেছিল সেই কাকুটা যে আমার বুকে পেটে বোমা বেঁধে দিয়েছিল। এটা বেহেস্তই তো"।
-"ওসব তুই যা দেখেছিস মা সেগুলো তোর মাথায় গুঁজে দেওয়া ভাঁওতা। ওটা বেহেস্ত নয়। বাস্তব নয়।এই শ্যাওলা ঘরের মধ্যেই তোকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে মা। তোর মুক্তি নেই। তোর দুঃখের ভাগ নিতে আমরা এ ঘরে এসেছি", ঠাণ্ডা কান্নায় ফ্যাসফ্যাসে গলায় কোরাস বললে।
শিউরে উঠে আদেকুম্বি দেখলে সত্যিই এই শ্যাওলা মাখানো বদ্ধ ঘরের দরজাটা আর দেখা যাচ্ছে না।

-"তোমরা খারাপ লোক, তোমরা আমায় বেহেস্তে ফেরত যেতে দাও", আদিকুম্বি এবার কেঁদে উঠলে।
কান্নার কোরাস আরও জোরালো হল।
দাড়িওলা লোকটা এবার উঠে এসে আদেকুম্বিকে জড়িয়ে ধরলে।

-"তুমি কে? আমায় বেহেস্তে যেতে দাও...", আদেকুম্বির মনে হল সে অজ্ঞান হয়ে আসছে।

-"আমার নাম রবীন্দ্রনাথ রে মা", লোকটা আদিকুম্বির পেট থেকে বেরিয়ে আসা নাড়িভুঁড়ি আদিকুম্বির পেটে ঢোকাবার চেষ্টা করতে করতে বললে, "সমস্ত মিথ্যে আদিকুম্বি। তোর বেহেস্ত মিথ্যে। যারা মানুষ খুন করতে দশ বছরের শিশুদের ব্যবহার করে তারা মিথ্যে। এমনকি আমরাও মিথ্যে- আমাদের সৃষ্টি সমস্ত মিথ্যে। শিশুরা যেখানে বলি যায় মা, সে ইতিহাস তো পুরোটাই মিথ্যে। আমরা, এখানের এই বুড়োগুলোও সেই ইতিহাসেরই অংশ রে মা। আমাদের কাউকে ক্ষমা করিস না আদেকুম্বি। ক্ষমা করিস না। ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমাদের অভিশাপ দে মা। অভিশাপ দে আমাদের সভ্যতা কে, ইতিহাস কে। আমাকে। কাউকে ছাড়িস না রে মা। কাউকে ছাড়িস না। আমরা সবাই মিলে সত্তর হাজার বছর ধরে তোকে খুন করার ছক কষেছি। ক্ষমা করিস না আমাদের। ক্ষমা করিস না"।

(খবর/ স্ক্রিনশট সূত্র - বিবিসি)

সলমান



ইচ্ছে ছিল বজরঙ্গী ভাইজান দেখতে যাওয়ার। শেষ মুহূর্তে অমুদা টেনে নিয়ে গেল অন্যত্র।
অমুদা বললে "সলমানকে দেখতে চাস?"


-"অফ কোর্স, পয়সা উসুল একক্সপিরিয়েন্স", আমি বললাম, "কে না চায়?"।


-"আমি তোকে বেটার সলমান এক্সপিরেয়েন্স অফার করছি। বাইসেপ, ছাতি, হ্যান্ডসাম চেহারা, মন ভোলানো হাসি, নায়িকাদের নিয়ে অবলীলায় লোফালুফি, মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া স্টান্ট; এক কথায় যাকে বলে ভাই-লাইক প্যাকেজ। সবচেয়ে বড় কথা; এত সমস্ত ক্যারিস্মাটিক ডিসপ্লে দেখতে পাবি লাইভ। নিজের চোখের সামনে। বুক চিতিয়ে ক্যামেরার আড়াল ছাড়া হৃদয় কাঁপিয়ে যায় এই সলমান"।


-বলছ?



-কমিট করছি।


যা হোক। একরকম বাধ্য হয়ে অমুদার পিছু পিছু গেলাম নয়া সলমান দেখতে। ফেমাস সার্কাসে। সেখানে সত্যিই দর্শন হল অন্য সলমানের। অমুদা কী ভাবে যে এই সুপারস্টারের নাম জানতে পেরেছিল কে জানে। ট্র‍্যাপিজ থেকে শুরু করে জাগলিং থেকে ছুরির রোমহর্ষক খেল; এ সলমান সর্বত্র অনবদ্য। সহ-জিমনাস্টিনি নায়িকার হাত ধরে যখন কোন বেল্টের সুরক্ষা ছাড়াই সে তাঁবুর ছাতে উঠে একের পর এক রোম্যান্টিক ডিগবাজি খেয়ে চলেছে তখন উন্মত্ত গ্যালারির সাথে তাল মিলিয়ে আমিও ফ্যাস ফ্যাস শব্দে শিস দেওয়ার জবরদস্ত চেষ্টা করছি। তিন চারটে গা কাঁপানো খেলার শেষে যখন সলমান গ্যালারির দিকে চেয়ে হাত নাড়লে, তার মুখে তখন বলিউড গলানো হাসি।

সলমানের খেল শেষ হতেই আমি আর অমুদা বেরিয়ে এলাম। অমুদা কে থ্যাঙ্ক ইউ বলার আগেই অমুদা পিঠে হাত রেখে বললে, "সবচেয়ে বড় কথা কী জানিস? তোর মনে যে সলমান কে প্লেস করে দিলাম আজকে, সে কোন জঙ্গলে বা ফুটপাথে চোরাগোপ্তা শিকার করে বেড়ায় না। জেল ফাঁকি দিয়ে বক্স অফিসের ব্লেডে তোর পকেট কেটে তোর রক্তে গাঁজা ইঞ্জেক্ট করে না। ইওর মানি ফর সার্কাস টিকিট ওয়াজ ওয়েল স্পেন্ট। হিরো চিনতে শেখ। রিয়েল হিরো তৈরির প্রসেসে কন্ট্রিবিউট করতে শেখ। কাল বিকেলে আবার আসিস। সাতটার শোয়ের আগে। সলমানের সঙ্গে আলাপ সেরে রেখেছি। একটা অটোগ্রাফ ম্যানেজ করে দেব তোকে। ওকে?"

বিছানাউদ্দিন ও রোববার

"খিদমতগার, ইধর আও, তুরন্ত", হাঁকলেন নবাব বিছানাউদ্দিন।

বালিশ খাঁ তড়িঘড়ি এসে সেলাম ঠুকলে।

"সেনাপতি তৈরি তো?", জানতে চাইলেন নবাব।

"সেনাপতি পাশবালিশ শাহ আপনার আদেশের অপেক্ষায় জাঁহাপনা ", নতশিরে জানালে বালিশ খাঁ।

"বহুত খুব", হাসলেন বিছানাউদ্দিন, "বালিশ খাঁ, এবার তুমি পাশবালিশ শাহ কে বলে এসো যে নবাব সাহেব হুকুম করছেন রবিবার দুপুরের দিকে তাক করে ল্যাদ কামান দাগা শুরু করতে। অভি! তুরন্ত!"।

"যো হুকুম জঁহাপনা", কুর্ণিশ করলে বালিশ খাঁ, "আর কোনও হুকুম? "

খানিক ভেবে বললেন নবাব বিছানাউদ্দিন "গুমোট রয়ে গেছে সামান্য। অল্প স্নেহের আতর ছড়িয়ে দাও দেখি বাবা বালিশ খাঁ। আর আদরবাই কে বল সুরাপাত্র ভরে বাঁটুল দি গ্রেট পরিবেশন করতে। তুরন্ত। তুরন্ত!"।

Thursday, July 16, 2015

উষ্ণ

হান্স বাবার কাছে বারবার সেই দারুণ মজার দেশের কথা শুনতে চায়। সেই নরম হাওয়ার দেশের কথা, সেই উষ্ণ পরিবেশের দেশের কথা। আর বাবা এত সুন্দর করে সেসব গল্প বলে যে হান্সের বার বার মনে হয় যেন গল্পের থেকে একটু নরম গরম হাওয়া তার গাল দু'টোকে ছুঁয়ে যায়। সে দেশ অবশ্য হান্সের বাবা নিজের চোখে দেখেনি। এমনকি হানসের বাবার বাবা বা তার বাবাও চোখে দেখেনি সে রূপকথার দেশ।
হান্সের দাদুর দাদুর বয়স যখন ছয়, সেই সময় সেই মায়াবী দেশ ছেড়ে অনেকে তখন এই কনকনে ঠাণ্ডার দেশে চলে আসে। আসতে বাধ্য হয়। হান্সের দাদুর দাদুও সেই দলে ছিলেন।
- সবাই ওই সুন্দর দেশ ছেড়ে চলে আসে কেন বাবা?
- কতবার বলব হান্স, মানুষের খাবার ফুরিয়ে গেছিল। তাই ও দেশ ছেড়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। কেউ ধারে কাছে রয়ে গেছিল। আর কেউ কেউ অনেক দূরে চলে যায়। যেমন তোর দাদুর দাদু।
- খাবার কেন ফুরিয়ে গেছিল বাবা?
- আবার বলতে হবে?
- হ্যাঁ!
- বেশ। সে দেশে আমাদের খাওয়ার ফুরিয়ে গেছিল কারণ আমরা চাষআবাদ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
- চাষআবাদ কী বাবা?
- নিজের খাবার নিজে উৎপন্ন করা।
- আরিব্বাস। চাষআবাদ বন্ধ করেছিলাম কেন?
- সে লম্বা গল্প। অনেক অনেক অনেক বছর আগে আমাদের জীবন ঠিক আজকের মতই ছিল। তারপর আমরা বেশি খাবার যোগানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে চাষআবাদ শুরু করলাম। সেই থেকে প্যাঁচালো দুনিয়া শুরু হল। খাবারের জন্য চাষ, চাষের জন্য যন্ত্রপাতি, যন্ত্রপাতির জন্য কারখানা, এ সব কিছুর জন্য বাজার, বাজারের জন্য অর্থনীতি।
- অর্থ কী?
- অর্থ নীতি। ইকনমি। মনে নেই আগের দিন বলেছিলাম?
- ঠিক ঠিক। আচ্ছা। ইকনমির পর?
- এত কিছু আসায় সুবিধে হল এই যে প্রচুর খাবার এলো। জিনিষপত্র এল। কিন্তু মুস্কিল হল খাবারের লোক অনেক বেশী পয়দা হল। গরীব তৈরি হল, বড়লোক তৈরি হল, বোকা তৈরি হল, ধান্দাবাজ তৈরি হল। যুদ্ধ তৈরি হল।
- যুদ্ধ? যুদ্ধ কী?
- সে অনেক বড় ব্যাপার রে হান্স। সে গল্প অন্য একদিন করব। মোদ্দা কথা হল, মানুষ ভালো থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে অ্যায়সা ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে প্রাণ ওষ্ঠাগত।
- কী মুস্কিল।
- মুস্কিল তো বটেই। অবশেষে, অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করার পরে তোর দাদুর দাদুদের সময় মানুষ ঠিক করলে অনেক হয়েছে। ইকনমির ভাঁওতা আর নয়। আবার ভবঘুরে জীবনে ফিরে যেতে হবে।
- ভবঘুরে, মানে আমরা যেমন থাকি?
- হ্যাঁ। চাষআবাদ নয়, আশেপাশে যতদিন খাওয়ার দাওয়ার কুড়িয়ে পাই খাও; খাওয়ার শেষ হয়ে গেলে অন্য কোথাও।
- আমি নতুন কোথাও যাই না কেন? এই বিচ্ছিরি ঠাণ্ডার মধ্যে আমায় ফেলে রেখেছ কেন?
- ধুর। তোর বয়স মাত্র পাঁচ। এই অঞ্চলে আমরা আরও বছর দুই তিন নিশ্চিন্তে আছি। খাবার ফুরলে দেখা যাবে।
- এবার ওই গরম দেশের গল্প বল প্লীজ।
- গরম বলতে, আমাদের এই টূপুসার তুলনায় সেখানে গরম অনেক। তবে তখন মানুষের সহ্য ক্ষমতা এত কম ছিল যে ওই গরমের দেশেও তাদের বেজায় ঠাণ্ডা লাগত।
- হি হি হি হি! মানুষ আগে কী বোকা ছিল।
- তা ছিল।
- তবে ওদের দেশ কী সুন্দর ছিল বল বাবা। আর আমাদের দেশে একে এত ঠাণ্ডা আর তার ওপর এত বিতিকিচ্ছিরি নাম - টূপুসা। এটা কোন নাম হল? অথচ দাদুর দাদুর সেই দেশের নাম কী সুন্দর ছিল; সাইবেরিয়া। শুনলেই মনে হয় সাই সাই করে বেড়িয়ে আসি। আচ্ছা বাবা, সাইবেরিয়ায় এত গরম আর আমাদের এই টূপুসায় এত ঠাণ্ডা কেন?
-কারণ সাইবেরিয়া ছিল অন্য গ্রহে হান্স। আমাদের টূপুসা যেমন প্লুটো গ্রহতে আছে, এখানেই সর্বত্রই কাটখোট্টা ঠাণ্ডা। সাইবেরিয়া অন্য গ্রহের ছিল রে, সে গ্রহটা এমন উটকো ঠাণ্ডা ছিল না। সেই জন্যেই...। অনেক হল। এবার ঘুমো।