Saturday, February 28, 2015

ধর্ম

ধর্ম অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। অনেকক্ষণ ধরে। একটা চাপ ধরা অস্বস্তি। একটা দমবন্ধ করা বুক চিন্‌চিন্‌ তার পিছু ছাড়ছিল না।ঘামতে শুরু করায় পরনের টিশার্টটা খুলে রেখেছিল। নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল ধর্মর। মনে হচ্ছিল যেন একটু তাজা হাওয়া গায়ে লাগলে ভালো লাগতো। কিন্তু মন চাইলেও জানলা খোলার উপায় ছিল না। হাজার হাজার ফ্যানের চোখ, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ-বাল্ব তার ঘরের দিকে অনবরত তাক করা আছে। সেলিব্রেটি হয়ে থাকার মাশুল যে কী সাঙ্ঘাতিক। চরসের রসও আজ শরীরকে তাজা করতে পারছিল না। ধর্মর চোখ ছলছলে হয়ে আসছিল বার বার। আবছায়া ঘরেও কালো চশমায় চোখ ঢেকে বসেছিল সে; পাছে আচমকা আয়নায় নিজের চোখ দেখে ফেলতে হয়। 

সাহস হয় না আজকাল নিজের চোখের দিকে তাকাতে। 

কান ফাটানো শব্দে ঘরের মোবাইলটা বেজে উঠলো। ধর্ম টের পেল যে তিন নম্বর ম্যানেজারের ফোন। এই ম্যানেজারদের কাঁধে ভর দিয়েই চলার অভ্যাস করে ফেলেছিল ধর্ম; সেলিব্রেটিদের তেমন ভাবেই কাটাতে হয় জীবন। ধর্ম যে ভাবে পা ফেলবে, হাসবে, কথা বলবে, আদর করবে; পাবলিকে সেটাই আঁকড়ে ধরবে। কাজেই প্রত্যেকটা পা ফেলা, প্রত্যেকটা হাসি ধর্মকে সাহস অত্যন্ত হিসেব করে ফেলতে হয় এবং সে হিসেবটুকু কষে দেয় তার ম্যানেজারেরা। কারণ ধর্ম বোঝে যে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত রেভিন্যুর উর্বর উৎস। 
সমস্তই ঠিকঠাক চলছিল। দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছিল। ধর্মর প্রত্যেকটা সৃষ্টি তার ভক্তদের মধ্যে আগুনের মত ছড়িয়ে পরে, ভালো খারাপের বিচারে আর আটকে থাকে না ধর্মের সৃষ্টি। সে এখন হট-সেলিং। তার নাম লেখা টিশার্ট, টুপি কোকাকোলার মতই পপুলার। ধর্ম জানে যে তার ম্যানেজাররা শুধু তার ডিজিটাল অটোগ্রাফ বেঁচেই অগুনতি টাকা আয় করে। বেশ কাটছিল জীবন ম্যানেজারদের সাথে। হঠাৎ আজকে ম্যানেজারদের ফোন আর নিতে ইচ্ছে করছিল না ধর্মর। ধর্মর ইচ্ছে করছিল পরমার সাথে কথা বলতে। পরমা কী এখনও দূরেই থাকতে চায় ?  
পথ চলার শুরুর দিনগুলো ধর্মের মনে আবছা হতে শুরু করেছিল। সেই সময়টা তার মনে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছিল যখন সে সাইকেলে ঘুরতো। পরনে আকাশী ফতুয়া। পিঠের ব্যাগে কবিতার খাতা। ঘাসে সাইকেল শুইয়ে রেখে পরমার কোলে মাথা রেখে ঘাসের ডগা চিবুতে চিবুতে কবিতা আউরে চলা।  ধর্ম কবি হতে চেয়েছিল, কিন্তু কি ভাবে যেন কারখানা হয়ে পড়লো। কী ভীষণভাবে ব্যবসার গ্রাসে পড়ে গেল ধর্মের কবিতা। “বড্ড টাকা মা, বড্ড টাকা, বড্ড কষ্ট”। ককিয়ে উঠছিল আজ ধর্ম। মাদক ভরা সিগারেটে একের পর এক জ্বালিয়েও জ্বালা জুড়চ্ছিল না। ধর্মের ইচ্ছে হচ্ছিল মাথার চুল খামচে ধরতে।

Monday, February 23, 2015

মেয়েটা



তখন আমি বেশ ছোট। প্রেম করা ব্যাপারটা তখনও ডেঁপোমি বলেই জানি। বিকেলে হন্যে হয়ে ক্যাম্বিস বলে ক্রিকেট খেলি। জ্যামিতিকে ভয় পাই। নন্টেকে ফন্টের চেয়ে বেশী ভালোবাসি। সদ্য সাইকেল চালানো শিখে মনে হয় ডানার আনন্দ বুঝি। তিনটে সিঁড়ি না টপকে পা ফেলতে পারি না। ফুল প্যান্ট পরি শুধু বিয়েবাড়ি যেতে হলে। আঁকাতে ভালোবাসি আর আঁকার মাস্টারকে ভালোবাসি না। ফড়িং ধরতে পারি, আর তার লেজে সুতো বেঁধে ঘুড়ির মত ওড়াতে পারি। গদা আর তীর-ধনুক, দু’টোতেই সমান পারদর্শী। স্কুল ফেরতা দুপুরে মাকে জড়িয়ে না ধরলে ঘুম আসে না। রবিবারে বাবার পাশে গুটিসুটি হেঁটে মাছের বাজার যাই, এই মাছ নাও-ওই মাছ নিও না বলে কাদা জলে ছপছপ করি।  সন্ধেবেলা মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে হাত পা ধুয়ে দুধ মুড়ি খেতে বসি। অকারণে বন্ধুদের সাথে পেট ফাটিয়ে হাসতে পারি, একে অপরের টিফিন কেড়ে খেতে পারি।

Wednesday, February 18, 2015

প্ল্যানচেট

ফতুয়ার ওপরের বোতামটা খুললেন  অনিমেষ। হাওয়াই চটি জোড়া খুলে হাতে নিলেন। পাজামাটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে নিলেন। ভেজা বালির ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেন ছপাতছপ ঢেউয়ের দিকে। গোড়ালি ডোবা জলে এসে দাঁড়ালেন। ঢেউয়ের ঝটপট আর বুকে মুখে ঝড়ো হাওয়া এসে মনটা ঠাণ্ডা করে গেল। আজ অমাবস্যা। আকাশে হয়তো মেঘও রয়েছে, একটাও তারা নেই। এ অঞ্চলটা মূল শহরতলির ভিড় থেকে বেশি কিছুটা দূরে। কাছের রাস্তাতে লোকজন কেউই নেই। অনিমেষের হোটেলও অন্তত আধ কিলোমিটার দূরে, মাঝে পুরোটাই ফাঁকা। রাত্রের কালোতে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের বুকের সাদা ফেনাটুকু দেখা যায়। পায়ের তলায় বালি সরে যাওয়ার ভালো লাগা শিরশিরানি। সব মিলে ভালো না লাগার কোন উপায় নেই। পাহাড়ের গুণ হল সে শ্রোতা। কিন্তু সমুদ্র আগ বাড়িয়ে দু’টো কথা নিজে বলে যায়। অন্ধকার আজ এতটাই নিকষ যে ঘড়ি দেখতে পারলেন না। মোবাইল ফোন জ্বেলে সময় দেখলেন অনিমেষ, রাত পৌনে দু’টো। এপ্রিলের রাত্রি হলেও, গভীর রাতের সমুদ্রের ধারালো হাওয়া সত্তর বছরের চামড়ায় বিঁধতে বাধ্য। কিন্তু আজ কোন কিছুই পরোয়া করার সময় নয়। অনিমেষের ভীষণ ভালো লাগতে আরম্ভ করেছিল। ভীষণ। কতদিন পর সে গোপালপুর এলে। শেষ এসেছিল বছর দশেক আগে। তখনও অপলা সাথে ছিল।

Wednesday, February 11, 2015

গান

“এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে”, গাইছিলেন অনন্তবাবু, “বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে”। আজ অফিস থেকে একটু বেশিই আগে বেরিয়ে পড়েছিলেন। সামান্য ফাঁকি আর কি! অনন্তবাবু তো কবিতা লিখতে পারেন না, তাই হিসেব লেখার কেরানীগিরির কাজে আলতো ফাঁকি দেওয়াটাই তার কাছে কবিতা লেখার মত আরামের।ব্যাচেলর হওয়ায় জীবনটায় একটা দরদী জেল্লা আছে। বাজারপত্তর নেই, বউয়ের ব্লাউজ কেনার বা বাপের বাড়ি যাওয়ার বায়না নেই, ছেলে-মেয়ের এটা দাও সেটা দাও নেই।  বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাড়িতে ঢুকে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ঝুল বারান্দায় বসে পড়া। কাঠের চেয়ারে হেলান আর বেঁটে বেতের মোড়ার উপর পা। খাসা। হাতে এক কাপ লেবু চা, নিজের বানানো। এক বাটি মুড়ি মধ্যে এক পিস্‌ বেগুনী, অফিস ফেরতা নিধুর চপের দোকান থেকে আনা। আগে আনতেন দু’পিস্‌ করে। মাগ্যির বাজারে একটা বেগুনীই যথেষ্ট, তাছাড়া বয়স বাড়ছে- দু’খানা বেগুনী হজম করার দিন আর নেই।

Monday, February 9, 2015

প্রশ্নোত্তর - ১

যদি যুধিষ্ঠির কে করা যক্ষের প্রশ্ন আর উত্তরগুলো যদি একটু অন্যরকম হত? কেমন হত? এর ওপর একটা লেখা অনেকদিন আগে পোস্ট হয়েছে।  এবার একটু অন্যরকম ভাবে প্রশ্ন উত্তরগুলো গুছিয়ে নেওয়া। এখানে প্রথম কিস্তি। 

ভালো কী ?
এগরোল।

খারাপ কী ?
ডিম ছাড়া যে কোন রোল। (চিকেন/মাটন রোল বলে কিছু হয় না, হয় এগ চিকেন নয় এগ মাটন। আদর্শ - ডাব্‌ল এগ চিকেন/মটন)।  

সুখী কে ?
সদ্য ভাজা এগরোল যার হাতে এই মাত্র এলো।

দুঃখী কে ?
এগরোলের ক্যালরি মাপেন যিনি।

সবচেয়ে দ্রুত কী?
এগরোল প্রেমীর “এগরোল খেতে হবে” চিন্তা।

সবচেয়ে শ্লথ কী?
রোলের অর্ডার দেওয়া আর হাতে পাওয়ার মাঝের সময়ে ঘড়ির কাঁটা খানি।

সব চেয়ে ভারী কী?
পেঁয়াজ কম শসা বেশি এগরোলের দায়ভার।

সব চেয়ে হালকা কী?
এগরোল খাইয়ের মেজাজ।

কলঙ্কের চেয়েও কালো কী?
ভেজ রোল।

হীরের চেয়েও দামী কী?
এগরোলের ভিতর সঠিক পরিমাণে টাটকা কাঁচা লংকা কুচি আর লেবুর রসের কম্বিনেশন।

সাফল্য কী?
নিখুঁত এগরোল বানিয়ের খোঁজ পাওয়া।

ব্যর্থতা কী।
এগরোল খুঁজে না পেয়ে প্যাটিস জাতীয় কিছু খাওয়া।