Tuesday, January 6, 2015

অমু ও বিকেল

বিকেল বেলা। এই চারটে সোয়া চারটে। ডিসেম্বরের বিকেল, রোদে ওম আছে তেজ নেই। ঝকঝকে আকাশ। ছাদটা বেশ বড়, অনায়াসে সত্তর-আশিজন লোককে বসিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে এমন। ছাদের এক কোণে টাবে প্রচুর পিটুনিয়া। নয় তলার ছাদ, রাস্তার গোলমালের আওয়াজ অল্পই আসে এখানে। ছাদের এক কোণে মাদুর পাতা, মাদুরের ওপরে নীল-সাদা ছাপা বেড কভার আর তার ওপরে একটা পাশবালিশ। পাশবালিশে ঘেঁষা একটা হজমি গুলির শিশি। মাদুরের এক কোণে আনন্দবাজারের শব্দছকওলা পাতাটা আধখোলা, তার ওপর আড়াআড়ি করে রাখা একটা ডট-পেন। তার পাশে একটা ট্রানজিস্টার।

অমু পাশবালিশে কনুই রেখে আধশোয়া হয়ে মাদুর জুড়ে ছিল। আধো তন্দ্রা ভারী আরামে রাখে মনটাকে। তার পরনে একটা খয়েরি রঙের কটকি ফতুয়া আর পাজামা। গায়ের ভাগলপুরি চাদরটা খুলে পাশে রাখা। অস্ফুট গুনগুনে আধা পদ্য আধা গানের মত গুনগুন করে চলেছে সে “ সে যে গান শুনিয়েছিল হয়নি সেদিন শোনা, সে গানের পরশ লেগে হৃদয় হল সোনা”। আর থেকে থেকে ঢুলছে। ছোটমামা বলে সিঙ্গেল মল্টের মত নেশা নাকি আর দু’টি নেই। অমুর মনে হয় ছোটমামা কোনদিন শীতের বিকেলে ছাতে আসেননি। পুওর সোল। 

এমন সময় ঝনাৎ করে মোবাইল ফোনে বেজে ওঠায় একরাশ নেশা-ভাঙা বিরক্তি নেমে আসে অমুর মুখে। নীলার ফোন। ধরতেই হল।

নিরালাপুর

দু’মাইল হেঁটে এখানে আসতে হয় নিশিকান্তবাবুকে। বাড়ি থেকে বেশ দূরে। বসতি এখানে নেই। রেল লাইন আছে। এক কোণায় একটা পুকুর, শাপলায় ভরা। ঝোপঝাড় আধো জংলা জায়গা। ট্রেন চলাচল বিশেষ নেই এ লাইনে। আপ আর ডাউন মিলে দিনে পাঁচটা লোকাল ট্রেন আসা যাওয়া করে। একটা সিমেন্টে বাঁধানো উঁচু জায়গা মত আছে ডাউন লাইন ঘেঁষে। সেখানে বসতে ভালোবাসেন সত্তর বছরের নিশিকান্ত। গায়ে শাল, গলা কান জড়িয়ে মাফলার, হাতে লাঠি। বাহাত্তর বছর হতে চললো, হাতে লাঠি তো থাকবেই। তবে এ বয়েসেও যে দৈনিক চার মাইল হন্টন চালিয়ে যেতে পারছেন, সেটাই বা কম কী। 

এ জায়গাটা বেওয়ারিশ, কেউ তেমন আসা যাওয়া করে না। তাই নিজেই এ জায়গার একটা নাম দিয়ে নিয়েছেন নিশিকান্ত; নিরালাপুর। ঠিক বিকেল চারটে বাজলে নিরালাপুরে এসে পৌঁছন নিশিকান্তবাবু। চারটে বত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে আপ লাইনে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন পাস করে। সেটা চলে গেলে উঠে পড়েন নিশিকান্তবাবু। ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে আসেন। পকেটে থাকে দু’টো বিস্কুট। কাঁধের ঝোলা থেকে আনন্দবাজার বের করে পড়তে শুরু করেন, খবরের কাগজ বিকেলে পড়ার অভ্যাসটুকু তার বহুদিনের। কাঁধের ঝোলায় থাকে ছোট ট্রানজিস্টার। এ যন্ত্রটা আজ থেকে বারো বছর আগে শিলিগুড়ি থেকে কিনেছিলেন নিশিকান্তবাবু। এখনও দিব্যি চলছে। আকাশবাণীতে আধুনিক বাংলা গানের আসর বসে বিকেল চারটে থেকে, চড়ুই শালিকের কিচিরমিচিরে মিশে যায় রেডিওর গান। বেশির ভাগ দিনই ব্রজবালা এসে হাজির হয় লেজ নাড়তে নাড়তে। ব্রজবালা নামটা নিশিকান্তবাবুরই দেওয়া। নেড়ি হলেও থিন অ্যারারুটে আপত্তি নেই ব্রজবালার। নিশিকান্তবাবু না ওঠা পর্যন্ত পাশে এলিয়ে শুয়ে থাকে ব্রজবালা, সামান্য থিন অ্যারারুটেই অনুগত হয়েছে সে।

Monday, January 5, 2015

সপ্তপদী



কৃষ্ণেন্দু বাইক স্টার্ট দিতেই টের পেলে তার কাঁধ রিনার হাত দু’টো জাপটে ধরেছে। জ্যাকেটের উপর দিয়েও রিনার হাতের উষ্ণতা ছুঁয়ে গেল কৃষ্ণেন্দুকে। সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে মিচকি হাসি অফার করলে কৃষ্ণেন্দু, প্রত্যুত্তরে রিনার উচ্ছল হাসির আলোয় ভেসে গেল সে। প্রেমের গন্ধটা যে এত মিষ্টি সেটা আগে টের পায়নি কৃষ্ণেন্দু । না কি এটা রিনার গায়ের গন্ধ? একটা বুক হালকা করে দেওয়া ভালো লাগা তার মধ্যে। রিনা। ডাকসাইটে রিনা ব্রাউন তার প্রেমিকা। মফঃস্বল ঘেঁষা ফাঁকা রাস্তা, তবু বাইকের গতি মন্থরই রাখলো কৃষ্ণেন্দু। সন্ধ্যে নেমে আসছে দ্রুত, রিনারও ঘরে ফেরার বিশেষ তাড়া, তবু বাইক জোরে ছুটিয়ে সন্ধ্যেটার ওপারে গিয়ে কলকাতার ভিড়ে মিশতে ইচ্ছে করছিল না কৃষ্ণেন্দুর। তার গান গাইতে ইচ্ছে করছিল। তবে দুম করে গান গাওয়ার থেকে কাব্য ছকাটা কী বেশি ভালো হবে? রবীন্দ্রনাথের পর থেকে এ হুজুগটা বাঙালির প্রেমিক যুগলদের মধ্যে বেশ উঠেছে। কাব্যের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে সেখান থেকে বরং গানের দিকে চলে যাওয়া যাবে।

Saturday, January 3, 2015

তিন

পাপান গল্প শুনতে ভালোবাসতো। বাবু হয়ে বসে, গালে হাত দিয়ে, হা করে। সবার কাছে সে বসে যেত গল্পের আবদার নিয়ে। বাবার কাছে, মায়ের কাছে, মিমিপিসিমার কাছে, বুবাইদাদার কাছে, দিদানের কাছে, পোষা কুকুর মিতুর কাছে কাছে, মেজকার কাছে।
দেখা হওয়া মানেই তাকে গল্প বলতে হবে। না বললেই ছেলের চোখ থেকে টপটপিয়ে জল। গল্প না বলে কোন উপায় থাকতো না কারোর। আর একটা গল্পই বারবার শুনতে চাইতো পাপান, অন্য কোন গল্পে তার মন ভরতো না।
সকলের স্বপ্নে এসে সে বায়না ধরতো, “বল না, সেদিনের পর থেকে তোমরা আমায় স্বপ্নের বাইরে দেখতে পাও না কেন। সেদিনের গল্পটা বল না

Thursday, January 1, 2015

চলে যাওয়ার গল্প

-মহারাজ।
-হুঁ।
-কে। সোমানন্দ?
-আজ্ঞে হ্যাঁ। এবার যে যেতে হয়।
-পাঁচটা বেজে গেছে?
-পৌনে পাঁচ। ছাত্ররা সব বসে রয়েছে। বিশেষ অতিথিও এসে পড়লেন বলে।
-যাক। হাইস্কুল শুরু হল তবে।
-আপনি মাথায় ছিলেন বলেই...।
-কারোর মাথায় চড়ে কিছু হয় না সোমানন্দ। এ আশ্রমে আমার আগে যে সব মহারাজ ছিলেন,তাদের অধ্যবসায়, ঘাম, রক্ত মিশে আছে এখানের প্রতিটি ইটে। নির্মলানন্দ মহারাজের আমলেই এ আশ্রমের প্রাইমারি স্কুলের শুরু। পরমহংসের কৃপায় কাজ এগিয়েছে। আমরা নিমিত্ত।  
-তবু। কত ঝড়ঝাপটা গেল, এক সময় তো মানে হচ্ছিল প্রাইমারি স্কুলটাও হয়তো টিকবে না...হাই-স্কুলের ফান্ড তো দূর অস্ত। মনে আছে সেবার সেই কত রকম হুমকি আসতে শুরু হল আশ্রম বন্ধ করে দেওয়ার জন্য? অথচ আপনাকে সামান্য বিব্রতও কোনদিন কোন মুহূর্তে দেখিনি...।
-বিব্রত কার জন্য সোমানন্দ? কিসের জন্য? হাইস্কুল না হলে না হত, দায় পরমহংসের, আমাদের তো নয়। প্রাইমারি স্কুলটাও বন্ধ হলে হত। আশ্রম উঠে গেলে যেত। কত পুকুর বুজে যায় দিনমানে। কিন্তু সোমানন্দ আমাদের একসাথে কাজ করাটা তো মিথ্যে হত না। এই ফুলের মত শিশুগুলোর জন্যে ব্যয় করা মুহূর্ত, দিন, মাস, বছরগুলো তো মিথ্যে হত না। নিয়তির দায় মানুষের নয়, আমাদের নয়।
- গুরুভাইদের মধ্যে আড়ালে আবডালে শীতলানন্দ বলে আপনার বদনাম আছে মহারাজ। সে আপনার অজানা নয়। আপনার গায়ে নাকি ঝড়, বৃষ্টি, দুঃখ, আনন্দ কিছুই স্পর্শ করে না। এমনকি হাইস্কুলের ফান্ড মঞ্জুর হওয়ার পরেও আপনাকে দেখে মনে হয়নি যে আপনি দশটি বছর এর জন্যে লড়ে গিয়েছেন।
-শীতলানন্দ। পরমহংসের ভক্ত সব, রসবোধ না থাকলে চলবে কেন?
-চলুন মহারাজ। সময় হয়ে এলো। বিশেষ অতিথিও এসে পড়লেন বলে।
-গা ভারি এলিয়ে আসছে।
-বেশ। এসে বিশ্রাম নেবেন না হয়। আসলে, সত্যিই তো। ঝড়ঝাপটা তো কম পোহাতে হয়নি আপনাকে। বিশেষ করে গত বছর খানেক। ক্লান্তি আসাটা...
-ক্লান্তিকে ভয় নেই সোমানন্দ। উত্তেজনার অভাবটা ভাবায়।