Thursday, April 3, 2014

মাছের বাজার


বাজারের মুখে এসে রিক্সা থামতে কালোকইবাবু আনন্দবাজারটা মুড়ে পাঞ্জাবির ঝোলা পকেটে গুঁজলেন। ছপাত শব্দে আনাজ বাজারের ঘোলা জল ঠেলে এগিয়ে গেলেন আমিষ বাজারের দিকে। শাক-পাতি পরে কিনলেও হবে, কিন্তু বেলা বেড়েছে কি টাটকা মানুষজন সব হাওয়া হয়ে যাবে। গিন্নী এদিকে আবার কচি মানুষের মাথা দিয়ে আজ ঘিলু-চচ্চড়ি রাঁধবেন, খোকা বড়-খাল থেকে ফিরছে আজ গরমের ছুটিতে।


হুড়মুড় করে এগিয়ে যাবেন এমন সময় ছলবাত শব্দে ধাক্কা বিধুকাতলা বাবুর সঙ্গে।
- সামলে কালোকইবাবু, সামলে। আমার এমন ধ্যাপস চেহারাটি চোখ এড়ায় কি করে মশায় ?”, এক গাল হেসে বললেন বিধুকাতলা।
-ইয়ে, মানে দেরি হয়ে গেল কিনা। বেলা বাড়লেই তো আবার সেই অন্ধ্র থেকে চালান আসা মরে সাদা হয়ে যাওয়া মানুষ কিনতে হবে। টেস্ট নেই, কেরোসিনের গন্ধ। দাম দু পয়সা বেশি দেব কিন্তু বাঙালি কচি খোকামানুষ ছাড়া রবিবারের পাতে পোষায় না”  
-তা যা বলেছেন। তবে মাগ্যির বাজারে, রোজ রোজ বাঙালি খেতে হলে যে ব্যাঙ্ক ব্যাল্যান্স লাটে উঠবে মশায়

মৃদুলবাবু এবং আলু-সেদ্ধ



মৃদুলবাবুর একটা জবরদস্ত চাকরি নেই; কাজ বলতে বড়বাজারের এক মাড়োয়ারি গদিতে খাতা সামলানো।
কিন্তু তাঁর রাতের খাবারের স্টিলের থালাটির কোনায় এক খাবলা চন্দ্রমুখী আলু-সেদ্ধ রয়েছে।

মৃদুলবাবুর আর সংসার করা হয়ে উঠলো না। বয়স প্রায় পঞ্চাশ, নতুন করে কিছু হবে- সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায়। বাপ-মা বহু আগেই গত হয়েছেন, সময়মত উঠে-পড়ে তাঁর বিয়ে দেওয়ার জন্যে তেমন কেউ ছিলেননা
তবে তাঁর পাতের কোণে রাখা আলু-সেদ্ধর ড্যালাখানা অতি মিহি ভাবে যত্নে চটকে মাখা।

পার্টির কাজ

-     “ পার্টির কাজ ? খুব পারবো বিনুদা। আমি খুব খাটবো, দেখো। কিন্তু চাকরিটা হবে তো ?”
-     “ ডিগ্রী দিয়ে তো কিস্যু করতে পারলি না, পার্টিকে ভরসা করে দেখ”
২।
-     “ জান লড়িয়ে দেব বিনুদা। দরকার হলে পাড়ায় প্রত্যেককে জনে জনে বোঝাব। আমাদের পলিসির কথা, আমাদের লক্ষ্যের কথা। কিন্তু ভোট এদিক ওদিক হতে দেব না। তুমি দেখো”
-     “ মুখের ভাষা সকলে বোঝেনা নীলয়। প্রয়োজনে…”
-     “ কিন্তু আইডোলজির কথা যদি…”
-     “ পেটের কথা ভাব। তোর মা’র ক্যানসারের কথা ভাব। আইডোলজিতে পেট ভরে না ক্যানসার সারে?”

বসন্ত উৎসব

-          আমাদের পাড়ায় একটা ফাংশন রেখেছি আগামী শনিবার। ওই আমাদের বেতলা ইয়ুথ ক্লাবের তরফ থেকেই অরগানাইজ করা আর কি। সবার ভারি ইচ্ছে যে এম-এল-এ কি দিয়ে উদ্বোধন করানোর। আপনার সঙ্গে আমার ইয়ে যে আছে সেটা সবাই জানে। তাই বললে আমি যেন আপনাকে অনুরোধ করি। না করবেন না স্যার, ছেলেরা আমার উপর ডিপেন্ড করে আছে। আপনার নামের  ওয়েলকাম ব্যানার পর্যন্ত
-          কালচারাল ইভেন্ট ?
-          এই পাড়ার ছেলে মেয়েরা মিলে। বসন্ত উৎসব।
-          বসন্ত উৎসব ?
-          ওই আর কি। পাড়ার ছেলে মেয়েরা মিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খান তিনেক রবীন্দ্রসঙ্গীত, দুটো নাচ। আবৃত্তি। ছেলেদের রিকুয়েস্টে একটা নাটকও…
-          ক্যালক্যাটায় বসন্ত কোথায় মশায় ?

Wednesday, April 2, 2014

অপুর সংসার

কদিন ধরে এ সময়ে মেঘ করে আসছে নিয়মিত। বৃষ্টি হচ্ছে না। আকাশ দানা দানা গুমোট জমা করে; তারপর নিজের মনেই অবহেলায় নষ্ট করে দেয় নিজের মেজাজ। দোতলার এই ঘুপচি ঘরের এই সামান্য ফোঁকর; জানালা না বলে বেয়াড়া সাইজের ঘুলঘুলি বললেই মানায় ভালো। সে জানালার চার খানি শিক ঘরখানার মধ্যে কয়েদখানার গন্ধ সঞ্চার করে। ওই শিক গুলো পেরিয়ে দৃষ্টি স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল বেয়ে নেমে যায় কলকাতায়, অথবা জলের পাইপ বেয়ে উঠে যায় আকাশে।

এই আধলা জানলাখানা এই ঘুপচি ঘরে ভারি মানানসই। এই ঘুপচি ঘরখানাও আবার এই হাড়গিলে-বুড়ো বাড়িতে মানায় ভালো। ঠিক যেমন ভাবে এই বুড়ো বাড়ির দেওয়াল দিব্যি দাঁড়িয়ে যায় এই ঘিঞ্জি কলাকাতাইয়া গলিটিতে।  ভাবনাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দেন অপূর্ব আর সিগারেটের ধোঁয়া মাখানো দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন জানালার ওপারে।

ঘুপচি ঘরে আধ ভাঙা জলচৌকি। একটা কুঁজো। অল্প বাসন। দুটো হাত পাখা যার একটা ভাঙা। একটা আশি পাওয়ারের বাল্ব। সতের বছরের পুরনো একটা টেবিল ফ্যান; যার খাজনার থেকে বাজনার পরিমাণ দৃষ্টিকটু ভাবে বেশি।

অপূর্ব জানালায় মন বসান। বিকেলের আকাশ-মেঘ ফাঁকির তাল করছে। অপূর্ব নিজের সত্তর বছরের গালের খসখসে চামড়ায় হাত বুলিয়ে নেন। হাসি আসে, সঙ্গে কাশি। ওষুধের কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। ওষুধের কথা মনে আসতেই কালচে দেওয়ালের কালচে ফ্রেমে বাঁধা লালচে ফটোয় চোখ চলে যায়। ঘরের আলো ঘোলাটে না তাঁর দৃষ্টি; স্থির বুঝতে পারেন না তিনি। না কি স্মৃতি টলমল করছে বলে এমন আবছায়া ?