Monday, July 30, 2012

মনে রাখার ব্যাপার-স্যাপার

ন্যাবা-জ্যেঠুর বাড়িতে রাত সাড়ে এগারোটায় ঢুঁ মারতে হলো দাদুর হাঁটুর ব্যাথার হোমিওপ্যাথিক টোটকার জন্যে। ন্যাবা-জ্যেঠুর হোমিও-চিকিত্‍সাতেই দাদুর হাঁটু নাকি পুর্ণিমা-অমাবস্যাতে ম্যাক্সীমাম রিলিফ পায়। আজ আচমকা ব্যথাটা চাড় দেওয়াতে এই রাত-দুপুরে দাদু দেরাজ খুলে দেখলেন ওষুধের স্টক নীল। ন্যাবা-জ্যেঠু দাদুর মর্নিং ওয়াক সঙ্গী হওয়ায় রাত্রিবেলা প্রয়োজনে বিরক্ত করতে বিশেষ অসুবিধে নেই। ভদ্রলোকের হোমিওপ্যাথিতে এ অঞ্চলে বেশ পসার রয়েছে।সদ্য বিপত্নীক। এক মাত্র ছেলে বউ-বাচ্চা নিয়ে দিল্লিতে থাকে। পেল্লায় বাড়িতে একাই থাকেন।  

কলিং বেল টিপতেই ন্যাবা জ্যেঠু নিজেই দরজা খুললেন।দাদুর প্রয়োজনের কথা বললাম। ঘুম যে ভাঙ্গাইনি সেটা ন্যাবা জ্যেঠু নিজেই জানালেন; “যদিও আর্লি ট্যু বেডয়ের ফিলসফিতেই বিশ্বাস, তবে আজ জেগে রয়েছি অন্য কারণে, ছেলের তরফ থেকে বিশেষ ফোন আসবে”বিশেষ ফোন কেন জিজ্ঞেস করাতেই ন্যাবা-জ্যেঠু খোলসা করলেন : “গত বছর এই দিনে তোমাদের জ্যেঠিমা মারা গেছিলেন, তাই নিমুর (ন্যাবা জ্যেঠুর ছেলে)ফোন একটা এক্সপেক্ট করছিবেচারী ভারী মা ন্যাওটা ছিলোআজকের দিনটা নিশ্চই আমার সাথে ফোন করে একটু মন হালকা করে চাইবে। গোটা দিনের ব্যস্ততায় হয়তো ফোন করতে পারেনি, নিশ্চয় একবার ফোন করবে...” বলতে বলতেই ন্যাবা জ্যেঠুর ফোন বেজে উঠলো, “নিমু উইল লিভ ফর হান্ড্রেড ইয়ারস...কল এসেছে...মিনিট-পনেরো দাও আমায়, কথা বলেই ওষুধ টা এনে দিচ্ছি”। সঙ্গে একটা সাহেবী “এক্সকিউজ মী” জুড়ে ন্যাবা জেঠু পাশের ঘরে গেলেন কথা বলতেঠিক ৪৫ সেকন্ডের মাথায় ফেরত এলেন

-“কী ব্যাপার জ্যেঠু, লাইন কেটে গ্যালো নাকি?”, জিজ্ঞেস করলাম,
“না:”, জ্যেঠু হাসলেন, “কাল ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ণ ফাইল করার শেষ দিন, আমার ভারী ভূলো মন তো, তাই আমার চার্টার্ড-পুত্র আমায় মনে করিয়ে দিলে যাতে আমি এই বেসিক ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে একটা গোলমাল না করে দিই, তুমি পাঁচ মিনিট বসো; আমি ওষুধ নিয়ে আসছি”

Sunday, May 27, 2012

জামাই-ষষ্ঠী Alert

এই দু বছর আগেপহেলা জামাই ষষ্ঠীর আগের দিন সন্ধ্যেমনে একটা সিরিয়াস ইয়ে চলছেদু দিন ধরে খাওয়া ঈষত্‍ কমিয়ে রেখেছি; খালি পেটে যথেষ্ট জল খেয়ে বাওয়েল মুভমেন্ট স্মুদ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এমন সময় পিসেমশাই পাকড়াও করলেন।
পিসেমশাই:  ভুলে যেওনা, ইউ আর এ জামাইফাদার-ইন-লয়ের পেনশন ফান্ডের ওপর নিজের স্পাইন সিমেন্ট করতে যেওনাজামাই ষষ্ঠী-ফষ্ঠীর মত ফিউডাল-সেক্সিষ্ট ব্যপারে আদেখলামো করতে যাওয়া সোজা ভাষায় আনএথিকালএই মাগ্গির বাজারে ফোর্সড উত্সব পালন উইথ চিংড়ি-ইলিশ-পাঁঠা-মণ্ডা-মেঠাই সামগ্রিক ভাবে গ্রসপ্লাস এই মের গরমে ওসব ক্যালরি-ফ্যালরির লেভেল-টেভেল মলটভ মেরে উড়িয়ে দেওয়াটা একটা আদ্যপান্ত ম্যালিশাস ব্যাপার 

শশুর-বাড়ি ল্যান্ড করার আগে কমুনিকেট করে দেবে যে তোমার পেটে পার সাপার, একটির বেশি জাতের আমিষ রান্না সহ্য হয় নাপ্লাস এক বেলার বেশি দু বেলা তুমি খেতে পারবে না কারণ তোমার অন্যত্র নিমন্ত্রণ আছেনিমন্ত্রণ না থাকলে গুল মারবেআনহিনডার্ড শশুর-জবাই চলতে পারে নাএছাড়া, শশুরবাড়ি পৌছবার আগে মিষ্টির হাড়িটি জবরদস্ত দেখে নিও, যাতে জামাই-ষষ্ঠীর খানায় তোমার শশুরের ইনভেস্টমেন্টকে মোটামুটি ম্যাচ করতে পারো। এবং হ্যাঁ, মেল-শভিনিজ্ময়ের মাথায় লাঠি মেরে নিজের পিতাকে বোলো একটা বউ-ষষ্ঠীর শ্যাডো-প্রোগ্রাম করতেজাস্ট টু এনসিওরম দ্যাট দ্য ব্যালন্স ইজ মেইনটেইন্ড। বুঝলে মিস্টার পচা মিউকারজি?”

এতটা এক নি:শ্বাসে বলে পিসেমশাই নিজের এক মাত্র মেয়ে, আমার পিসতুতো বোন মুচকির দিকে তাকালেন : “ আর এই যে মামনি, এই পচাদা কে যে কথাগুলো বললাম, সেগুলো ভালো করে মনে রেখো কেমন? মনে রেখে নিজের ফিউচার হাসব্যান্ডকে ভার্বাটিম কনভে করে দিও, কেমন?”

Monday, April 30, 2012

মশারির ব্যাপার

মশা দূর করবার প্রযুক্তি যতই এগিয়ে আসুক, কোনও টোটকাই নাইলনের ভালোবাসা কে টেক্কা দিতে পারবে নামশারিকী অনাবিল, বঙ্গ-গৃহস্থালির সব চেয়ে কমনীয় টুকরো এই মশারি। নীলে, সবুজে, হলুদে, সাদায় মিহি-মসৃন জাদুএক সময় প্রতিটি বাঙালি খাটের স্নেহ-অংশ ছিলো স্ট্যান্ড বা খুঁটি; মশারি টাঙ্গাবার জন্যে। সেই স্ট্যান্ড এই মশা-মারা লিকুইডেটরের যুগে প্রায় অবলুপ্তঅথবা ঘরের বিশেষ প্রান্তের বিশেষ পেরেকটিতে পৌছবার জন্যে মশারির কোণে ঝুলতো বিশেষ মাপ বিশিষ্ট দড়ি (ক্ষেত্র বিশেষে পায়জামার দড়িও)গৃহস্থের গার্হস্থ-Efficiency’র পরিমাপ বুঝতে হলে তার মশারি টাঙ্গানোর ভঙ্গি কতটা অবলীলা-মিশ্রিত, সেটা বুঝে নিলেই চলবে। আমার মত দরকচা মারা আদমি যে মশারি-টাঙ্গাতে গিয়ে লম্বা-চওড়া মাপতেই যে হিমশিম খাবে, সেটাই স্বভাবিক।

মশারি ছিলো দাপুটে ঘুমের প্রাথমিক শর্ত; তাজমহলের সফেদপনা আর বাঙালির রাতের বিছানার ওপর মশারি একই রকম আবশ্যক।পরিপাটি করে পাতা পরিষ্কার কড়কড়ে চাদর, নরম পাতলা বালিশ, পুষ্ট-পাশ-বালিশ বিশিষ্ট এক ঘুমমোহিনী বিছানা। নীল-নাইলনের মশারি টানটান করে টাঙ্গানো, পরিপাটি করে তোশকের নীচে ঠেলে দেওয়া মশারির কাপড়ের বেসএকপাশে শুয়ে ঠাকুমাঅন্যপাশে ডেসিম্যাল সাইজের আমিঠাকুমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমায় ঘুম পাড়ানো, আমার বক বক।ঠাকুমা বলতেন “বলো দেখি নাড়ুগোপাল, ‘ঘরের মধ্যে ঘর/তার মধ্যে বসে আছেন ভোলা মহেশ্বর’,কী ব্যাপার সেটা?”

আমি বলতাম “মশারি”

Wednesday, April 25, 2012

বিকেল

দুপুর আর সন্ধ্যের মাঝের সময়টুকু বিকেল করে গড়ে তুলতে হয়।  

গ্রীষ্মের হবু সন্ধ্যে। অচানক একদিন জলদি অফিস ফেরত।সাবান-ফেনায় গা ভাসিয়ে সাবেকী স্নান। ধবধবে ফতুয়া-পাজামা। পরিষ্কার ব্যালকনিবেতের চেয়ারে নরম কুসন। টবে পাতাবাহার, জবা ফুরফুরে। আকাশ সবে হলদে ও লালের মধ্যে হিসেব ভুল করতে শুরু করেছে। নরম হাওয়ার পাউডার মাখা কাঁধের পাশে আলগোছে ঘুর ঘুর। হাতে আদা মেশানো দার্জিলিং-চায়ের অমৃত-পানীয় সৌখিন খয়েরী আল্পনার বর্ডার দেওয়া সফেদ কাপে। রান্না-ঘর থেকে ফুলুরি ভাজার তেল-কড়াইয়ের মনমোহিনী চড়-চড় শব্দ। নিক্কন ও নারী কন্ঠের চাপা সুরে অতুলপ্রসাদি

বিকেল বিকেলের মায়াবী খাতে আপনি বয়ে চলবে। শুধু দিনের বাসী খবরের কাগজটি আওতার মধ্যে না থাকলেই হলো।     

Monday, April 23, 2012

এখন গরম-তখন গরম

গরম বেড়ে চলেছেপাল্লা দিয়ে বাড়ছে মেজাজের গরমিল। অফিসিও ইঁটের পাঁজা তেতে থাকে বারো মাস, ফাইল-সেলস-হিসেব-পত্তর ছোলাভাজা হয়ে মুখের কোণে ড্যালা পাকিয়ে থাকে সর্বক্ষণ কিন্তু গেলবার উপায় নেই।কিন্তু প্রাকৃতিক পারদ-থাপ্পড় এই অফিসের উত্তাপকে আরও দু:সহ করে তোলে। মুস্কিল হচ্ছে সেই বয়সটা নেই যে বয়সে বোশেখের দুপুরের রোদ কোন বিপন্নতা ছিল না, বরং গরমের ছুটির দুপুরের ক্রিকেটের আবেদন ছিল আরও অনেক বেশি ক্ষিপ্র। 

অনেক ভেবে দেখলাম, গরমের নির্মমতা কিন্তু ছেলেবেলায় কখনো মালুম হয় নি। অথচ সে সময় ঠান্ডা অফিস ঘরের বদলে ছিলো ঘট-ঘট শব্দে ফ্যান ঘোরা ক্লাসঘর, মোটরগাড়ির আমুদে ছায়ার বদলে ছিলো সাইকেল, ফ্রিজ-ঠান্ডা জলের বদলে ছিলো মেটে-কূঁজোর জল; যাবতীয় গরম-বিরোধী-উপাদান সত্বেও, বোশেখ কে এখন এত প্রচন্ড মনে হয় যে বলার নয়আমার সহকর্মীর ভাষায়, দুপুরে রাস্তায় পা রাখলে মনে হয় চল্লিশ লিটার থাম্স-আপ কিনে ড্রামে ভরে, নিজেই সেই ড্রামে উদোম হয়ে ঝাঁপ দিয়ে তুফানি করিঅথচ ছেলেবেলায় মার বারণ অগ্রাহ্য করে দুপুর রোদে মাঠে ছুটে গিয়েছি।এখন ভাবলে মনে হয় পাগলামিখেলা শেষে বিকেলে ঘণ্টী-বাজানো গাড়ি থেকে কিনে খাওয়া চার আনার বরফ-লেবু জল; আহা:! এমন তৃপ্তি বোধ করি আর জন্মেও জুটবে না  আর এখন লিটার লিটার গ্লুকোজ-গোলা জল খেয়ে পেট ফুলে যায় কিন্তু তেষ্টা মেটে না