- আর কতবার বলবো চীফসেক্রেটারি মশাই! আমার কোনো দাবীদাওয়া নেই। সোজা কথা; এই যে বাইশজন মানুষ, এ'দের মধ্যে অন্তত ছ'জনকে আমি খুন করব। বাকিদের ছেড়ে দেবো। আর আপনার পুলিশ বা আর্মি কোন রকম ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করছে আঁচ পেলেই স্যাট করে সব্বাইকে উড়িয়ে দেবো।
- কোন ছ'জন আপনার টার্গেট সে'টা অন্তত জানা দরকার।
- সে'টা এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি জানেন। আর ঘণ্টা দশেকের মধ্যেই আশা করি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারবো। আমি রিসার্চ করছি।
- আপনি শহরের সবচেয়ে বড় হাইরাইজের রুফটফ কফিশপে মাল্টিপল ফায়্যার আর্ম নিয়ে ঢুকে বাইশজনকে হোস্টেজ নিয়েছেন। স্টেট লেভেল সেন্ট্রাল লেভেল সমস্ত এজেন্সিকে আপনি একা হাতে পরাস্ত করেছেন। উঁচু মহল থেকে ইন্সট্রাকশন এসেছে আপনার সঙ্গে নেগোশিয়েট করার। যতটা সম্ভব আপনার দাবী মেনে নিয়ে সিচুয়েশন ডিএস্কালেট করার। অথচ আপনি বলে চলেছেন আপনার কোন দাবী নেই। কোনো দলের হয়ে আপনি নাকি এই কাজ করেননি...।
- দল মানে কী? আমায় কি টেররিস্ট ঠাউরেছেন নাকি? না মানে, আমি যেটা করছি সে'টা ডেফিনিটল সন্ত্রাস। তবে আমার কোনো পলিটিকাল মোটিভ নেই।
- এ'টা আমায় বিশ্বাস করতে বলছেন মিস্টার সামন্ত? আপনি খেলিয়ে খেলিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন না?
- আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাসে আমার কিছু এসে যায় না মিস্টার সামন্ত। বিভ্রান্তিটাও আপনাদের মনের মধ্যে। আমি তো বলেছি। ছ'জনকে খতম করবো। তারপর সারেন্ডার। আপনারা বেচাল চাললে বাইশজনই শেষ।
- কিন্তু কেন? মিস্টার সামন্ত কেন? আপনি নেশাগ্রস্ত নন। মিসগাইডেড ইয়ুথ নন। আপনি ইনসিস্ট করছেন কোনো পলিটিকাল মোটিভ আপনার নেই। তবু এতগুলো নির্দোষ মানুষকে মেরে আপনি কী পাবেন?
- চারদিকে এত আনন্দ। এত আলো। এই একটানা উৎসব। এ'সব আমার সহ্য হচ্ছে না জানেন। আমার মধ্যে এত কষ্ট, এত গ্লানি, এত রাগ, এত হেরে যাওয়া; আর আমার আশেপাশের পৃথিবীটা নিজস্ব স্টাইলে হেলতে দুলতে গানে সিনেমায় আড্ডায় ফুর্তিতে এগিয়ে যাবে...এ'টা আমি মেনে নিতে পারছি না। এ'টা অন্যায়।
- আপনাকে একটু বিশদে বলতে হবে সামন্তবাবু। উই ক্যান হেল্প ইউ।
- এই দেখুন! আমি আপনার হেল্প চাইব বলে এ'খানে আসিনি। আমার হেল্প চাই না। অনুকম্পা চাই না। ওই কী বলে, এমপ্যাথি কম্প্যাশন কিচ্ছু চাই না। আমি চাই একটু গোলমাল। আমার জীবনের সমস্ত সম্পর্ক ভেসে গিয়েছে, জীবনটা জাস্ট ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছে। বুকের মধ্যে ক্রমাগত অসহ্য কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে। প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হচ্ছে বুক-মাথা ফেটে বেরিয়ে যাবে; এমনই বিষাক্ত যন্ত্রণা। এই দুঃখ নিয়ে আমি আর পারছি না জানেন। আর এই দুঃখের চারপাশে মানুষের এই বেহায়া আনন্দ আর দৈনিক ভাঁড়ামো; এ'গুলো আমার বড় অশ্লীল মনে হচ্ছে। কিছু একটা মারাত্মকভাবে গুঁড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত গায়ের জ্বালা জুড়বে না যেন। কিছু একটা ভয়ানক না করে ফেললে এই দুঃখ আমি আর বইতে পারবো না।
- মিস্টার সামন্ত...ওই মানুষগুলোর কোন দোষ নেই কিন্তু...।
- দোষ আছে। দে আর ওয়ে টু হ্যাপি। এত আনন্দ বরদাস্ত করা সম্ভব নয়। আমি বোঝার চেষ্টা করছি এদের মধ্যে সবচেয়ে আনন্দে কোন ছয়জন আছে। তাঁরা এখান থেকে বেঁচে বেরোবে না।
- সামন্তবাবু। আপনার দুঃখ কী আমরা জানি না...তবে...।
- তবে কী? আপনারা জানেন না। আর জানলেও বুঝবেন না। আমার রিডেম্পশন নেই। এ দুঃখ থেকে মুক্তি নেই। একটা বিস্ফোরণ না ঘটলে...।
- মিস্টার সামন্ত। প্লীজ।
- কী প্লীজ। সেক্রেটারি সাহেব, আপনি জানেন সন্তানশোক কী জিনিস? জানেন আপনি? জানেন না। আমি আপনার ব্যাপারেও রিসার্চ করেছি মোবাইলে। আপনি কিছুই জানেন না। হাসিখুশি পরিবার। আনন্দ চারদিকে। প্রেম। স্নেহ। ভালোবাসায় ভরপুর একটা সংসার। ছবির মত। গ্রিটিংস কার্ডের মত। স্ত্রী, পুত্র। গতমাসে আন্দামান ঘুরতে গেছিলেন না? আমেজিং ভ্যাকেশন শটস। আর কেরিয়ারে তো কেল্লা ফতে করেই দিয়েছেন। তবে আমি চেষ্টা করছি আমার এই কফিশপ বন্দীদের মধ্যে আপনার চেয়েও আনন্দে থাকা কিছু মানুষকে খুঁজে বের করতে। হেহ্।
- হেহ্।
- অমন মুরুব্বির মত হেহ করলেন যে বড়।
- মিস্টার সামন্ত। আপনার রিসার্চ নির্ভুল। প্রেম, স্নেহ, ভালোবাসায় ভরপুর একটা সংসারের মধ্যে আমি সত্যিই আছি। প্লাস, কেল্লা ফতে কেরিয়ার।
- সো শাট আপ অ্যান্ড গেট লস্ট।
- হ্যাঁ। এ'বার ফোন রাখবো। একটা কথা বলে রাখি। মিস্টার সামন্ত, এ কথা সত্যি যে আমি সন্তানশোক কী জিনিস তা জানি না। জানলে হয়তো আমার চারপাশের এই আনন্দমগ্ন পৃথিবীকে আমিও ঘেন্না করাম। কিন্তু এই যে আপনার আনন্দ দেখে দুঃখ বিচারের অভ্যাস, এ আপনার মূর্খের স্বর্গে বাস।
- এই, আমায় জ্ঞান দেবেন না।
- আপনার কাছে দু'টো রাইফেল আছে। একটা পিস্তল কাজেই আপনাকে জ্ঞান দেওয়ার দুঃসাহস আমার নেই। তবে অন্য একটা কথা বলে যাই। জানেন মিস্টার সামন্ত, শত কর্মব্যস্ততাতেও আমি কোনদিন আমার মেয়ের কেমো সেশন মিস করিনি। একমাত্র মেয়ে তো। আই মীন, এতদিন করিনি। আজ প্রথম মিস করলাম আপনার এই পাগলামির জন্য। সত্যিই আমি সন্তানশোক আপনার মত করে জানি না। আপনি আমাদের আন্দামান ভ্রমণের কথা জানলেন রিসার্চ করে। ফেসবুকে ইন্সটাগ্রামে আনন্দ দেখলেন। সঠিক দেখলেন। কিন্তু সামন্তবাবু, ডাক্তারের ওয়ার্নিং, যে আর মাসখানে পর থেকে সম্ভবত কোন ট্র্যাভেলিং চলবে না, সে'টার বিজ্ঞাপন আমি কী'ভাবে দেবো? আপনার হোস্টেজরাও নিজেদের যন্ত্রণার বিজ্ঞাপন দেবে কী করে? আমি সন্তান শোক জানি না। কিন্তু শেষবারের মত আপনার সন্তান সমুদ্র দেখছে আপনার কাঁধে মাথা রেখে, এ যন্ত্রণা আপনি জানেন? আপনার সব বন্দীদের ফেসবুক প্রোফাইল দেখুন। আনন্দ দেখুন। আর ভেবে যান আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে আর যাবতীয় দুঃখের ওপর অধিকার আপনার একার।
- মিস্টার সেক্রেটারি...। আই অ্যাম সরি।
- যাক গে। শুনুন। আমাদের স্নাইপারা ফাইনালি আপনাকে টার্গেটে আনতে পেরেছে। এইমাত্র কনফার্মেশন পেলাম। এবার ভালোয় ভালোয় সারেন্ডার করে বন্দুক ফেলে হাত ওপরে তুলে বেরিয়ে আসুন। নয়ত খেলা শেষ। আপনার আঙুল ট্রিগারের দিকে গেলেই...।
- আপনার লোকজনকে পাঠিয়ে দিন। এদের আমি ছেড়ে দিচ্ছি।
- থ্যাঙ্কিউ।
- সেক্রেটারিদাদা, আপনার স্নাইপারদের আমি ভয় পাইনা। কিন্তু আমি আর পারছি না জানেন।
- আমি জানি কিন্তু। বিশ্বাস করুন আমি জানি। কেমন? আমি জানি। আসুন। আমি আছি তো। আসুন।
No comments:
Post a Comment