Sunday, March 8, 2026

বড়ম্যাচ

- এই যে, দীপক। তোমরা নাকি মেস ছেড়ে দল বেঁধে মনোহরবাবুর বাড়িতে খেলা দেখতে যাচ্ছ?
- যাচ্ছি তো। আপনিও চলুন না রায়দা। বেশ গল্প আড্ডা হবে। তা'ছাড়া মনোহরবাবুর নতুন রাঁধুনিটি শুনেছি গুণী মানুষ। অতএব সুখা ক্রিকেট দিয়ে দিন শেষ হবে না।
- তোমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছে?
- বুঝলাম না। আরে, সেই যে! সে'বার ঘটা করে আমরা সবাই মনোহরবাবুর বাড়িতে টেস্ট ম্যাচের ফিফথ ডে টেলিকাস্ট দেখতে গেলাম। অবধারিত জেতা ম্যাচ খুইয়ে বাড়ি ফিরলাম।
- খুইয়ে মানেটা কী। আপনি তো খোয়াননি। টিম হেরে গেলো। ক্রিকেটে অমন হয়।
- এক সেকেন্ড। আর তার বছরখানেক আগের ব্যাপারটা? মনোহরের সোফায় আমি বসা মাত্রই আজহারের হাতের সেঞ্চুরি ফসকে যাওয়াটা? সে'টা কিছু নয় বলছ?
- আপনি তো আর আজহারকে রানআউট করিয়ে দেননি। সে ঘটনায় আপনার, বা মনোহরবাবুর বাড়ির সোফা বা সে টিভির কোন ভূমিকা নেই।
- মাই গুডনেস! আধুনিক যুগের মানুষ তোমরা, ইয়াং টার্কস! তোমরা ডেটা রিফিউস করছ?
- এ'টা ডেটা?
- এক্সেলে টেবিল বানিয়ে দিলে বুঝতে কি সুবিধে হবে?
- রায়দা। আপনার সঙ্গে বাজে গল্পে আটকে থাকলে আমার স্নানের লাইন মিস হয়ে যাবে। ভুতো আর বিপিনবাবুর পর ঢুকতে হলে আমার সেই সন্ধে হয়ে যাবে। মনোহরবাবুর বাড়ি যেতে হবে স্নান না করে। রোববারের স্নানটা আবার আমার কাছে পিলিগ্রিমেজ।
- যা হোক, তোমরা লায়েক হয়েছ। আজ মেসের বাজার সামলাচ্ছো, কাল অফিস, পরশু দেশ সামলাবে। শুধু ভেবে দেখো, ভজার চায়ের দোকানে বসে তোমরা অন্তত খান চারেক সিরিজ আর টুর্নামেন্ট জয় দেখেছ। এগেইন, ডেটা কথা বলে ভায়া।
- তা অবিশ্যি ঠিক।
- মানছি। ভজার দোকানের বেঞ্চিতে মনোহরবাবুর এসির হাওয়া খাওয়া সম্ভব নয়। মানছি বেচারি ভজা চা আর মামলেটের বেশি কিছু সাপ্লাই করতে পারে না। কিন্তু স্রেফ আরাম আর মুর্গি পোলাওয়ের লোভে অমন হান্ড্রেড পার্সেন্ট হেরো জায়গায় গিয়ে তোমরা দেশকে ডোবাবে, সে'টা যে পুরোপুরি সেলফিশ আর সুইসাইডাল, গুরুজন হিসেবে এ কথা আমি বারবার বলবো।
- ব্যাপারটা...ব্যাপারটা নেহাত ভুল বলেননি...ভুতোও কথাটা বলেছিল বটে একবার।
- ভুতো অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছেলে। জিমেটিমে যায় বটে, তবে এখনও মাথাটা তেমন মুটিয়ে যায়নি।
- শুধু মনোহরবাবু যে কী মনে করবেন...।
- কিচ্ছুটি না। ভদ্রলোক নিজেও ব্যাপারটা ভালো ভাবে বুঝবেন। তুমি চাইলে আমি নিজে কনভে করে দেব ভদ্রলোককে।
- সেই ভালো। আমি গিয়ে বাকিদের বলি। এতদিন পর এত বড় একটা ফাইনাল..। চান্স নেওয়াটা ঠিক হবে না।
- তাই তো বলছি...।
- ইয়ে, আপনি তা'হলে...।
- আমার জন্য আবার রথতলার শ্যামা ইলেটকট্রনিক্সের রাস্তার দিক তাক করা পেল্লায় টিভি সেটটা ভীষণ লাকি। মনে নেই সে'বার একা হাতে লাস্ট ইনিংস চেজটা ম্যানেজ করে দিচ্ছিলাম? কী ভীমরতি ধরল পান খাওয়ার জন্য খানিকদূরের পান দোকানে গেলাম আর শচিন আউট। ব্যাস, খেল খতম।
- বেশ। সে কথাই রইলো। আমি বাকিদের কনভিন্স করছি।


******

- আরে, রায়বাবু যে। আসুন আসুন। তা আপনাদের মেসের দলবল কই...।
- তাঁরা আজ আসতে পারলে না বুঝলেন। ইয়ং ছেলেপুলের দল। ও'দের আবার হইহই ছাড়া কিছুই জমে না। আমরা আবার খানিকটা সিনিয়র, তাই হাই ভোল্টেজ সিচুয়েশনে ঠিক খোলতাই করে চেলামেল্লি করতে পারে না। অতএব বুঝতেই পারছেন...।
- বটেই তো বটেই তো। বেশ তো। যাক আপনি এসেছেন। আমার একজন সঙ্গী হলো।
- আমার আবার হইহট্টগোল না-পসন্দ বুঝলেন। এই দু'জন মিলে গা এলিয়ে একটু খেলা দেখবো। উপভোগ করবো। বাজে গল্প কানে আসবে না। সমস্ত ফোকাস শুধু ম্যাচে। এই দল বেঁধে খেলা দেখলে সেই ফোকাসটা নষ্ট হয়ে যায়।
- তা তো ঠিকই। তা, ম্যাচ শুরু হল বলে। রতনকে বলি চায়ের সঙ্গে কিছু ভাজাভুজির ব্যবস্থা করতে।
- আপনার রতনের সুনাম আছে কিন্তু বেশ বাজারে। তা, ওঁর হাতের মোরগ পোলাওটা নাকি লেজেন্ডারি?

পল্টুবাবুর দোকান

- আরে! কদ্দিন পর এলেন বলুন দেখি।
- কদ্দিন আর কই। এই তো সে'দিন তোমার দোকানে বসে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে গেলাম সমরদের সঙ্গে। চা আর মামলেট অর্ডার করলাম। জোরাজুরি করা সত্ত্বেও মামলেটের দাম নিলে না, সে'টা নাকি আমার জন্য অন দা হাউস।
- সে তো গেলো মাসে। যাক গে, বসুন। আজ পেঁয়াজি ভাজা হচ্ছে।
- বেশ বেশ। দিয়ো দুটো। তবে আগে চা দিতে বলো পল্টু। গলা না ভেজালেই নয়।
- আপনাকে বেশ ক্লান্ত লাগছে দত্তদা। রোদ্দুরে ঘোরাঘুরি হয়েছে বিস্তর কি?
- ওই সেই পেনসন আটকে যাওয়ার ব্যাপারটা। এই নিয়ে টাকাটা চার মাস জমা হয়নি। গতকাল জানলাম লাইফসার্টিফিকেটে কোনো সমস্যা আছে। তা নিয়ে আজ বিস্তর ছোটাছুটি হলো।
- তা সমস্যা মিটেছে কি?
- আশা করি। সামনের মাস পড়লে বুঝবো। বুড়োবুড়ির সংসার। বুঝতেই পারছো, তিনমাস ব্যাঙ্কে টাকা জমা না পড়লে...।
- বিলক্ষণ। আসুন, এই যে। আপনার স্পেশ্যাল আদা চা।
- আহ। তৃপ্তি। গিন্নীকে আমি বার বার বলি, পল্টুর হাতের চায়ে যে কী একটা ম্যাজিক রয়েছে...।
- আজ পেঁয়াজিটা কিন্তু ভজন ভাজছে। ওই মেদিনীপুর থেকে যে ছোকরাটা এসেছে আর কী। ভালো খারাপ; সব দায় সে ব্যাটার। পেঁয়াজিটা নতুন ইন্ট্রোডিউস করলাম আজ দোকানে, কাজেই ওটার দাম দিতে যাবেন না। আপনাকে টেস্ট করিয়ে শুভারম্ভ হবে'খন।
- আহ, রোজ রোজ এলেই যদি দামটাম না নিয়ে খাইয়ে যাও, তাহলে তো আসা মুশকিল।
- রোজ রোজ আর আপনাকে পাচ্ছি কই দত্তদা।
- বেড়ে গন্ধ ছড়িয়েছে তোমার পেঁয়াজির।
- ভজনা, চারটে পেঁয়াজি এ'দিকে দিয়ে যা বাবা।
- আবার চারটে কেন...।
- খান না, খান। আমি দেখি।
- পল্টু, আমি খেয়াল করেছি যে'দিন থেকে আমি সমরদের পেনসন আটকে যাওয়ার ব্যাপারটা বলেছি...তুমি...।
- আজ্ঞে, আমি একটু ও'দিকটা দেখে আসছি...খদ্দেররা বসে রয়েছে...দোকানের ছেলেগুলো এমন ফাঁকিবাজ হয়েছে বুঝলেন...আমি না কড়া হাতে সুপারভাইজ না করলে...।
- আমি কিন্তু একদম ব্যাঙ্করাপ্ট নই হে, পকেট একদম গড়ের মাঠ নয়...ওই দ্যাখো...চলে গেলো।...এই...এই যে...তুমিই ভজন? দেখি কেমন ভেজেছ পেঁয়াজি...। দাও...।
পল্টুবাবু খেয়াল করেছেন যে যে'দিন থেকে দত্তবাবুর থেকে তিনি টাকা নিতে ইতস্তত করছেন, সে'দিন থেকে ভদ্রলোক আসাযাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। যে বৃদ্ধ চারমাস হল পেনসন পাচ্ছেন না, তাঁর থেকে টাকা নিতে পল্টুবাবুর মন সরে না। অথচ দত্তবাবুকে নিরস্ত করাও চাট্টিখানি কথা নয়, ভারি ঢিঁট বুড়ো।
ও'দিকে অমন দুর্দান্ত পেঁয়াজিতে কামড় দিয়েও ঠিক সুবিধে করতে পারলেন না দত্তবাবু। ফ্রি মামলেট পেঁয়াজির ঠেলায় এমন সুন্দর আড্ডার জায়গায় আজকাল আর তাঁর নিয়মিত আসা হয় না। পল্টুটা আচ্ছা আহাম্মক।

সঙ্গী


"ওই যে, ওই দিকে। আর ধরুন..এই মাইল দেড়েক"।
"অদ্দূর যেতে পারবো নাকি মশাই। হাঁটুর সিচুয়েশন তো বলেইছি"।
"ক্ষতি নেই। এ'খানেই হাত পা ছড়িয়ে দিব্যি বসা যায়। কফির ফ্লাস্কটা আছে তো আপনার ঝোলাব্যাগে"?
"তা আছে, কিন্তু ভাই...আপনি অনায়াসে ঘুরে আসতে পারেন কিন্তু। এদ্দূর এসে ওই সাররিয়াল ওয়াটারফলটা আপনি আমার জন্য মিস করছেন ভাবলেই..না না..বড্ড খারাপ লাগছে"।
"রেস্টহাউস থেকে একসঙ্গে বেরোলাম। পৃথক ফল নিয়ে ফেরত গিয়ে কী লাভ বলুন"।
"বেশ। গপ্পই হোক"।
"আহা, গপ্প নয়। স্রেফ ছড়িয়ে বসা। ঝর্ণার যে শব্দ আসছে, সে'টাকে আমরা অনার করবো"।
"কফির চুমুকের শব্দটা চলবে তো"?
"সে'টা তো চেরি অন টপ"।
"বেশ। ফ্লাস্ক খুলছি আর মুখ বন্ধ করছি"।
"মিউজিক"।

অবশেষে



অবশেষে
অন্ধকার কেটেছে, ঝড় থেমেছে।

ঝগড়াবিবাদ মিটিয়ে নিয়ে সাদাসিধে মানুষের দল যে যার বাড়ি ফিরেছে।
পুড়ে যাওয়া ট্রান্সফর্মার সারাই হওয়ায় তিনদিনের লোডশেডিং পর্বে ইতি টানা গেছে।

বৃষ্টি থামায় পিচ থেকে কভার সরিয়ে ডাকওয়ার্থ ল্যুইসের অঙ্কে মন দেওয়া গেছে।

সাতটা পোস্টকার্ডের খোঁচা দিয়ে একটা পেল্লায় ইনল্যান্ড লেটারি উত্তর আদায় করা গেছে।

অবশেষে
বম্বের পাড়ায় পাতে দেওয়ার মত ডিমতড়কার সন্ধান পাওয়া গেছে।

মহেন্দ্রনাথ ও নজরুল

ভাঙা আসরে একলা পড়ে রইলেন বাবু মহেন্দ্রনাথ। মঞ্চ থেকে গায়ক বিদেয় নিয়েছেন, বাজিয়েরা সরে পড়েছেন। দর্শকরা শতরঞ্চি এলোমেলো করে গায়েব। সুর কানে একা রয়ে গেছেন মহেন্দ্রনাথ। তাঁর চোখ ছলছল, আর বুকপকেটে শালপাতায় মোড়া জর্দাবিহীন সাদা পান। আজকাল বড় একলা হয়ে পড়েছেন তিনি। এই ফুরিয়ে যাওয়া জলসায় সে একাকিত্ব ইয়াব্বড় হয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। মহেন্দ্রনাথ বাধ্য হয়ে গান ধরলেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠে সুর নেই, তবে প্রাণে আছে। নজরুলগীতিতে প্রাণ ঢাললেই তা জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে, ফিজিক্সের নিয়ম প্রায়।

নজরুল ছুঁয়ে ভেসে চলেছেন মহেন্দ্রনাথ।
গান ভাসছে হাওয়ায়। প্রবল একলা মহেন্দ্রনাথ তখন একাই গানের আসর হয়ে নিজেকে মাত করছেন। একা মানুষের লজ্জা পেতে নেই, মিইয়ে যেতে নেই। জগতসংসারে যে যত একা, তার তত গানের প্রয়োজন, তার তত হাউহাউয়ের প্রয়োজন।

দু'টো নজরুল পেরিয়ে সবে একটা দরদী বাউলে এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় বাবু মহেন্দ্রর রসভঙ্গ হলো।
"মহিন্দর সাহাব, ডু ইউ ওয়ান্ট আ বিয়ার"?
দড়াম করে ক্লাবের বিলিয়ার্ড রুমে এসে পড়লেন বাবু মহেন্দ্রকুমার।

একটা পালিশ দেওয়া "অফ কৌর্স" বলে তড়িঘড়ি সেই বাউল পরিস্থিতি ধামাচাপা দিয়ে লিলির হাতটা নিজের দিকে টেনে নিলেন ভদ্রলোক।

ও'দিকে

এ'দিককার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বপনবাবুর বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। লাউঞ্জে আসা মাত্রই একজন বেশ সুন্দরী রিসেপশনিস্ট এসে মিহি সুরে "ওয়েলকাম" বলে দু'টো ফর্ম ধরিয়ে দিলে। বেশ সাদাসিধে ফর্ম, মিনিট চারেকের মধ্যেই 'ফিল আপ' হয়ে গেলো। প্রম্পটনেস ব্যাপারটা স্বপনবাবু বরাবরই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। কাজেই ফর্ম জমা দেওয়া মাত্রই যখন অন্য আর এক রিসেপশনিস্ট এসে তাঁকে রুম নম্বর সেভেন-বি'তে রিপোর্ট করতে বললো, ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন।
সেভেন-বি'তে নক করতেই একটা বেশ চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "ভিতরে আসুন"। দেখা হলো এক ভারিক্কি মেজাজের মাঝবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে। ইশারায় স্বপনবাবুকে বসতে বলে একটা পেল্লায় ফাইলে মুখ গুঁজলেন ভদ্রলোক। বলাই বাহুল্য ফাইলের ওপর লেখা, স্বপন চট্টরাজ, (জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১, ১২:৩২ / মৃত্যু ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৩)। চেয়ারে জুত করে বসতে ভারিক্কি ভদ্রলোকই কথা পাড়লেন,
"স্বপনবাবু, আমিই এই স্টেশনের ম্যানেজার, সভ্রহেজ্বজা"।
"নমস্কার..সভ্র..হে..ইয়ে"।
"সভ্রহেজ্বজা। এই স্টেশনের ম্যানেজার"।
"এ'রকম স্টেশন আরো আছে নাকি"?
"ন্যাচেরালি। সমস্ত এক্সপায়ারি তো একটা স্টেশনের পক্ষে হ্যান্ডল করা সম্ভব নয়"।
"তা, আমার এখন কী.."।
"আপনার ভেহিকল তৈরি আছে। তা'তে করে সোজা কোয়ার্টার্সে"।
"কোয়ার্টার্স"?
"হ্যাঁ। সে'খানেই ব্যবস্থা। আমি একটা ব্রশার আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি.."।
"না মানে, সভ্রবাবু.."।
"সভ্রহেজ্বজা"।
"বলছিলাম,সে কোয়ার্টার কি স্বর্গ না মানে.. ন..নরক"।
"আজ্ঞে"?
"মানে, স্বর্গ না নরক"?
"ও'সব ছেলেমানুষি কনসেপ্ট আপনাদের মুখে প্রায়ই শুনি। কিন্তু এ'খানে মশাই সবার জন্য পাইকারি হারে একই ব্যবস্থা"।
"সর্বনাশ। এত পুণ্য অর্জন করলাম, সব কি জলে গেল"?
"ওয়ান ম্যানস পুণ্য ইজ আনাদার ম্যানস সিন। আর মানুষ মাত্রই ঢ্যাঁটা, তাদের পলিটিক্সে আমরা মাথা ঘামাইনা। আপনি যা অর্জন করেছেন, তা হিউম্যান কারেন্সি। ও দিয়ে এখানে ফুটুরডুম হবে"।
"আর ইয়ে, রিবার্থের ব্যাপারটা"?
"মানুষের শখ যত দেখি তত অবাক হই বুঝলেন"।
"ওই ব্যাপারটাও তা'হলে.."।
"অবাক। অবাক হই। আপনাদের দেখে। একটা গোটা জীবন ঘ্যানঘ্যান করে কাটিয়ে দিলেন অথচ এ'দিকে আসা মাত্রই রিবার্থ রিলেটেড এনকোয়্যারি"।
"লাস্ট কোশ্চেন। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড স্যার। ভেহিকল যে'টা দিচ্ছেন, সে'টার উইন্ডো সীট পাবো কি? আসলে নতুন এলাকা তো তাই.."।

ভীতুর উল্লাস

আমি খুব ভীতু মানুষ। এবং আর পাঁচটা ভীতু মানুষের মত চাকরীর আশ্রয়টা আমার খুব দরকারি। সে অর্থে অ্যাম্বিশন নেই কিন্তু ভয় বিস্তর; হাতের পাঁচ যে'টুকু আছে সে'টুকুও যেন কোনোদিন কোনোভাবে ফসকে না যায়। বলাই বাহুল্য প্রিভিলেজড দুনিয়ায় আমার বসবাস। অতএব সত্যিই যারা অসহায় ও সম্বলহীন, তাঁদের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। আমার সেভিংস আছে, ইনস্যুরেন্স আছে, আগামী মাসে মাইনে না ঢুকলেও চাল-সবজি কেনার উপায় রয়েছে। তবুও আমার একটা বড় ভয়ের জায়গা হচ্ছে 'হঠাৎ কোনও একটা ভুলে, বা সামান্য অসতর্কতায় চাকরী খোয়ানো'। বয়স যত বাড়ছে সে দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে; এই যে খেটেখুটে কাজের জায়গায় যে সামান্য সুনাম অর্জন করেছি, তা যে কতটা ভঙ্গুর তা প্রতি মূহুর্তে টের পাই।

কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি ক্ষমার অযোগ্য। বারবার ভুল করে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাই। সে সব ইনএফিশিয়েন্সি মকুব করার দাবী আমার নেই। কিন্তু মূহুর্তের অসতর্কতায় জীবন এস্পারওস্পার হয়ে যাওয়া, ভয় সে'খানে। আর একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, যারা কাজ করে তাঁদের প্রত্যেকের ভুল হয়। ব্যাঙ্কের কর্মী, ক্রিকেটার, লেখক, ইনফ্লুয়েন্সার, এমএলএ, শিকারি, জাদুকর; সবার হয়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে "টু বি ইন দ্য রং প্লেস অ্যাট দ্য রং টাইম"। অনেক সময় হয় কী আপাত দৃষ্টিতে যে ভুল নিতান্তই ছোটখাটো, সে'টা এমন সময়ে ঘটে যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তেমনও ঘটে বটে অনেকসময়।

একটা ব্যাপার বড় অদ্ভুত। নিজের কাজে সবাই দৈনন্দিন কত ভুলচুক করছি, অথচ অন্যের একটা সে'রকমই ভুল ধরতে পারলে যে মব-উল্লাস দেখা যায়, বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায়, তা দেখে গলা শুকিয়ে যায়। এ ওই গণধোলাই দেওয়ার প্রবণতা, এই যা "দে শালাকে দু'ঘা" বলে নাচতে পারা; ব্যাপারটা যত দেখি তত বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বিশেষত খেটে-খাওয়া কর্মীদের ভুলের প্রতি আখের-গুছিয়ে-রাখা মানুষদের যে সমবেত আক্রোশ, তা দেখে অসহায় বোধ হয়। ভয় হয়। এত রাগ আমাদের মধ্যে, এত প্রবল তলপেটে লাথি কষানোর ইচ্ছে; একটা দুর্বল এলেবেলে টার্গেট পেলেই হলো। হয়তো নিজেদের যন্ত্রণাকে সামাল দিতে না পারার ফলে অন্যের কলার টেনে ধরার ইচ্ছেটা সবার মধ্যেই প্রবল (নিজেকেও বাদ দিচ্ছি না সে খুনে হায়েনার দল থেকে)। একজন অসহায় মানুষকে রগড়ে নিজেদের বিপ্লবী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে আমাদের সার্থকতা। তা'তে কার চাকরী গেলো, কার জীবন জলে গেলো; সে'সব নিয়ে ভাবতে বসলে আমাদের রাগ নেতিয়ে যাবে, কাব্য শুকিয়ে যাবে। তাই এ'ভাবেই এগিয়ে চলা ছাড়া কোনও গতি দেখি না। যদ্দিন সোশ্যাল-মবের ইনফ্লুয়েন্সিং লাথিটা নিজের পেটের দিকে ধেয়ে না আসছে, তদ্দিন 'অল ইজ ওয়েল' বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই আমাদের কাজ।

মেজোপিসের কমেন্ট্রি

মেজোপিসের সঙ্গে খেলা দেখতে বসলে শুভর খেলাটা আর দেখা হয় না, পিসের কমেন্ট্রিতে কান রেখেই সময় কেটে যায়। সমস্যা হলো পিসেমশাইয়ের ব্যক্তিত্ব যতটা তীক্ষ্ণ, অবজার্ভেশনগুলো ততটাই মোটা-দাগের। কাজেই চট করে "আরে থামো না পিসে" বলাও যায় না, আবার অযথা গালগল্পও সহ্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

ব্যাটার মিস করলে, পিসে বললে, "উইকেটে লাগলেই আউট ছিলো"। আরে বাবা, উইকেটে লাগলে আউট যে হবে সে'টা বলার কী দরকার।

স্টেপ করে কেউ ছক্কা হাঁকালে। পিসে; "স্টেপ আউট না করলে এই শটটা মারতে পারতো না বুঝলি। স্টেপ আউট করেছে তাই পারলে"। এ কথার প্রতিবাদ হয় না, মেনে নেওয়াও যায় না।

বোলার ওয়াইড বল করলে। মেজোপিসে জানালে যে বোলার রানআপ শুরু করার আগেই নাকি তাঁর মন বলছিল যে এ'বারে ওয়াইড দেবে। পরের বলে কী হবে মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলবে "পরের বলের ব্যাপারে ঠিক ফিলিংটা আসছে না। ইনস্টিঙ্কট সবসময় কাজ করে না রে"।

কেউ ছয় মারলে। "আরে তোর রোল ধরে খেলার"। ঠিক আছে, মেনে নিলাম। পরের বলেই ব্লক করলে। "আরে ধরে খেলবি মানে কি রানই নিবি না"?

শুভ ভাবছে হয় ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দেবে অথবা পরিবার-সহ পিসির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে। কিন্তু দিনের পর দিন এই "ভালো না খেললে জেতা মুশকিল" ধরণের মন্তব্য শুনে আর খেলা হজম হচ্ছে না।