Sunday, January 18, 2026

পান সে পানসে নয়


আমার পানের দোকান ভালো লাগে। সিগারেট খাই না, মশলাপাতির দিকেও ঝোঁক নেই। মাঝেমধ্যে ওই মিষ্টিপান। কিন্তু এই পানদোকানের ভিড়ে গিয়ে দাঁড়ানো বেশ তৃপ্তির। এ চাইছে কলকাত্তা সাদা, ও চাইছে ফ্লেক। এ ফলাও করে বলছে জর্দার কোড তো এ চাইছে মশলা এলাচ। ব্যাস্ত পানওলা, আত্মবিশ্বাসী খদ্দেরের দল। আর চমনবাহার, গুলকন্দ, পানমশলার বাহারে সুবাস মাখানো বাতাসে সিগারেটের কড়া গন্ধ এসে মিশছে।

আমি দেখেছি, দুঁদে পানওলাদের আঙুল চলে অসাধারণ দ্রুততায় অথচ তাঁদের মুখ শান্ত ও নিস্পৃহ। মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। এই মুগ্ধতার জেরে হপ্তায় খানদুয়েক মিষ্টিপান ঠেকানো যাচ্ছে না। পানদোকানের ভীড়ে আমারও যে একটা জরুরী ভূমিকা আছে, সে'টা বেশ টের পাচ্ছি।

Friday, January 16, 2026

ভালো কোয়ালিটির মনখারাপ

- বুঝলে ভাইটি , ভালো কোয়ালিটির মনখারাপ আজকাল আর সহজে দেখা যাচ্ছে না।
- মন খারাপের কোয়ালিটি? বিনোদবাবু, দু'পাত্তর চড়িয়েছি আমি, আর নেশাগ্রস্ত কথা বলছে আপনি।
- আহা, এই যে মুচমুছে বেগুনি, এর মধ্যে ইন্টক্সিক্যান্ট নেই বলছ? তবে আমারকথাটা তলিয়ে দেখো। যা দিনকাল পড়েছে, মনখারাপকে যে একটু নারচার করবে তার উপায় নেই।
- মনখারাপ, তার আবার নারচার। তার আবার কোয়ালিটি।
- ও মা। গামছা আর ন্যাতা কি এক হলো?
- মনখারাপ ব্যাপারটাই তো নেগেটিভ।
- এই যে সুরাপান করছ ভায়া, সবই জলে যাচ্ছে। মনখারাপ যদি অত নেগেটিভই হবে তবে সঙ্গীত সাহিত্য সবই মিছে। তবে ওই, মনখারাপ হাই কোয়ালিটির না হলে সবই মাটি। আর সে'খানেই বিস্তর সমস্যা বুঝলে। এত ভেজাল চাদ্দিকে।
- ভেজাল কী'রকম?
- এই ধরো একটা নধর মনখারাপের কারণ পাওয়া গেল। সে'টাকে খেলিয়ে খেলিয়ে চোখে ছলছল ভাব আনতে হবে। ভ্যাঁ ভ্যাঁ মার্কা বেহেড কান্না নয়, ভারি শ্যামল মিত্র লেভেলের ছলছল হতে হবে বুঝলে। দুঃখের ডিস্কো ব্যাপারটা বড্ড লাউড। আমার বুকে তা'তে চোট লাগে। ওই যা বলছিলাম, শ্যামল মিত্রয়েস্ক ছলছল দরকার। একটু আধো-অন্ধকারের খোঁজ করতে হবে। তা'ছাড়া, দেখবে মনখারাপের কোয়ালিটি ভালো হলে সঙ্গীতবোধ আপনা থেকেই ধারালো হয়ে যায়। সে'টাই নিয়ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, জেনুইন মনখারাপগ্রস্ত মানুষ কখনো ছেঁদো কথার দিকে ঘেঁষতে পারে না। যা কিছু গভীর, যা কিছু সুন্দর; সে'দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁর কোন উপায় নেই। তাই বলছিলাম, মনখারাপ টের পেলে সে মনখারাপের মাথায় হাত বুলিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। তাকে চাবকে সিধে করতে চাইলেই সমস্যা।
- কী'রকম সমস্যা?
- ওই, মনকেমনকে সামাল না দিতে পারলে ছলছলের বদলে বিরক্তি ও বিরক্তির পর জমাট রাগ। দুঃখকে ডিসিপ্লিন না করতে পারলে সে বাবাজি মাথায় উঠে নাচতে শুরু করে। সেই আগডুমবাগডুমে ছলছল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেখানে সঙ্গীত মিইয়ে যায়, সাহিত্য শুকিয়ে যায়। মনখারাপের সে এক বিশ্রী ওয়েস্টেজ।
- ওয়েস্টেজ ব্যাপারটা খুবই খারাপ।
- খুবই খারাপ ভায়া। খুবই খারাপ। ভালো একটু মনখারাপ যদি গ্রিপ করতে পারতাম ভাইটি, উতরে যেতাম।

ঝুনুর বাবা, মান্তুর বোন

- ঝুনু? এসেছিস?
- উফ! বাইরে কী বৃষ্টি পিসি।
- ভিজে গেছিস নিশ্চয়ই!
- ভিজে কাক। তোমার গামছাটা নিলাম।
- দেখতে পাই না তো কী, ঝমঝম শুনছি কখন থেকে আর ভাবছি আজ নির্ঘাত ঝুনু ভিজেটিজে আসবে।
- শ্যামলীর মাকে বলছিলে তো ওঁর সেই স্পেশ্যাল বাটিচচড়িটা করতে?
- দ্যাখ না, ঢাকা দেওয়া আছে টেবিলে। আর পাবদার ঝাল, তুই আসবি শুনে সে নিজেই নিয়ে এসেছিলো।
- বহুত খুব। তবে তুমি আবার উঠতে যেও না। আমিই বেড়ে নেবো।
- হ্যাঁ রে, মান্তু বলছিল তোর ছুটি বাতিল হয়ে গেছে?
- বাবা ইতিমধ্যেই সে কথা জানিয়ে দিয়েছে?
- মা মরা ছেলে, ঝুনু তোকে চোখে হারায়।
- সে সিম্পটম তো দেখি না। যখনই দেখা হয় কেমন একটা খ্যাঁকখ্যাঁকে মেজাজ।
- সে ওর ধাঁচই তেমন। তা হ্যাঁ রে, তোর ছুটি বাতিল কেন হল?
- বর্ডারে কিছু আনরেস্ট, তাই আর কী...।
- যুদ্ধটুদ্ধ লাগবে নাকি? খবরে তো রোজই দুঃসংবাদই শুনি।
- কেন দ্যাখো ও'সব। তার চেয়ে তোমার বাংলা সিরিয়ালগুলোই ভালো। বাহ্‌, চচ্চড়িতে আজ বেড়ে ঝাল দিয়েছে তো শ্যামলীর মা।
- নিশ্চয়ই হাত না ধুয়েই লেগে পড়েছিস।
- বৃষ্টিতে ভিজলাম তো।
- ঝুনু, বাবাকে ফোন করিস নিয়মিত। কেমন?
- তোমায় ফোন করতে বললে না তো?
- বাপটাকে একটু দেখিস, মান্তুর যত হেডমাস্টারি সব হাবেভাবে, তোর ব্যাপারে ও আদতে কিন্তু ভারি নার্ভাস।
- বাবা? নার্ভাস? হাসালে পিসি।
- ফোন করিস মান্তুকে। কেমন?
- বাবাকে তুমি প্যাম্পার করেছ চিরকাল। অথচ বাবা তোমার সেই স্নেহ-ফেহকে কখনই পাত্তা দেয়নি।
- ডেঁপোমি না করে আমি যা বলছি মনে রাখিস। হপ্তায় অন্তত দু'বার কল করিস বাবাকে। আমায় রোজ রোজ ফোন করে বাজে খেজুর না করলেও চলবে।
- তোমার কথা শুনলে মাঝেমধ্যে মনে হয় তুমি বাবার দিদি না, মা। এত বায়াসড যে কেউ হতে পারে মাইরি পিসি...।
- দেখতে পাই না, হাঁটাচলার শক্তিও প্রায় গেছে বললেই চলে। ওই যে বায়াস না কি বললি, ওটাই আমার শক্তি। ওঁর জন্যেই টিকে আছি। ওই বায়াসই আমার চোখের দৃষ্টি, আমার হাঁটুর জোর।
- তা এত যে চিন্তা তোমার ভাইয়ের জন্য, সে কতবার তোমার খোঁজ করতে আসে?
- সে হিসবে করলে কি আর বায়াসড হতাম রে ঝুনু? সে বায়াস না থাকলে টিকে থাকতাম কী নিয়ে?
- পাবদাটাও টেরিফিক।
- চারটে মাছ আছে। সবকটা খাবি।
- পিসি, তোমার টিফিন বাক্স একটা দিও। একটা বাবার জন্য নিয়ে যাব।
- যাস।
- পিসি, ফোন কিন্তু তোমাকেই বেশি করবো।
- সে কি আর আমি জানি না?

মনমোহিনীর জানালা


মনমোহিনীর জানালার সঙ্গে সম্পর্কটা বড় মজবুত। এমনিতে হাবেভাবে সে বড়ই চঞ্চল, দুদ্দাড় করে গোটা বাড়ি মাথায় তুলছে। এই খামোখা উৎসাহে লাফাচ্ছে, তো এই অকারণ আনন্দে গড়াগড়ি যাচ্ছে।

কিন্তু সে'টা তার বাইরের পরত। নিপাট শান্ত ভিতরটা বেরিয়ে আসে সে যখন জানালার পাশে এসে বসে। তখন সে নরম। মধুবাবু কাছে এসে বসলে সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবে, ওই একটা "এসেছ? এসো" ভাব। তারপর ফের জানালার বাইরে চোখ। গাছের পাতার ঝিরঝিরে মুভমেন্ট যে চোখের জন্য এত মোলায়েম সে'টা মধুবাবুকে শিখিয়েছে মনমোহিনী। দেওয়াল বেয়ে পিঁপড়েদের হেঁটে যাওয়াও যে এত 'সুদিং', সে'টা মধুবাবু এদ্দিনে বুঝতে পেরেছেন। নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় উঠোনে ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটি, অদূরে রাস্তায় মানুষজনের হেঁটে যাওয়া। দু'মিনিট দেখলে মনে হয় সমস্তটাই এলোমেলো, র্যান্ডম। মিনিট দশেক সে'দিকে তাকিয়ে থাকলে বিরক্তি আসে। কিন্তু একটানা মিনিট কুড়ি তাকিয়ে থাকার পর মনের মধ্যে প্যাটার্নটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; অতি র্যান্ডম দুনিয়ায় প্যাটার্ন চিনতে পারার মত আরামদায়ক ব্যাপার খুব কমই আছে। সে আরাম মধুবাবু চিনেছেন জানালাপ্রেমি মনমোহিনীর থেকে।

বাড়ির এই জানালাটার একটা নাম রেখেছেন মধুবাবু; "নেটফ্লিক্স"।

স্বপ্নরীল

স্বপ্নে দেখলাম আমাদের স্বপ্ন ডাইরেক্টলি টেনে নিয়ে রীল হিসেবে প্রকাশ করছে ফেসবুক। আর হয়েছে কী; আমার একটা মামলেট বানানোর স্বপ্ন রীল ট্রাম্পের সমস্ত রীলের চেয়ে বেশি লাইক পেয়েছে। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে, ট্রাম্প সোফাসমেত আমায় ওয়াশিংটনে তুলে নিয়ে গেছে।

"কী ব্যাপার ভাইটি, এমন রাষ্ট্রবিরোধী স্বপ্ন দেখার তুমি সাহস পেলে কী করে"? স্পষ্ট বাংলা। যা শুনে স্বপ্নের আমি তো থ, "চুপ করে থাকলে পার পাবে না। চটপট জবাব দাও"।

"আমি তো আমেরিকার সিটিজেন নই স্যার। কাজেই আমার স্বপ্ন আপনার রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে না"।

"ওই কে কোথায় আছিস এ ব্যাটার দেশকে আমাদের বাহাত্তর নম্বর রাজ্য হিসেবে জুড়ে দে। দিয়েছিস? দিয়েছিস তো? ভেরি গুড। হ্যাঁ, কী বলছিলে"?

"বলছিলাম মামলেট রাষ্ট্রবিরোধী কেন"?

"রবীন্দ্রনাথ কি মামলেট খেতেন"? স্পষ্ট উৎপল দত্তের কণ্ঠস্বর নকল করে বললেন, আমি রবি ঘোষের মত বিব্রত হলাম।

"রবীন্দ্রনাথকে তো আপনি গত পরশু ব্যান করেছিলেন আপনার থেকে একটা নোবেল বেশি পাওয়ার অপরাধে। অতএব তাঁর মামলেট খাওয়া না খাওয়ায় কী এসে যায় বলুন"।

"এই কে কোথায় আছিস। একে মিউট কর"। মার্কিন টেকনোলজির বহর দেখে আমি তো হতবাক, সত্যিই কথা বন্ধ হয়ে গেল আড়ালে কেউ কোনো সুইচ টেপায়।

"হ্যাঁ, যা বলছিলাম", ট্রাম্প বলা শুরু করলেন, "এই যে তুমি আমার হাতে-পায়ে ধরে এতক্ষণ কান্নাকাটি করলে তাতে আমার মন গলেছে"।

আমি প্রতিবাদে মাথা নাড়তে গেলাম। টের পেলাম মাথা-ঘাড়ও মিউট করে দিয়েছে। কোথায় লাগে চীনের টেকনোলজি।

"আর এই যে তুমি তোমার স্বপ্নগুলো আমায় সতেরোটাকায় বেচে দিতে চেয়ে অনুরোধ উপরোধ করছ, তা'তে আমি আর না বলতে পারছি না"।

আমি হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ করতে গেলাম। টের পেলাম গোটা শরীর অবশ।

"জানো", ট্রাম্প বেশ ইয়ারদোস্তির সুরে বললেন, "গতকাল আমি বাংলায় একটা গান লিখে পোস্ট করলাম। জীবনে কী পাব না, ভুলেছি সে ভাবনা। আড়াই কোটি লাইক এলো আড়াই সেকেন্ডে। বিউটিফুল না? যাক গে , শোনো। আমায় না বলে তুমি আর স্বপ্ন দেখো না, কেমন"?

বাহাত্তর বার না বলার চেষ্টা করলাম অথচ গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। কিন্তু যেই বলতে চাইলাম "তাই হবে স্যার", আমার গলা বেয়ে বাহান্নটা অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো।

মনোহরবাবুর বিকেল



বেশিরভাগ বিকেলে ওই কোণের চেয়ারটাতে একা এসে বসবেন মনোহরবাবু। এক কাপ চা নিয়ে মন দেবেন খবরের কাগজে। মনু ছাড়া অন্য কোনো ওয়েটার তাঁর অর্ডার নেবে না। অবশ্য অর্ডার বলতে দু'কাপ চায়ের মাঝে একটা মাখনরুটি। মনোহরবাবুর ভাগ্য ভালো এ রেস্টুরেন্ট বয়স ও জীর্ণতার দিক থেকে প্রায় তাঁরই মত; অতএব এ'খানে তেমন ভিড় হয় না। আর কোণাটা যেহেতু মাত্রাতিরিক্ত ঘিঞ্জি তাই সে টেবিল খালিই থাকে। কালেভদ্রে সে টেবিল খালি না থাকলে মনোহরবাবু পাশের পার্কের বেঞ্চিতে বসে দিনের বাসি কাগজটা পড়ে শেষ করেন।

এখানে চা যে খুব ভালো বানায় তা নয়। কিন্তু অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে মন চায় না। খবরের কাগজেও আজকাল আর খবর কই, শুধুই বিজ্ঞাপন আর রাবিশ। কিন্তু ওই, অভ্যাস ছেড়ে কোথায়ই বা যাবেন। গান শুনতে ভালো লাগে না, টিভি তো দু'চোখের বিষ। অহেতুক অগভীর আড্ডা ব্যাপারটাকে কিছুতেই নিজের অভ্যাসের গণ্ডিতে টেনে আনতে পারেননি মনোহর। অতএব একপ্রকার বন্ধুহীন জীবন, অবশ্য এ'টা তাঁর কাছে স্বস্তির বলে মনে হয়।
মনোহরবাবু অভ্যাসপ্রিয়। আর তাঁর প্রিয়তম অভ্যাস হলো রাণুর কথা ভাবা। রাণুর না থাকাটাও অবশ্য তাঁর অভ্যাসের লিস্টে ঢুকে গিয়েছে। কী আশ্চর্য, আচমকা রাণু ফিরলে কি অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটবে? দ্বিতীয় চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময় কাগজটা মুড়িয়ে সরিয়ে রাখেন। তখন এইসব হিজবিজ ভাবনা মনে আসে। মনু রোজ এসে "সত্তর টাকা" বলা মাত্র ভাবনার সুতো কেটে যাবে। সে সুতো কেটে যাওয়াটাও অভ্যাসের ফর্দে ঢুকে গেছে। এ টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারে রাণু বসেছে কয়েকবার, হলুদ আলোয় তাঁকে মনকেমনভাবে সুন্দর লাগতো। "মনকেমনভাবে" কথাটা সম্ভবত বিটকেল বাঙলা, রাণুর অভ্যাস ছিলো এ'টা বলা। রাণু থাকতে কতবার শুধরে দিয়েছেন। রাণু নেই, তাই তাঁর ভুলচুলগুলোকে বড় আপন বোধ হয়, মনকেমনভাবে আপন। হলুদ আলোয় রাণুর না থাকাটায় এই রেস্টুরেন্টের বিকেলগুলো ন্যালাক্যাবলা হয়ে পড়েছে। হঠাৎ যে আজ কী হলো, মনুর "সত্তর টাকা"র উত্তরে পকেট হাত না দিয়ে মনোহর বললেন, "আর এক কাপ চা দিও মনু"।

সাহাবাবুর রেসিগনেশন

সহকর্মী হিসেবে সাহাবাবুর তুলনা হয় না৷ কর্মঠ, সৎ, এবং হাসিখুশি। কাজে ফাঁকি একদম বরদাস্ত করতে পারেন না, অথচ কী ভাবে যেন ইঁদুরদৌড় থেকে গা বাঁচিয়ে দিব্যি কর্মজীবনটা কাটিয়ে দিলেন৷ গপ্প-আড্ডায় মাঝেমধ্যেই বলতেন, "কম্প্রোমাইজ করবো না কোনোদিন বুঝলে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করতে রাজি কিন্তু নিজের হিসেবে, নিজের মত করে কাজ করব। জোরজুলুম হুজ্জুতি কিছুতেই মেনে নেবো না। আর যে'দিন দেখব নিজের মত করে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, সে'দিন? চিঠি রেডি রেখেছি"। এই বলে নিজের টেবিল ড্রয়ার খুলে একটা ভাঁজ করা কাগজ দেখিয়ে মুচকি হাসতেন ভদ্রলোক। সাহাবাবুর ড্রয়ারে মজুদ রেসিগনেশন লেটারকে আমরা বলতাম সাহাস্ত্র। সাহাবাবু মুচকি আসতেন।

আজ ভদ্রলোকের অফিসের শেষ দিন। সন্ধেয় ফেয়ারওয়েল ফাঙশন। দুপুরের দিকে আমি আবদার করলাম, "ও চিঠির তো আর কোনো কাজ নেই। আজ আমাদের দেখান না"। নির্দ্বিধায় সে কাগজ ড্রয়ার থেকে বের করে আমায় দিলেন সাহাবাবু। সে ভাঁজ খুলে দেখলাম সে'টা মাসকাবারির ফর্দ। চাল, ডাল, তেল, নুন, আটা, মশলা আর যা কিছু আটপৌরে। আমায় হতবাক দেখে ভদ্রলোক অমায়িক সুরে বললেন, "ব্রাদার। ওই লিস্ট আমি প্রতি মাসের পয়লায় বানাই। যখনই মনে হয়েছে নিজের মত করে কাজ করাটা কাজের চেয়েও জরুরি, তখনই একবার টুক করে এই কাগজ খুলে নজর দিয়েছি। ম্যাজিকের মত কাজ দিয়েছে"।

"তা'হলে এ'টা রেসিগনেশন লেটার নয়"?

"রেসিগনেশনই তো ভায়া। তবে নিজের কাছে। সাহাস্ত্র টু কন্ট্রোল দ্য গ্রেট সাহা।।রেসিগনেশন টু সেল্ফ"।

সন্দীপনের ভ্যান


সন্দীপন ভ্যান চালান। এ মাল ও মাল, এ'খান থেকে ও'খান। ভোর থেকে সন্ধে, হপ্তায় ছ'দিন। বাড়তি রেটে পয়সা দিলে রোববারও বেরিয়ে পড়তে আপত্তি নেই তাঁর। টাকা জিনিসটা দরকারি, দরকারকে উড়িয়ে দেওয়ার বিলাসিতা সন্দীপনের না-পসন্দ। তবে সে দরকারটার বাইরে গিয়ে সন্দীপন গান ভালোবাসেন, ভালোবাসেন গুনগুন করতে। কিশোরকুমারের একটা ছবি তাঁর বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো, সে ভালোবাসাটা নেহাত দেখনাই নয়।

ফুডডেলিভারি অ্যাপের দুনিয়ায় মাঝে একবার ঢুঁ দিয়েছিলেন। দু'পয়সা বেশি কামিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগ ছিল। এবং সেই প্রতিনিয়ত দশ মিনিটের যুদ্ধে কিশোরকুমার বিদেয় নিয়েছিলেন। বিদেয় নেওয়াটা বড় কথা নয়। সন্দীপন আজও ভেবে অবাক হয়ে পড়েন যে কিশোরকুমারের সেই চলে যাওয়াটাকে পাত্তা দেওয়ার সময়ও তখন তাঁর হাতে ছিলো না।

টের পেয়েছিলেন আচমকাই। দশ মিনিটের হুড়মুড়ে একদিন তাঁর স্কুটারের চাকা ফসকে সে একটা বিশ্রী ব্যাপার। ছ'মাসের কাজ না থাকার সময় কিশোর ফিরেছিলেন। পেটের খিদে সে ভদ্রলোকের গানগুলোকে তেমন ম্লান করতে পারেনি দেখে বেশ অবাক হয়েছিলেন সন্দীপন। বেশ একটা নিশ্চিন্দি ভাবও টের পেয়েছিলেন।

সন্দীপন ভ্যান নিয়ে দিব্যি আছেন। কিশোরে ফিরেছেন। আর আবিষ্কার করেছেন যে বোগানভেলিয়া তাঁর বড় প্রিয়।

Saturday, January 3, 2026

মুক্তিপণ

- আর কতবার বলবো চীফসেক্রেটারি মশাই! আমার কোনো দাবীদাওয়া নেই। সোজা কথা; এই যে বাইশজন মানুষ, এ'দের মধ্যে অন্তত ছ'জনকে আমি খুন করব। বাকিদের ছেড়ে দেবো। আর আপনার পুলিশ বা আর্মি কোন রকম ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করছে আঁচ পেলেই স্যাট করে সব্বাইকে উড়িয়ে দেবো।

- কোন ছ'জন আপনার টার্গেট সে'টা অন্তত জানা দরকার।

- সে'টা এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি জানেন। আর ঘণ্টা দশেকের মধ্যেই আশা করি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারবো। আমি রিসার্চ করছি।

- আপনি শহরের সবচেয়ে বড় হাইরাইজের রুফটফ কফিশপে মাল্টিপল ফায়্যার আর্ম নিয়ে ঢুকে বাইশজনকে হোস্টেজ নিয়েছেন। স্টেট লেভেল সেন্ট্রাল লেভেল সমস্ত এজেন্সিকে আপনি একা হাতে পরাস্ত করেছেন। উঁচু মহল থেকে ইন্সট্রাকশন এসেছে আপনার সঙ্গে নেগোশিয়েট করার। যতটা সম্ভব আপনার দাবী মেনে নিয়ে সিচুয়েশন ডিএস্কালেট করার। অথচ আপনি বলে চলেছেন আপনার কোন দাবী নেই। কোনো দলের হয়ে আপনি নাকি এই কাজ করেননি...।

- দল মানে কী? আমায় কি টেররিস্ট ঠাউরেছেন নাকি? না মানে, আমি যেটা করছি সে'টা ডেফিনিটল সন্ত্রাস। তবে আমার কোনো পলিটিকাল মোটিভ নেই।

- এ'টা আমায় বিশ্বাস করতে বলছেন মিস্টার সামন্ত? আপনি খেলিয়ে খেলিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন না?

- আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাসে আমার কিছু এসে যায় না মিস্টার সামন্ত। বিভ্রান্তিটাও আপনাদের মনের মধ্যে। আমি তো বলেছি। ছ'জনকে খতম করবো। তারপর সারেন্ডার। আপনারা বেচাল চাললে বাইশজনই শেষ।

- কিন্তু কেন? মিস্টার সামন্ত কেন? আপনি নেশাগ্রস্ত নন। মিসগাইডেড ইয়ুথ নন। আপনি ইনসিস্ট করছেন কোনো পলিটিকাল মোটিভ আপনার নেই। তবু এতগুলো নির্দোষ মানুষকে মেরে আপনি কী পাবেন?

- চারদিকে এত আনন্দ। এত আলো। এই একটানা উৎসব। এ'সব আমার সহ্য হচ্ছে না জানেন। আমার মধ্যে এত কষ্ট, এত গ্লানি, এত রাগ, এত হেরে যাওয়া; আর আমার আশেপাশের পৃথিবীটা নিজস্ব স্টাইলে হেলতে দুলতে গানে সিনেমায় আড্ডায় ফুর্তিতে এগিয়ে যাবে...এ'টা আমি মেনে নিতে পারছি না। এ'টা অন্যায়।

- আপনাকে একটু বিশদে বলতে হবে সামন্তবাবু। উই ক্যান হেল্প ইউ।

- এই দেখুন! আমি আপনার হেল্প চাইব বলে এ'খানে আসিনি। আমার হেল্প চাই না। অনুকম্পা চাই না। ওই কী বলে, এমপ্যাথি কম্প্যাশন কিচ্ছু চাই না। আমি চাই একটু গোলমাল। আমার জীবনের সমস্ত সম্পর্ক ভেসে গিয়েছে, জীবনটা জাস্ট ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছে। বুকের মধ্যে ক্রমাগত অসহ্য কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে। প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হচ্ছে বুক-মাথা ফেটে বেরিয়ে যাবে; এমনই বিষাক্ত যন্ত্রণা। এই দুঃখ নিয়ে আমি আর পারছি না জানেন। আর এই দুঃখের চারপাশে মানুষের এই বেহায়া আনন্দ আর দৈনিক ভাঁড়ামো; এ'গুলো আমার বড় অশ্লীল মনে হচ্ছে। কিছু একটা মারাত্মকভাবে গুঁড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত গায়ের জ্বালা জুড়বে না যেন। কিছু একটা ভয়ানক না করে ফেললে এই দুঃখ আমি আর বইতে পারবো না।

- মিস্টার সামন্ত...ওই মানুষগুলোর কোন দোষ নেই কিন্তু...।

- দোষ আছে। দে আর ওয়ে টু হ্যাপি। এত আনন্দ বরদাস্ত করা সম্ভব নয়। আমি বোঝার চেষ্টা করছি এদের মধ্যে সবচেয়ে আনন্দে কোন ছয়জন আছে। তাঁরা এখান থেকে বেঁচে বেরোবে না।

- সামন্তবাবু। আপনার দুঃখ কী আমরা জানি না...তবে...।

- তবে কী? আপনারা জানেন না। আর জানলেও বুঝবেন না। আমার রিডেম্পশন নেই। এ দুঃখ থেকে মুক্তি নেই। একটা বিস্ফোরণ না ঘটলে...।

- মিস্টার সামন্ত। প্লীজ।

- কী প্লীজ। সেক্রেটারি সাহেব, আপনি জানেন সন্তানশোক কী জিনিস? জানেন আপনি? জানেন না। আমি আপনার ব্যাপারেও রিসার্চ করেছি মোবাইলে। আপনি কিছুই জানেন না। হাসিখুশি পরিবার। আনন্দ চারদিকে। প্রেম। স্নেহ। ভালোবাসায় ভরপুর একটা সংসার। ছবির মত। গ্রিটিংস কার্ডের মত। স্ত্রী, পুত্র। গতমাসে আন্দামান ঘুরতে গেছিলেন না? আমেজিং ভ্যাকেশন শটস। আর কেরিয়ারে তো কেল্লা ফতে করেই দিয়েছেন। তবে আমি চেষ্টা করছি আমার এই কফিশপ বন্দীদের মধ্যে আপনার চেয়েও আনন্দে থাকা কিছু মানুষকে খুঁজে বের করতে। হেহ্‌।

- হেহ্‌।

- অমন মুরুব্বির মত হেহ করলেন যে বড়।

- মিস্টার সামন্ত। আপনার রিসার্চ নির্ভুল। প্রেম, স্নেহ, ভালোবাসায় ভরপুর একটা সংসারের মধ্যে আমি সত্যিই আছি। প্লাস, কেল্লা ফতে কেরিয়ার।

- সো শাট আপ অ্যান্ড গেট লস্ট।

- হ্যাঁ। এ'বার ফোন রাখবো। একটা কথা বলে রাখি। মিস্টার সামন্ত, এ কথা সত্যি যে আমি সন্তানশোক কী জিনিস তা জানি না। জানলে হয়তো আমার চারপাশের এই আনন্দমগ্ন পৃথিবীকে আমিও ঘেন্না করাম। কিন্তু এই যে আপনার আনন্দ দেখে দুঃখ বিচারের অভ্যাস, এ আপনার মূর্খের স্বর্গে বাস।

- এই, আমায় জ্ঞান দেবেন না।

- আপনার কাছে দু'টো রাইফেল আছে। একটা পিস্তল কাজেই আপনাকে জ্ঞান দেওয়ার দুঃসাহস আমার নেই। তবে অন্য একটা কথা বলে যাই। জানেন মিস্টার সামন্ত, শত কর্মব্যস্ততাতেও আমি কোনদিন আমার মেয়ের কেমো সেশন মিস করিনি। একমাত্র মেয়ে তো। আই মীন, এতদিন করিনি। আজ প্রথম মিস করলাম আপনার এই পাগলামির জন্য। সত্যিই আমি সন্তানশোক আপনার মত করে জানি না। আপনি আমাদের আন্দামান ভ্রমণের কথা জানলেন রিসার্চ করে। ফেসবুকে ইন্সটাগ্রামে আনন্দ দেখলেন। সঠিক দেখলেন। কিন্তু সামন্তবাবু, ডাক্তারের ওয়ার্নিং, যে আর মাসখানে পর থেকে সম্ভবত কোন ট্র্যাভেলিং চলবে না, সে'টার বিজ্ঞাপন আমি কী'ভাবে দেবো? আপনার হোস্টেজরাও নিজেদের যন্ত্রণার বিজ্ঞাপন দেবে কী করে? আমি সন্তান শোক জানি না। কিন্তু শেষবারের মত আপনার সন্তান সমুদ্র দেখছে আপনার কাঁধে মাথা রেখে, এ যন্ত্রণা আপনি জানেন? আপনার সব বন্দীদের ফেসবুক প্রোফাইল দেখুন। আনন্দ দেখুন। আর ভেবে যান আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে আর যাবতীয় দুঃখের ওপর অধিকার আপনার একার।

- মিস্টার সেক্রেটারি...। আই অ্যাম সরি।

- যাক গে। শুনুন। আমাদের স্নাইপারা ফাইনালি আপনাকে টার্গেটে আনতে পেরেছে। এইমাত্র কনফার্মেশন পেলাম। এবার ভালোয় ভালোয় সারেন্ডার করে বন্দুক ফেলে হাত ওপরে তুলে বেরিয়ে আসুন। নয়ত খেলা শেষ। আপনার আঙুল ট্রিগারের দিকে গেলেই...।

- আপনার লোকজনকে পাঠিয়ে দিন। এদের আমি ছেড়ে দিচ্ছি।

- থ্যাঙ্কিউ।

- সেক্রেটারিদাদা, আপনার স্নাইপারদের আমি ভয় পাইনা। কিন্তু আমি আর পারছি না জানেন।

- আমি জানি কিন্তু। বিশ্বাস করুন আমি জানি। কেমন? আমি জানি। আসুন। আমি আছি তো। আসুন।